মুহাম্মদ বিন ইয়াহিয়া
মুহাম্মদ বিন ইয়াহিয়া | |
|---|---|
محمّد بن يحيى | |
প্রিন্স নতো ইগোমো | |
| জন্ম | মুহাম্মদ ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দ |
| মৃত্যু | ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭ (বয়স ১০২–১০৩) |
| সমাধি | মাকাম কেলাম্বু কুনিং |
| অন্যান্য নাম | হাবিব তেঙ্গগারোং |
| পেশা | ইসলামি পণ্ডিত, মুফতি |
| নিয়োগকারী | কুতাই সুলতানাত |
| পরিচিতির কারণ | কুতাইয়ের মুফতি |
| উপাধি | হাবিব, রাদেন শরীফ পেংহুলু, প্রিন্স নতো ইগোমো |
| দাম্পত্য সঙ্গী | আজি আইশিয়াহ গেলার আজি রাদেন রেসমিনিংপুরি |
| পিতা-মাতা | আলি বিন ইয়াহিয়া (পিতা) শরিফা বিনতি তাহির (মাতা) |
| আত্মীয় | আজি মুহাম্মদ আলিমুদ্দিন (শ্বশুর) আজী মুহাম্মদ পারিকেসিত (ভগ্নিপতি) |
হাবিব মুহাম্মদ বিন ইয়াহিয়া (আরবি: محمّد بن يحيى; ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দ/১২৬০ হিজরি[১] – ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ/২৬ রবিউল আউয়াল ১৩৬৬ হিজরি)[২] ছিলেন হাদরামাউত থেকে আগত একজন প্রখ্যাত ইন্দোনেশীয় ইসলামি পণ্ডিত। তিনি তাঁর পাণ্ডিত্য ও রাজকীয় প্রভাবের কারণে মূলত প্রিন্স নতো ইগোমো (Pangeran Noto Igomo) উপাধিতেই সর্বসাধারণের কাছে অধিক পরিচিত ছিলেন। সুলতান আজি মুহাম্মদ আলিমুদ্দিনের (১৮৯৯–১৯১০) শাসনামলে তিনি পূর্ব কালিমান্তানের কুতাই সালতানাতের গ্র্যান্ড মুফতি হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।[৩]
তিনি কেবল একজন ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না, বরং কুতাই কার্তানেগারা সালতানাতের বিচারিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তাঁর ব্যাপক প্রভাব ছিল। ১৮৪৪ সালে ইয়েমেনের হাদরামাউতে জন্মগ্রহণকারী এই মনীষী পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়ায় হিজরত করেন এবং সেখানে ইসলামি শিক্ষা ও দাওয়াহ প্রসারে নিজেকে উৎসর্গ করেন। তাঁর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা এবং আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইসলামি ঐতিহ্যে এক অবিস্মরণীয় ছাপ রেখে গেছে। ১৯৪৭ সালে ১০৩ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করার আগ পর্যন্ত তিনি এই অঞ্চলের ধর্মীয় ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।[৩]
প্রাথমিক জীবন
[সম্পাদনা]হাবিব মুহাম্মদ বিন ইয়াহিয়া ১২৬০ হিজরি (১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দ) সালে হাদরামাউত অঞ্চলের আল-মাসিলা নামক একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বা আলাওয়ি সাদাহ পরিবারের সদস্য ছিলেন এবং তাঁর বংশনাম ছিল ‘আল বিন ইয়াহিয়া’। তাঁর পিতা ছিলেন সাইয়্যিদ আলি বিন হাসান বিন তাহা বিন ইয়াহিয়া (মৃত্যু ১৮৭৫) এবং মাতা ছিলেন বিন তাহির পরিবারের একজন শরিফা।[১][৪][৫]
