রোজার সময়সীমা
রোজার সময়সীমা হল এমন একটি নির্দিষ্ট সময়, যা শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত হয়েছে এবং এটি রোজার ইবাদতের সাথে সম্পর্কিত। এই সময়সীমার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: মাসের শুরু ও শেষ হওয়ার সময়, দিনের শুরু ও শেষ হওয়ার সময়, সেহরির সময়, ইমসাকের সময়, ইফতারের সময়, রমজানের রোজার শুরু ও শেষ হওয়ার সময়, ফরজ ও নফল রোজার আদায় ও কাযা করার সময় এবং সে সব সময়, যখন রোজা রাখা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। [১]
সময়সীমা
[সম্পাদনা]রোজার সময়সীমা শরিয়ত কর্তৃক নির্দিষ্ট ও জ্ঞাত পরিস্থিতি। শরিয়ত রোজা ফরজ হওয়ার সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং তা হল প্রতি বছরের রমজান মাসের দিনগুলি। এর বাইরে উক্ত সময়সীমার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: চন্দ্র বছরের বিভিন্ন মাসের দিন ও রাত, মাসের শুরু ও শেষ হওয়ার সময়, দিনের শুরু ও শেষ হওয়ার সময়, সেহরির সময়, ইমসাকের সময়, ইফতারের সময়, রমজানের রোজার শুরু ও শেষ হওয়ার সময়, ফরজ রোজা আদায়ের সময়, কাযা রোজার সময়, নফল রোজার সময় ও নিষিদ্ধ সময়ে রোজা রাখা। এছাড়াও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: যেসব দিনে রোজা রাখা হারাম, যেসব সময়ে রোজা রাখা মাকরুহ, মেঘাচ্ছন্ন দিন, সন্দেহজনক দিন, চাঁদ দেখার বিধান, মাস প্রমাণিত হওয়ার বিধান এবং রোজার সময় নির্ধারণ সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত।
ইসলামি শরীয়ত রোজার জন্য একটি নির্দিষ্ট মাস নির্ধারণ করেছে, যা চন্দ্র বছর অনুযায়ী ধর্তব্য হয় এবং তা হল রমজান মাস। রোজার সময় হল নির্দিষ্ট সময়সীমা, যার শুরু ও শেষ শরীয়ত দ্বারা নির্ধারিত। সময়সীমাটি মাসের শুরু ও শেষ হওয়ার সময়, দিন ও রাতের নির্ধারিত সময় অন্তর্ভুক্ত করে। রোজার সময় রাতের অংশে সমস্ত খাবার ও পানীয় গ্রহণ করা বৈধ, যা সূর্যাস্ত থেকে সুবদে সাদিক অর্থাৎ ফজরের দ্বিতীয় আলোর উদয় পর্যন্ত থাকে। এরপর দিনের অংশ হল রোজার নির্ধারিত সময়, যখন ইমসাক পালন করা হয় এবং তা সূর্যাস্ত পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
রোজার দিন
[সম্পাদনা]রোজার দিন বা রোজার সময়সীমা হল সেই নির্দিষ্ট সময়, যখন রোজাদার সব ধরনের পানাহার থেকে বিরত থাকে। এটি শুরু হয় ফজরের দ্বিতীয় আলো উদয়ের সময়, যা ফজরের নামাজের সময়। এটি শেষ হয় সূর্যাস্তের সাথে, যা মাগরিবের নামাজের সময়। এই সময়ের বাইরে রোজাদারের জন্য পানাহার করা বৈধ।
রোজার রাত
[সম্পাদনা]রোজার রাত হল সেই সময়সীমা, যখন রোজাদার পানাহার করতে পারে এবং অন্য সকল বৈধ কার্যক্রম সম্পাদন করতে পারে। এটি সূর্যাস্ত থেকে শুরু হয়ে ফজরের দ্বিতীয় আলো উদয় পর্যন্ত স্থায়ী হয়। ইসলামের প্রথম যুগে রোজাদারদের জন্য এশার নামাজের পর কিংবা ঘুমানোর পর থেকে রোজা চালিয়ে যাওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। পরে আল্লাহ এই বিধান সহজ করে দেন এবং সম্পূর্ণ রাতব্যাপী পানাহার ও অন্যান্য বৈধ কাজ করার অনুমতি দেন। [২]
