রাশিচক্র

জ্যোতির্বিজ্ঞানে রাশিচক্র (ইংরেজি ভাষায়: Zodiac, গ্রিক ভাষায়: ζῳδιακός বা জোডিয়াকোস) বলতে আকাশে সূর্যের আপাত গতিপথের ১২টি ভাগকে বোঝায়। এই আপাত গতিপথের নাম ভূকক্ষ, কারণ প্রকৃতপক্ষে এটি সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর কক্ষপথ। ভূকক্ষের খ-দ্রাঘিমাকে ১২টি ভাগে ভাগ করা হয় যার প্রতিটি ৩০ ডিগ্রি করে। এভাবে মোট ১২টি বিভাগ মিলে ৩৬০ ডিগ্রি তথা একটি বৃত্ত তৈরি করে। ভূকক্ষের সমতল থেকে ৮-৯ ডিগ্রি উত্তর বা দক্ষিণ (খ-অক্ষাংশ) পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলটিকে বলা হয় রাশিবন্ধনী (zodiacal belt)। চাঁদ এবং খালি চোখে দৃশ্যমান গ্রহগুলোর গতিপথও এই বন্ধনীর মধ্যে অবস্থান করে।
কিন্তু বাস্তবিক অর্থে রাশিচক্র কেবলই একটি খ-স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা, আরও নির্দিষ্ট করে বললে এটি এক ধরনের ভূকক্ষীয় স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা। প্রতিটি স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা তৈরি করতে প্রয়োজন পড়ে একটি প্রসঙ্গ তল যেখান থেকে অক্ষাংশ গণনা শুরু হয়, এবং প্রসঙ্গ তলে এমন একটি প্রসঙ্গ বিন্দু যেখান থেকে দ্রাঘিমাংশ গণনা শুরু হয়। রাশিচক্রের ক্ষেত্রে সেই প্রসঙ্গ তল হচ্ছে ভূকক্ষ এবং ভূকক্ষের প্রসঙ্গ বিন্দুটি হচ্ছে মহাবিষুবের সময় সূর্যের অবস্থান।
যে তারামণ্ডলগুলোর মধ্য দিয়ে ভূকক্ষ অতিক্রম করে তার প্রতিটিকেই কোন না কোন জন্তুর আকৃতি দেয়া হয়েছিল। এজন্য প্রাচীন গ্রিসের অধিবাসীরা রাশিচক্রকে ডাকতো "জোডিয়াকোস কিকলোস" বা "জন্তুদের বৃত্ত" নামে। রাশিচক্রে মোট তারামণ্ডলের সংখ্যা এবং তাদের আকৃতি আগে নির্দিষ্ট করে বলা যেতো না, তবে গাণিতিক জ্যোতির্বিদ্যার গোড়াপত্তনের পর তারামণ্ডলগুলোর সীমানা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। রাশিচক্রে মোট ১২টি তারামণ্ডল রয়েছে এবং আপাতভাবে বলা যায় সূর্য এই ১২টি তারামণ্ডলের মধ্য দিয়েই অতিক্রম করে। কোন মণ্ডলে সূর্য কতদিন থাকে তাও নির্দিষ্টভাবে জানা যায়।[১]
রাশিচক্রের প্রাচীন ইতিহাস
[সম্পাদনা]রাশিচক্রের (Zodiac) ধারণাটির উৎপত্তি সুদূর প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার ব্যাবিলনীয় সভ্যতা থেকে, যা খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময়ে বিকশিত হয়েছিল। ব্যাবিলনীয় জ্যোতির্বিদরা আকাশের সেই কাল্পনিক পথটিকে, যা ধরে সূর্য, চন্দ্র এবং গ্রহগুলি চলাচল করে বলে মনে হয় (এই পথকে ক্রান্তিবৃত্ত বা Ecliptic বলা হয়), সেটিকে ১২টি সমান ভাগে ভাগ করেন—প্রতিটি ভাগ ছিল 30∘ করে। এই বিভাগগুলির নামকরণ করা হয়েছিল সেই সময়কালে দৃশ্যমান প্রধান নক্ষত্রপুঞ্জগুলির নামানুসারে এবং এগুলি ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং ভবিষ্যদ্বাণী উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত প্রথম দিকের একটি সুসংগঠিত মহাজাগতিক স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা। পরবর্তীতে, এই ব্যাবিলনীয় জ্ঞান গ্রীক সভ্যতায় প্রবেশ করে, যেখানে এর নাম দেওয়া হয় "Zodiakos Kyklos" বা "প্রাণীর বৃত্ত"। গ্রীকরাই