যাত্রা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পশ্চিমবঙ্গ যাত্রা আকাদেমি ও ফণিভূষণ বিদ্যাবিনোদ যাত্রামঞ্চ

যাত্রা ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গবাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় লোকনাট্য ধারা। এগুলি প্রধানত চারঘণ্টাব্যাপী বিপুল আয়োজনের বিনোদন। উচ্চ শব্দ ও চড়া আলোর ব্যবহার এবং দৈত্যাকার মঞ্চে নাটকীয় উপস্থাপনা যাত্রার বৈশিষ্ট্য। অতিনাটকীয় ভাবভঙ্গি ও আবৃত্তির মাধ্যমে প্রায়ই যাত্রার উপস্থাপনা করা হয়ে থাকে। সম্প্রতি যাত্রার উন্নতিকল্পে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কলকাতার বাগবাজারে স্থাপন করেছেন পশ্চিমবঙ্গ যাত্রা আকাদেমি ও ফণিভূষণ বিদ্যাবিনোদ যাত্রামঞ্চ। যাত্রা বাংলাদেশ, ভারতের বিভিন্ন স্থানে হয়ে থাকে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে, অসাম, ত্রিপুরা ইত্যাদি প্রদেশে অনুষ্ঠিত হয়।

যাত্রাপালা[সম্পাদনা]

শক্তিশালী গণমাধ্যম হিসাবে যাত্রার স্বীকৃতি আছে। নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ি (১৮৮৯-১৯৫৯) বলে গেছেন, ‘আমাদের জাতীয় নাট্য বলিয়া যদি কিছু থাকে তাহাই যাত্রা।’ নাট্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জিয়া হায়দার (১৯৩৬-২০০৮) বলেন ‘যাত্রাই হতে পারে আমাদের জাতীয় নাট্য।’ তবে দুঃখজনক যে, এ সম্ভাবনা আদৌ আমাদের দৃষ্টিগোচর হলো না।

যাত্রার জন্মকথা[সম্পাদনা]

বৈদিক যুগে বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের দেব-দেবীর উৎসব হতো। ভক্তরা ঢাকঢোল নিয়ে মিছিলসহকারে নাচতে নাচতে-গাইতে গাইতে উৎসবে যোগ দিত। এক জায়গায় এক দেবতার বন্দনা ও লীলাকীর্তন শেষ করে আরেক জায়গায় আরেক দেবতার উৎসবে গান-বাজনার মিছিল নিয়ে যাত্রা শুরু করত। সূর্যদেবকে উপলক্ষ করে সৌরোৎসব, শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীতে কৃষ্ণযাত্রা, জগন্নাথ দেবের উদ্দেশে রথযাত্রা, দোল পূর্ণিমায় দোল যাত্রা এবং মনসামঙ্গলে ভাষান যাত্রা।’ এই যে, দেবদেবীদের উৎসবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া- এ ‘যাওয়া’ থেকেই ‘যাত্রা’ কথাটির উৎপত্তি বলে একদল গবেষক মনে করেন। ড. আশরাফ সিদ্দিকীর মতে শব্দটি দ্রাবিড় থেকে এসেছে। কারণ দ্রাবিড়দের মধ্যে এখনো এমন অনেক উৎসব আছে যাকে বলা হয় ‘যাত্রা’ বা ‘যাত্র।’ অন্যদল মনে করেন মধ্যযুগে এ দেশে যে পাঁচালী গান প্রচলিত ছিল, তা থেকে যাত্রার উদ্ভব।

যাত্রার ইতিহাস[সম্পাদনা]

যাত্রাপালার ইতিহাসে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে আছেন এক মহান ব্যক্তি, নাম ব্রজেন্দ্র কুমার দে (১৯০৭-১৯৭৬)। তিনি সর্বমোট ১৮৯টি পালা লিখেছেন। শুধু তাই নয়, যাত্রার রচনা রীতিকে সংস্কার ও সমকালীন করেছেন। জন্ম বর্তমান শরীয়তপুর জেলার গংগানগর গ্রামে। বাংলাদেশে গত ৫০ বছরে বিভিন্ন জাতীয় যাত্রা উৎসবে, মেলায় পার্বণে এবং বিভিন্ন যাত্রাদলে তার রচিত যাত্রাপালাই সবচেয়ে বেশি অভিনীত হয়েছে। ছোটখাটো একটি তালিকা দেওয়া যেতে পারে। যেমন- দোষী কে, চণ্ডীমঙ্গল, সোহ্রাব-রুস্তম, বাঙালি, রাজ সন্ন্যাাসী, চাঁদ সুলতানা, আঁধারের মুসাফির, বর্গী এল দেশে, চাষার ছেলে, রাজনন্দিনী, স্বামীর ঘর, ধর্মের হাট, লীলাবসান, বিদ্রোহী নজরুল, নটি বিনোদিনী, করুণাসিন্ধু বিদ্যাসাগর। প্রথম জাতীয় যাত্রা উৎসব স্মরণিকায় তার সম্পর্কে বলা হয়েছে,