অন্যান্য
[সম্পাদনা]দিন ও রাত
দিন ও রাত হল সময়ের দুটি পর্ব, যা একে অপরের পরিপূরক। এদের মোট দৈর্ঘ্য ২৪ ঘণ্টা, যা চাঁদের হিসাবে নির্ধারিত হয়। দিনকে চিহ্নিত করে সূর্যের আলো এবং রাতকে চিহ্নিত করে অন্ধকার।
ইফতারের সময়
ইফতারের সময় হল শরীয়ত নির্ধারিত একটি নির্দিষ্ট সময়, যা ইমসাকের শেষ পর্যায় নির্দেশ করে। এটি সূর্যাস্তের সাথে শুরু হয় এবং ফজরের দ্বিতীয় আলো উদয় পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
রোজার সময় নির্ধারণ
কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা ইমসাক (উপবাস) ও ইফতারের (পানাহার) সময় নির্ধারিত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন: 'আর তোমরা পানাহার করো, যতক্ষণ না কালো সুতা থেকে সাদা সুতার পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়, তারপর রাত পর্যন্ত রোজা পাল করো'। [৩] এই আয়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, রাতের সময় রোজাদারের জন্য পানাহার বৈধ, যা সূর্যাস্ত থেকে ফজরের দ্বিতীয় আলো উদয় পর্যন্ত স্থায়ী হয়। সাহাবি আদি ইবনে হাতিম বলেন, যখন এই আয়াত নাজিল হয়, আমি একটি কালো ও একটি সাদা দড়ি নিয়ে আমার মাথার নিচে রাখলাম এবং রাতে তা পরীক্ষা করলাম, কিন্তু কোনো পার্থক্য বুঝতে পারলাম না। এরপর আমি আল্লাহর রাসুলের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বললেন: এটি (কালো ও সাদা সুতোর পার্থক্য) হল এটি রাতের অন্ধকার ও দিনের আলোর পার্থক্য। [৪] [৫]
উপবাসের সূচনা
ইমসাক বা উপবাসের সময় শুরু হয় সুবহে সাদিক অর্থাৎ ফজরের দ্বিতীয় আলো উদয়ের সময় থেকে। কারণ পবিত্র কুরআনে ইমসাকের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে কালো সুতা থেকে সাদা সুতার পার্থক্য স্পষ্ট হওয়ার মাধ্যমে। এটি তখন ঘটে, যখন রাতের অন্ধকার দূর হতে শুরু করে এবং দিনের আলো প্রকাশ পেতে থাকে। [৩]
রোজার বিধান সহজকরণ
প্রথমদিকে মুসলমানদের জন্য রোজার বিধান কঠিন ছিল। তারা এশার নামাজের পর কিংবা ঘুমানোর পর পানাহার করতে পারত না। কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহ এই বিধান সহজ করেন এবং সমস্ত রাতব্যাপী পানাহার করার অনুমতি প্রদান করেন, যা আজ পর্যন্ত বহাল রয়েছে।[৬]
রোজার সময় নির্ধারণের বিধান
[সম্পাদনা]মহান আল্লাহ কুরআনে বলেন:
"তোমাদের জন্য রমজানের রাতসমূহে স্ত্রীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন বৈধ করা হয়েছে। তারা তোমাদের জন্য পোষাকস্বরূপ এবং তোমরাও তাদের জন্যে পোষাকস্বরূপ। আল্লাহ জানতেন যে, তোমরা নিজেদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করছিলে, কিন্তু তিনি তোমাদের ক্ষমা করেছেন এবং তোমাদের প্রতি দয়া করেছেন। অতএব এখন তোমরা তাদের সঙ্গে মিলিত হও এবং আল্লাহ যা তোমাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন, তা অন্বেষণ করো। আর খাও ও পান করো, যতক্ষণ না ফজরের আলো (সাদা রেখা) কালো রেখা থেকে পৃথকভাবে পরিস্কার হয়ে যায়। এরপর রোজা পূর্ণ করো রাত পর্যন্ত। আর তোমরা যখন মসজিদে ইতিকাফে থাকো, তখন তাদের সঙ্গে মেলামেশা করো না। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা; সুতরাং এগুলো অতিক্রম করো না। এভাবে আল্লাহ তাঁর নিদর্শনসমূহ মানুষকে পরিষ্কারভাবে বোঝান, যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করতে পারে।” (বাকারা: ১৮৭)
