রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
অধ্যাপক

রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী
Ramendra Sundar Trivedi.jpg
পেশাঅধ্যাপনা, লেখক, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি
ভাষাবাংলা
জাতীয়তাব্রিটিশ ভারতীয়
ধরনজনপ্রিয় বিজ্ঞান
বিষয়যুক্তিবাদী রচনা

আচার্য রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী (আগস্ট ২০, ১৮৬৪ - জুন ৬, ১৯১৯)[১] বাংলা ভাষার একজন বিজ্ঞান লেখক। তিনি ভারতের মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন।[২] তার পূর্বে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ ছিল না। উপযুক্ত বইয়ের অভাবই ছিল এর মূল কারণ। তিনি প্রচুর গ্রন্থ ও প্রবন্ধ রচনা করেন এবং বক্তৃতার মাধ্যমে বাঙালিদেরকে বিজ্ঞান চর্চায় অনুপ্রাণিত করেন। তাঁর কোনো মৌলিক গবেষণা বা আবিষ্কার নেই, তবে তিনি মূলত লেখনীর মাধ্যমেই একজন বিজ্ঞানী ও শাস্ত্রজ্ঞের মর্যাদা লাভ করেছেন। বিশুদ্ধ বিজ্ঞান ছাড়াও তিনি দর্শনসংস্কৃত শাস্ত্রের দুর্বোধ্য বিষয়গুলো সহজ বাংলায় পাঠকের উপযোগী করে তুলে ধরেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

পরিবার ও প্রাতিস্বিক জীবন[সম্পাদনা]

রামেন্দ্রসুন্দর ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি মহকুমার জেমো গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম গোবিন্দসুন্দর এবং মা চন্দ্রকামিনী। বাংলা ভাষার চর্চার জন্য বিখ্যাত হয়েছেন রামেন্দ্রসুন্দর, কিন্তু জন্মসূত্রে তিনি বাঙালি ছিলেন না। তার পূর্বপুরুষরা বন্ধুগল গোত্রের জিঝৌতিয়া ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এই সম্প্রদায়ের লোকেরা রামেন্দ্রসুন্দরের জন্মের দু-শ বছর আগে থেকেই মুর্শিদাবাদে বসবাস করতো। এর ফলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের সকলের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে যায় এবং এক অর্থে তারা বাঙালিদের মতই বাংলার চর্চা করতে শিখেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সূচনার আগেই ১৮৭৮ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে জেমো রাজপরিবারের নরেন্দ্র নারায়ণের কনিষ্ঠ কন্যা ইন্দুপ্রভা দেবীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

১৮৮২ সালে কান্দি ইংলিশ স্কুল থেকে প্রবেশিকা উত্তীর্ণ হন। বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজের একজন প্রাক্তনী এই রামেন্দ্র।[৩] ১৮৮৪ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। একই কলেজ থেকে ১৮৮৬ সালে রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞান উভয় সাম্মানিক স্নাতক পরীক্ষাতেই প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৮৮৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তরেও প্রথম স্থান অর্জন করে নেন ত্রিবেদী; ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ বৃত্তি পান।[২][১]

আচার্য রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর প্রতিকৃতি

শিক্ষকজীবন[সম্পাদনা]

১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দে রিপন কলেজে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নশাস্ত্রের অধ্যাপক হন। পরে প্রথমে ছয় মাসের জন্য অস্থায়ী অধ্যক্ষ এবং শেষে স্থায়ী অধ্যক্ষ হন। ১৮৯২ সালে রিপন কলেজেই পদার্থবিদ্যা ও রসায়নশাস্ত্রের অস্থায়ী অধ্যাপক হিসেবে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তী ছয় মাসে তিনি স্থায়ী অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। ১৯০৩ সালে তিনি এই কলেজের স্থায়ী অধ্যক্ষ নির্বাচিত হন, আমরণ সে পদেই বহাল ছিলেন।[৪][১]

বিজ্ঞানসাহিত্য[সম্পাদনা]

