লগি-বৈঠা আন্দোলন
লগি-বৈঠা আন্দোলন বা লগি-বৈঠা র্যালি হল ২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবর তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক আহ্বায়িত একটি রাজনৈতিক সমাবেশ, যা তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গৃহীত কিছু অভিযুক্ত সিদ্ধান্তের কারণে সঙ্ঘটিত হয়।[১] এটি ২০০৬-০৮ সময়কালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের একটি অংশ।
প্রেক্ষাপট
[সম্পাদনা]উক্ত সমাবেশের মূল দাবি ছিল ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হওয়ার কথা ছিল তার প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বিচারপতি কে. এম. হাসানকে নিয়োগ প্রদান না করা। তিনি এক সময়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন। তৎকালীন আওয়ামী লীগের মতে, কে এম হাসান যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতে পারেন সে জন্য বিএনপি সংবিধান সংশোধন করে বিচারপতিদের অবসর গ্রহণের বয়সসীমা বাড়িয়ে দিয়েছিল। ২৮ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ক্ষমতা ছাড়লেও অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন। আওয়ামী লীগ ও মিত্র দলগুলোর অভিযোগ ছিল যে, তিনি বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তার নির্দেশে চলছিল।
ঘটনাবলি ও ফলাফল
[সম্পাদনা]আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র দলগুলো ২৮ অক্টোবর পল্টন এলাকায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে সমাবেশ ডাক দেয়, সেখানে অনেকে লগি-বৈঠা নিয়ে হাজির হয়। একই দিন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বায়তুল মুকাররম মসজিদের উত্তর গেটে পূর্ব ঘোষিত সমাবেশ ছিলো। ফলে চলমান সংঘর্ষে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হতাহতের ঘটনা ঘটে, ঐ দিন থেকে পরবর্তী একমাসের মধ্যে ৪০ জন নিহত ও শতাধিক আহত হয়[২] এবং সংবাদমাধ্যমে হত্যা ও আক্রমণের বেশ কিছু স্পর্শকাতর ভিডিওচিত্র প্রকাশিত হয়।[৩][৪] জামায়াতে ইসলামী দাবি করে যে, এ মোকাবেলায় তাদেরই বেশি সংখ্যক নেতাকর্মী নিহত হয়েছে।[৫] তাদের দাবিমতে, ঐ দিন জামাআতে ইসলামের ৬ জন কর্মী নিহত হয়, যারা হলেন মুজাহিদ, জসিম (১), জসিম (২), মাসুম, শিপন, শাহজাহান আলী, আরাফাত, রফিক, জাবেদ আলী, হাবীব, সাবের, আব্বাস ও রুহুল আমীন।[৬][৭][৮] টানা তিন-চার দিন বিএনপি-জামায়াত বিরোধীরা গুলিস্তান-পল্টন এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখে। এর মধ্যে বিচারপতি কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান,[৯] যার ফলে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী দলগুলোর দাবি রক্ষিত হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি মঈন ইউ আহমেদের সহায়তায় ইয়াজউদ্দিন আহমেদ কর্তৃক জরুরি আইন জারি হয় এবং ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়।[১০]
চার্জশিট
[সম্পাদনা]২০০৭ সালের ১১ এপ্রিল ৪৬ জন আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। চার্জশিট দাখিলের পর ২২ এপ্রিল ২০০৭ মহানগর হাকিম মীর আলী রেজা মামলার চার্জশিট গ্রহণ করেন। চার্জশিট গ্রহণ করার পরপর আদালত পলাতক আসামীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করে। পরদিন ২৩ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে মীর আলী রেজা পরোয়ানা স্থগিত করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর তাদের দলীয় নেতাকর্মী, সমর্থক ও শুভাকাক্ষীদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ৯ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব আবু সাঈদ পল্টন থানায় দায়ের করা হত্যা মামলাটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসককে একটি পত্র দেয়। ১৭ আগস্ট আদালত মামলাটি প্রত্যাহারের আবেদন মঞ্জুর করে।[১১]
অন্যান্য অভিযোগ
[সম্পাদনা]৩১ মে ২০০৭ সালে, কোতোয়ালি মডেল থানার উপ-পরিদর্শক সুলতান মাহমুদ চৌধুরী আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের ১৯ জন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে একটি অভিযোগপত্র দাখিল করেন। মামলায় (যা ৮ নভেম্বর ২০০৮ সালে আবদুর রহমান দায়ের করেছিলেন) অভিযোগ করা হয় যে এই ১৯ জন ব্যক্তি ইসলামিক সমাজ কল্যাণ পরিষদের অফিসে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাট চালিয়েছেন। ৮ জুন ২০১১ সালে, আদালতে সকল আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।[১২]
