ত্রিপুরসুন্দরী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(ললিতা-ত্রিপুরসুন্দরী থেকে পুনর্নির্দেশিত)
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
শ্রীচক্রের উপর বামপদ স্থাপন করে সিংহাসনে উপবিষ্ট শ্রী ললিতা-ত্রিপুরসুন্দরী (পার্বতী); হাতে সনাতনী প্রতীক ইক্ষুদণ্ড, পুষ্পবাণ, পাশ-অঙ্কুশ।
দেবী ত্রিপুরাসুন্দরীর চিত্র, ঊনবিংশ শতাব্দী
চতুর্ভুজা ললিতার রূপে পার্বতী, সঙ্গে পুত্র গণেশস্কন্দ,ওড়িশা, পূর্ব ভারত। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত একাদশ শতাব্দীর ভাস্কর্য।

ত্রিপুরসুন্দরী বা ষোড়শী বা ললিতা [১] এক হিন্দু দেবী। ইনি দশমহাবিদ্যার অন্যতমা। ত্রিপুরসুন্দরী রাজরাজেশ্বরী নামেও পরিচিতা।

ত্রিপুরসুন্দরীর ষোড়শী রূপটি ষোড়শবর্ষীয়া এক বালিকার রূপ। এই রূপ ষোড়শপ্রকার কামনার প্রতীক। ষোড়শীতন্ত্রে ত্রিপুরাসুন্দরীকে "শিবের নয়নজ্যোতি" বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি কৃষ্ণবর্ণা ও শিবোপরি উপবিষ্টা। শিব ও ষোড়শীকে শয্যা, সিংহাসন অথবা ব্রহ্মা, বিষ্ণু, রুদ্রইন্দ্রের মস্তকোপরিস্থিত বেদিতে উপবিষ্ট রূপে কল্পনা করা হয়।

ললিতা শ্রীবিদ্যা সংক্রান্ত অন্যতমা দেবী। ললিতা ধনুক, পঞ্চবাণ, পাশ ও অঙ্কুশধারিনী। পাশ-অঙ্কুশ বন্ধন ও মুক্তির প্রতীক, পঞ্চবাণ পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের প্রতীক এবং ইক্ষুধনু মনের প্রতীক।

ভারতীয় রাজ্য ত্রিপুরার নাম ত্রিপুরসুন্দরীর নাম থেকে ব্যুৎপত্তিলাভ করেছে। উদয়পুর শহরের অদূরে রাধাকিশোরপুর গ্রামের নিকট একটি পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির দেবীর প্রধান মন্দির।

কাশ্মীরি পণ্ডিতরা ত্রিপুরাসুন্দরীর পাঁচটি স্তবগান সংকলন করেছেন। পঞ্চস্তবী নামে পরিচিত এই স্তবগানগুলি উক্ত সম্প্রদায়ের মধ‍‍্যে আজও জনপ্রিয়।