এই পদ্ধতিকে আরও পরিমার্জিত করে এবং গ্রীক জ্যোতির্বিদ টলমি (Ptolemy) তাঁর রচনায় এটিকে সুসংগঠিত করে। বর্তমানে পশ্চিমা জ্যোতিষশাস্ত্রে ব্যবহৃত ক্রান্তীয় রাশিচক্র (Tropical Zodiac) এই গ্রীক-রোমান ঐতিহ্য থেকেই এসেছে। অন্যদিকে, ভারতে যে বৈদিক জ্যোতিষ প্রচলিত, সেখানে নাক্ষত্রিক রাশিচক্র (Sidereal Zodiac) ব্যবহার করা হয়, যা নক্ষত্রপুঞ্জের বাস্তব অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, এবং সময়ের সাথে সাথে মহাজাগতিক পরিবর্তনের জন্য নিয়মিতভাবে সমন্বয় করা হয়। এইভাবেই, হাজার হাজার বছর ধরে রাশিচক্র মানবজাতির মহাবিশ্বকে বোঝার এবং নিজেদের ভাগ্য নির্ণয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে।[২][৩]
বারো রাশি
[সম্পাদনা]

| ক্রম | চিহ্ন | অবস্থান | বাংলা নাম | লাতিন নাম | প্রতিরূপ | গ্রিক নাম | সংস্কৃত নাম |
|---|---|---|---|---|---|---|---|
| ১ | ♈︎ | ০° | মেষ | Aries | ভেড়া | Κριός (Krios) | Meṣa (मेष) |
| ২ | ♉︎ | ৩০° | বৃষ | Taurus | ষাঁড় | Ταῦρος (Tauros) | Vṛṣabha (वृषभ) |
| ৩ | ♊︎ | ৬০° | মিথুন | Gemini | জমজ ডায়াসকিউরি | Δίδυμοι (Didymoi) | Mithuna (मिथुन) |
| ৪ | ♋︎ | ৯০° | কর্কট | Cancer | কাঁকড়া | Καρκίνος (Karkinos) | Karka (कर्क) |
| ৫ | ♌︎ | ১২০° | সিংহ | Leo | সিংহ | Λέων (Leōn) | Siṃha (सिंह) |
| ৬ | ♍︎ | ১৫০° | কন্যা | Virgo | কুমারীত্ব | Παρθένος (Parthenos) | Kanyā (कन्या) |
| ৭ | ♎︎ | ১৮০° | তুলা | Libra | দাঁড়িপাল্লা | Ζυγός (Zygos) | Tulā (तुला) |
| ৮ | ♏︎ | ২১০° | বৃশ্চিক | Scorpio | কাঁকড়াবিছে | Σκoρπίος (Skorpios) | Vṛścika (वृश्चिक) |
| ৯ | ♐︎ | ২৪০° | ধনু | Sagittarius | (অশ্বমানব) ধনুর্ধর | Τοξότης (Toxotēs) | Dhanuṣa (धनुष) |
| ১০ | ♑︎ | ২৭০° | মকর | Capricornus | পর্বত ছাগল | Αἰγόκερως (Aigokerōs) | Makara (मकर) |
| ১১ | ♒︎ | ৩০০° | কুম্ভ | Aquarius | জলাধার | Ὑδροχόος (Hydrokhoos) | Kumbha (कुंभ) |
| ১২ | ♓︎ | ৩৩০° | মীন | Pisces | মাছ | Ἰχθύες (Ikhthyes) | Mīna (मीन) |
তারামণ্ডল
[সম্পাদনা]
| নাম | উজ্জ্বলতম নক্ষত্র[৪] |
|---|---|
| মেষ | আশ্বিনী[৫] / হামাল |
| বৃষ | রোহিণী |
| মিথুন | সোমতারা |
| কর্কট | পুষ্যা |
| সিংহ | মঘা |
| কন্যা | চিত্রা |
| তুলা | বিশাখা |
| বৃশ্চিক | জ্যেষ্ঠা |
| ধনু | কাউস অস্ট্রেলিস |
| মকর | দেনেব আলগেদি |
| কুম্ভ | শতভিষা |
| মীন | মত্স্যমুখ |
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Zodiac, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা
- ↑ "Zodiac | Signs, Dates, Symbols, Months, Astrology, & Facts | Britannica"। www.britannica.com (ইংরেজি ভাষায়)। ১৩ অক্টোবর ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ১৬ অক্টোবর ২০২৫।
- ↑ "12 Astrology Zodiac Signs Dates, Meanings and Compatibility"। www.zodiacsign.com। সংগ্রহের তারিখ ১৬ অক্টোবর ২০২৫।
- ↑ "ম্যাগনিচিউড স্কেল"। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২।
- ↑ নক্ষত্রাদি, নক্ষত্র (হিন্দু জ্যোতিষ)