রুহুল্লাহ খোমেইনী
রূহুল্লাহ খোমেইনী | |
|---|---|
روحالله خمینی | |
১৯৮৯ সালের আগে তোলা দাপ্তরিক ছবি | |
| ১ম ইরানের সর্বোচ্চ নেতা | |
| কাজের মেয়াদ ৩রা ডিসেম্বর ১৯৭৯ – ৩রা জুন ১৯৮৯ | |
| রাষ্ট্রপতি | |
| প্রধানমন্ত্রী | তালিকা
|
| ডেপুটি | হোসেইন-আলী মোন্তজেরী (১৯৮৫–১৯৮৯) |
| পূর্বসূরী |
|
| উত্তরসূরী | আলী খামেনেয়ী |
| বিপ্লবের নেতা[ক] | |
| কাজের মেয়াদ ৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯[খ] – ৩রা ডিসেম্বর ১৯৭৯ | |
| প্রধানমন্ত্রী |
|
| পূর্বসূরী | মোহম্মদ রেজা পহলবী (শাহ হিসেবে) |
| উত্তরসূরী | স্বয়ং (সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে) |
| ব্যক্তিগত বিবরণ | |
| জন্ম | রূহুল্লাহ মোস্তফবী মূসবী খোমেইনী ১৭ মে ১৯০০[গ] খোমেইন, রাজতন্ত্রী ইরান |
| মৃত্যু | ৩ জুন ১৯৮৯ (বয়স ৮৯) তেহরান, ইসলামি প্রজাতন্ত্রী ইরান |
| সমাধিস্থল | রূহুল্লাহ খোমেইনীর মাজার |
| দাম্পত্য সঙ্গী | খদীজে সকফী (বি. ১৯২৯) |
| সন্তান | ৭ জন, মোস্তফা, জহরা, ফরীদে ও আহমদ-সহ |
| আত্মীয়স্বজন | খোমেইনী পরিবার |
| শিক্ষা | কোম হওজা |
| স্বাক্ষর | |
| ওয়েবসাইট | imam-khomeini |
| ব্যক্তিগত তথ্য | |
| ধর্ম | ইসলাম |
| আখ্যা | শিয়া[১] |
| সম্প্রদায় | ইসনা আশারিয়া |
| ব্যবহারশাস্ত্র | জাফরি |
| ধর্মীয় মতবিশ্বাস | উসুলি |
| উল্লেখযোগ্য ধারণা | খোমেইনীবাদ, বিলায়তুল ফকীহ |
| উল্লেখযোগ্য কাজ |
|
| মুসলিম নেতা | |
| শিক্ষক | হোসেইন বরূজর্দী |
| সামরিক কর্মজীবন | |
| আনুগত্য | |
| সেবা/ | |
| কার্যকাল | ১৯৭৯–১৯৮৯ |
| পদমর্যাদা | সর্বাধিনায়ক |
| যুদ্ধ/সংগ্রাম | ইরান–ইরাক যুদ্ধ |
Styles | |
| উদ্ধৃতিকরণের রীতি | বিশিষ্ট মরজিউত তকলীদ আয়াতুল্লাহিল উজমা ইমাম খোমেইনী[২] |
| কথ্যরীতি | ইমাম খোমেইনী[৩] |
| ধর্মীয় রীতি | আয়াতুল্লাহিল উজমা রূহুল্লাহ খোমেইনী[৩] |
| বিকল্প রীতি | আয়াতুল্লাহ খোমেইনী |
সৈয়দ রূহুল্লাহ মোস্তফবী মূসবী খোমেইনী[ঘ] (ফার্সি: سید روحالله مصطفوی موسوی خمینی, উচ্চারণ [ɾuːɦʔolˈlɒːɦe xomejˈníː] ; ১৭ই মে ১৯০০[গ] – ৩রা জুন ১৯৮৯) ছিলেন একজন ইরানি শিয়া মুসলিম ধর্মগুরু, বিপ্লবী ও রাজনীতিবিদ, যিনি ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮৯ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ইরানের ইসলামি বিপ্লবের প্রধান নেতা ছিলেন, যা মোহম্মদ রেজা পহলবীকে উৎখাত করে ইরানকে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করে।
খোমেইনী বর্তমান ইরানের মর্কজি প্রদেশে অবস্থিত খোমেইন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বয়স যখন ২ বছর তখন তাঁর পিতা হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। অল্প বয়স থেকেই তিনি আত্মীয়স্বজনের সহায়তায় কুরআন ও হাদিস অধ্যয়ন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি ইসনা আশারিয়া ধারায় একজন উচ্চপদস্থ আলেমে পরিণত হয়ে ওঠেন—একজন আয়াতুল্লাহ, মরজি, মুজতাহিদ, ফকীহ, হাফেজ এবং ৪০টিরও বেশি কিতাবের রচয়িতা। শ্বেত বিপ্লবের বিরোধিতার ফলে ১৯৬৪ সালে তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্বাসিত করে বুরসায় পাঠানো হয়। প্রায় এক বছর পরে তিনি নজফে চলে যান, যেখানে তিনি তাঁর ধর্মীয়–রাজনৈতিক তত্ত্ব বিলায়তুল ফকীহ (আইনজ্ঞের অভিভাবকত্ব) সম্পর্কে যে বক্তৃতাগুলি দেন, সেগুলো পরে সংকলিত হয়ে হকুমতে এসলামি গ্রন্থে প্রকাশিত হয়।
