মৌলিক কম্পাঙ্ক

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
কোন রজ্জুতে সৃষ্ট কম্পন এবং স্থির তরঙ্গ। চিত্রে, মৌলিক কম্পাঙ্ক এবং এর প্রথম ছয়টি উপসুর দেখানো হয়েছে।

স্বাভাবিক কম্পাঙ্ক বা মৌলিক কম্পাঙ্ক (ইংরেজি: natural frequency or fundamental frequency; অনেক সময় শুধু মৌলিক বলে অভিহিত করা হয়) দ্বারা কোন পর্যাবৃত্ত তরঙ্গরূপের সর্বনিম্ন কম্পাঙ্ককে নির্দেশ করা হয়। সংগীতশাস্ত্রে, মৌলিক দ্বারা কোন স্বরে (note) বিদ্যমান তীক্ষ্ণতায় (pitch) উপস্থিত সর্বনিম্ন আংশিক সমমেল (partial harmonic) বোঝায়। সাইনুসয়েড এর উপরিপাতনের পরিভাষায়, মৌলিক কম্পাঙ্ক হচ্ছে সাইনুসয়েডের সমষ্টিতে বিদ্যমান নিম্নতম কম্পাঙ্ক। কোন কোন ক্ষেত্রে, মৌলিক কম্পাঙ্ককে (অথবা ) দ্বারা প্রকাশ করা হয়; যার মাধ্যমে শূন্য থেকে গণনা শুরু করে প্রাপ্ত সর্বনিম্ন কম্পাঙ্ক নির্দেশ করা হয়।[১][২][৩] আবার অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে একে , প্রথম সমমেল হিসেবে প্রকাশ করা হয়।[৪][৫][৬][৭][৮] (সেক্ষেত্রে, দ্বিতীয় সমমেল হচ্ছে , ... , ইত্যাদি। এক্ষেত্রে শূন্যতম সমমেল হবে হার্জ)।

বেনওয়ার্ড ও সেকার রচিত মিউজিক : ইন থিওরি অ্যান্ড প্র্যাকটিস (অনূদিত বাংলা শিরোনাম: সঙ্গীত: তত্ত্বে এবং চর্চায় ) গ্রন্থে বলা হয়েছে:

যেহেতু মৌলিক হচ্ছে সর্বনিম্ন কম্পাঙ্ক এবং একে সবচেয়ে জোরালো বলেও অনুভূত হয়, শ্রবণেন্দ্রিয় এটিকে সুরের সুনির্দিষ্ট তীক্ষ্ণতা হিসেবে (ঐকতান বর্ণালি) হিসেবে শনাক্ত করে... স্বতন্ত্র আংশিক (সমমেল) গুলো আলাদাভাবে নয়, বরং একত্রে মিশে গিয়ে কানে একটি অভিন্ন সুর হিসেবে শোনা যায়।[৯]

— বেনওয়ার্ড এবং সেকার, মিউজিক: ইন থিওরি অ্যান্ড প্র্যাকটিস (৭ম সংস্করণ)[১০]

ব্যাখ্যা[সম্পাদনা]

সকল সাইনুসয়েডাল এবং সাইনুসয়েড নয় এমন অনেক তরঙ্গরূপও সময়ের সাথে সাথে অবিকলভাবে পুনরাবৃত্ত হয় - এগুলো পর্যাবৃত্ত তরঙ্গ। কোন তরঙ্গরূপের পর্যায়কাল হচ্ছে এর সর্বনিম্ন মান, যার জন্য নিচের সমীকরণটি সত্য:

সকল এর জন্য।

যেখানে হচ্ছে সময়ে তরঙ্গরূপের মান। এর অর্থ হচ্ছে ওপরের সমীকরণটি এবং দৈর্ঘ্যের যেকোন ব্যবধিতে তরঙ্গরূপের মানগুলোকে সংজ্ঞায়িত করতে পারলেই ঐ তরঙ্গটি পূর্ণাঙ্গরূপে সংজ্ঞায়িত হবে।

কোন তরঙ্গরূপকে ফুরিয়ে ধারা দ্বারা উপস্থাপন করা যায়।

যেকোন তরঙ্গরূপকে এর পর্যায়কালের গুণিতক হিসেবে বর্ণনা করা যায়। কোন তরঙ্গের জন্য, ক্ষুদ্রতম এমন একটি পর্যায়ের অস্তিত্ব থাকে যার মধ্যে ফাংশনটিকে পূর্ণাঙ্গরূপে বর্ণনা করা যায়; এই পর্যায়কে বলা হয় মৌলিক পর্যায়। মৌলিক কম্পাঙ্ককে সংজ্ঞায়িত করা হয় এর গৌণিক বিপরীতক হিসেবে:

