লঙ্গর (সুফিবাদ)

| ইসলাম সম্পর্কিত একটি ধারাবাহিকের অংশ সুফিবাদ |
|---|
|
|
লঙ্গর (ফার্সি: لنگر) দক্ষিণ এশিয়ার সুফি মুসলমানদের একটি প্রতিষ্ঠান। এখানে ধর্ম বা সমাজের ভেদাভেদ না করে গরিব-দুঃখীদের খাবার আর পানীয় দেওয়া হয়। সুফিবাদে এর শিকড় চিশতী তরিকার সঙ্গে জড়িত।
ব্যুৎপত্তি
[সম্পাদনা]লঙ্গর মূলত একটি ফার্সি শব্দ। পরে এটি উর্দু, পাঞ্জাবি আর বাংলায় ‘লঙ্গর’ নামে ছড়িয়ে পড়ে।[১][২]
ইতিহাস
[সম্পাদনা]লঙ্গর প্রথা ও প্রতিষ্ঠানটি প্রথম শুরু করেন বাবা ফরিদ। তিনি চিশতি সুফি সম্প্রদায়ের একজন মুসলিম ছিলেন।[৩][৪] দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ভারতীয় উপমহাদেশের সুফিদের মধ্যে লঙ্গরের প্রথা ইতিমধ্যেই জনপ্রিয় ছিল। ১৬২৩ সালে সংকলিত জাওয়াহির আল-ফারিদি গ্রন্থে এই প্রথার প্রসার সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে।[৫] পরবর্তীতে এই প্রতিষ্ঠান ও শব্দটি শিখ সম্প্রদায় গ্রহণ করে।[৬]
লঙ্গরে খাদ্য একটি বিশাল পাত্রে পরিবেশন করা হয় যাকে দেগ বলা হয়। এটি দরগাহ (সুফি তীর্থস্থান)-এর চত্বরে থাকে।[৭]
ধর্মীয় অর্থ
[সম্পাদনা]- গরিবদের খাবার দেওয়ার সুফিদের রীতি। বিশেষ করে চিশতি সম্প্রদায়ের, একটি বড় ঐতিহ্য।
সুফি সাহিত্য ও রচনাগুলিতে মিষ্টি খাদ্য (যেমন চিনি, গুড়) পবিত্রতা ও আল্লাহর নৈকট্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। লবণকে পবিত্রতা ও সততার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। কাঁচা গম থেকে রুটি তৈরির প্রক্রিয়াকে সুফিদের আধ্যাত্মিক জীবনের উন্নতির সঙ্গে তুলনা করা হয়।[৬]
সুফি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান (যিকির) মহিমা ও প্রশংসার মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণে করা হয়। গান, নাচ এবং ঢোল বাজানো সাধারণত এই ধরনের আচার-অনুষ্ঠানের অংশ। পাশাপাশি খাবার ভাগাভাগিও করা হয়ে থাকে। শিখ সম্প্রদায়ও লঙ্গরের ঐতিহ্য গ্রহণ করেছিল। সেখানেও এটি একই নামে পরিচিত।[৬]
লঙ্গর খানা
[সম্পাদনা]লঙ্গর খানায় সবার জন্য লঙ্গর বিতরণ করা হয়। এর অর্থ ‘ভিক্ষাঘর’। বড় দরগাহে সাহাম চিরাগ (আঙিনার প্রদীপ)-এর দুপাশে দুটি দেগ (রান্নার বড় পাত্র) থাকে। এগুলো পাথরের শক্ত গাঁথনিতে বসানো হয়। এতে চাল, চিনি, ঘি আর শুকনো ফল মিশিয়ে সুস্বাদু খাবার রান্না হয়। এটি তাবারক হিসেবে সবাইকে দেওয়া হয়। বড় দেগ-এর প্রান্তের পরিধি ৩.১ মিটার (প্রায় ১০ ফুটের একটু বেশি)। এতে ৭০ মণ চাল রান্না করা যায়। ছোট দেগ-এ রান্না হয় ২৮ মণ। আজমেরের দরগাহে এর একটি সম্রাট আকবর ১৫৬৭ খ্রিস্টাব্দে দিয়েছিলেন। রাজপুত্র বা ধনী তীর্থযাত্রীরা সাধারণত উরসের সময় এই দেগ-এ রান্নার আয়োজন করেন।
আজমিরের লঙ্গর খানা
[সম্পাদনা]বড় দেগ: সাহান-ই-চিরাঘের ভিতরে এবং বুলন্দ দরওয়াজার ডান পাশে বারি দেগ অবস্থিত। সম্রাট আকবর চিত্তৌরগড় যুদ্ধে জয়ী হলে পায়ে হেঁটে আজমির শরীফ পরিদর্শনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং একটি বড় কড়াই উপহার দিয়েছিলেন। তাই যুদ্ধ জয়ের পর তিনি তার কথা রেখেছিলেন। কড়াইয়ের পরিধি (ডিগ্রি) হল ১১.৪ মিটার (১২+১⁄২ গজ)। এতে একবারে ১২৫ মণ চাল রান্না করা যায়। এটি ১৫৬৮-৬৯ খ্রিস্টাব্দে (হিজরি ৯৭৬) দেওয়া হয়।
ছোট দেগ: এটি সাহান-ই-চিরাঘের ভিতরে বুলন্দ দরওয়াজার বাম দিকে অবস্থিত। এটি সুলতান নূরউদ্দিন জাহাঙ্গীর হিজরি ১০১৩ সনে (১৬০৪/১৬০৫ খ্রিস্টাব্দ) উপহার দিয়েছিলেন। এতে একবারে ৮০ মণ চাল রান্না করা যায়।
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Satish C. Bhatnagar (নভেম্বর ২০১২), My Hindu Faith and Periscope, Volume 1, Trafford, পৃ. ২৪৫, আইএসবিএন ৯৭৮১৪৬৬৯৬০৯৭৮
- ↑ Steingass, Francis Joseph (১৯৯২), A Comprehensive Persian-English Dictionary, Asian Educational Services, পৃ. ১১৩০, আইএসবিএন ৯৭৮৮১২০৬০৬৭০৮
- ↑ Epilogue, Vol 4, Issue 1, পৃ. ৪৫
- ↑ Talib, Gurbachan Singh (১৯৭৩), Baba Sheikh Farid: His Life and Teaching, পৃ. ৭
- ↑ Barbara D Metcalf (১৯৮৪)। Moral Conduct and Authority: The Place of Adab in South Asian Islam। University of California Press। পৃ. ৩৩৬–৩৩৯। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫২০-০৪৬৬০-৩।
- 1 2 3 R. Nivas (১৯৬৭), Transactions, Volume 4, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডি, পৃ. ১৯০
- ↑ Lizzio, Kenneth (২০০৫)। "Pilgrims of Love: An Ethnography of a Global Sufi Cult": ৬০৪–৬০৮। ডিওআই:10.1111/j.1478-1913.2005.00115.x।
{{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি journal এর জন্য|journal=প্রয়োজন (সাহায্য)