রণজিত গুহ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

রণজিত গুহ (জন্মঃ ২৩ মে, ১৯২২) দক্ষিণ এশিয়ার একজন ইতিহাসবিদ যিনি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন,[১] এবং প্রাচীন জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করা অনেক সংগঠনের সম্পাদক ছিলেন। ১৯৫৯ সালে তিনি ভারত থেকে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান, এবং সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে রিডার পদে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি ভিয়েনা, অস্ট্রিয়াতে বসবাস করেন।[২]

তার রচিত Elementary Aspects of Peasant Insurgency in Colonial India গ্রন্থটি ব্যাপকভাবে ধ্রুব হিসাবে বিবেচিত।[৩] বিখ্যাত নোবেলজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতে, তিনি হলেন "বিশ শতকের সবচেয়ে সৃজনশীল ভারতীয় ঐতিহাসিক"।[৪]

পরিচিতি[সম্পাদনা]

১৯২৩ সালের ২৩ মে, বরিশালের বাখরগঞ্জের সিদ্ধকাটি গ্রামে গুহর জন্ম৷ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সূত্রে তালুকদার ছিল তাঁর পরিবার। গুহ-র লিখেছেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই শ্রেণি-পরিচিতির গ্লানি তাঁর মনে গেঁড়ে বসে– যার বীজেই তাঁর পরবর্তী জীবনের ইতিহাস-ভাবনার উন্মেষ।

কলকাতায় এসে গুহ জড়িয়ে পড়েন কমিউনিস্ট আন্দোলনে। সিপিআই-এর সক্রিয় সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র তিনি ১৯৪৭ সালে ডিসেম্বরে প্যারিসে বিশ্ব ছাত্র সম্মেলনেও যোগ দেন। এর পর একে একে সাইবেরিয়া, উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও চিন বিপ্লব স্বচক্ষে জরিপ করেন তিনি দলের প্রতিনিধি হিসেবে।

১৯৫৬ সালে, বিদেশ থেকে ফেরার কিছু পর, হাঙ্গেরিতে সোভিয়েত অনুপ্রেবেশের বিরোধিতায় তিনি দল ছেড়ে দেন।[৫] তত দিনে অবশ্য তাঁর লেখালেখি শুরু হয়ে গেছে৷ দলীয় মুখপত্রে 'মেদিনীপুরের লবণশিল্প' নামে একটি লেখা লেখেন। সাহিত্য-সমালোচনাও করেছিলেন এই সময়ে, নীরেন্দ্রনাথ রায়ের ম্যাকবেথ-অনুবাদকে সমালোচনা করেন তিনি। সঙ্গে চলতে থাকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পেছনের তাত্ত্বিক ভাবনা নিয়ে তাঁর ধারাবাহিক, অসম্পূর্ণ রচনা।

দল ছাড়ার পর গুহ বিদ্যাসাগর কলেজ ও সুশোভন সরকারের আমন্ত্রণে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু কাল পড়ান। তাঁর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিয়ে গবেষণার ইচ্ছে থাকলেও নরেন্দ্রকৃষ্ণ সিংহ তাঁকে ছাত্র হিসেবে নেন নি। সিংহ অর্থনৈতিক ইতিহাসের মুখবন্ধ হিসেবে ভাবনার বিবর্তনকে গুরুত্ব দিতে রাজি ছিলেন না।

রণজিৎ পাড়ি জমালেন সাসেক্সে। সেখানেই গবেষণা করতে থাকলেন তিনি, বছর কয়েক পর বই হয়েও বেরোবে অধুনা-উদযাপিত তাঁর গবেষণা 'আ রুল অফ প্রপার্টি'। যে বিশ্ব-সাম্রাজ্য তৈরি সাম্রাজ্যবাদীদের অভীষ্ট ছিল, সেই ধ্রুব বিশ্বমন্য চিন্তাভাবনা, গুহর মতে, উপনিবেশের ছকভাঙা বিশিষ্ট পরিস্থিতিতে খাটে নি। অতএব, বুর্জোয়া শ্রেণি তৈরির বদলে তা ফল দিয়েছিল পুরোপুরি অন্য: স্বত্বভোগী পরভৃৎ-জমিদার শ্রেণি তৈরি করেছিল তা।

বিদ্যায়তনিক কোলাহল থেকে প্রায়-অন্তরিন গুহ ষাটের দশকে বিলেতে কিছু পাঠচক্র চালিয়েছিলেন মাত্র। সত্তরের দশকের শুরুতে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের নকশালপন্থী ছাত্রদের সংস্পর্শে আসেন তিনি। গাঁধী নিয়ে ভাবতে চাইলেও তিনি শেষ পর্যন্ত মন দেন ঔপনিবেশিক কৃষক-সমাজ নিয়ে তাঁর কাজে।

সাবঅল্টার্ন তত্তের প্রবর্তন ও অন্যান্য কাজ[সম্পাদনা]