যেহেতু পর্যায় পরিমাপ করা হয় সময়ের এককে, সেহেতু কম্পাঙ্কের একক হয় । যখন সময়ের একক সেকেন্ড, তখন কম্পাঙ্ক হয় , যা হার্জ নামেও পরিচিত। এক মুখ বন্ধ এবং এক মুখ উন্মুক্ত এমন কোন নলের দৈর্ঘ্য যদি হয়, তাহলে মৌলিক সমমেল এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য হবে (ওপরের চিত্রের প্রথম দুটি অ্যানিমেশন দ্রষ্টব্য)। সেক্ষেত্রে,

তাহলে,

সম্পর্কটি ব্যবহার করে পাই,

এখন ওই একই নলের উভয় প্রান্তই যদি একত্রে বন্ধ অথবা একত্রে খোলা থাকে (শেষের দুটি অ্যানিমেশন দ্রষ্টব্য), মৌলিক সমমেলের তরঙ্গদৈর্ঘ্য হয় । একই পদ্ধতিতে মৌলিক কম্পাঙ্ক পাওয়া যায়:

২০ °সে (৬৮ °ফা) তাপমাত্রায়, বাতাসে শব্দের বেগ ৩৪৩ মিটার প্রতি সেকেন্ড (১,১৩০ ফুট/সে)। এই গতিবেগ তাপমাত্রার ওপর নির্ভরশীল এবং প্রতি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য ০.৬ মিটার/সেকেন্ড হারে বাড়তে থাকে (প্রতি ডিগ্রি ফারেনহাইট বৃদ্ধির জন্য ১.১ ফুট/সেকেন্ড হারে)।

ভিন্ন ভিন্ন তাপমাত্রায় শব্দের বেগ:

  • তাপমাত্রা ২০ °সে. হলে, শব্দের বেগ, ৩৪৩.২ মি./সে.
  • তাপমাত্রা ০ °সে. হলে, শব্দের বেগ, ৩৩১.৩ মি./সে.

সঙ্গীতশাস্ত্রে[সম্পাদনা]

সঙ্গীতশাস্ত্রে, মৌলিক বলতে কোন স্বরে (note) উপস্থিত এমন তীক্ষ্ণতা (pitch) বোঝায় যা ঐ স্বরের নিম্নতম আংশিক (partial) হিসেবে অনুভূত হয়। কোন রজ্জু বা বায়ু স্তম্ভের সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্যজুড়ে কম্পন, কিংবা বাদকের নির্বাচিত উচ্চতর সমমেল এর ওপর ভিত্তি করে মৌলিক কম্পাঙ্ক সৃষ্টি করা যায়। সমমেলগুলোর কম্পাঙ্কের মধ্যে মৌলিক-ও একটি। সমমেল হচ্ছে সমমেল শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত যেকোন কম্পাঙ্ক, যা সাধারণ মৌলিক কম্পাঙ্ক এর ধনাত্মক পূর্ণ-সাংখ্যিক গুণিতকের একটি আদর্শ সেট। মৌলিককেও সমমেল হিসেবে ধরা হয় এ কারণে যে, এটি নিজ কম্পাঙ্কের এক গুণের সমান।[১১]

মৌলিক হচ্ছে সেই কম্পাঙ্ক যাতে সম্পূর্ণ তরঙ্গই কম্পিত হয়ে থাকে। তরঙ্গে উপস্থিত সাইনুসয়েড উপাংশসমূহ, যাদের কম্পাঙ্ক মৌলিক কম্পাঙ্কের চেয়ে বৃহত্তর, তাদেরকে বলা হয় উপসুর। মৌলিক এবং উপসুর সহ কম্পাঙ্কের সকল উপাংশ, যা নিয়ে কোন তরঙ্গরূপ গঠিত হয়, তাদেরকে একত্রে বলা হয় আংশিক (partials)। এগুলো একত্রে সমমেল শ্রেণি (harmonic series) গঠন করে। উপসুরগুলোর মধ্যে যেগুলো মৌলিক কম্পাঙ্কের পূর্ণ সাংখ্যিক গুণিতক, তাদের সমমেল বলা হয়। কোন উপসুর যদি সমমেলের খুব কাছাকাছি, কিন্তু পুরোপুরি অবিকল না হয়, সেগুলোকে কখনো কখনো আংশিক সমমেল (harmonic partial) বলা হয়ে থাকে, যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের সমমেল বলেই অভিহিত করা হয়। কখনো কখনো এমন উপসুর সৃষ্টি করা হয়, যা সমমেলের ধারে কাছেও থাকে না; তাদেরকে শুধু আংশিক বা অসমমেল উপসুর বলে নির্দেশ করা হয়।

