মেহেদি (উদ্ভিদ)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

মেহেদি
Lawsonia inermis
Lawsonia inermis Ypey36.jpg
Lawsonia inermis
বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ: Plantae
বিভাগ: Magnoliophyta
শ্রেণী: Magnoliopsida
বর্গ: Myrtales
পরিবার: Lythraceae
গণ: Lawsonia
প্রজাতি: L. inermis
দ্বিপদী নাম
Lawsonia inermis
L.

মেহেদি (Lawsonia inermis, মেহেদী, মেহেন্দী, মেন্দি। ইংরেজিতে হেনা, যা আরবি হিন্না حِنَّاء থেকে এসেছে [১]) এক ধরনের সপুষ্পক উদ্ভিদ, যার পাতা প্রাচীনকাল থেকে ত্বক, চুল, নখ, পশুর চামড়া ও পশম রঙিন করার কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই উদ্ভিদের পাতার সাথে অন্যান্য দ্রব্য মিশিয়ে আধা-কৃত্রিম পদার্থ তৈরি করা হয়, সেটাও মেহেদি নামেই পরিচিত। মেহেদির নানা প্রকার ঔষধি গুণাগুণও রয়েছে ।

হাতে মেহেদি দেয়া হচ্ছে

পরিচিতি[সম্পাদনা]

দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-কাণ্ড[সম্পাদনা]

মেহেদি একটি লম্বা গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ, যা সাধারণত ১.৮ থেকে ৭.৬ মিটার (৬ থেকে ২৫ ফুট) পর্যন্ত লম্বা হয়। এটি একটি বহু শাখাযুক্ত উদ্ভিদ। কচি সময় এর কাণ্ড গুলো বেশ নমনীয় থাকলেও ধীরে ধীরে বেশ শক্ত পোক্ত এবং অভঙ্গুর হয়ে উঠে। কাণ্ডে পাতা একে অপরের বিপরীতে বৃদ্ধি পায়। তারা অবৃন্তক , উপ - বৃত্তাকার এবং ভল্লাকার ( দীর্ঘ এবং মাঝখানে ব্যাপকতর; গড় মাত্রা ১.৫ - ৫.০ সেমি X ০.৫ - ২ সেমি বা এক্স ০.২ - ০.৮ মধ্যে ০.৬ - ২ হয়) হয় , এবং এতে শান দেওয়া ( দীর্ঘ সরুকারী বিন্দু), এবং পৃষ্ঠে পৃষ্ঠীয় বিষণ্ন শিরা আছে ।

পাতা-ফুল-ফল[সম্পাদনা]

দীর্ঘজীবী মেহেদি উদ্ভিদে ফুল ফুটতেও দেখা যায় আবার এই ফুল থেকে ফলও উৎপন্ন হয়। ফুলের চারটি সেপাল এবং একটি ২ মিমি (০.০৭৯০ ইঞ্চি) ক্যালিক্স টিউব, ৩ মিমি (০.১২ ইঞ্চি) স্প্রেড লোব থাকে। এর পাপড়ি ডিম্বাকৃতি , সাদা বা লাল ক্যালিক্স টিউবের প্রান্তে জোড়া পুংকেশর থাকে। ডিম্বাশয় চার-কোষবিশিষ্ট ৫ মিমি (০.২০ মধ্যে) দীর্ঘ এবং খাড়া হয়। হেনা ফল ছোট, বাদামী ক্যাপসুল প্রকৃতির, ৪ –৮ মিমি (০.১৬ – ০.৩১ ইঞ্চি) ব্যাস বিশিষ্ট, প্রতি ফলে ৩২ থেকে ৪৯ বীজ থাকে এবং এরা অনিয়মিতভাবে চার ভাগে খোলে।

চাষাবাদ[সম্পাদনা]

মেহেদি উদ্ভিদ প্রচন্ড তাপ সহনশীল উদ্ভিদ। এগুলো উত্তর আফ্রিকা , এশিয়া এবং উত্তর অস্ট্রেলিয়ার শুষ্ক এবং গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের আদি স্থানীয় উদ্ভিদ। এগুলো প্রায় সর্বোচ্চ ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়ও টিকে থাকতে পারে, তবে ৩৫ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৯৫ এবং ১১৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট) তাপমাত্রায় এগুলোর ফলন সর্বাধিক হয়। বৃষ্টিপাতের ব্যবধানের সময় এদের দ্রুত বৃদ্ধি হয় এবং অভঙ্গুর পুরান কাণ্ড হতে নমনীয় এবং ভঙ্গুর নতুন কাণ্ড বের হয়। প্রবৃদ্ধি পরবর্তীকালে ধীর হয়ে যায়। শীতকালে এদের পাতাগুলি ধীরে ধীরে হলুদ হয়ে যায় এবং দীর্ঘ শুষ্ক বা শীতল বিরতিতে পড়ে যায়। যেখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড (৫২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) এর নিচে থাকে সেখানে এটি সমৃদ্ধ হয় না। আর তাপমাত্রা সর্বনিম্ন ৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড (৪১ ডিগ্রি ফারেনহাইট) এর নিচে নামলে এরা মারা যায়।

