বিষয়বস্তুতে চলুন

রত্নগোত্রবিভাগ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

রত্নগোত্রবিভাগ বা উত্তরতন্ত্রশাস্ত্র বৌদ্ধধর্মের তথাগতগর্ভ তত্ত্বের ওপর রচিত সংস্কৃত গ্রন্থ বিশেষ। এই গ্রন্থের মূল রচনা ও টীকাভাষ্যগুলির তিব্বতীচীনা ভাষায় সংরক্ষিত রয়েছে।

রচয়িতা

[সম্পাদনা]

চীনা ঐতিহ্যে রত্নগোত্রবিভাগ গ্রন্থের রচয়িতা হিসেবে স্থিরমতি বা সারমতির নামের উল্লেখ থাকলেও তিব্বতী ঐতিহ্যে এই গ্রন্থের শ্লোকগুলির রচয়িতা হিসেবে মৈত্রেয়নাথ এবং শ্লোকের ব্যাখ্যাকার হিসেবে অসঙ্গের নামের উল্লেখ রয়েছে। চীনা গ্রন্থে প্রাপ্ত স্থিরমতি নামটি তিব্বতী ঐতিহ্যে প্রাপ্ত মৈত্রেয়নাথের বিশেষণ বলেও কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন।[n ১] শক লিপিতে সংস্কৃত ভাষায় রচিত রত্নগোত্রবিভাগের একটি অংশের আবিষ্কারের পর এই গ্রন্থের মূল শ্লোকগুলির রচয়িতা হিসেবে মৈত্রেয়নাথের অংশগ্রহণের প্রমাণ পাওয়া যায়।[২] যদিও জিকিদো তাকাসাকি ধর্মধাত্ববিশেষশাস্ত্র নামক গ্রন্থের সঙ্গে রত্নগোত্রবিভাগের তুলনা করে এর টীকাভাষ্যের রচয়িতা হিসেবে স্থিরমতির নামকেই যথার্থ বলে মনে করেছেন।[৩]:৬২ পিটার হার্ভের মতে এই গ্রন্থে অসঙ্গের অবদান সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।[৪]

ইতিহাস

[সম্পাদনা]

ভারতে রত্নগোত্রবিভাগ গ্রন্থ ও তার টিকাভাষ্য সম্বন্ধে খুব অল্পই প্রমাণ রয়েছে। মৈত্রী পা রত্নগোত্রবিভাগ ও ধর্মধর্মতাবিভাগ গ্রন্থ দুইটি পুনরাবিষ্কার করেন[৫], যদিও বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার শিক্ষক জ্ঞানশ্রীমিত্র সাকারসিদ্ধিশাস্ত্র এবং সাকারসংগ্রহ গ্রন্থ দুইটি রচনার সময়ে রত্নগোত্রবিভাগ গ্রন্থ সম্বন্ধে পরিচিত ছিলেন। রত্নাকরশান্তি নামক মৈত্রী পার অপর এক শিক্ষক তার সূত্রসমুচ্চয়ভাষ্য নামক গ্রন্থ রচনার সময় রত্নগোত্রবিভাগ গ্রন্থকে উদ্ধৃত করেন। মৈত্রী পা এই গ্রন্থের শিক্ষা আনন্দকীর্তি ও সজ্জন নামক দুই বৌদ্ধ ভিক্ষুকে দান করেন।[n ২] র্ঙ্গোগ-লো-ত্সা-বা-ব্লো-ল্দান-শেস-রাব কাশ্মীরি পণ্ডিত রত্নবজ্র[৭] এবং সজ্জনের সহায়তায়[৩]: একাদশ শতাব্দীতে শ্রীনগর শহরে তিব্বতী ভাষায় এই গ্রন্থ ও তার টীকাভাষ্য অনুবাদ করেন।[৮] পরবর্তীকালে জো-নাং ধর্মসম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা দোল-পো-পা-শেস-রাব-র্গ্যাল-ম্ত্শানর্ন্যিং-মা শিক্ষক 'জাম-ম্গোন-'জু-মি-ফাম-র্নাম-র্গ্যাল-র্গ্যা-ম্ত্শো এই গ্রন্থের টীকা রচনা করেন।[৯]

সংস্করণ

[সম্পাদনা]