পূর্ববর্তী আক্রমণের অভিযোগ
[সম্পাদনা]এর পূর্বে ১০ অক্টোবর বরিশাল শহরের ইসলামী সমাজকল্যাণ পরিষদে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে লগি বৈঠা দিয়ে আক্রমণের অভিযোগ এনে মামলা করা হয় এবং ২০১১ সালের ৮ই জুন বিভাগীয় আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় সকল অভিযুক্তকে খালাস দেওয়া হয়।[১৩]
সমালোচনা
[সম্পাদনা]পরবর্তীতে বিএনপি নেতা খালেদা জিয়া, সাদেক হোসেন খোকা, ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা মতিউর রহমান নিজামীসহ বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন সভা সমাবেশে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিভিন্নসময় বক্তব্য প্রদানকালে উক্ত আন্দোলনকে নেতিবাচকরূপে তুলে ধরেন।[১৪][১৫][১৬][১৭][১৮]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ অজয় দাশগুপ্ত (২৭ অক্টোবর ২০১৯)। "লগি-বৈঠা আন্দোলনের ১৩ বছর"। চ্যানেল আই অনলাইন (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৩১ অক্টোবর ২০২০।
- ↑ Rahman, Waliur (৮ জানুয়ারি ২০০৭)। "Is Bangladesh heading towards disaster?"। BBC। সংগ্রহের তারিখ ১১ জানুয়ারি ২০০৭।
- ↑ Ahmed, Rumi (২৪ এপ্রিল ২০১৩)। "The war of brutal videos and our handicapped conscience"। ঢাকা ট্রিবিউন। সংগ্রহের তারিখ ৩১ অক্টোবর ২০২০।
- ↑ "২৮ অক্টোবর: ইতিহাসের এই দিনে যা হয়েছিল"। somoynews.tv (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ২৮ অক্টোবর ২০২০। সংগ্রহের তারিখ ৩১ অক্টোবর ২০২০।
- ↑ "লগি বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুষ হত্যা : শিবির নেতার বক্তব্য"। Daily Nayadiganta। ২৮ অক্টোবর ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ৩১ অক্টোবর ২০২০।
- ↑ "ঢাকা মহানগর পশ্চিম, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির"। shibirdcw.org (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৩০ অক্টোবর ২০২৫।
- ↑ ""আমার ছেলের প্রতিটা দাঁত তারা খুঁচিয়ে তুলে ফেলেছিল"—লগি-বৈঠার তাণ্ডবে নিহত শিপনের পিতা"। দ্যা ঢাকা ডায়েরি। ২৯ অক্টোবর ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ৩০ অক্টোবর ২০২৫।
- ↑ "'মুজাহিদ ছিল আমার চোখের মণি'— লগি-বৈঠার তাণ্ডবে নিহত শিবির কর্মীর মা"। দ্যা ঢাকা ডায়েরি। ২৯ অক্টোবর ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ৩০ অক্টোবর ২০২৫।
- ↑ "কে এম হাসান প্রধান উপদেষ্টা হচ্ছেন না"। www.bbc.com। ২৮ অক্টোবর ২০০৬। সংগ্রহের তারিখ ৩১ অক্টোবর ২০২০।
- ↑ আহমেদ, আসিফ (২৯ অক্টোবর ২০১৬)। "লগি-বৈঠার এক দশক"। সমকাল (ইংরেজি ভাষায়)। ৭ নভেম্বর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩১ অক্টোবর ২০২০।
- ↑ "রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর আজ"। The Daily Sangram। ২৮ অক্টোবর ২০২০। ১৪ অক্টোবর ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩১ অক্টোবর ২০২০।
- ↑ লগি-বৈঠা: মামলার ১৯ আসামি খালাস। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। ৮ জুন ২০১১। ৬ নভেম্বর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩১ অক্টোবর ২০২০।
- ↑ "লগি-বৈঠা: মামলার ১৯ আসামি খালাস"। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (ইংরেজি ভাষায়)। ৮ জুন ২০১১। ৬ নভেম্বর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩১ অক্টোবর ২০২০।
- ↑ "Khaleda Bangs on Logi Boitha Issue, Hasina Ignores Threats on Her Life"। VOA Bangla। ২১ ডিসেম্বর ২০০৮। সংগ্রহের তারিখ ৩১ অক্টোবর ২০২০।
- ↑ হাসান, সোহরাব (১৫ অক্টোবর ২০১৩)। "আ.লীগের লগি-বৈঠার জবাবে বিএনপির দা-কুড়াল!"। প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ৩১ অক্টোবর ২০২০।[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
- ↑ "লগি-বৈঠা দিয়ে হত্যা করে লাশের ওপর নৃত্য করার পরও শেখ হাসিনা শান্তির দূত?"। The Daily Sangram। ১৬ অক্টোবর ২০১৮। ৭ নভেম্বর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩১ অক্টোবর ২০২০।
- ↑ "আওয়ামী লীগ লগি-বৈঠার হুমকি দিচ্ছে: এমকে আনোয়ার"। banglanews24.com। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১১। সংগ্রহের তারিখ ৩১ অক্টোবর ২০২০।
- ↑ "Rice at Tk 40 a kg result of AL movement: Nizami"। The Daily Star (ইংরেজি ভাষায়)। ২৬ ডিসেম্বর ২০০৮। সংগ্রহের তারিখ ৩১ অক্টোবর ২০২০।