বিষয়বস্তুতে চলুন

মুসলিম ইবনে সাঈদ আল-কিলাবি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

মুসলিম ইবনে সাঈদ ইবনে আসলাম ইবনে জুরাহ ইবনে আমর ইবনে খুওয়াইলিদ সাইক আল-কিলাবি (আরবি: مسلم بن سعيد الكلابي ) ছিলেন একজন সামরিক কর্তকর্তা, যিনি ৭২৩-৭২৪ সালে উমাইয়া খিলাফতের অধীনে বৃহত্তর খোরাসানের গভর্নর ছিলেন। তিনি মাওয়ারান্নাহরের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে সমঝোতা স্থাপনের প্রচেষ্টা ও তুর্গেীয়দের বিরুদ্ধে " তৃষ্ণার দিনে যুদ্ধে" বড় সামরিক পরাজয়ের জন্য সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন।

জীবনী

[সম্পাদনা]
মুসলিমের বংশ অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিল। তিনি বনু কিলাব গোত্রের আমর শাখার প্রধানদের একটি পরিবারের বংশধর ছিলেন। তিনি ও তাঁর দাদা আসলাম ইবনে জুরয়া উমাইয়া খেলাফতের সময় খোরাসানের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মুসলিমের বংশসূত্র অত্যন্ত সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ ছিল। তাঁর দাদা আসলাম ৬৭১ থেকে ৬৭৫ সাল পর্যন্ত খুরাসানের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তাঁর পিতা সাঈদ ছিলেন ইরাকের শক্তিশালী গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের ঘনিষ্ঠ সমর্থক ও অনুগত ব্যক্তি। সাঈদের এই আনুগত্যের পুরস্কারস্বরূপ হাজ্জাজ তাকে মাকরানের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন।[] মুসলিমের পরিবারটি বনু কিলাব গোত্রের একটি শাখা ছিল, যারা বিশেষ করে বসরায় বসবাস করত। এই গোত্রের অধিকাংশ সদস্যই জাজিরা অঞ্চলে বসবাস করত। এই গোত্রেই পরবর্তীতে বিখ্যাত নেতা জুফার ইবনুল হারিস আল-কিলাবি জন্মগ্রহণ করেন।[]

মুসলিমের পিতা গভর্নর থাকা অবস্থায় নিহত হলে মুসলিম ইবনে সাঈদকে হাজ্জাজ নিজের আশ্রয়ে লালন-পালন করেন।[][] তিনি মুসলিমকে নিজের পালিত পুত্রের মতোই বড় করেন এবং নিজের ছেলেদের সঙ্গে একসঙ্গে তাকে প্রতিপালন করেন। ফলে মুসলিম শৈশব থেকেই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নানা বিষয় খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান।[] পরবর্তীকালে মুসলিম বসরার গভর্নর আদি ইবনে আরতাতের অধীনে একটি প্রাদেশিক উপ-গভর্নরের পদে নিযুক্ত হন। এটিই তাঁর প্রথম সরকারি পদ ছিলেন। এই পদে তিনি যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ৭২০ সালে ইয়াজিদ ইবনুল মুহাল্লাবের বিদ্রোহ সংঘটিত হলে পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির হয়ে ওঠে। ফলে তখন মুসলিম বসরা থেকে সিরিয়ায় পালিয়ে যান। যাওয়ার সময় নিজের সাথে তিনি প্রাদেশিক রাজস্বের অর্থও নিয়ে যান, যাতে তা বিদ্রোহীদের হাতে না পড়ে। এরপর মুসলিম ইরাকের গভর্নর উমর ইবনে হুবাইরার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সঙ্গী হয়ে ওঠেন। উমর ইবনে হুবাইরা তাঁর দক্ষতা ও আনুগত্যের কারণে ৭২২/৭২৩ সালে মুসলিমকে খুরাসানের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন। এই পদে তিনি সাঈদ ইবনে আমর আল-হারাশির স্থলাভিষিক্ত হন।[][] তবে তিনি যখন খোরাসানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন এই অঞ্চলটির পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিল। কারণ সম্প্রতি বিজিত মাওয়ারান্নাহর অঞ্চলে স্থানীয় ইরানি ও তুর্কি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, যা এর আগে আল-হারাশি অত্যন্ত কঠোরভাবে দমন করেন।[]

উমর ইবনে হুবাইরা তাঁকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সময় পরামর্শ দেন যে, স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সমঝোতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা করতে হবে। বিশেষ করে যারা নতুন করে ইসলাম গ্রহণ করেছে (মাওয়ালিরা), তাদের প্রতি সহনশীল ও সমন্বয়মূলক নীতি গ্রহণ করতে হবে। মুসলিম এই পরামর্শ অনুসরণ করার চেষ্টা করেন। তাই তিনি এমন কিছু কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেন, যারা স্থানীয় জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল; যেমন তিনি বাহরাম সিস নামে একজন জরথুস্ত্রীয় ব্যক্তিকে মার্ভ।অঞ্চলের মারজবান (সীমান্ত গভর্নর) হিসেবে নিয়োগ দেন, যাতে স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন করা যায়।[][]

