লক্ষ্মণরেখা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
ভিক্ষাজীবী ব্রাহ্মণের বেশে লঙ্কার রাজা রাবণের সীতার নিকট অভিগমন

লক্ষ্মণরেখা (সংস্কৃত ভাষায় দেবনাগরী লিপিতে:लक्ष्मणरेखा) বা রাম-অনুজ লক্ষ্মণের দ্বারা অঙ্কিত রেখা। মূল বাল্মিকী রামায়ণের বাইরে পরবর্তীকালে একাধিক আঞ্চলিক ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন ধ্রুপদীতে রচিত হয়, এই আঞ্চলিক রামায়ণগুলির কিছু সংস্করণে এই লক্ষ্মণরেখার উল্লেখ পাওয়া যায়। লক্ষ্মণ তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ও ভ্রাতাপত্নীর সহিত বর্তমান মহারাষ্ট্রের নাশিক শহরের অনতিদূরে দণ্ডকারণ্যের পঞ্চবটী অঞ্চলের নিকট কুটির নির্মাণ করে বাস করতেন। উক্ত কুটিরটিকে বেষ্টন করে লক্ষ্মণের দ্বারা অঙ্কিত রেখাটিই লক্ষ্মণরেখা নামে পরিচিত। লক্ষ্মণ তার অগ্রজ রামের সন্ধানে কুটীর থেকে দূরবর্তী স্থানে যাওয়ার পূর্বে সীতাকে সুরক্ষিত রাখার উদ্দেশ্যে এই রেখাটি তৈরী করেছিলেন। উত্তর ভারতের বহুল প্রচলিত বাল্মীকি রামায়ণের রামচরিতমানস সংস্করণটিতে অরণ্যকাণ্ডে এইরূপ লক্ষ্মণরেখা বা ঐজাতীয় কোনো কাহিনীর উল্লেখ পাওয়া যায় না। বাল্মীকি রচিত মূল রামায়ণেও লক্ষ্মণরেখার উল্লেখ নেই। তবে রামচরিতমানসে লঙ্কাকাণ্ডের ৩৫.১ নম্বর শ্লোকে লক্ষ্মণরেখার কথা রয়েছে। কাহিনী অনুযায়ী, মন্দোদরী তার স্বামী রাবণের বীরত্বের ওপর প্রশ্ন তুলে তাকে তিরষ্কার ও লাঞ্ছনা করে বলেছিলেন যে, তার এমনই শৌর্যপ্রতাপ এবং তার ভীমশক্তির এমনই কদর যে সে সামান্য এক ভিক্ষুকরূপী বনচারী তথা রামানুজ লক্ষ্মণের পর্ণকুটীরের চারিধারে করা সামান্য রেখা অতিক্রম করতেও অপারগ। স্বামীর প্রতি তার এই মন্তব্য ছিলো নিতান্তই রূপকধর্মী এবং দম্ভভেদী।[১]

গল্প অনুসারে, পর্ণকুটীরের সামনে ঘোরাঘুরি করতে থাকা সোনার গাত্রবর্ণ যুক্ত উজ্জ্বল একটি হরিণ দেখে সীতার হৃদয় নন্দনিত হয়ে ওঠে এবং স্বামী রামের নিকট ওটিকে কাছ থেকে একবার দেখার মনষ্কামনা প্রকাশ করেন। রাম হরিণটিকে দেখে কিঞ্চিত বিচলিত হন ও সন্দেহ প্রকাশ করে সীতাকে এই ইচ্ছা ত্যাগ করতে বলেন। তাসত্ত্বেও সীতা রামের কাছে অনুরোধ করলে তিনি সোনার হরিণটিকে ধরার জন্য তার পিছু নেয়৷।হরিণটি ছিলো আসলে ছদ্মবেশী রাক্ষস মারীচ, যিনি রাবণের আদেশানুসারে রামলক্ষ্মণকে কুটীরের থেকে দূরবর্তী স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য ছদ্মবেশ ধরেছিলেন। বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও তিনি ফেরত না এলে সীতা চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং লক্ষ্মণকে খুঁজতে যাবার নির্দেশ দেন। লক্ষ্মণ তাতে কর্ণপাত করেন না। পরে মারীচ বাণের আঘাত পেয়ে রামের স্বর নকল করে চিৎকার করলে সীতার দুঃখ দেখতে না পেয়ে লক্ষণ অন্বেষণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বিবেচনা করে লক্ষ্মণ সীতাসহ পর্ণকুটীরের চারিধারে একটি রেখা অঙ্কিত করেন। রাম, সীতা ও স্বয়ং লক্ষ্মণ ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তি সেই রেখা অতাক্রম করতে গেলে সেই রেখা থেকে অগ্নি নিঃসৃৃত হবে এবং তাকে অগ্নিদগ্ধ ও ভষ্মীভূত করবে। রামের অনুসন্ধানে লক্ষ্মণ কুটীর থেকে দূরে রওনা দিলে সেই সুযোগ বুঝে লঙ্কার রাক্ষস রাজা রাবণ ব্রাহ্মণ ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে সীতার নিকট উপস্থিত হয়ে ভিক্ষা প্রার্থনা করেন। রাবণের ছলনা বুঝতে না পেরে অসন্দিগ্ধ মনে ভুলবশত লক্ষণরেখা অতিক্রম করে রাবণকে ভিক্ষা দিতে গেলে রাবণ সীতাকে অপহরণ করে নিজের পুষ্পক রথে তুলে নিজের রাজধানীর উদ্দেশ্যে রওনা হন।[২]

খড়িবোলি ভাষাতে রচিত রাধেশ্যাম রামায়ণে উল্লেখ রয়েছে যে, সীতা অমনোযোগীভাবে লক্ষ্মণ রেখা টপকে যান কারণ ভারতীয় রীতি-নীতি অনুসারে আগত অতিথি দেবতুল্য তথা অতিথি দেবো ভবঃ। ভিক্ষুকরূপে আগত ব্রাহ্মণ ছিলো তার কাছে অতিথিস্বরূপ। রাবণ ঐ রেখা টপকে ভেতরে আসতে বাধাপ্রাপ্ত হন। তখন তিনি গৃৃৃহকত্রীকে বলেন যে তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ব্যতীত প্রবেশ সম্ভব না তাই তিনিই যেন রেখা টপকে তাকে ভিক্ষা দেন।[৩]

বর্তমান ব্যবহার[সম্পাদনা]

বর্তমান ভারতীয় ভাষায় কথোপকথনে লক্ষ্মণরেখা বলতে কঠোর দেশাচার বা আইনবিধির কথা বোঝানো হয়ে থাকে, যা ভঙ্গ করা কারো উচিৎ নয়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]