রাহুল সাংকৃত্যায়ন তিব্বত থেকে সংস্কৃত ভাষায় এই গ্রন্থের দুইটি পুঁথি আবিষ্কার করেন[৩]:[১০][১১][১২] এই গ্রন্থের সংস্কৃত, তিব্বতী[১৩]চীনা ভাষার[১৪] সংস্করণগুলির মধ্যে চীনা অনুবাদটি সর্বাপেক্ষা পুরাতন হলেও এই অনুবাদটি মূল সংস্কৃত গ্রিন্থটির সঠিক প্রতিনিধিত্ব করে না।[৩]: চীনা অনুবাদটি চিউ চিং য়ি -চেং পাও সিং লুন নামে পরিচিত যাকে সংস্কৃত অনুবাদ করলে নামটি দাঁড়ায় উত্তর একযানরত্নগোত্রশাস্ত্র[৩]:[১৫] তিব্বতী ভাষায় এই গ্রন্থের নামটি হল থেগ-পা-ছেন-পো-র্গ্যুদ-ব্লা-মা'ই-ব্স্তান-ব্চোস (ওয়াইলি: Theg-pa-chen-po rgyud-bla ma'i bstan-bcos) এবং এর টীকা ভাষ্য গ্রন্থটি থেগ-পা-ছেন-পো-র্গ্যুদ-ব্লা-মা'ই-ব্স্তান-ব্চোস-র্নাম-পার-ব্সাদ-পা (ওয়াইলি: Theg-pa-chen-po rgyud-bla ma'i bstan-bcos rnam-par-bsad-pa)[৩]: ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে ইউজিন ওবারমিলার তিব্বতী থেকে এই গ্রন্থের ইংরেজিতে অনুবাদ করেন।[১৬] পরবর্তীকালে রোজমেরী ফুকস[১৭] এবং জিকিদো তাকাসাকি এই গ্রন্থকে সম্পূর্ণ রূপে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন।[৩]

ব্যাখ্যা

[সম্পাদনা]

রত্নগোত্রবিভাগ গ্রন্থের পৃথক ব্যাখ্যা বা টীকাভাষ্য অংশ থাকলেও এই গ্রন্থের সঙ্গেই এর ব্যাখ্যা অংশটি সংযুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়, যা রত্নগোত্রবিভাগব্যাখ্যা নামে পরিচিত। জিকিদো তাকাসাকি সংস্কৃত এবং তার চীনা ও তিব্বতী অনুবাদের বিশ্লেষণ করে ব্যাখ্যা অংশটি বাদ দিয়ে মূল শ্লোকগুলিকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হন। পরবর্তীকালে ল্যাম্বার্ট স্মিটহাউসেন[১৮] (in the German) এবং জান দেজং[১৯] বিস্তারিতভাবে তার কাজের বিশ্লেষণ করেন।

এই গ্রন্থে ৪৩০টি সংস্কৃত শ্লোকের সাথে একটি গদ্য টীকাভাষ্য বা ব্যাখ্যা রয়েছে। টীকাভাষ্যটিতে তথাগতগর্ভ সম্পর্কিত ভিন্ন সূত্র থেকে প্রচুর উদ্ধৃতি রয়েছে। তিব্বতী ও চীনা অনুবাদগুলি মূল সংস্কৃত গ্রন্থ থেকে অনেকটাই পৃথক। এই তিন ভাষার সংস্করণগুলি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে শ্লোকগুলির মধ্যে মাত্র ২৭টি মূল শ্লোক এবং বাকি ৪০৫টি শ্লোক অতিরিক্ত ও পরিপূরক কারিকাবিশেষ।[৩]:১০-১৮

বিষয়বস্তু

[সম্পাদনা]

রত্নগোত্রবিভাগ গ্রন্থে তথাগতগর্ভ তত্ত্ব সম্বন্ধে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এই গ্রন্থের অপর নাম উত্তরতন্ত্রশাস্ত্র এই রচনার সেই দাবিকেই জোরালো করে যে, তথাগতগর্ভ সম্পর্কিত শিক্ষাই গৌতম বুদ্ধের অন্তিম শিক্ষা। এই তত্ত্বে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক সচেতন জীব হয় বুদ্ধত্ব লাভের ক্ষমতা ধরেন।[২০] এই গ্রন্থে সমস্ত জীবে বিরাজমান তথাগতগর্ভের ধাতু সম্বন্ধেও আলোচনা করা হয়েছে।[n ৩] এই গ্রন্থে শ্রীমালাদেবী সিংহনাদসূত্র থেকে উদ্ধৃতি নিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যে যে সমস্ত জীব শূন্যতা সম্বন্ধে সচেতন নয়, তাদের তথাগতগর্ভ সম্বন্ধে কোন জ্ঞান থাকে না।[n ৪] প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রগুলিতে শূন্যতা সম্বন্ধে যে শিক্ষা দেওয়া হয়, এই গ্রন্থে তার চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।[n ৫] এই গ্রন্থে সুগতগর্ভ সম্পর্কিত গ্রন্থগুলির বক্তব্যকে একত্র করে বুদ্ধত্ব, ধর্ম, সংঘ, ধাতু, বোধি, গুণ ও কর্ম এই সাতটি বজ্রপদ সম্বন্ধে পাঁচটি অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।[২২]