ইসলামি বিপ্লব সফল হওয়ার পর খোমেইনী ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে একই বছরের ডিসেম্বর মাসে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তাঁর আনুষ্ঠানিক নিয়োগ পর্যন্ত দেশের কার্যত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কাজ করেন। আন্তর্জাতিক প্রভাবের জন্য ১৯৭৯ সালে টাইম সাময়িকী তাঁকে বর্ষসেরা ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করে এবং পরবর্তী দশকে তাঁকে “পশ্চিমা জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে শিয়া ইসলামের প্রায় প্রতীকী মুখ” হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তিনি ইরান জিম্মি সংকট চলাকালে জিম্মিকারীদের প্রতি সমর্থনের জন্য; ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক সালমান রুশদিকে দ্য স্যাটানিক ভার্সেস উপন্যাসে ইসলামের নবী মুহম্মদ সম্পর্কে বিতর্কিত বর্ণনার (যা খোমেইনীর মতে ধর্ম অবমাননা ছিল) কারণে তাঁকে হত্যার আহ্বান জানানোর জন্য; ইরান–ইরাক যুদ্ধ চলাকালীন সাদ্দাম হুসেইনের সরকার উৎখাতের প্রচেষ্টার জন্য; এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে “মহা শয়তান” ও ইসরায়েলকে “ছোট শয়তান” নামে ডাকার জন্য জন্য পরিচিত ছিলেন।
একটি ব্যাপক ব্যক্তিত্বের অর্চনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া খোমেইনী আয়াতুল্লাহ উপাধি ধারণ করতেন এবং ইরানের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিকভাবে তাঁর সমর্থকদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ইমাম খোমেইনী নামে পরিচিত ছিলেন।[৪] তাঁর রাষ্ট্রীয় জানাজায় প্রায় ১ কোটি মানুষ উপস্থিত হয়েছিল, যা ছিল সে সময়কার ইরানের মোট জনসংখ্যার প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ; এটিকে ইতিহাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইরানে তাঁকে আইনত “অলঙ্ঘনীয়” গণ্য করা হয়—তাঁকে অপমান করলে কারাদণ্ড হতে পারে; তেহরানের বেহেশ্তে জহরা গোরস্থানে অবস্থিত তাঁর স্বর্ণগম্বুজযুক্ত সমাধি তাঁর অনুসারীদের কাছে একটি তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে ইসলামি পুনর্জাগরণ, স্বাধীনতা, সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা এবং ইরানে বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একজন অগ্রদূত হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে, সমালোচকেরা তাঁকে পশ্চিমবিরোধী ও ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্য, গণতন্ত্রবিরোধী পদক্ষেপ, ১৯৮৮ সালে হাজারো ইরানি রাজবন্দীদের মৃত্যুদণ্ডসহ মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ইরান–ইরাক যুদ্ধ চলাকালে মানব-ঢেউ আক্রমণের জন্য ব্যাপকভাবে শিশুসৈন্য ব্যবহারের অভিযোগে সমালোচনা করেছেন।[৫][৬][৭][৮]