তাঁর প্রপিতামহ হাবিব তাহা বিন মুহাম্মদ বিন ইয়াহিয়া ছিলেন এই বংশের প্রথম ব্যক্তি, যিনি মালয়েশিয়ার পেনাং হয়ে নুসান্তারা অঞ্চলে আগমন করেন। পেনাংয়ে অবস্থানকালে তিনি নির্বাসিত সুলতান হামেংকুবুওনো দ্বিতীয় (১৭৫০–১৮২৮)-এর সান্নিধ্য লাভ করেন। পরবর্তীকালে উক্ত সুলতান তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।[৩]
ব্যক্তিগত জীবন
[সম্পাদনা]জীবদ্দশায় হাবিব মুহাম্মদ বিন ইয়াহিয়া চারজন নারীকে বিবাহ করেন। তিনি ইয়েমেনের তারিম থেকে এডেন যাওয়ার পথে সেখানে প্রথম বিবাহ করেন।[১] তবে এই সংসারে তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। পরবর্তীতে বাতাভিয়া (বর্তমান জাকার্তা) থেকে সুরাবায়া যাওয়ার পথে তিনি সুরাবায়ার এক তরুণীকে বিবাহ করেন। তাঁদের শরিফা ফাতিমাহ নামে একটি কন্যাসন্তান জন্মায়। এরপর তিনি তাঁর চাচাতো ভাই হাবিব আবদুল্লাহ বিন আলি বিন আবদুর রহমান বিন তাহিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে সুরাবায়া থেকে আম্বন যাওয়ার পথে সেখানে তৃতীয় বিবাহ করেন। এই সংসারে সাইয়্যিদ আলি নামে তাঁর একটি পুত্রসন্তান জন্মায়। সবশেষে তিনি তেঙ্গগারোং-এ আজি আইশিয়াহ গেলার আজি রাদেন রেসমিনিংপুরিকে বিবাহ করেন। তিনি ছিলেন কুতাইয়ের ১৯তম সুলতান আজি মুহাম্মদ আলিমুদ্দিনের কন্যা এবং ২০তম সুলতান আজি মুহাম্মদ পারিকেসিতের বোন। এই দম্পতির ৯ জন সন্তান ছিল—৬ জন পুত্র (সাইয়্যিদ আহমদ, সাইয়্যিদ উমর, সাইয়্যিদ আলি, সাইয়্যিদ বারি, সাইয়্যিদ আবদুল মওলা ও সাইয়্যিদ হুসাইন) এবং ৩ জন কন্যা (শরিফা সেহহাহ, শরিফা নূর ও শরিফা ফাতিমাহ)।[৬] কুতাই রাজপরিবারে বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে তাঁর বংশধরদের পুরুষদের জন্য “আজি সাইয়্যিদ” এবং নারীদের জন্য “আজি শরিফা” উপাধি ব্যবহৃত হয়।[৭] সামারিন্দা থেকে আসা ইন্দোনেশীয় অভিনেতা আদজি রাদেন সাজিদ ফাদলি তাঁরই বংশধরদের একজন।[৮]
ইন্দোনেশিয়ায় অভিবাসন
[সম্পাদনা]হাদরামাউত থেকে যাত্রা
[সম্পাদনা]হাবিব মুহাম্মদ বিন ইয়াহিয়ার ইন্দোনেশিয়ায় অভিবাসনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাণিজ্য, ইসলামি দাওয়াহ প্রচার এবং বাতাভিয়া ও আম্বনে বসবাসরত আত্মীয়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা। আল-মাসিলা থেকে তাঁর ইন্দোনেশিয়া পৌঁছানোর যাত্রাপথ সম্পর্কে দুটি ভিন্ন বিবরণ পাওয়া যায়।
- প্রথম পথ: মাসিলা → তারিম → এডেন → বাতাভিয়া → সুরাবায়া → আম্বন → তেঙ্গগারোং।
- দ্বিতীয় পথ: মাসিলা → তারিম → এডেন → বাতাভিয়া → সুরাবায়া → আম্বন → সুরাবায়া → তেঙ্গগারোং।[১]
আল-মাসিলা থেকে যাত্রার সময় তিনি তারিম হয়ে এডেনে পৌঁছান। তারিমে অবস্থানকালে তিনি এমন এক ব্যক্তির বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেন, যিনি কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ছিলেন। হাবিব মুহাম্মদের চিকিৎসায় আল্লাহর রহমতে ওই ব্যক্তি সুস্থ হয়ে ওঠেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বাড়ির মালিক তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রীকে হাবিব মুহাম্মদের সঙ্গে বিবাহ দেন। কিছুদিন সেখানে অবস্থানের পর তিনি পুনরায় যাত্রা শুরু করেন এবং অবশেষে বাতাভিয়ায় পৌঁছান।