এই আয়াতে "রফাস" শব্দের মাধ্যমে যৌন সম্পর্কের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা ইসলামে শালীন ভাষায় গোপনীয়তা রক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়। ইবনে আব্বাস বলেন, কুরআনে মুবাশারাত, ইলতিমাস, ইফযা, দুখুল ও রফাস শব্দাবলী দ্বারা যৌন মিলন বুঝানো হয়েছে। ভাষাবিদ জাজ্জাজের মতে, রফাস একটি বিস্তৃত শব্দ, যা নারীদের প্রতি পুরুষদের যৌন আকাঙ্ক্ষা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
তাফসিরকার বাগভী উল্লেখ করেন, ইসলামের প্রথম যুগে রোজাদার ব্যক্তি ইফতারের পর রাতের প্রথমাংশ (এশার নামাজ) পর্যন্ত বা ঘুমানোর আগ পর্যন্ত খাওয়া-দাওয়া এবং স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারতেন। কিন্তু কেউ যদি এশার নামাজ পড়ে ফেলত বা ঘুমিয়ে পড়ত, তাহলে পরবর্তী রাত পর্যন্ত তার জন্য খাবার ও যৌন সম্পর্ক হারাম হয়ে যেত। একবার উমর ইবনুল খাত্তাব ইফতারের পর স্ত্রী-সহবাস করেন, যদিও তিনি এশার নামাজ পড়েছিলেন। এরপর তিনি অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর রাসুলের নিকট গিয়ে বিষয়টি জানান। তখন অন্য সাহাবিরাও একইরকম পরিস্থিতি স্বীকার করেন। এর পরই উপরোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়, যা রোজার রাতে খাওয়া-দাওয়া ও দাম্পত্য সম্পর্ককে বৈধ করে দেয়, যতক্ষণ না ফজরের সময়ের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে পরিষ্কারভাবে পৃথক হয়ে যায়।[৭]
আদি ইবনে হাতিম বলেন, এই আয়াতের “সাদা সুতা ও কালো সুতা” কথাটি তিনি সরলভাবে বুঝে একটি কালো ও একটি সাদা রশি নিয়ে তাঁর বালিশের নিচে রাখেন এবং রাত্রি জেগে দেখেন যে, রশি দুটি কখন আলাদা বোঝা যায়। পরে আল্লাহর রাসুলের কাছে বিষয়টি বললে তিনি বলেন, “এখানে সাদা ও কালো সুতো দ্বারা মূলত রাতের অন্ধকার ও দিনের আলো বুঝানো হয়েছে।”[৮]
চান্দ্রবছর (হিজরি সন)
[সম্পাদনা]চান্দ্রবছর বা হিজরি সন নামে পরিচিত এই বছরটি চাঁদের আবর্তনের উপর নির্ভর করে গণনা করা হয়। প্রতি চান্দ্রমাস হিলাল বা চাঁদের উদয় দেখার মাধ্যমে শুরু হয়। পুরো চন্দ্রবছরে আনুমানিক মোট ৩৫৪ দিন হয়। এই বছরটি ১২টি চান্দ্রমাসে বিভক্ত, যার প্রতিটি মাসে কমপক্ষে ২৯ দিন হয় এবং কখনও কখনও তা একটি দিন বেশি হয়ে ৩০ দিন হয়। যে মাস ৩০ দিনে পূর্ণ হয় তাকে "পূর্ণ মাস" বলা হয় এবং ২৯ দিনে শেষ হলে বলা হয় "অপূর্ণ মাস"।
সাধারণত একটি চান্দ্রবছরে ৬টি মাস পূর্ণ (৩০ দিন) ও ৬টি মাস অপূর্ণ (২৯ দিন) হয়ে থাকে। তবে কোন মাস পূর্ণ আর কোন মাস অপূর্ণ হবে, সেটি নির্দিষ্ট নয়; বরং তা চাঁদের দর্শনের উপর নির্ভর করে। চান্দ্রবছরের এই হিসাব সৌর বছরের (গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি) তুলনায় ভিন্ন; কারণ সৌর বর্ষপঞ্জিতে প্রতিটি মাসে নির্দিষ্ট সংখ্যক দিন থাকে এবং কেবল ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি ৪ বছরে একদিন হ্রাস পায়।