প্রারম্ভিক জীবন
[সম্পাদনা]পারিবারিক পটভূমি
[সম্পাদনা]
সৈয়স রূহুল্লাহ মোস্তফবী মূসবী খোমেইনী ছোটখাটো জমিদার, আলেম ও ব্যবসায়ীদের একটি বংশ থেকে উদ্ভূত ছিলেন।[৯] তাঁর পূর্বপুরুষেরা ১৮শ শতাব্দীর শেষের দিকে উত্তর-পূর্ব ইরানের খোরাসান প্রদেশে অবস্থিত তাঁদের মূল আবাস নিশাপুর থেকে অস্থায়ীভাবে অবধ রাজ্যে অভিবাসন করেন, যা বর্তমানে ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের একটি অঞ্চল। সে সময় অবধের শাসকগণ ছিলেন পারসিক–বংশোদ্ভূত দ্বাদশী শিয়া মুসলিম।[১০][১১][১২] তাদের শাসনামলে তারা বিপুল সংখ্যায় পারসিক আলেম, কবি, আইনজ্ঞ, স্থপতি ও চিত্রশিল্পীদের আমন্ত্রণ জানাতেন ও আশ্রয় দিতেন।[১৩] পরবর্তীতে পরিবারটি অবধের রাজধানী লখনউয়ের-ল নিকটবর্তী ছোট শহর কিন্তূরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।[১৪][১৫][১৬][১৭]
খোমেইনীর পিতামহ আহমদ হিন্দী কিন্তূরে জন্মগ্রহণ করেন।[১৫][১৭] তিনি ১৮৩০ সালে লখনউ ত্যাগ করে নজফে অবস্থিত ইমাম আলীর মাজারে তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে অটোমান ইরাকে যান এবং আর কখনও ভারতে ফিরে আসেননি।[১৪][১৭] জীবনীকার বাকের মঈনের মতে, ভারতে ব্রিটিশ শক্তির বিস্তার থেকে বাঁচার জন্যই তিনি এই অভিবাসন করেছিলেন।[১৮] ১৮৩৪ সালে সৈয়দ আহমদ মূসবী হিন্দী ইরান সফর করেন এবং ১৮৩৯ সালে তিনি খোমেইনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।[১৫] যদিও তিনি ইরানে বসবাস শুরু করেন, তবুও ভারতে থাকার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে তিনি হিন্দী নামে পরিচিত থাকেন; এমনকি রূহুল্লাহ খোমেইনীও তাঁর কিছু গজলে ছদ্মনাম হিসেবে হিন্দী ব্যবহার করেছিলেন।[১৪] খোমেইনীর আরেক পূর্বপুরুষ মির্জা আহমদ মুজতাহিদে খোনসারী ছিলেন সেই আলেম যিনি তামাক আন্দোলন চলাকালে তামাক ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একটি ফতোয়া জারি করেছিলেন।[১৯][২০]
শৈশব
[সম্পাদনা]জন্মসনদ অনুযায়ী সৈয়দ রূহুল্লাহ মোস্তফবী মূসবী খোমেইনীনি ১৭ই মে ১৯০০ সালে মর্কজি প্রদেশের খোমেইন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তাঁর ভাই মোর্তজা (পরবর্তীতে আয়াতুল্লাহ পসন্দীদে নামে পরিচিত) তাঁর জন্মতারিখ ২৪শে সেপ্টেম্বর ১৯০২ বলে উল্লেখ করেছেন, যা পয়গম্বরে ইসলাম মুহম্মদের কন্যা ফাতিমার জন্মবার্ষিকী।[২১][২২]
তাঁর জন্মের প্রায় দুই বছর পর ১৯০৩ সালে তাঁর পিতা মোস্তফা মূসবী হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে তাঁকে তাঁর মা আগা খানুম এবং খালা সাহেবেত লালন-পালন করেন।[২৩]