পরের বছর তিনি একটি নতুন অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন, যার লক্ষ্য ছিল ফারগানা উপত্যকা দখল করা। কারণ পূর্ববর্তী কয়েক বছরের অস্থিরতায় এই অঞ্চলটি মুসলিম শাসনের হাতছাড়া হয়ে যায়। কিন্তু অভিযানের শুরুতেই নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। তখন খবর আসে যে, নতুন খলিফা হিসেবে হিশাম ইবনে আবদুল মালিক সিংহাসনে আরোহণ করেছেন এবং ইরাকের নতুন গভর্নর হিসেবে খালিদ ইবনুল কাসরি নিযুক্ত হয়েছেন। এই পরিবর্তনের ফলে খুরাসানের আরবদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা গোত্রীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবার প্রকাশ্যে এসে পড়ে। আল-কিলাবিকে খুব শিগগিরই পদ থেকে প্রত্যাহার করা হতে পারে, এমন আশঙ্কায় বলখে অবস্থানরত ইয়েমেনি (দক্ষিণ আরব) সৈন্যরা অভিযানে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। শেষ পর্যন্ত উত্তর আরব বা মুদারিদের একটি বাহিনীর মাধ্যমে তাদের যোগ দিতে বাধ্য করা হয়, যার নেতৃত্ব দেন নাসর ইবনে সাইয়ার। এই বাহিনী বারুকান নামক স্থানে ইয়েমেনি সৈন্যদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। অবশেষে অভিযান শুরু হয়; কারণ খালিদ আল-কাসরি মুসলিমকে চিঠি লিখে অনুরোধ করেন যে, তার স্থলাভিষিক্ত খালিদের ভাই আসাদ খুরাসানে পৌঁছানো পর্যন্ত যেন তিনি অভিযান অব্যাহত রাখেন।[][]

এরপর তিনি নিজের সেনাবাহিনী নিয়ে জাক্সার্তেস নদীর উপত্যকা ধরে ফারগানার দিকে অগ্রসর হতে থাকেন এবং সেখানকার প্রধান বসতিকে অবরোধ করেন।[] [][]

কিন্তু তুর্গীয়দের আগমনের খবর পাওয়া মাত্রই তাকে দ্রুত দক্ষিণ দিকে পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হতে হয়। কয়েক দিন পরে তুর্গীয়রা কাছাকাছি এসে পড়লে উমাইয়া বাহিনী দেখতে পায় যে, তাদের পথ স্থানীয় রাজপুত্রদের বাহিনী দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে, যারা তুর্গীয়দের সঙ্গে মিত্রতা করেছিল। এই সংঘর্ষটি “তৃষ্ণার দিন” নামে পরিচিত। সেই যুদ্ধে আরব সৈন্যদের শত্রুর সারি ভেঙে জাক্সার্তেস নদী পার হয়ে নিরাপদ স্থানে পৌঁছাতে বাধ্য হতে হয় এবং এতে তারা ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। পরে আল-কিলাবি সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব আবদুর রহমান ইবনে নাঈমের হাতে তুলে দেন। তিনি অবশিষ্ট সৈন্যদের নিয়ে সমরকন্দে ফিরে যান। এই বিপর্যয়ের ফলে পরবর্তী কয়েক বছরে মাওয়ারান্নাহরে মুসলিম শাসন প্রায় সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে।[১০]

বলা হয়, আল-কিলাবি পদচ্যুত হওয়ার পর খুরাসানের কিছু আরব সৈন্য বারুকানের যুদ্ধের জন্য তাকে দায়ী করে তাকে প্রহার করতে শুরু করে। কিন্তু আব্দুর রহমান হস্তক্ষেপ করে তাদের থামান। পরে তার উত্তরসূরি আসাদ আল-কাসরি তার সাথে সদয় আচরণ করেন এবং তাকে ইরাকে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন। [১১][১২][১৩]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. 1 2 Crone 1980, পৃ. 138।
  2. 1 2 Blankinship 1994, পৃ. 126।
  3. 1 2 Powers 1989, পৃ. 187।
  4. 1 2 3 4 Gibb 1923, পৃ. 65।
  5. Powers 1989, পৃ. 183, 187–188।
  6. Hillenbrand 1989, পৃ. 24 (note 24)।
  7. Blankinship 1989, পৃ. 10–11, 13–14।
  8. Blankinship 1989, পৃ. 14–15।
  9. Blankinship 1994, পৃ. 126–127।
  10. Blankinship 1989, পৃ. 15–16।
  11. Blankinship 1994, পৃ. 127।
  12. Blankinship 1989, পৃ. 22।
  13. Blankinship 1989, পৃ. 25।

গ্রন্থপঞ্জি

[সম্পাদনা]