ব্যবহার[সম্পাদনা]

ব্যবহার[সম্পাদনা]

ব্রোঞ্জ যুগ থেকেই দুনিয়াবাসীরা রঞ্জক হিসেবে মেহেদি ব্যবহার করে আসছে। দুনিয়ার বহু দেশে এটি উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বাংলাদেশ এবং ভারতে ঈদ ও বিয়ে উপলক্ষে এর ব্যবহার অনেকটা আবশ্যিকরূপে প্রচলিত। ভারতীয় আদালতে চুলের রঙ হিসেবে মেহেদির ব্যবহারের কথা উল্লেখ আছে যেটা প্রায় ৪০০ খ্রিষ্টাব্দের।[২] ছত্রাক-রোধী হিসেবেও মেহেদি কার্যকর।[৩] কাপড় ও চামড়া সংরক্ষণেও এর ব্যবহার হয়। মেহেদি ফুল থেকে সুগন্ধী তৈরি হতো বহু প্রাচীনকাল থেকেই, বর্তমান যুগে এর উৎপাদন আবার শুরু হয়েছে। পোকা দমনেও মেহেদি ব্যবহৃত হয়। লসোন (lawsone) বা ২-হাইড্রক্সি-১,৪ ন্যাপথা কুইনোন নামক এক প্রকার জৈব যৌগের উপস্থিতির কারণেই মেহেদিতে রঙ হয়। মেহেদির পাতাতেই প্রধানত: লসোন থাকে। যে গাছের পাতায় লসোন বেশি সে গাছের ফলে বীজ কম হয়।[৪] মেহেদি পেস্টের পিএইচ মান ৫.৫ হলে এর কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।

পদ্ধতি[সম্পাদনা]

সাধারন পদ্ধতি

কয়েক মুঠো পুষ্ট মেহেদি পাতা শিলপাটায় মিহি করে বেটে অথবা ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে নিলেই হাত- পা, চুলে ব্যবহার করা যায়।

শিল্পজাত পদ্ধতি[সম্পাদনা]

প্রয়োজনমত পুষ্ট মেহেদি পাতা নিয়ে সারাদিন কড়া রোদে শুকিয়ে ব্লেন্ডারে মিহি গুড়ো করে এতে আরো কিছু উপাদান ব্যবহার করে একে শিল্পজাত করা যায়। নিম্নে এর উপাদানের পরিমাণের ক্রম এবং কার্যপদ্ধতি দেওয়া হলো।

প্রয়োজনীয় উপকরণ: ১. পানি, (১ কাপ), ২. কফি / ব্ল্যাক টি (২ টেবিল চামচ), ৩. মেহেদি পাউডার, (৩ টেবিল চামচ), ৪. মেথির গুঁড়া / পাউডার, ( টেবিল চামচ), ৫. ভিনেগার / লেবুর রস (১ টেবিল চামচ), ৬. ইউক্যালিপটাস / এসেনশিয়াল অয়েল (বাধ্যতামূলক নয়), ৭. চিনি।

কার্যপদ্ধতি:

  • প্রথমেই মেহেদি পাউডারকে ভালোভাবে ছেঁকে নিতে হবে, যাতে তাতে কোনো আঁশ বা ময়লা না থাকে।
  • একটি বাটিতে পানি ঢেলে তাতে চিনি ও কফি পাউডার দিয়ে গরম করতে হবে। কফি পাউডার এর রঙ বেরিয়ে আসলে গরম করা বন্ধ করে তাতে মেহেদি পাউডার ও লেবুর রস মিশাতে হবে।
  • মিশ্রণটিকে ভালোভাবে মিশ্রিত করে হবে এবং উৎপন্ন পেস্টটিকে ভালোভাবে সারারাত ঢেকে রাখতে হবে। পরদিন সকালে প্রয়োজনমত এসেনশিয়াল অয়েল বা লেবুর রস নিয়ে পেস্টটিতে মিহি মেথির গুঁড়া ঢেলে নিতে হবে।
  • . পেস্টটিকে ভালোভাবে মিশাতে হবে। এবার আবারও ৫-৬ ঘণ্টার জন্য মিশ্রণটিকে ফ্রিজে রাখতে হবে। এতে ৫-৬ ঘণ্টা পর পেস্ট এর উপরের আবরণ বাদামী দেখাবে এবং পেস্ট এর উপরে হালকা বাদামী জলীয় দ্রবণ জমবে।
  • এরপর পরিমাণমত মেহেদি টিউবে নিয়ে ব্যবহার করতে হবে বা বাজারজাত করতে হবে।

ঔষধি গুণ[সম্পাদনা]