রূহুল্লাহ ৬ বছর বয়সে কুরআন ও প্রাথমিক ফার্সি ভাষা অধ্যয়ন শুরু করেন।[২৪] পরের বছর তিনি একটি স্থানীয় বিদ্যালয়ে ভর্তি হন, যেখানে তিনি ধর্মীয় শিক্ষা, নওহা খানী (শোকগাথা আবৃত্তি) এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী বিষয় শিখতে শুরু করেন।[১৮] শৈশবজুড়ে তিনি আত্মীয়দের সহায়তায় তার ধর্মীয় শিক্ষা চালিয়ে যান, যার মধ্যে তাঁর মায়ের চাচাতো ভাই জাফর[১৮] এবং তার সৎ বড় ভাই মোর্তজা পসন্দীদে—যিনি একজন আলেম ও কবি ছিলেন—উল্লেখযোগ্য।[২৫]
শিক্ষা ও শিক্ষকতা
[সম্পাদনা]
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তাঁর জন্য ইসফাহানের একটি ইসলামি হওজায় পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি এর পরিবর্তে আরাকের হওজায় পড়তে আগ্রহী হন। সেখানে তিনি আয়াতুল্লাহ আব্দোলকরীম হায়রী ইয়াজদীর তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা শুরু করেন।[২৬] ১৯২০ সালে খোমেইনী আরাকে চলে যান এবং সেখানে তাঁর পড়াশোনা শুরু করেন।[২৭] পরের বছর আয়াতুল্লাহ হায়রী ইয়াজদী তেহরানের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত পবিত্র শহর কোমের হওজায় স্থানান্তরিত হন এবং তার ছাত্রদেরও সেখানে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। খোমেইনী সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন, কোমে চলে যান[২৫] এবং সেখানে দারুশ শাফা বিদ্যালয়ে বসবাস শুরু করেন।[২৮]
খোমেইনীর পড়াশোনার বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল ইসলামি আইন (শরিয়ত) ও ব্যবহারশাস্ত্র (ফিকহ)।[২৪] তবে এই সময়ে তিনি কবিতা ও দর্শনের (ইরফান) প্রতিও আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কোমে পৌঁছনোর পর তিনি দর্শন ও তসব্বুফের পণ্ডিত মির্জা আলী আকবর ইয়াজদীর শরণাপন্ন হন। ইয়াজদী ১৯২৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু এরপরও খোমেইনী জওয়াদ আকা মালেকী তব্রীজী এবং রাফিয়ী কজবীনীর কাছে দর্শনের শিক্ষা অব্যাহত রাখেন।[২৯][৩০] তবে সম্ভবত তাঁর ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিলেন আরেক শিক্ষক মোহম্মদ আলী শাহ আবাদী[৩১] এবং ইতিহাসখ্যাত বিভিন্ন সুফি মরমী চিন্তাবিদ, যেমন মোল্লা সদরা ও ইবন আরবী।[৩০]
খোমেইনী প্রাচীন গ্রিক দর্শন অধ্যয়ন করেন এবং আরিস্তুর দর্শনে প্রভাবিত হন, যাকে তিনি যুক্তিবিদ্যার প্রতিষ্ঠাতা মনে করতেন।[৩২] তিনি আফলাতুনের দর্শনেও প্রভাবিত ছিলেন; বিশেষত তিনি মনে করতেন, “দিব্যত্বের ক্ষেত্রে” আফলাতুনের মতামত “গভীর ও দৃঢ়”।[৩৩] ইসলামি দার্শনিকদের মধ্যে তিনি প্রধানত ইবন সীনা ও মোল্লা সদরার দ্বারা প্রভাবিত হন।[৩২]
দর্শনের পাশাপাশি খোমেইনী সাহিত্য ও কবিতার প্রতিও আগ্রহী ছিলেন। তাঁর কবিতার সংকলন তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। কৈশোরকাল থেকেই তিনি আধ্যাত্মিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে কবিতা লিখতেন। তাঁর কবিতা তিনটি সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে: The Confidant, The Decanter of Love and Turning Point এবং Divan।[৩৪]