[১] বাতাভিয়ায় তিনি তাঁর মাতুল হাবিব আবু বকর বিন তাহিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরবর্তীতে সুরাবায়ার বোটো পুতিহ এলাকায় হাবিব শায়খ বাফাকিহের নিকট ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। এছাড়াও তিনি আম্বনে বসবাসরত তাঁর জেঠাতো ভাই হাবিব আবদুল্লাহ বিন আলি বিন আবদুর রহমান বিন তাহিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।[৫][৯]
তেঙ্গগারোংয়ে আগমন
[সম্পাদনা]১৮৭৭ সালে হাবিব মুহাম্মদ বিন ইয়াহিয়া তেঙ্গগারোং-এ পৌঁছান।[৯] সেখানে তিনি কুতাইয়ের ১৯তম সুলতান আজি মুহাম্মদ আলিমুদ্দিনের কন্যা আজি আইশিয়াহ গেলার আজি রাদেন রেসমিনিংপুরিকে বিবাহ করেন।[১০]
কার্যক্রম
[সম্পাদনা]কুতাইয়ের মুফতি
[সম্পাদনা]
সুলতান আজি মুহাম্মদ আলিমুদ্দিন হাবিব মুহাম্মদ বিন ইয়াহিয়াকে সালতানাতের পেংহুলু ও মুফতি হিসেবে নিযুক্ত করেন। এর ফলে ধর্মীয় বিষয়ক সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ ক্ষমতা তাঁর ওপর ন্যস্ত হয়।[৪] সুলতান তাঁকে সম্মানসূচক “রাদেন শরীফ পেংহুলু” উপাধিতে ভূষিত করেন এবং পরবর্তীতে তিনি “প্রিন্স নতো ইগোমো” উপাধিও লাভ করেন।
দায়িত্ব পালনকালে প্রিন্স নতো ইগোমো তেঙ্গগারোং ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ইসলামি শিক্ষার প্রসার ঘটান। তিনি মূলত শরিয়া আইন এবং তাসাউফসহ বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয়ে পাঠদান করতেন।[৫]
অন্যান্য আলেমদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে তিনি কালিমান্তান অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের গতি ত্বরান্বিত করেন। তাঁর দাওয়াহ কার্যক্রমে অন্যতম সহযোগী ছিলেন হাবিব আলউই বিন আবদুল্লাহ আল-হাবসি, যিনি দক্ষিণ কালিমান্তান-এর বারাবাই-এ আরব ক্যাপ্টেন হিসেবে কর্মরত ছিলেন। হাদরামাউতের এই দুই বাল্যবন্ধু পরবর্তীতে বোর্নিও দ্বীপে পুনরায় একত্রিত হয়ে দ্বীনি কাজে আত্মনিয়োগ করেন।[৪]
অন্যান্য কার্যক্রম
[সম্পাদনা]ধর্মীয় দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি জনগণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নেও মনোনিবেশ করেন। তিনি স্থানীয়দের বাগান করা এবং কৃষিকাজে সম্পৃক্ত হতে উৎসাহিত করতেন। জনগণের সহায়তায় তিনি পূর্ব কুতাইয়ের সাংকুলিরাং-এ নারিকেল বাগান, সান্দারান-এ রটান বাগান এবং কুতাই কার্তানেগারার বুকিত জেরিং ও মুআরা কামান এলাকায় রাবার বাগান স্থাপন করেন।[২]
মৃত্যু
[সম্পাদনা]
