মেন্ডীয়বাদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মান্দেয়ান দারফাশ, মেন্ডীয় বিশ্বাসের প্রতীক

মেন্ডীয়বাদ বা মান্দাই ধর্ম (ইংরেজি:"Mandaeism);একটি নস্টিক ধর্ম। এ ধর্মের অনুসারীরা আদম, অ্যাবেল, সেথ, ইনস, নুহ, শ্যাম, আরাম ও বিশেষভাবে জন দ্যা ব্যাপ্টিস্টকে শ্রদ্ধা করে থাকে। মেন্ডিয়ানরা জাতিতে সেমিটিক আর তাদের ভাষা হল পূর্ব অ্যারামাইক ভাষা যা মেন্ডাইক নামে পরিচিত। মেন্ডাইয়ান নামটি এসেছে অ্যারামাইক মেন্ডা থেকে যার মানে জ্ঞান, যা গ্রিক ভাষায় নসিস। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে সাধারণত তারা 'সুব্বা' বা স্যাবীয় নামে পরিচিত। সুব্বা পরিভাষাটি অ্যারামাইক মূল থেকে নেয়া হয়েছে যা খ্রিস্টান ব্যাপ্টিজমের সাথে সম্পর্কিত, ম্যানডিক ভাষায় যা স্যাবি। ইসলামে স্যাবীয়দেরকে ইহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে 'আসমানী গ্রন্থের মানুষ' বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞের মতে, মেন্ডীয় ধর্ম প্রথম তিন খ্রিষ্টীয় শতাব্দীর মধ্যে উদ্ভূত হয়েছে, মেসোপটেমিয়া অথবা সিরিয়া-ফিলিস্তিন অঞ্চলে। তবে কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, মেন্ডীইজম খ্রিস্টান ধর্মেরও আগের। এ ধর্ম কারুন, ইউফ্রেটিসটিগ্রিস নদীর তীরে এবং শাত-আল আরবের পাশের নদীগুলো, ইরাকের দক্ষিণে ও ইরানের খুজেস্তান রাজ্যে এ ধর্মের প্রসার ছিল। সারা পৃথিবীতে ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার মেন্ডীয় আছে বলে ধারণা করা হয়।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

মেন্ডীয় গ্রন্থ 'হারান গাওয়াইতা' অনুযায়ী মেন্ডীয়দের যাত্রা শুরু হয় যখন নেসেরীয়রা ফিলিস্তিন ত্যাগ করে ও মেসোপটেমিয়ায় প্রথম শতাব্দীতে স্থানান্তরিত হয়। কারণ জেরুজালেমতে তাদেরকে অত্যাচার করা হয়েছিল যখন শহরটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তারা প্রথমে হারানে (আধুনিক তুরস্ক) ও পরে ইরানের মিডিয়ান হিলে যায়। অবশেষে মেসোপটেমিয়ায় দক্ষিণ অংশে বসতি স্থাপন করে। মুসলিমরা যখন মেসোপটেমিয়া দখল করে তখন মেন্ডীয়দের নেতা আনুশ মুসলিমদের সামনে তাদের ধর্মগ্রন্থ গিনযা রাব্বা দেন।

মুসলিমদের তারা বলেন, তাদের প্রধান নবী জন দ্যা ব্যাপ্টিস্ট, ইসলামে ইয়াহিয়া নামে পরিচিত।

ধর্মীয় বিশ্বাস[সম্পাদনা]

ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যসমূহ[সম্পাদনা]

মেন্ডীয়বাদ একটি ধার্মিক বিশ্বাস বা মতবাদের চেয়েও আসলে একটি সংস্কৃতি হিসেবে পরিচিত। ই.এস.ড্রাওয়ারের মতে মেন্ডিজমের নয়টি  বৈশিষ্ট্য রয়েছে,