তাঁর কবিতা সম্পর্কে জ্ঞান সমসাময়িক কবি নাদের নাদেরপুরের (১৯২৯–২০০০), বক্তব্য থেকেও বোঝা যায়। তিনি স্মরণ করেন যে ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে তিনি বহু ঘণ্টা খোমেইনীর সঙ্গে কবিতা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। নাদেরপুরের ভাষায়: “চার ঘণ্টা ধরে আমরা কবিতা আবৃত্তি করেছিলাম। আমি যে কোনো কবির একটি পংক্তি পড়লে, তিনি সঙ্গে সঙ্গে পরের পংক্তিটি আবৃত্তি করতেন।”[৩৫]
রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত হওয়ার বহু আগেই রূহুল্লাহ খোমেইনী দীর্ঘ সময় ধরে নজফ ও কোমের হওজাগুলোতে শিক্ষকতা করেছেন। পরে তিনি শিয়া ইসলামের অন্যতম প্রধান আলেমে পরিণত হন।[৩৬] তিনি রাজনৈতিক দর্শন, ইসলামি ইতিহাস এবং নৈতিকতা পড়াতেন। তাঁর অনেক ছাত্র—যেমন মোর্তজা মোতহরী—পরে প্রখ্যাত ইসলামি দার্শনিক এবং মরজা হয়ে ওঠেন। একজন আলেম ও শিক্ষক হিসেবে খোমেইনী ইসলামি দর্শন, আইন এবং নৈতিকতা নিয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেন।[৩৭]
তিনি দর্শন ও মরমীবাদের মতো বিষয়গুলোর প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, যেগুলো সাধারণত সেমিনারির পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত ছিল না এবং অনেক সময় সন্দেহ বা বিরোধিতার চোখে দেখা হত।[৩৮]
২৭ বছর বয়সে তিনি তার শিক্ষাজীবনের সূচনা করেন—প্রথমে একটি ছোট ব্যক্তিগত গোষ্ঠীকে ইরফান ও মোল্লা সদরার দর্শন নিয়ে ব্যক্তিগত পাঠদান দিয়ে। প্রায় একই সময়ে, ১৯২৮ সালে তিনি তার প্রথম গ্রন্থ শরহ দু'আউস সহর (দু'আউল বহার ব্যাখ্যা) প্রকাশ করেন। এটি ছিল আরবি ভাষায় রচিত একটি বিশদ ব্যাখ্যা, যা রমজান মাসে ভোরের আগে ইমাম জাফর আস-সাদিক কর্তৃক পঠিত একটি দোয়ার ব্যাখ্যা। কয়েক বছর পরে তিনি সিরুস সলাত (নামাজের রহস্য) রচনা করেন, যেখানে ওজু থেকে শুরু করে নামাজ শেষে সালাম পর্যন্ত প্রতিটি অংশের প্রতীকী ও আধ্যাত্মিক অর্থ বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।[৩৯]
এই গ্রন্থের ভাষা ও ধারণাগত কাঠামোতে ইবন আরবীর ভাবধারার স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়। পরবর্তীতে এই গ্রন্থটি সৈয়দ আমজাদ হোসেইন শাহ নকবী ইংরেজিতে অনুবাদ করেন এবং ২০১৫ সালে ব্রিল প্রকাশনী থেকে The Mystery of Prayer: The Ascension of the Wayfarers and the Prayer of the Gnostics নামে প্রকাশিত হয়।[৪০]
রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি
[সম্পাদনা]তার হওজার পাঠদান প্রায়ই সমসাময়িক সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার সঙ্গে ধর্মের সম্পর্কের গুরুত্বের ওপর কেন্দ্রীভূত ছিল এবং তিনি ১৯৪০-এর দশকে ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধিতা করেন। তার প্রথম রাজনৈতিক গ্রন্থ কশফুল আসরার (গোপন রহস্য উন্মোচন),[৪১][৪২] ১৯৪২ সালে প্রকাশিত হয়। এটি ছিল আসরারে হেজার সালে (হাজার বছরের রহস্য) নামক একটি গ্রন্থের সমালোচনামূলক জবাব, যা ইরানের অন্যতম প্রধান মোল্লাতন্ত্রবিরোধী ইতিহাসবিদ আহমদ কসরবীর এক শিষ্য লিখেছিলেন।[৪৩]