‘চারণ কবি মুকুন্দ দাশের পর এমন মৃত্তিকাসংলগ্ন আধুনিক যাত্রাপালা নির্মাতা এ দেশে একাধিক জন্মগ্রহণ করেননি।’ তিনি ‘যাত্রাপালাসম্রাট’ ও লোকনাট্যগুরু’ উপাধি পেয়েছিলেন। পরিমার্জন ও পরিশীলিত যাত্রাপালার যে ধারা ব্রজেন দে তৈরি করে গেছেন, তার অনুসারী হয়ে সেই চেতনায় এগিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশের পালাকাররা। যাত্রার মানোন্নয়নে নিজের দায়বদ্ধতা থেকে পালা লিখছেন পশ্চিমবঙ্গের বিধায়ক ভট্টাচার্য, উৎপল দত্ত, অমর ঘোষ, মন্মথ রায় প্রমুখ যশস্বী নাট্যকাররা। আমাদের এখানে সেই মনমানসিকতা এখনো দেখা যাচ্ছে না। তবে কিছুটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন মামুনুর রশীদ। সবুজ অপেরার ব্যানারে ‘ওরা কদম আলী’ এবং চারণিক নাট্যগোষ্ঠীর ব্যানারে ‘এখানে নোঙর’ যাত্রামঞ্চে অভিনীত হয়।

কিন্তু পুরোপুরিভাবে যাত্রার আঙ্গিক বৈশিষ্ট্য না থাকায় নাটক দুটির পালা রূপান্তরে তেমন সফলতা আসেনি। এ বন্ধ্যাত্ব কাটিয়ে সময়ের দাবি মেটাতে গত শতাব্দীর ৮০’র দশক থেকে যাত্রার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই মৌলিক যাত্রাপালা লিখে যাচ্ছেন। এ তালিকায় রয়েছে- পরিতোষ ব্রহ্মচারীর ক্লিওপেট্রা, ফুলন দেবী, নদীর নাম মধুমতি, জালাল উদ্দীনের রাজ্যহারা, কিছু খেতে দাও, আরশাদ আলীর গৌরীমালা, সতী কলংকিনী, সাহেব আলীর জংলী মেয়ে, ননী চক্রবর্তীর যৌতুক, দস্যু রানি, কলিকালের মেয়ে, এমএ মজিদের কমলা সুন্দরী, ঘুণে ধরা সমাজ। সাধন মুখার্জির চণ্ডালের মেয়ে, পৃথিবীর আত্মহত্যা, মহসীন হোসাইনের অমর প্রেম, সম্রাট কবি বাহাদুর শাহ্, মীরজাফরের আর্তনাদ, অতুল প্রসাদ সরকারের কারবালার কান্না, হাসানের বিষপান, মতিউর রহমানের রাজ সিংহাসন, যৌতুক হলো অভিশাপ, রাখাল বিশ্বাসের মানস প্রতিমা, রক্তাক্ত সমাজ। সেকেন্দার আলী শিকদারের হোসেনের অন্তিম শয্যা, সফিকুল ইসলাম খানের দায়মুক্তি, সভ্যতার লজ্জা, আমিনুর রহমান সুলতানের বিদ্রোহী বুড়িগঙ্গা, বিউটি বেগমের রাজনর্তকি ও মিলন কান্তি দে’র দাতা হাতেম তাই, বিদ্রোহী নজরুল, রক্তে রাঙানো বর্ণমালা।

[১][২][৩][৪]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Jatra Britannica.com.
  2. Jatra South Asian Folklore: An Encyclopedia : Afghanistan, Bangladesh, India, Nepal, Pakistan, Sri Lanka, by Peter J. Claus, Sarah Diamond, Margaret Ann Mills. Published by Taylor & Francis, 2003. আইএসবিএন ০-৪১৫-৯৩৯১৯-৪. Page 307.
  3. Jatra The Cambridge guide to Asian theatre, by James R. Brandon, Martin Banham. Published by Cambridge University Press, 1997. আইএসবিএন ০-৫২১-৫৮৮২২-৭. Page 89-91.
  4. Eastern regions The world encyclopedia of contemporary theatre, by Don Rubin, Chua Soo Pong, Ravi Chaturvedi. Published by Taylor & Francis, 2001. আইএসবিএন ০-৪১৫-২৬০৮৭-৬.Page 133.

যুগান্তর পত্রিকা