পৌরাণিক উপাখ‍্যান

ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ মতে,দেবী ললিতা ত্রিপুরসুন্দরী আদি পরাশক্তি। কামদেবের ভস্মোদ্ভুত ভণ্ডাসুর নামে অসুরকে বিণাশ করতে তাঁর আবির্ভাব ঘটে। একবার চিত্রকর্মা নামে রুদ্রগণের এক সেনাপতি খেলার ছলে কামদেবের ভস্ম দ্বারা এক পুত্তলিকা তৈরি করেন। চিত্রকর্মা তা মহাদেবের কাছে নিয়ে যান। মহাদেবের উদ্দেশ‍্য ছিল দুর্বোধ‍্য। পুত্তলিকাটিকে শিবের কাছে নিতেই তাতে প্রাণ সঞ্চারিত হয় ও এক বালকে পরিণত হয়। চিত্রকর্মা তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। সে বালকটিকে উপদেশ ও শতরুদ্রেয় মন্ত্র দান করেন এবং মহাদেবের তপস‍্যা করার পরামর্শ দেন। বালকটি মহাদেবের কঠোর তপস‍্যা করতে থাকে। মহাদেব তার তপস‍্যায় তুষ্ট হয়ে বর প্রার্থনা করতে বলেন। সে তখন বর প্রার্থনা করে যে, তার প্রতিদ্বন্দীর অস্ত্রের আঘাতে সে যেন আবদ্ধ না হয় এবং সে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর অর্ধ বল হরণ করে নিজের বল বৃদ্ধি করতে পারে। মহাদেব তাঁকে বরদান করেন এবং সাথে ষাট হাজার বছর রাজত্ব করার বর দেন। মহাদেব তখন প্রস্থান করলেন। সে বিস্মিত ও শঙ্কিত হল। পরে সব ভুলে গেল। ব্রহ্মা সকল কিছুর সাক্ষী ছিলেন। তিনি হতাশ হন এবং তাকে ভণ্ড ভণ্ড বলতে লাগলেন।কারণ, সে ধর্মচ‍্যুত হয়েছিল। তার মধ‍্যে আসুরিক প্রবৃত্তি দেখা দেয়। তাই তার নাম হয় ভণ্ডাসুর। কামদেবের অবশেষ ভস্ম থেকে তার দুই ভাই বিশুক্র ও বিশঙ্গের জন্ম হয়। পড়ে থাকা ভস্ম তিনশ' অক্ষৌহিণী সেনায় পরিণত হয়। শুক্রাচার্য সবকিছু শুনে তাদের গুরুর দ্বায়িত্ব পালন করেন।তিনি দৈত‍্যপ্রকৌশলী ময়কে মহেন্দ্র পর্বতের উপর এক পুরী নির্মাণ করতে বলেন। যার নাম হয় শোণ‍্যক পুরী। শুক্রাচার্য প্রতি ঘরে নিয়মিত যজ্ঞানুষ্ঠানের, বেদাধ‍্যয়ন ও তপস‍্যার পরামর্শ দেন।তিনি ভণ্ডাসুরকে শোণ‍্যক পুরের রাজা,বিশুক্র ও বিশঙ্গকে যুবরাজ পদে অভিষিক্ত করেন। ভণ্ডাসুরের সন্মোহিনী,কুমুদিনী,চিত্রাঙ্গী ও সুন্দরী নামে চারজন স্ত্রী ছিলেন। ভণ্ডাসুর তাদের থেকে ত্রিশজন পুত্র প্রাপ্ত হন।