এই গ্রন্থে তিনি রেজা শাহের কিছু নীতিরও সমালোচনা করেন, যেমন হিজাব নিষিদ্ধকরণ। তিনি তাঁর পিতার হত্যার জন্যও রেজা শাহকে দায়ী করতেন। এছাড়া তিনি ১৯২০-এর দশকে ইরানের সংসদে বিরোধী দলের নেতা আয়াতুল্লাহ হাসান মোদাররিসের বক্তব্য শোনার জন্য কোম থেকে তেহরানে যেতেন।
১৯৬৩ সালে গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ সৈয়দ হোসেইন বরূজর্দীর মৃত্যুর পর খোমেইনী একজন মরজি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। তিনি ইসলামপন্থী ব্যক্তিত্ব যেমন শেখ ফজলুল্লাহ নূরী ও আবোল-কাসেম কাশানীর আদর্শকেও মূল্য দিতেন। খোমেইনী ফজলুল্লাহ নূরীকে “একজন বীরত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব” হিসেবে দেখতেন এবং সাংবিধানিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের প্রতি তার আপত্তি মূলত নূরীর ১৯০৭ সালের সংবিধানের বিরোধিতার ধারার সঙ্গেই সম্পর্কিত ছিল।[৪৪][৪৫][৪৬]
চিত্রসম্ভার
[সম্পাদনা]- তরুণ খোমেইনী
- ১৯৭৯ সালের ১লা ফেব্রুয়ারিতে ইরানে প্রত্যাবর্তন
পাদটীকা
[সম্পাদনা]- ↑ ৩রা ডিসেম্বর ১৯৭৯ পর্যন্ত কার্যত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে এটি খোমেইনীর উপাধি ছিল। এরপর তিনি নিজেকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
- ↑ ৫ থেকে ১১ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ পর্যন্ত খোমেইনী ও মোহম্মদ রেজা পহলবীর মধ্যে রাষ্ট্রপ্রাধান্য নিয়ে বিরোধ ছিল।
- 1 2 তাঁর জন্মসনদে লিপিবদ্ধ জন্মতারিখ ১৭ই মে ১৯০০; যদিও তাঁর ভাই আয়াতুল্লাহ মোর্তজা পসন্দীদে তাঁর জন্মতারিখ ২৪শে সেপ্টেম্বর ১৯০২ বলে উল্লেখ করেছেন, যা নবী মুহম্মদের ﷺ মেয়ে ফাতিমার জন্মবার্ষিকী।
- ↑ ফার্সি: روحالله خمینی, Ruhollâh Khomeyni, উচ্চারণ [ɾuːɦʔolˈlɒːɦe xomejˈníː]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑
- Bowering, Gerhard; Crone, Patricia; Kadi, Wadad; Stewart, Devin J.; Zaman, Muhammad Qasim; Mirza, Mahan, সম্পাদকগণ (২০১২)। The Princeton Encyclopedia of Islamic Political Thought। Princeton University Press। পৃ. ৫১৮। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৪০০৮-৩৮৫৫-৪।
- Malise Ruthven (২০০৪)। Fundamentalism: The Search for Meaning (Reprint সংস্করণ)। Oxford University Press। পৃ. ২৯। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৯-১৫১৭৩৮-৯।
- Jebnoun, Noureddine; Kia, Mehrdad; Kirk, Mimi, সম্পাদকগণ (২০১৩)। Modern Middle East Authoritarianism: Roots, Ramifications, and Crisis। Routledge। পৃ. ১৬৮। আইএসবিএন ৯৭৮-১-১৩৫-০০৭৩১-৭।
- ↑ "ইসলামি প্রজাতন্ত্রী ইরানের সংবিধান, অধ্যায় ১, অনুচ্ছেদ ১"। ইরানের সংবিধান।
- 1 2 উদ্ধৃতি ত্রুটি:
<ref>ট্যাগ বৈধ নয়; "a" নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি - ↑ "Ayatollah Khomeini (1900–1989)"। BBC – History। সংগ্রহের তারিখ ২০ জুন ২০১৩।
- ↑ Overton, Iain (১৩ এপ্রিল ২০১৯)। "How a 13-year-old boy became the first modern suicide bomber"। gq-magazine.co.uk (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১০ ডিসেম্বর ২০২৪।