১৯৮০ সালে সাবঅলটার্ন তত্ত্ব নিয়ে হাজির হলেন গুহ, পরের বছর থেকে তা অক্সফোর্ড প্রকাশও করতে থাকল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচনায়, সদ্যনির্মিত সেন্টার ফর স্টাডিজ-এ, বা এক্ষণের মত সাময়িকপত্রে তাঁর ভাবনা প্রকাশিত হল৷ তাঁর মতে, ভারতীয় ইতিহাস-লিখন এক বদ্ধতায় পর্যবসিত হয়েছে। কেন-না, তা উচ্চবর্গকে স্বতঃসিদ্ধ আলোচনা-বিষয় হিসেবে ধরে নেয়। গুহর বিকল্প: নিম্নবর্গের দিকে ইতিহাসকারকে চোখ ফেরাতে হবে৷ তার ব্যক্তিক চৈতন্য, বিদ্রোহী মানস ও আদিসত্তার প্রকরণগুলি আলোকপর্বের গোঁড়ামো কাটিয়ে ইতিহাসবিদকে পড়তে হবে৷

গুহর প্রস্তাবিত সাবঅলটার্ন গোষ্ঠীতে অধিকাংশই ছিলেন পিএইচডি-ও না-করা ছাত্ররা। পার্থ চট্টোপাধ্যায়, গৌতম ভদ্র, দীপেশ চক্রবর্তী, শাহিদ আমিন, ডেভিড আর্নল্ড ও ডেভিড হার্ডিম্যান ছিলেন এই দলে। পরে, কিছু কালের জন্য ছিলেন সুমিত সরকার-ও।

গুহ আশির দশকে নিলেন চূড়ান্ত রাজনৈতিক সাবঅলটার্ন মুখপত্রগুলি সম্পাদনার ভার, অন্য দিকে, তত্ত্ববিশ্বে বেশ কিছু আলোড়ন-তোলা লেখা লিখলেন। গ্রামশি, ফুকো, রলা বার্ত ও ক্লদ লেভি স্ত্রসের গঠনবাদের ভিত্তিতে, নিজের কিছু টিপ্পনী যোগ করে, অসম ক্ষমতা-সম্পর্কের একটি কাঠামো তৈরি করলেন গুহ৷ এই প্রেক্ষিত দিয়েই চেনা যাবে ঔপনিবেশিক ভারতের ইতিহাস– যা খণ্ডিত, ভগ্ন সাবঅলটার্ন চৈতন্যকে পড়তে চায়। কোনও বস্তুনিষ্ঠ, তথ্যপুঞ্জে আচ্ছাদিত, পরম সত্যে ধাবমান গবেষণা-পদ্ধতিটিকে তিনি খারিজ ও অবৈধ করে দিলেন, কার্যত একার হাতে। কৃষক অভ্যুত্থানের গঠনতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা নিয়ে এই সময়ে বই লিখলেন৷ শুধু ভারত নয়, জাপান বা লাতিন আমেরিকাতেও এই সাবঅলটার্নি শাখা ছড়িয়ে পড়ল৷ উৎসকে সত্য হিসেবে না ধরে একটি বয়ান হিসেবে পড়তে শিখিয়ে পাঠের নানা স্তর দেখালেন তিনি। তত দিনে, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক বিতর্কে যোগ দিয়েছেন, সাবঅলটার্ন কর্তৃত্ব ও এলিট আধিপত্যের নয়া সমালোচনা করলেন তিনি।

নব্বই দশকের আগেই গুহ নৃতত্ত্ব পড়াতে ক্যানবেরায় পাড়ি জমালেন। সাবঅলটার্ন গোষ্ঠীর কুশীলব চরিত্র থেকে অবসরও নিলেন। নব্বই দশকে ধীরে ধীরে ভাষাদর্শন নিয়ে আগ্রহী হয়ে পড়লেন তিনি। তাঁর বিষয়মাধ্যম হিসেবে উঠে এল বাংলা ভাষা, ভাবনায় এলেন জীবনানন্দ বা সমর সেন। প্রাচীন ভারতীয় ভাষাতত্ত্ব, হাইডেগারের প্রপঞ্চদর্শন ও হেগেলের ভাববাদ তত দিনে তাঁর প্রিয় বিষয়। অন্য দিকে, ডমিন্যান্স উইদাউট হেজেমনির আলোচনায় উঠে এসছে ইতিহাসে স্বরাজের প্রশ্ন– ব্যক্তিক বোধ ও বিশ্ব-ইতিহাসের সর্বজনীনতার হুকুমদারির যে অন্তর্লীন টানাপোড়েন তাঁর পরের বই 'হিস্ট্রি অ্যাট দ্য লিমিট অফ ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি'-রও বক্তব্য।