একবার ভণ্ডাসুর তার ভাই ও অন‍্যান‍্য রাক্ষসদের নিয়ে বায়ুরূপ নিয়ে ত্রিলোকের সকল স্বর্গের দেবতা, মর্ত‍্যের মানুষ ও পাতালের নাগেদের দেহে প্রবেশ করে তাদের দেহ থেকে বীর্য, রস সহ অন‍্যান‍্য তরল পদার্থ শোষণ করে ও তাদের রূপ হরণ করে কুরূপ, নপুংসক ও শক্তিহীন করে তোলেন। তাদের মধ‍্যে আর একে অপরের প্রতি প্রেমভাব রইল না। তারা তখন ব্রহ্মাকে নিয়ে বিষ্ণুর কাছে গেলেন। বিষ্ণু ছিলেন যোগনিদ্রায় মগ্ন। পরে তারা বিষ্ণুর স্তব করে করে তাকে জাগরিত করে। বিষ্ণু তখন তাদের পরম পুরুষ মহাশম্ভুর তপস‍্যা করতে বলেন। তপস‍্যায় তুষ্ট হয়ে মহাশম্ভু দেবী আদি পরাশক্তিকে নিয়ে আবির্ভুতা হন। মহাশম্ভু ছিলেন মেঘের মতো কৃষ্ণবর্ণ। তার দক্ষিণ হস্তে শূল ও বামহস্তে নরকপাল। অন‍্যদিকে দেবী আদি পরাশক্তি ছিলেন চন্দ্রমার মতো কোমলাভা। তার হস্তে ছিল পুস্তক ও অক্ষমালা।মহাশম্ভু তখন বললেন যে তিনি সব অবগত। মহাপ্রলয় থেকে মহাশম্ভু ও অবন্তর প্রলয় থেকে বিষ্ণু রক্ষা করেন। তখন ভণ্ডাসুর সৃষ্ট কামপ্রলয় থেকে স্বয়ং আদি পরাশক্তি ললিতা ত্রিপুরসুন্দরী উদ্ধার করবেন। দেবতাদের তিনি দেবী ললিতার শরণাপন্ন হতে বলেন। দেবতারা কী করবেন তা জানতেন না।তখন তারা পুনরায় মহাশম্ভুর স্তব করেন। মহাশম্ভু তাদের মহাযজ্ঞ করতে বলেন। তিনি স্বয়ং হবেন যজ্ঞের হোতা এবং তার চিদাগ্নি হবে যজ্ঞের অগ্নি। শুষ্ক জল সমুদ্র হবে যজ্ঞের হোম কুণ্ড এবং অবশেষ ছয় সমুদ্র হবে যজ্ঞের ঘৃত। পঞ্চ সৃষ্টির সকল প্রাণী ও অগ্নি ব‍্যতীত বাকি পঞ্চতত্ত্ব হবে যজ্ঞাহুতি। অবশেষে দেবগণ সে যজ্ঞাগ্নিতে প্রবেশ করলে দেবী ললিতা চক্ররাজ রথে আবির্ভুত হবেন ও ভণ্ডাসুরকে নিধন করে কাম দেবকে পুনর্জীবীত করবেন। অবশেষে আরম্ভ হল সেই যজ্ঞের । দেবগণ সেই হোমকুণ্ডে প্রবেশ করলেন।