চান্দ্রবছরের এই পদ্ধতি মূলত শরিয়তে রমজান, হজ, ঈদ ইত্যাদি ইবাদত নির্ধারণে ব্যবহৃত হয় এবং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি সুনির্দিষ্ট সময়-প্রণালী।[৯]
মাসের সূচনা
[সম্পাদনা]ইসলামি হিজরি চান্দ্রবর্ষের কোনো মাস শুরু হওয়ার জন্য পূর্ববর্তী মাসের সমাপ্তি অপরিহার্য। এই মাসের শুরু চিহ্নিত করা হয় চাঁদের নতুন অবস্থান (হিলাল) দর্শনের মাধ্যমে। যদিও জ্যোতির্বিজ্ঞানের মাধ্যমে চাঁদের আবর্তন ও মাসের হিসাব নির্ধারণ করা যায়, তবে ইসলামি শরিয়ত মাসের শুরু ও শেষ নির্ধারণে জ্যোতির্বিজ্ঞান বা গণনার ওপর নির্ভর করে না। বরং শরিয়তের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এর পদ্ধতি হল দুটি: চাঁদ দেখা অথবা পূর্ববর্তী মাস ৩০ দিনে পূর্ণ করা—যদি চাঁদ দেখা না যায়। কারণ জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়; বরং বিশেষজ্ঞদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
হাদিসে হাদিসে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর থেকে রমজান সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে: "তোমরা চাঁদ না দেখা পর্যন্ত রোজা শুরু করো না; আর চাঁদ না দেখা পর্যন্ত রোযা ভঙ্গও করো না। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে, তাহলে ৩০ দিন গণনা করে মাস পূর্ণ করো" (সহীহ মুসলিম ও বুখারি)।[১০]
রমজান মাসের রোজার শুরুর সময় নির্ধারণ করা হয় হিলাল বা নতুন চাঁদ অনুযায়ী, যা শা’বান মাসের ২৯ তারিখ সূর্যাস্তের পরে ঘটে। যদি চাঁদ দেখা যায়, তাহলে সেই রাত থেকেই রমজান মাস শুরু হয়ে যায় এবং পরদিন রোযা পালন করা আবশ্যক। কিন্তু যদি চাঁদ দেখা না যায়—মেঘ, ধোঁয়া বা আলোছায়ার কারণে—তাহলে শা’বান মাসকে ৩০ দিনে পূর্ণ করে পরেরদিন রোযা শুরু করা হবে।
অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: "আমরা এক নিরক্ষর জাতি, আমরা লিখি না, হিসাবও করি না। মাস কখনো ২৯ দিনে হয়, আবার কখনো ৩০ দিনে (সহীহ বুখারি)। [১১]
চাঁদ দেখা
[সম্পাদনা]হিলাল বা নতুন চাঁদ দেখা হয় প্রতি চান্দ্রমাসের ৩০তম রাতে অর্থাৎ ২৯তম দিনের সূর্যাস্তের পরে। এই হিলাল দেখা গেলে বুঝা যায় যে, পুরাতন মাসটি ২৯ দিনেই শেষ হয়েছে এবং একটি নতুন মাস শুরু হয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ রমজান মাস—যা হিজরি বর্ষের নবম মাস—শুরু হয় হিলাল দেখা বা পূর্ববর্তী মাস শা’বান ৩০ দিন পূর্ণ করার মাধ্যমে। মহান আল্লাহ কুরআনে বলেন: "তোমাদের মধ্যে যারা এই মাস পাবে, সে যেন এতে রোযা রাখে" (সূরা বাকারা: ১৮৫)।