নতুন সহস্রাব্দে তিনি পাড়ি জমালেন ভিয়েনার শহরতলি পুর্কের্সডর্ফে। ২০০৭ থেকে লিখতে শুরু করলেন বাংলায়, যার কেন্দ্রীয় বিষয় ভাবনার ইতিহাস, কখনও সাহিত্য, কখনও দর্শনে চরাচরের সঙ্গে 'আমি'র যে দ্বৈত সংলাপ আলো ফেলেছে। তাঁর মতে, এই মানবিক গুণটি ভারতে প্রকাশ পেয়েছে সাহিত্যে, ইতিহাসে নয়। রামমোহন থেকে বঙ্কিমচন্দ্র, মহাভারত থেকে বিভূতিভূষণের ঋতবাদী ভাবনাই হয়ে উঠল জীবনসায়াহ্নে এই দার্শনিকের বোধের আয়ুধ।

দ্বিভাষিকতা ও বাংলাভাষায় কাজ[সম্পাদনা]

রণজিৎ গুহ বাঙালি চিন্তাবিদদের মধ্যে প্রকৃত দ্বিভাষিকের এক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। আঠারো শতকের গোড়ায় দরিদ্র মলাঙ্গিদের চরম দুর্দশা ও বিদ্রোহ নিয়ে তিনি তাঁর প্রথম ইতিহাস বিষয়ক প্রবন্ধ ‘মেদিনীপুরের লবণশিল্প’ বাংলায় রচনা করেন, যা রমেশচন্দ্র মজুমদার ও নরেন্দ্রকৃষ্ণ সিংহ সম্পাদিত ইতিহাস’ পত্রিকায় ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হয়। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ, এ রুল অফ প্রপার্টি' (১৯৬৩), প্রকৃতপক্ষে তাঁর লেখা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সূত্রপাত (১৯৫৭) নামক বাংলা প্রবন্ধের খসড়া থেকেই পরবর্তীকালে জন্মলাভ করে।

রণজিৎ গুহ ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় একাধিক প্রবন্ধ রচনা করেছেন বিভিন্ন সময়ে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল দয়া: রামমোহন রায় ও আমাদের আধুনিকতা (২০১০), প্রেম না প্রতারণা (২০১৩) ইত্যাদি। তাঁর বিভিন্ন লেখায় এসেছে সাহিত্যের বিভিন্ন প্রসঙ্গ, যেমন; কবির নাম ও সর্বনাম (২০০৯), ছয় ঋতুর গান (২০০৯) প্রভৃতি।[৬]

রণজিৎ গুহের সমস্ত বাংলায় লেখা আনন্দ পাবলিশার্স থেকে দুখণ্ডে সমগ্র আকারে প্রকাশিত হয়েছে। ISBN 9789388870481

গ্রন্থপঞ্জি[সম্পাদনা]

লেখক[সম্পাদনা]

  • A rule of property for Bengal : an essay on the idea of permanent settlement, Paris [etc.] : Mouton & Co., 1963, New edition: Duke University Press, আইএসবিএন ০-৮২২৩-১৭৬১-৩
  • Elementary Aspects of Peasant Insurgency in Colonial India, Oxford University Press, Delhi, 1983, New edition: Duke Univ Press, 1999, আইএসবিএন ০-৮২২৩-২৩৪৮-৬ - a classic of Subaltern Studies
  • Guha, Ranajit, "History at the Limit of World-History" (Italian Academy Lectures), Columbia University Press 2002
  • An Indian Historiography of India: A Nineteenth Century Agenda & Its Implications. Calcutta: K.P. Bagchi & Company. 1988.
  • Dominance without Hegemony: History and Power in Colonial India, Harvard University Press, 1998
  • The Small Voice of History, Permanent Black, 2009

সম্পাদনা[সম্পাদনা]

  • (গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিবেক-এর সাথে), Selected Subaltern Studies, New York: Oxford University Press, 1988
  • A Subaltern Studies Reader,1986-1995, Univ of Minnesota Press, 1997, আইএসবিএন ০-৮১৬৬-২৭৫৮-৪

নিবন্ধ[সম্পাদনা]

গুহ-কে নিয়ে কাজ[সম্পাদনা]

  • Sathyamurthy, T. V. "Indian Peasant Historiography: A Critical Perspective on Ranajit Guha's Work." In: Journal of Peasant Studies (October 1990) vol.18, no.1, pp. 93–141.
  • Ranajit Guha's Biography written by Shahid Amin and Gautam Bhadra and the complete bibliography compiled by Gautam Bhadra are available in Subaltern Studies Volume VIII edited by David Arnold and David Hardiman, OUP, 1994.

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Guha, Ranajit (১৯৯৩)। Subaltern Studies Reader, 1986-1995। University of Minnesota Press। আইএসবিএন 0-8166-2759-2 
  2. Milinda Banerjee। "In Search of Transcendence: An Interview with Ranajit Guha" (PDF)University of Heidelberg। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১১ 
  3. Biswas, Amrita (২০০৯)। "Research Note on Subaltern Studies"। Journal of Literature, Culture and Media Studies। পৃষ্ঠা 200। 
  4. "রচনাসংগ্রহ প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড"desh.co.in। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৯-১১ 
  5. রায়, বিশ্বজিৎ। "ধর্ম আসলে 'ভাল ইতিহাসের নথিখানা'"anandabazar.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৯-১১ 
  6. "রচনাসংগ্রহ প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড"desh.co.in। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৯-১১