তিনি বাংলা সংস্কৃতির ধারা বজায় রাখার জন্যই ১৮৯৪ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ গঠন করেন যা তখনকার সর্বোচ্চ গুণমানী প্রতিষ্ঠান ছিল। তিনি ১৯০৪ থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি ছিলেন।[৫] তাঁরই প্রচেষ্টায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ঐতিহ্যবাহী গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১৪ সালে কলকাতার টাউন হলে 'বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলন'-এর সপ্তম অধিবেশনের বিজ্ঞান শাখার সভাপতি ছিলেন রামেন্দ্রসুন্দর। সেখানে তিনি বাংলায় প্রবন্ধ পাঠ করতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অসম্মতি জানায়। তিনি তখন প্রবন্ধ পাঠ থেকে বিরত থাকেন। শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার দেবপ্রসাদ সর্বাধিকারী তাঁকে অনুমতি দিলে তিনি বাংলায় প্রবন্ধ পাঠ করেন। সাধারণ মানুষের কাছে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের প্রচার তাঁর জীবনের এক ব্রত ছিল। তিনি সাহিত্যের সঙ্গে বিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন।[৪]

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সম্পর্কে বলেন:

বাংলার লেখকমণ্ডলীর মধ্যে সাধারণত লিপিনৈপুণ্যের অভাব দেখা যায় না; কিন্তু স্বাধীন মননশক্তির সাহস ও ঐশ্বর্য অত্যন্ত বিরল। মনন ও রচনারীতি সম্বন্ধে রামেন্দ্রসুন্দরের দুর্লভ স্বাতন্ত্র্য ছিল। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁহার সেই খ্যাতি বিলুপ্ত হইবে না। বিদ্যা তাঁহার ছিল প্রভূত, কিন্তু সেই বিদ্যা তাঁহার মনকে চাপা দিতে পারে নাই। তিনি যাহা বলিতেন, তাহার বিষয়বিচারে অথবা তাহার লেখন-প্রণালীতে অন্য কাহারো অনুবৃত্তি ছিল না।[৬]

প্রকাশিত গ্রন্থাবলি[সম্পাদনা]

  • জিজ্ঞাসা (১৯০৩)[৭][১]
  • বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা (১৯০৬)
  • চরিত কথা (১৯১৩)[৮]
  • শব্দকথা (১৯১৭)[১]
  • বিজ্ঞান জ্যোতিষ সমাজ
  • ধর্ম্মের জয়
  • ঐতরেয় ব্রাহ্মণ (অনুবাদ, ১৩১৮ বঙ্গাব্দ)
  • জগৎ কথা
  • কর্ম্ম-কথা (১৯১৩)[১]
  • বিচিত্র জগৎ (১৯১৩)[১]
  • প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের স্থূল মর্ম্ম
  • মায়া-পুরী
  • প্রকৃতি (১৩০৩ বঙ্গাব্দ)[২]
  • বিচিত্র প্রসঙ্গ (১৩২১ বঙ্গাব্দ)[২]

মৃত্যু[সম্পাদনা]

১৯১৯ সালের ৬ জুন তিনি মৃত্যুবরণ করেন।[২]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

  1. "Distinguished-Alumni|CU"www.caluniv.ac.in। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১১-০১ 
  2. "Adorn Publication"adornbooks.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১১-০১ 
  3. "Surendranath Law College ::PRESIDENT DESK"snlawcollege.ac.in। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১১-০১ 
  4. "রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী"সববাংলায়। ২০২১-০৯-০৭। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৯-১০ 
  5. "পরিষদ সম্পর্কে – বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ"। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১১-০১ 
  6. "Rabindranath Tagore - Essays - ব্যক্তিপ্রসঙ্গ - রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী (ramendrasundar thibedi)"www.tagoreweb.in। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১১-০১ 
  7. "Adorn Publication"adornbooks.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১১-০১ 
  8. "Shishu Sahitya Samsad Private Limited"samsadbook.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১১-০১