পাদটীকা

[সম্পাদনা]
  1. Il se peut que quelques-unes des divergences, en principe fondamentales, entre les traditions tibétaines et chinoise au sujet de l'auteur du RGV soient plus apparentes que réeles. Jusqu' ici on a le plus souvent procédé en suposant que la tradition indo-tibétaine qui tient Maitreya pour l'auteur de ce traité est entirècontraire a la tradition sino-indienne sur *Sāramati. Cependant, ne serait-il pas également possible de considérer le nom *Sāramati -- de même que le nom Vyavadāta-samaya dans le colophon du MSA -- comme une épithète de Maitreya ? En effect, dans le Maitreya-prasthāna-sūtra, bLo-gros brtan-po (= Sthiramati, ou quelque nom synonyme comme Dṛḍhamati) a été effectivement mentioneé comme l'appelation sous laquelle Maitreya était connu dans dans une existence antériere. Si le nom mentioné par Fa-tsang et d'autres autorités pouvait alors être considéré comee une epithéte de Maitreya, la divergence entre la tradition rapporté par les docteurs chinois et la tradition indo-tibétaine ne serait plus irréductible.[১]
  2. Tradition has it that the Dharmadharmatāvibhaga and the Ratnagotravibhāga were rediscovered and taught by Maitrīpa, but Maitrīpa's teacher at Vikramaśīla, Jñānaśrīmitra (ca. 980-1040), must have already known these two works when he composed his Sākārasiddhiśāstra and Sākārasamgraha. Ratnākaraśānti, another teacher of Maitrīpa, also quotes the Ratnagotravibhāga in the Sūtrasamuccayabhāṣya. Maitrīpa passed the Dharmadharmatāvibhaga and the Ratnagotravibhāga on to *Ānandakīrti and Sajjana.[৬]
  3. The principal subject matter of this treatise is the special theory of Dhatu (fundamental element) of the Absolute (Tathagata-garbha = essence of Buddha)... It is an exposition of the theory of the Essence of Buddhahood (tathagata-garbha), the fundamental element (dhatu) of the Absolute, as existing in all sentient beings. ... This element which had been regarded as an active force (bija) before, is regarded, in this text, as eternal, quiescent and unalterable, as the true essence of every living being and source of all virtuous qualities.[২১]:৪০,৪১
  4. The Uttaratantra is a Mahayana text with emphasis on Buddhist metaphysics and mysticism [...] Tathagata-garbha thought is complementary to sunyata thought of the Madhyamika and the Yogacara, as it is seen in the Uttaratantra. The Uttaratantra first quotes the Srimala-devi-sutra to the effect that tathagata-garbha is not accessible to those outside of sunya realization and then proceeds to claim that sunyata realization is a necessary precondition to the realization of tathagata-garbha. There is something positive to be realized when one’s vision has been cleared by sunyata. The sunyata teachings of the prajna-paramita are true but incomplete. They require further elucidation, which is found in the Uttaratantra.[২১]:৫০
  5. The sunyata teachings in the Prajna-paramita are true, but incomplete. They require still further elucidation, which the Uttaratantra provides. Thus it assumes the Prajna-paramita teachings as the purva or prior teachings, and the tathagata-garbha teachings as the uttara, in the sense of both subsequent and superior.[২১]:৪৬,৪৭