মৌলিক কম্পাঙ্ককে প্রথম সমমেল এবং প্রথম আংশিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরপর আংশিক এবং সমমেলের সংখ্যাক্রম সচরাচর একইভাবে হয়ে থাকে (যেমন- দ্বিতীয় আংশিক হচ্ছে দ্বিতীয় সমমেল...ইত্যাদি)। কিন্তু যদি অসমমেল আংশিক এর উপস্থিতি থাকে, সেক্ষেত্রে এদের সংখ্যাক্রম আর একই থাকে না। মৌলিকের ওপরে এদের অবস্থান অনুসারে উপসুরের সংখ্যাক্রম দেওয়া হয়। অতএব, কড়াকড়িভাবে বললে, প্রথম উপসুর হচ্ছে দ্বিতীয় আংশিক (এবং সাধারণত দ্বিতীয় সমমেল)। এ রকম রীতির কারণে যেহেতু বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে, সেজন্য শুধুমাত্র সমমেলগুলোকে তাদের সংখ্যাক্রম দ্বারা নির্দেশ করা হয়, এবং উপসুর ও আংশিকগুলোকে সমমেলের সাথে তাদের সম্পর্ক দ্বারা প্রকাশ করা হয়ে থাকে।

যান্ত্রিক ব্যবস্থায়[সম্পাদনা]

ধরা যাক, একটি স্প্রিং এর এক প্রান্ত দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ এবং অপর প্রান্তে ভর সংযুক্ত অবস্থায় রয়েছে; তাহলে সেটা হবে একক স্বাধীনতার মাত্রা (single degree of freedom, SDoF) বিশিষ্ট একটি দোলক। একে গতিশীল করা হলে তা নিজের স্বাভাবিক কম্পাংকে দুলতে থাকবে। একক স্বাধীনতার মাত্রার কোন দোলক ব্যবস্থায়, যেখানে গতিকে একটিমাত্র স্থানাংক দ্বারা বর্ণনা করা যায়, সেখানে স্বাভাবিক কম্পাঙ্ক ঐ ব্যবস্থার দুটি বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে: ভর এবং কাঠিন্য (stiffness)। ব্যবস্থাটি বাধাহীন (no damping) ধরে নিয়ে, স্বাভাবিক কম্পাঙ্ক বা মৌলিক কম্পাঙ্ক () পাওয়া যায় নিম্নোক্ত সমীকরণ থেকে:

যেখানে,

স্প্রিং এর কাঠিন্য (stiffness)

ভর

স্বাভাবিক কম্পাঙ্ক (রেডিয়ান প্রতি সেকেন্ড এককে)।

স্বাভাবিক কম্পাঙ্ক নির্ণয়ের জন্য এর মানকে দ্বারা ভাগ করা হয়। অথবা,

যেখানে,

স্বাভাবিক কম্পাঙ্ক (এসআই একক: হার্জ বা, চক্র/সেকেন্ড)

স্প্রিং এর কাঠিন্য (এসআই একক: নিউটন প্রতি মিটার ())

ভর (এসআই একক: কিলোগ্রাম ())।

মোড বিশ্লেষণের (modal analysis) সময়, প্রথম মোডের কম্পাঙ্কই হচ্ছে মৌলিক কম্পাঙ্ক।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "sidfn"। Phon.UCL.ac.uk। ২০১৩-০১-০৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১২-১১-২৭ 
  2. Lemmetty, Sami (১৯৯৯)। "Phonetics and Theory of Speech Production"। Acoustics.hut.fi। সংগ্রহের তারিখ ২০১২-১১-২৭ 
  3. "Fundamental Frequency of Continuous Signals" (PDF)। Fourier.eng.hmc.edu। ২০১১। সংগ্রহের তারিখ ২০১২-১১-২৭ 
  4. "Standing Wave in a Tube II – Finding the Fundamental Frequency" (PDF)। Nchsdduncanapphysics.wikispaces.com। ২০১৪-০৩-১৩ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১২-১১-২৭ 
  5. "Physics: Standing Waves"। Physics.Kennesaw.edu। ২০১৯-১২-১৫ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১২-১১-২৭ 
  6. Pollock, Steven (২০০৫)। "Phys 1240: Sound and Music" (PDF)। Colorado.edu। ২০১৪-০৫-১৫ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১২-১১-২৭ 
  7. "Standing Waves on a String"। Hyperphysics.phy-astr.gsu.edu। সংগ্রহের তারিখ ২০১২-১১-২৭ 
  8. "Creating musical sounds"OpenLearn। Open University। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০৬-০৪ 
  9. Benward, Bruce and Saker, Marilyn (1997/2003). Music: In Theory and Practice, Vol. I, 7th ed.; p. xiii. McGraw-Hill. আইএসবিএন ৯৭৮-০-০৭-২৯৪২৬২-০.
  10. Benward, Bruce and Saker, Marilyn (1997/2003). Music: In Theory and Practice, Vol. I, 7th ed.; p. xiii. McGraw-Hill. আইএসবিএন ৯৭৮-০-০৭-২৯৪২৬২-০.
  11. Pierce, John R. (২০০১)। "Consonance and Scales"। Cook, Perry R.। Music, Cognition, and Computerized SoundMIT Pressআইএসবিএন 978-0-262-53190-0