দেবগণ হোমকুণ্ডে প্রবেশ করতেই দেবী ললিতা ত্রিপুরাসুন্দরী হোমকুণ্ড হতে চক্ররাজ রথে আবির্ভুত হলেন। তিনি নিজের থেকে কামেশ্বর শিবকে সৃষ্টি করলেন। দেবী নিজের ইচ্ছাশক্তি থেকে পাশ, অঙ্কুশ, পঞ্চ পুষ্পবাণ ও ইক্ষুদণ্ড নির্মাণ করলেন। তিনি পুনরায় সৃষ্টিকার্য করলেন। তার বাম চক্ষু থেকে ব্রহ্মা ও লক্ষ্মী, দক্ষিণ চক্ষু থেকে বিষ্ণু ও পার্বতী এবং ঊর্ধ্ব চক্ষু থেকে মহাদেব ও সরস্বতী উৎপন্ন হল। দেবী ললিতা ব্রহ্মা ও সরস্বতীকে ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি, বিষ্ণু ও লক্ষ্মীকে ব্রহ্মাণ্ড পালন এবং মহাদেব ও পার্বতী প্রলয়কালে ব্রহ্মাণ্ড ধ্বংসের ভার দিলেন। দেবী তার কেশ হতে অন্ধকার, ত্রিনেত্র হতে চন্দ্র, সূর্য ও অগ্নি, কপালের সামনের অলঙ্কার হতে নক্ষত্রসকল, কপালের উপরের অলঙ্কার হতে নবগ্রহ, দশটি নখ হতে বিষ্ণুর দশ অবতার, ভ্রূ হতে দণ্ডবিধি, নিশ্বাস হতে বেদ, বচন হতে কবিত্ব ও ক্রিড়াসকল, স্তন হতে পর্বত, করতল হতে সন্ধ‍্যা, ঘাড়ের ত্রিরেখা হতে শাস্ত্রসমূহ, থুতনি হতে বেদাঙ্গ ও মন হতে তিনি সুখশক্তি উৎপন্ন করলেন। দেবী তার হৃদয় হতে বালাদেবীকে সৃষ্টি করলেন; ভণ্ডাসুরের ত্রিশ পুত্রকে বধ করেছিলেন। দেবী তার বুদ্ধি হতে শ‍্যামলা দেবী ও অহং হতে বারাহী দেবীকে সৃষ্টি করেন। শ‍্যামলা দেবীকে মুখ‍্যমন্ত্রী ও বারাহী দেবীকে সেনানায়িকা পদে অভিষিক্ত করা হয়। শ‍্যামলা দেবীকে মন্ত্রীনীও বলা হয়। দেবী তাকে তার অঙ্গুরীয় প্রদান করেছিলেন। ইনি ভণ্ডাসুরের ভাই বিশ্রুককে বধ করেন। দেবী তাকে গেয়চক্র রথ দান করেন। দেবী শ‍্যামলার হাতের পক্ষী থেকে দেব ধনুর্বেদ আবির্ভুত হয়ে দেবী ললিতাকে একটি দিব‍্য ধনুক দান করেন। অন‍্যদিকে দেবী বার্তালী (বারাহী) দেবী ললিতা তার ভ্রূদেশ হতে উৎপন্ন গদা দান করেন। দেবীর অন‍্য নাম দণ্ডনাথা। দেবী তাকে কিরিচক্র নামক রথ দান করেন। দেবী বারাহীর দেহরক্ষী দেবী তিরস্কারিণী বাল্হককে হত‍্যা করেন। ইনি বিশঙ্গকে নিধন করেন। দেবীর পাশ হতে সম্পতকরী, অঙ্কুশ হতে অশ্বরোধা ও গণ্ডদেশ হতে নকুলেশ্বরী দেবী আবির্ভুতা হলেন। মহাযুদ্ধে এরা ভণ্ডাসুরের জামাতাকে হত‍্যা করেন। দেবী সম্পতকরী দুর্মুদ ও অশ্বরোধা তার জ‍্যেষ্ঠ ভ্রাতা কুরুন্দকে হত্যা করেন। দেবী নকুলেশ্বরী রণসম্বরীকে গড়ুরাস্ত্রে হত‍্যা করেন। দেবী তার রথের আট চক্র হতে আট দেবতাকে সৃষ্টি করেন। দেবী তার মৃদু হাস‍্য হতে গণেশকে সৃষ্টি করেন। গণেশ বিঘ্নেশ্বর যন্ত্র নাশ ও গজাসুরকে হত‍্যা করেন। অবশেষে মহাযুদ্ধে দেবী ললিতা নারায়ণাস্ত্র ও পাশুপতাস্ত্র প্রয়োগে কুটিলাক্ষসহ সমগ্র অসুরসৈন‍্য ও শোণ‍্যক পুরী ধ্বংস করেন। দেবী কামেশ্বরাস্ত্রে ভণ্ডাসুরকে হত‍্যা করেন। দেবী ললিতা ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও ইন্দ্রাদি দেবতাদের অনুরোধে কামদেবকে পুনর্জীবিত করে নিজ ধাম শ্রীপুরে চলে গেলেন।

সাহিত্যে ত্রিপুরসুন্দরী[সম্পাদনা]

হিন্দু ধর্মসাহিত্যে ত্রিপুরসুন্দরীকে পরমাসুন্দরী দেবীরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। ললিতা সহস্রনামসৌন্দর্যলহরী স্তোত্রে তার রূপবর্ণনা করা হয়েছে। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, কামনা সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি সৃষ্টির স্রোত অবারিত রাখেন। আদি শঙ্করাচার্য তার ত্রিপুরসুন্দরী অষ্টকম স্তোত্রে ত্রিপুরসুন্দরীকে বিশ্বজননী বলেছেন। ত্রিপুরাসুন্দরীর মধ্যে কালীর শক্তি ও দুর্গার সৌন্দর্য ও মহত্বের সম্মিলন লক্ষিত হয়।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

আরও পড়ুন[সম্পাদনা]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. Frawley, David: "Tantric Yoga and the Wisdom Goddesses", page 89. Motilal Banarsidass Publishers, reprint 2005

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]