  1. একজন সর্বোচ্চ আকৃতিহীন সত্তা
  1. দ্বৈতবাদ (একজন মহাজাগতিক পিতা ও মাতা)
  1. ধারণার জগত
  1. আত্মা একটি বন্দী সত্তা
  1. গ্রহ নক্ষত্ররা মানুষের ভাগ্যে প্রভাব ফেলে ও মানুষ মৃত্যুর পর সেখানে ফিরে যায়
  1. একজন ত্রাণকর্তা থাকেন যিনি জীবনে আত্মার সাথে ভ্রমণ করেন
  1. রুপক ও প্রতীকের একটি সাংকেতিক ভাষা
  1. রহস্য (যা আত্মাকে সাহায্য ও বিশুদ্ধ করে)
  1. ধর্মের নতুন অনুসারীদের মাঝে উচ্চ পর্যায়ের গোপনীয়তা বজায় থাকে

বিশ্বতত্ত্ব[সম্পাদনা]

মেন্ডীয়বাদে কোন সাজানো বিশ্ব তত্ত্ব নেই। মহাবিশ্ব কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে সে ব্যাপারে কোন একক বর্ণনা নেই। এ ব্যাপারে বিভিন্ন বর্ণনার সমন্বয় রয়েছে।  

প্রধান নবীগন[সম্পাদনা]

মেন্ডীয়রা বিভিন্ন নবীকে স্বীকার করে। যেমন ইয়াহিয়া ইবনে জাকারিয়া। তাকে মেন্ডীয়রা তাদের ধর্মের প্রবর্তক হিসেবে না মানলেও বিশ্বাস করেন যে তার শিক্ষার মূল এসেছে নবী আদম থেকে। তারা ঈসা কে মিথ্যা মসীহ মনে করেন। তাছাড়া ইব্রাহীমমুসা কেও মিথ্যা নবী মনে করে। তবে নূহ ও বাইবেলের কিছু নবী যেমন এনস, শেম ও অ্যারামকে বিশ্বাস করে। তবে মুহাম্মদ সম্পর্কে তাদের কোনো মতামত নেই।

ধর্মগ্রন্থ[সম্পাদনা]

মেন্ডীয়দের বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল গিনযা, যা ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব ও প্রার্থনার সমন্বয়ে গঠিত। গিনযা আবার দুই ভাগে বিভক্ত- বাম গিনযা ও ডান গিনযা। সবচেয়ে প্রাচীনতম গ্রন্থগুলো তৃতীয় শতাব্দীর। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পান্ডুলিপিগুলো ষোল শতাব্দীর আগের নয়, যার বেশিরভাগই ১৮ ও উনিশ শতাব্দীতে এসেছে। গিনযা সাসানীয় সাম্রাজ্যইসলামী খিলাফতের সময়ও বিকশিত হতে থাকে।

অনুসারী সংখ্যা[সম্পাদনা]

মেন্ডীয় ধর্মের অনুসারীদের সংখ্যা ৬০,০০০- ৭০,০০০ বলে মনে করা হয়। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধে তাদের বাসস্থানে ধ্বস নামে। ফলে তারা পার্শ্ববর্তী দেশগুলো যেমন ইরান, সিরিয়াজর্ডানে স্থানান্তরিত হয়। ২০১১ সালে সৌদি আরব এর টিভি চ্যানেল আল আরাবিয়া ইরানের মেন্ডীয়দের সংখ্যা ৬০,০০০ হিসেবে প্রকাশ করে। তবে হল্যান্ডের পত্রিকা হল্যান্ড সেন্টিনেল ২০০৯ সালে প্রকাশ করে যে ইরানে মেন্ডীয়দের সংখ্যা কমে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজারে কমে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে অস্ট্রেলিয়ায় মেন্ডীয় আছে ১০,০০০ এর মত। এছাড়া ইরানের ১,০০০ মেন্ডীয় যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরিত হয় ২০০২ সালে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

১. Buckley, Jorun Jacobson(2002), The Mandaeans: Ancient Texts and modern people, Oxford University Press