  • মেহেদি পাতার রস ও সরষে তৈল ঘাড়ে মালিশ করলে ঘাড়ের ব্যথা কমে যায়। একমনকি গরুর ঘাড়ের ব্যাথাও কমে।
  • এ পাতা বেটে নখে ও চুলে লাগালে নখ ও চুল ভাল থাকে।
  • পায়ের তলায় পাতা বাটার প্রলেপ দিলে চোখে গুটি ওঠে না।
  • পাতা বেটে পুরানো একজিমায় লাগলে ভাল ফল পাওয়া যায়।
  • পাতা বেটে হাতে লাগালে লাল হয়। অনেকে পাকা চুলেও ব্যবহার করেন।
  • ইউনানী চিকিৎসকদের মতে, চুল উঠে যাওয়া বা পাকায় ১টি হরিতকি ও ১০/১২ গ্রাম মেহেদি পাতা একটু থেতো করে ২৫০ মলি গ্রাম পানিতে সেদ্ধ করে ৬০-৭০ মিলি থাকতে নামিয়ে ছেকে ঠান্ডা হলে মাথায় লাগালে উপকার পাওয়া যায়।
  • শ্বেতপ্রদরে ২৫ গ্রাম মেহেদি পাতা সেদ্ধ করে সেই পানিতে উত্তরস্তি ( ডুশ দেওয়া) দিলে সাদাস্রাব ও অভ্যন্তরের ‍চুলকানি প্রশমিত হয়। স্থানভ্রস্ট জরায়ুর ক্ষেত্রেও উপযুক্ত পদ্ধতি প্রয়োগ করলে অসুবিধা কমে যায়।
  • শুক্রমেহ রোগে মেহেদি পাতার রস এক চা চামচ দিনে দুবার পানিতে বা দুধের সাথে একটু চিনি মিশিয়ে খেলে এক সপ্তাহের মধ্যে উপকার পাওয়া যায়।
  • মুখ গলার ক্ষতে পাতা সেদ্ধ পানি মুখে খানিক্ষন রাখলে সেরে যায়।
  • গ্রীষ্মকালে ঘেমে গিয়ে গায়ে দুর্গন্ধ হলে মেহেদি পাতা ও বেনামূল সেদ্ধ পানিতে গোসল করলে উপকার পাবেন।
  • কানে পুজ হলে এ পাতার রস ২ ফোটা করে কানে দিলে ৪/৫ দিনে পুজ পড়া বন্ধ হয়ে যায়।
  • চোখ ওঠায় অল্প কয়েকটা পাতা থেঁতো করে গরম পানিতে ফেলে ছেকে সেই পানির ফোটা চেখে দিলে সেরে যায়। এমনকি চোখেন কোন থেকে পুজের মতো পড়তে থাকলেও এটি ব্যবহার করলেও সেরে যায়।
  • প্রাচীনপন্থী বৈদ্য সম্প্রদায়ের মতে শরীরে হিমোগ্লোবিন সঠিক পরিমানে আছে কি না জানার জন্য এটি ব্যবহার করা হয়। মেহেদি পাতা বাটা হাতের তালুতে লাগালে রংটা লালচে আভা দিলে ভাল, না হলে হিমোগ্লেবিন কম আছে বলে ধারণা করা হয়।
  • আগের দিনে নবাব-বাদশাহদের অনিদ্রা রোগ হলে মেহেদি ফুলের বালিশে ঘুমানোর পরামর্শ দেয়া হত। এতে আছে লাইলাকের গন্ধ। গন্ধটি পার্থিব সস্তায় সমৃদ্ধ।

[৫][৬][৭]

ছবি গ্যালারি[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Bailey, L.H., Bailey, E.Z., and the staff of the Liberty Hyde Bailey Hortorium. 1976. Hortus third: A concise dictionary of plants cultivated in the United States and Canada. Macmillan, New York.
  2. Auboyer, Jeannine (২০০২) [1961]। Daily life in ancient India: from 200 BC to 700 AD। London: Phoenix। আইএসবিএন 978-1-84212-591-5ওসিএলসি 50577157 
  3. Bosoglu A, Birdane F, Solmaz H (১৯৯৮)। "The effect of Henna (Folium lawsoniae) paste in ringworm in calves"। Indian Veterinary Journal75 (1): 83–84। আইএসএসএন 0019-6479 
  4. Singh, M., Jindal, S. K., & Singh, D. (২০০৫)। "Natural Variability, Propagation, Phenology and Reproductive Biology of Henna"। Henna: Cultivation, Improvement, and Trade। Jodhpur: Central Arid Zone Research Institute। পৃষ্ঠা 13–18। ওসিএলসি 124036118 
  5. আঃ খালেক মোল্লা সম্পাদিত;লোকমান হেকিমের কবিরাজী চিকিৎসা; আক্টোবর ২০০৯; পৃষ্ঠা- ২৫০-৫১
  6. টেলিভিশন, Ekushey TV | একুশে। "মেহেদি গাছের ঔষধি ব্যবহার"Ekushey TV (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১০-২২ 
  7. "চুলে মেহেদি ব্যবহারের যত উপকার"Jugantor (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১০-২২ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]