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. La Théorie du Tathāgatagarbha et du Gotra, David Seyfort Ruegg, EFEO (1969), p46
  2. V.H. Bailey & E.H. Johnston, "A Fragment of the Uttratantra in Sanskrit", BSOS 8 (1935-37) p77-89
  3. Takasaki, Jikido (1966). A Study on the Ratnagotravibhāga (Uttaratantra) Being a Treatise on the Tathāgatagarbha Theory of Mahāyāna Buddhism (Rome Oriental Series 33). Rome: Istituto Italiano per il Medio ed Estremo Oriente
  4. Peter Harvey, "An Introduction to Buddhism." Cambridge University Press, 1993, page 114.
  5. Hookham, S. K. (1991). The Buddha within: Tathagatagarbha doctrine according to the Shentong interpretation of the Ratnagotravibhaga. SUNY Press. আইএসবিএন ০-৭৯১৪-০৩৫৭-২. Source; [১] (accessed: Tuesday May 5, 2009), p.165.
  6. Mathes, Klaus-Dieter (2008). A Direct Path to the Buddha Within: Gö Lotsāwa's Mahāmudra Interpretation of the Ratnagotravibhāga. Somerville, MA, USA: Wisdom Publications, Inc. আইএসবিএন ০-৮৬১৭১-৫২৮-৪(pbk.:alk.paper): p.2
  7. Sadhukhan, Sanit Kumar (1994). 'A Short History of Buddhist Logic in Tibet'. Bulletin of Tibetology, p.12.
  8. THEG PA CHEN PO RGYUD BLA MA'I BSTAN BCOS BZHUGS SO[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  9. Duckworth, Douglas S. (2008). Mipham on Buddha-nature: the ground of the Nyingma tradition. SUNY Press. আইএসবিএন ০-৭৯১৪-৭৫২১-২.
  10. Johnston, E. H. (ed.) & Chowdhury, T. (indexation)(1950). The Ratnagotravibhāga Mahāyānanottaratantraśāstra. Patna. (NB: seen through the press and furnished with indexes by T. Chowdhury).
  11. Journal of Bihar and Orissa Research Society (J.B.O.R.S.), vol XXI, p. 31 (III. Ṣalu monastery, vol. XI-5, No. 43) and. XXIII, p. 34 (VII. Ṣalu monastery, vol. XIII-5, No. 242).
  12. "ratnagotravibhāgo mahāyānottaratantraśāstram"। ১৩ জুন ২০১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ 
  13. No. 4025; Tohaku University (Ed.)(1934). A Complete Catalogue of the Tibetan Buddhist Canons, Sde-dge Edition, Tohaku University
  14. No. 1611, Vol.31; Chinese Tripiṭaka. Taisho Daizokyo Edition, Japanese. Machine-readable text-database of the Taisho Tripitaka (zip files of Taisho Tripitaka vol. 1-85);
  15. "Taisho Tripitaka Vol. 31, No. 1611 究竟一乘寶性論"। ৭ সেপ্টেম্বর ২০০৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৪ জানুয়ারি ২০১৪ 
  16. Obermiller, Eugène (1931). 'The Sublime Science of the Great Vehicle to Salvation Being a Manual of Buddhist Monism.' Acta Orientalia 9, 81-306.
  17. Buddha Nature: The Mahayana Uttaratantra Shastra with Commentary Rosemary Fuchs. Snow Lion Publications. Ithica: 2000
  18. Schmithausen, Lambert (1971). 'Philologische Bemerkungen zum Ratnagotravibhaga.' Wiener Zeitschrift für die Kunde Südasiens 15, 123-77.
  19. deJong, Jan W. (1979). 'Review of Takasaki 1966'. Buddhist Studies by J. W. de Jong, 563-82. Ed. by Gregory Schopen. Berkeley: Asian Humanities Press.
  20. Mathes, Klaus-Dieter (2008). A Direct Path to the Buddha Within: Gö Lotsāwa's Mahāmudra Interpretation of the Ratnagotravibhāga. Somerville, MA, USA: Wisdom Publications, Inc. আইএসবিএন ০-৮৬১৭১-৫২৮-৪(pbk.:alk.paper): p.1
  21. Professor C.D. Sebastian, Metaphysics and Mysticism in Mahayana Buddhism, Delhi, 2005
  22. Bucknell, Roderick & Stuart-Fox, Martin (1986). The Twilight Language: Explorations in Buddhist Meditation and Symbolism. Curzon Press: London. আইএসবিএন ০-৩১২-৮২৫৪০-৪

আরো পড়ুন

[সম্পাদনা]
  • Takasaki, Jikido A Study on the Ratnagotravibhāga – Being a Treatise on the Tathāgatagarbha Theory of Mahāyāna Buddhism, Serie Orientale Roma XXXIII ISMEO 1966
  • Ruegg, D. Seyfort (1976). 'The Meanings of the Term "Gotra" and the Textual History of the "Ratnagotravibhāga"'. Bulletin of the School of Oriental and African Studies, University of London, Vol. 39, No. 2 (1976), pp. 341–363

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]