[১০]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়, হিলাল দেখা রমজান মাসে রোযা রাখার ফরয হওয়ার অন্যতম ভিত্তি। এক বা একাধিক নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য দ্বারা চাঁদ দেখা নিশ্চিত হলে পুরো অঞ্চলের মুসলিমদের উপর রোযা ফরজ হয়ে যায়। কিন্তু যদি মেঘ বা অন্য কোনো কারণে চাঁদ দেখা না যায়, তাহলে মাস ৩০ দিনে পূর্ণ করে নিতে হবে। শরিয়ার দৃষ্টিতে আলাদাভাবে চান্দ্রবর্ষের হিসাব অনুসরণ করার আদেশ নেই; কারণ তা সবার জন্য সহজ নয়। বরং চাঁদ দেখা নিজেই এক প্রকার ইবাদত এবং আল্লাহর হুকুম পালনের মাধ্যম। তাছাড়া সকল মুসলিমের জন্য পৃথক পৃথকভাবে চাঁদ দেখা জরুরি নয়; বরং নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার মাধ্যমে চাঁদ দেখা নিশ্চিত হলেই তা সকলের জন্য যথেষ্ট। চাঁদ দেখার জন্য এমন খোলা জায়গা নির্বাচন করতে হয়, যেখান থেকে সূর্যাস্ত পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। সেই সময় হিলাল খুবই সূক্ষ্ম, সূতার মতো চিকন এবং তা হয়তো মেঘ, ধোঁয়া বা সূর্যের আলোয় আচ্ছন্ন হতে পারে। এজন্য সতর্কভাবে চাঁদ দেখা ও এর জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচন জরুরি।[১১]
উদয়স্থলের ভিন্নতা
[সম্পাদনা]প্রখ্যাত ইসলামি পণ্ডিত ইমাম নববি বলেন: যদি কোন এক দেশে চাঁদ দেখা যায়, তাহলে তার নিকটবর্তী এলাকার লোকদের ওপর সেই চাঁদ দেখার ভিত্তিতে রোজা রাখা ফরজ হয়ে যায়। তবে দূরবর্তী অঞ্চলের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হল, যে অঞ্চলে মাতলা বা চাঁদের উদয়স্থল এক নয়, সেখানে রোজার শুরুতে ভিন্নতা হতে পারে। আমি মনে করি, এটিই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মত।[১২]
এ বিষয়ে একটি ঐতিহাসিক হাদিসও রয়েছে। সাহাবি কুরাইব বর্ণনা করেন: আমরা একবার উম্মুল ফজল বিনতে হারিসের একটি কাজের ব্যাপারে শামে (এখন সিরিয়া) গিয়েছিলাম। তখন সেখানে অবস্থানকালে আমরা রমজানের চাঁদ বৃহস্পতিবার রাতে দেখি এবং সেখানকার মানুষজন রোজা রাখাও শুরু করে দেন; এমনকি শামের তৎকালীন শাসক মুয়াবিয়াও রোজা রেখেছিলেন। মাসের শেষের দিকে আমি মদিনায় ফিরলাম। তখন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তোমরা কবে চাঁদ দেখেছ?’ আমি বললাম, ‘বৃহস্পতিবার রাতে।’ তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি নিজে দেখেছ?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, আমি নিজে দেখেছি এবং অন্যরাও দেখে রোজা রেখেছে।’ তিনি বললেন: ‘আমরা শনিবার রাতে চাঁদ দেখেছি। তাই আমরা ৩০ দিন পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত রোজা চালিয়ে যাব কিংবা নতুন চাঁদ দেখলে রোজা শেষ করব। আমি বললাম, ‘আপনারা কি মুয়াবিয়ার দেখা চাঁদ ও তার রোজার উপর সন্তুষ্ট নন?’ তিনি বললেন, ‘না; কারণ আমাদের রাসূলুল্লাহ এভাবেই নির্দেশ দিয়েছেন।[১৩]
ইমাম নববি এই হাদিস প্রসঙ্গে বলেন: "এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, চাঁদ দেখা সকল দেশের জন্য সাধারণ নয়; বরং সেটি স্থানভেদে পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে যদি সেই দূরত্ব এমন হয় যে, সেখানে নামাজ কসর (সংক্ষিপ্তভাবে আদায়) করতে হয়। কেউ বলেন, যদি ‘মাতলা’ এক হয়, তবে একই রায় প্রযোজ্য; আবার কেউ বলেন, যদি অঞ্চল বা জলবায়ু একই হয়, তখনও একই হুকুম প্রযোজ্য হয়। আবার কারো মতে, পৃথিবীর সব অঞ্চলে একসঙ্গে রোজা রাখা উচিত। তবে ইবনে আব্বাস যে কুরাইবের কথা গ্রহণ করেনি, তার মূল কারণ সেটা এক ব্যক্তির সাক্ষ্য হওয়া ছিল না; বরং তা ছিল দূরবর্তী অঞ্চলের চাঁদ দেখা, যা মদিনার জন্য প্রযোজ্য নয়।"[১৪][১১][১৫]