- ↑ Fard, Erfan (১৬ এপ্রিল ২০২১)। "Antisemitism Is Inseparable from Khomeinism"। besacenter.org (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১০ ডিসেম্বর ২০২৪।
- ↑ "Iran and the "Great Satan""। theweek.com (ইংরেজি ভাষায়)। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ১০ ডিসেম্বর ২০২৪।
- ↑ "Iranian Revolution | Summary, Causes, Effects, & Facts"। britannica.com (ইংরেজি ভাষায়)। ২৬ অক্টোবর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ১০ ডিসেম্বর ২০২৪।
- ↑ Abrahamian, Ervand (১৯৮৯)। Radical Islam: The Iranian Mojahedin। I.B. Tauris। পৃ. ২০। আইএসবিএন ১-৮৫০৪৩-০৭৭-২।
- ↑ Algar, Hamid (২০১০)। "A short biography"। Koya, Abdar Rahman (সম্পাদক)। Imam Khomeini: Life, Thought and Legacy। Islamic Book Trust। পৃ. ১৯। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৬৭৫০৬২২৫৪।
- ↑ Sacred space and holy war: the politics, culture and history of Shi'ite Islam by Juan Ricardo Cole
- ↑ Art and culture: endeavours in interpretation by Ahsan Jan Qaisar, Som Prakash Verma, Mohammad Habib
- ↑ Encyclopædia Iranica, "Avadh" ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১৭ মে ২০১৭ তারিখে, E. Yarshater
- 1 2 3 Ruhollah Khomeini's brief biography by Hamid Algar
- 1 2 3 From Khomein, A biography of the Ayatollah, 14 June 1999, The Iranian
- ↑ The Columbia world dictionary of Islamism by Olivier Roy, Antoine Sfeir
- 1 2 3 Khomeini: life of the Ayatollah, Volume 1999 by Baqer Moin
- 1 2 3 Moin 2000, পৃ. 18
- ↑ "Imam Khomeini's Biography"। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫। ৩ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৭ এপ্রিল ২০১৯।
- ↑ Moin, Baqer (২০০৯) [1999]। Khomeini: Life of the Ayatollah। I.B. Tauris। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৮৪৫১১-৭৯০-০।
- ↑ "Ruhollah Khomeini's birth date"। britannica.com। ১২ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
- ↑ "Ayatollah Khomeini (1900–1989)"। bbc.co.uk। BBC। সংগ্রহের তারিখ ২০ জুন ২০১৩।
- ↑ Reich 1990, পৃ. 310
- 1 2 Reich 1990, পৃ. 311
- 1 2 Milani 1994, পৃ. 85
- ↑ Moin 2000, পৃ. 22
- ↑ Brumberg 2001, পৃ. 45
- ↑ Moin 2000, পৃ. 28
- ↑ Moin 2000, পৃ. 42
- 1 2 Brumberg 2001, পৃ. 46
- ↑ Rāhnamā 1994, পৃ. 70–71
- 1 2 "Philosophy as Viewed by Ruhollah Khomeini"। imamreza.net। ১৪ জুন ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৯ মার্চ ২০১০।
- ↑ Kashful-Asrar, p. 33 by Ruhollah Khomeini
- ↑ "Introduction of Iman's works"। irib.ir। ১৫ অক্টোবর ২০০৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৯ জুন ২০০৭।.