১৩৬৬ হিজরির ২৬ রবিউল আউয়াল (১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ) হাবিব মুহাম্মদ বিন ইয়াহিয়া (প্রিন্স নতো ইগোমো) পরলোকগমন করেন। তাঁকে পূর্ব কালিমান্তান-এর কুতাই কার্তানেগারা রিজেন্সি-র অন্তর্গত তেঙ্গগারোং-এর 'মাকাম কেলাম্বু কুনিং'-এ দাফন করা হয়। তাঁর সমাধিটি তাঁর স্ত্রী এবং শ্বশুর সুলতান আজি মুহাম্মদ আলিমুদ্দিনের সমাধির পাশেই অবস্থিত। প্রতি বছর তেঙ্গগারোং-এর হাসানউদ্দিন মসজিদে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ‘হাউল’ (বার্ষিক স্মরণসভা) অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।ref name=:'Kutai' />[১১]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 3 4 5 Idham, 2014, পৃ. 125।
- 1 2 Idham, 2014, পৃ. 127।
- 1 2 3 Amrullah, Amri; Wulandari, Indah (৬ জুলাই ২০১৫)। "Muhammad bin Yahya, Mufti Kesultanan Kutai Kertanegara Ing Martadipura (1)" [Muhammad bin Yahya, Mufti of Sultanate of Kutai Kertanegara Ing Martadipura (1)]। Republika Online (ইন্দোনেশীয় ভাষায়)। ১৬ মার্চ ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৬ মার্চ ২০১৮।
- 1 2 3 Nashrullah, Nashih (১৩ জুলাই ২০১৫)। "Habib Tenggarong, Guru yang Disegani Masyarakat Kutai" [Habib Tenggarong, a Respected Teacher of Kutai Community]। Republika Online (ইন্দোনেশীয় ভাষায়)। ১৭ মার্চ ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৭ মার্চ ২০১৮।
- 1 2 3 Majalah alKisah No.02/Year VII/26 January–February 8, 2009, p.134-139
- ↑ Idham, 2014, পৃ. 126।
- ↑ "Gelar Kebangsawanan Kutai Kartanegara" [Kutai Kartanegara Nobility Title]। KutaiKartanegara.com (ইন্দোনেশীয় ভাষায়)। ১৭ মার্চ ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৭ মার্চ ২০১৮।
- ↑ algembira (৬ সেপ্টেম্বর ২০০৭)। "Habib Muhammad bin Ali bin Yahya" [Habib Muhammad ibn Ali ibn Yahya]। algembira (ইন্দোনেশীয় ভাষায়)। ১৭ মার্চ ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৭ মার্চ ২০১৮।
- 1 2 Amrullah, Amri; Wulandari, Indah (৬ জুলাই ২০১৫)। "Muhammad bin Yahya, Mufti Kesultanan Kutai Kertanegara Ing Martadipura (2-habis)" [Muhammad bin Yahya, Mufti of Sultanate of Kutai Kertanegara Ing Martadipura (2)]। Republika Online (ইন্দোনেশীয় ভাষায়)। ১৭ মার্চ ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৭ মার্চ ২০১৮।
- ↑ Win (৩০ জুন ২০০৩)। "Kesultanan Kutai Gelar Haul Sultan Sulaiman dan Pangeran Noto Igomo" [Kutai Sultanate Performed the Commemoration of the Day of the Death of Sultan Sulaiman and Prince Noto Igomo]। KutaiKartanegara.com (ইন্দোনেশীয় ভাষায়)। ১৭ মার্চ ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৭ মার্চ ২০১৮।
- ↑ Win (৩০ মে ২০০৪)। "Ribuan Umat Muslim Hadiri Haul Pangeran Noto Igomo dan Sultan AM Sulaiman" [Thousands of Muslims Attend Haul of Prince Noto Igomo and Sultan AM Sulaiman]। KutaiKartanegara.com (ইন্দোনেশীয় ভাষায়)। ১৭ মার্চ ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৭ মার্চ ২০১৮।