সন্দেহপূর্ণ দিন
[সম্পাদনা]সন্দেহপূর্ণ দিন বা ইয়াওমুস শাক (আরবি: يوم الشك) বলা হয় শাবান মাসের ৩০ তারিখকে, যখন মানুষ নিশ্চিত হতে পারে না যে, এটি কি শা'বান মাসের ৩০ তারিখ, না রমজানের প্রথম তারিখ। এটি তখনই হয়, যখন ওই রাতে রমযানের চাঁদ দেখা যায় না এবং আকাশও পরিষ্কার না থাকে।[১০]
মেঘাচ্ছন্ন দিন
[সম্পাদনা]‘মেঘাচ্ছন্ন দিন’ বলা হয় শাবান মাসের ৩০ তারিখকে, যখন চাঁদ দেখার রাতটিতে আকাশে মেঘ বা ধূলিকণা থাকায় চাঁদ দেখা সম্ভব হয় না। ফলে পরদিন রোজা রাখার সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা দেখা দেয়। শরিয়তে এই দিনের হুকুম সম্পর্কে বিভিন্ন ফিকহি মতামত রয়েছে। [১০]
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ জিবরিল, আহমদ মুসা। রোজা রমজানের মাসায়েল। ঢাকা: ইলহাম ILHAM।
- ↑ "Rules of Fasting"।
{{ওয়েব উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: ইউআরএল-অবস্থা (লিঙ্ক) - 1 2 তাফসিরে কুরআন, সূরা বাকারা: ১৮৭।
- ↑ صحيح البخاري كتاب الصوم باب قول الله تعالى وكلوا واشربوا حتى يتبين لكم الخيط الأبيض من الخيط الأسود من الفجر، رقم: (1817)
- ↑ باب قول الله تعالى وكلوا واشربوا حتى يتبين لكم الخيط الأبيض من الخيط الأسود من الفجر ثم أتموا الصيام إلى الليل فيه البراء عن النبي صلى الله عليه وسلم. فتح الباري شرح صحيح البخاري ص: (158).
- ↑ "المختصر في أحكام الصيام (PDF)"। www.alukah.net (আরবি ভাষায়)। ১৯ জুন ২০২২। সংগ্রহের তারিখ ৫ মে ২০২৫।
- ↑ تفسير البغوي، الجزءالأول، ص: (207)، تفسير سورة البقرة، آية رقم: (187)
- ↑ صحيح البخاري، (كتاب الصوم)، باب قول الله تعالى وكلوا واشربوا حتى يتبين لكم الخيط الأبيض من الخيط الأسود من الفجر، رقم: (1817)
- ↑ "The History of the Islamic Calendar in the Light of the Hijra"। al-islam.org (ইংরেজি ভাষায়)। ২ মার্চ ২০১৩। সংগ্রহের তারিখ ৪ মে ২০২৫।
- 1 2 3 4 al-Arour, Shaykh Adnan ibn Muhammad। নতুন চাঁদের বিধান - শায়খ আদনান ইবনে মুহাম্মাদ আল আরউর (ইংরেজি ভাষায়)।
- 1 2 3 "'চান্দ্রমাস' বই : একটি পর্যালোচনা : চাঁদ দেখার হাদীসসমূহের বিকৃতি ও অবমাননা"। www.alkawsar.com। সংগ্রহের তারিখ ৫ মে ২০২৫।
- ↑ منهاج الطالبين للنووي، كتاب الصيام
- ↑ صحيح مسلم، (كتاب الصيام) باب بيان أن لكل بلد رؤيتهم وأنهم إذا رأوا الهلال ببلد لا يثبت حكمه لما بعد عنهم، رقم: 1087
- ↑ شرح صحيح مسلم للنووي، (كتاب الصيام) باب بيان أن لكل بلد رؤيتهم وأنهم إذا رأوا الهلال ببلد لا يثبت حكمه لما بعد عنهم. ص: (161)
- ↑ "এক দেশে চাঁদ দেখা গেলে কি পৃথিবীর সকল দেশে রোযা বা ঈদ করা জরুরী নয়?"। www.hadithbd.com। সংগ্রহের তারিখ ৫ মে ২০২৫।