- ↑ Farhang Rajaee, Islamism and Modernism: The Changing Discourse in Iran, University of Texas Press, (2010), p. 116.
- ↑ "BBC – History – Ayatollah Khomeini (1900–1989)"। bbc.co.uk। BBC। ৪ জুন ১৯৮৯। সংগ্রহের তারিখ ১৯ মার্চ ২০১০।
- ↑ Encyclopædia Britannica। "Ruhollah Khomeini"। Encyclopædia Britannica। সংগ্রহের তারিখ ১৯ মার্চ ২০১০।
- ↑ "پایگاه اطلاع رسانی روابط عمومی سازمان صدا و سیما"। irib.ir। ১৫ অক্টোবর ২০০৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৯ জুন ২০০৭।.
- ↑ Ervand Abrahamian, Islam, Politics, and Social Movements, University of California Press, (1988), p. 269.
- ↑ Khomeini, Ruhollah (২০১৫)। Naqavi, Sayyid Amjad Hussain Shah (সম্পাদক)। The Mystery of Prayer: The Ascension of the Wayfarers and the Prayer of the Gnostics। Brill Publishers। আইএসবিএন ৯৭৮-৯০-০৪-২৯৮৩১-৬। ৬ জুলাই ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
- ↑ "Kashf al-Asrar"। gemsofislamism.tripod.com। ১ সেপ্টেম্বর ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৯ মার্চ ২০১০।
- ↑ Moin, Baqer, Khomeini: Life of the Ayatollah (2001), p. 60
- ↑ Encyclopedia of World Biography on Ruhollah Musavi Khomeini, Ayatullah। BookRags। সংগ্রহের তারিখ ১৯ মার্চ ২০১০।
- ↑ Con Coughlin (২০০৯)। Khomeini's Ghost: Iran since 1979। Pan MacMillan। আইএসবিএন ৯৭৮-০-২৩০-৭৪৩১০-৬।
- ↑ Globalisation, Religion & Development। International Journal of Politics & Economics। ২০১১। পৃ. ৪৫। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৯৫৬৮২৫৬-০-৫।
- ↑ Hamid Naficy (২০১১)। A Social History of Iranian Cinema, Volume 3: The Islamicate Period, 1978–1984। Duke University Press। পৃ. ১৫৯। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮২২৩-৪৮৭৭-১।
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]- ইমাম খামেনির অফিসাইল ওয়েবসাইট ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৭ মে ২০১৩ তারিখে
- ১৯০২-এ জন্ম
- ১৯৮৯-এ মৃত্যু
- ধর্মীয় নেতা
- ইরানি রাজনীতিবিদ
- ইরানি বিপ্লব
- ইরানের সর্বোচ্চ নেতা
- স্নায়ুযুদ্ধের নেতা
- বেহেশত-ই-জহরায় সমাধি
- ১৯০০-এ জন্ম
- ২০শ শতাব্দীর ইরানি কবি
- বিরুদ্ধ-মার্কিনবাদ
- রাজতন্ত্র বিরোধী
- সমাজতন্ত্র বিরোধী ইরানি
- ইরানি ভিন্নমতাবলম্বী
- নির্বাসিত ইরানি
- মুসলিম দার্শনিক
- সর্ব-ইসলামবাদ
- ইরানি বিপ্লবের ব্যক্তি
- টাইম সাময়িকীর বর্ষসেরা ব্যক্তি
- রুহুল্লাহ খোমেইনী
- ২০শ শতাব্দীর ইমাম
- ইরানে মার্কিন বিরোধী মনোভাব
- নারীবাদের সমালোচক
- বিপ্লব তাত্ত্বিক
- কুরআনের হাফেজ