বিষয়বস্তুতে চলুন

মুরগির মাংসের তরকারি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মুরগির মাংসের তরকারি
অঞ্চল বা রাষ্ট্রভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ এবং ক্যারিবিয়ান
প্রধান উপকরণমুরগির মাংস, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, কাঁচামরিচ, মসলা (হলুদ, জিরা, ধনে, গরম মসলা)

মুরগির মাংসের তরকারি দক্ষিণ এশিয়ার একটি খাবার যা ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের রান্না, ক্যারিবিয়ান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ব্রিটেন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার রান্নায় বেশ প্রচলিত। ভারতীয় উপমহাদেশের একটি সাধারণ তরকারিতে পেঁয়াজ এবং টমেটো ভিত্তিক চাটনি দিয়ে মুরগিরমাংস কষানো বা রান্না করা হয়, যা আদা, রসুন, টমেটো পিউরি, কাঁচামরিচ এবং বিভিন্ন ধরণের মসলা দিয়ে সুস্বাদু করা হয়, যার মধ্যে প্রায়শই হলুদ, জিরা, ধনে, দারুচিনি এবং এলাচ অন্তর্ভুক্ত থাকে। দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে, চিকেন কারি প্রায়শই কারি পাউডার নামে পরিচিত এটি পূর্ব-প্রস্তুত মসলার মিশ্রণ দিয়ে তৈরি করা হয়।

আঞ্চলিক বৈচিত্র্য

[সম্পাদনা]

ভারতীয় উপমহাদেশ

[সম্পাদনা]

ভারতীয় উপমহাদেশে মুরগির মাংসের তরকারির বহু আঞ্চলিক বৈচিত্র্য রয়েছে। সাধারণত এই পদ তৈরির শুরুতে তেলে আস্ত মসলা ফোড়ন দেওয়া হয়। এরপর পেঁয়াজ, আদা, রসুন, টমেটো এবং বিভিন্ন গুঁড়ো মসলা দিয়ে গ্রেভি তৈরি করা হয়। পরে হাড়সহ মুরগির মাংস যোগ করে অল্প আঁচে ধীরে ধীরে রান্না করা হয়। দক্ষিণ ভারতে নারকেল, কারিপাতা এবং কখনও নারকেলের দুধও ব্যবহৃত হয়, যা তরকারিটিকে আরও ঘন ও সুগন্ধি করে তোলে। এই খাবার সাধারণত ভাত বা রুটির সঙ্গে পরিবেশন করা হয়।[][]

ক্যারিবিয়ান

[সম্পাদনা]

ঔপনিবেশিক যুগে চুক্তিভিত্তিক ভারতীয় শ্রমিকদের মাধ্যমে মুরগির মাংসের তরকারি ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে পরিচিতি লাভ করে। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি ভারতীয় ধাঁচের পাতলা ঝোলজাতীয় তরকারির মতো ছিল, যেখানে মুরগির তুলনায় ঝোলের পরিমাণ বেশি থাকত। পরে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোতে গৃহপালিত মুরগির সহজলভ্যতার কারণে পদটি ধীরে ধীরে অধিক মুরগিনির্ভর ও মসলাদার রূপ লাভ করে। স্থানীয় সংস্করণে সাধারণত ধনেপাতা, স্ক্যালিয়ন, থাইম, রসুন ও মরিচ দিয়ে মুরগি মেরিনেট করা হয়। এরপর কারি মসলা কষিয়ে তার সঙ্গে মুরগি রান্না করা হয়। এই পদ সাধারণত রুটি, ভাত বা শিমজাতীয় খাবারের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। বর্তমানে গায়ানা, সুরিনাম, জ্যামাইকা, মার্টিনিক, সেন্ট লুসিয়া এবং অন্যান্য ইন্দো-ক্যারিবিয়ান প্রভাবিত অঞ্চলেও এটি জনপ্রিয়।[][]

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া

[সম্পাদনা]
কায়েং ইয়োত মাফরাও সাই কাই হলো উত্তর থাই অঞ্চলের তাল বা নারকেলের কচি ডগা এবং মুরগির মাংসের একটি তরকারি।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নারকেলের দুধ, মসলার পেস্ট ও ভাতভিত্তিক বিভিন্ন দেশীয় খাবারকে ইংরেজিতে সাধারণভাবে “কারি” নামে উল্লেখ করা হয়। থাই গায়েং গাই, কম্বোডিয়ান কারি সাচ মোয়ান এবং ফিলিপিনো গিনাতাং মানোক এ ধরনের খাবারের উদাহরণ। এছাড়া বার্মিজ তরকারি তেও মুরগির মাংসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার দেখা যায়।[][]

তবে ভারতীয় মুরগির মাংসের তরকারি থেকে প্রভাবিত আধুনিক কিছু রূপকে আলাদা করে চিহ্নিত করা যায়, কারণ সেগুলোতে কারি পাউডার, কারিপাতা বা অন্যান্য ভারতীয় মসলা ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে ফিলিপিনো ও মালেশীয় মুরগির তরকারি উল্লেখযোগ্য, যদিও এসব পদে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশীয় উপাদানের ব্যবহার এখনও বিদ্যমান।[]

উত্তর আমেরিকা

[সম্পাদনা]

কান্ট্রি ক্যাপ্টেন চিকেন হলো কারি পাউডার দিয়ে প্রস্তুতকৃত একটি মুরগির মাংসের পদ, যা দক্ষিণ যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। ধারণা করা হয়, ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগের মাধ্যমে এই খাবারটির উৎপত্তি। উনিশ শতকে প্রকাশিত হবসন-জবসন অভিধানে “কান্ট্রি ক্যাপ্টেন” নামটির উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে এটিকে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত এক ধরনের মুরগির তরকারি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।[]

“কান্ট্রি-ক্যাপ্টেন” শব্দটি ব্রিটিশ ভারতের এক ধরনের মুরগির তরকারিকে নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হতো, যা সাধারণত কারি মসলা ও পেঁয়াজ দিয়ে প্রস্তুত করা হতো।

পরবর্তীকালে এই পদটি মার্কিন দক্ষিণাঞ্চলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৪০ সালে জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ওয়ার্ম স্প্রিংসে মিসেস ডব্লিউ. এল. বুলাড “কান্ট্রি ক্যাপ্টেন” নামের এই খাবারটি ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ও জর্জ এস. প্যাটন কে পরিবেশন করেছিলেন।[]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Sen, Colleen Taylor (২০০৯)। Curry: A Global History। Reaktion Books। আইএসবিএন ৯৭৮১৮৬১৮৯৭০৪৬
  2. Achaya, K. T. (১৯৯৪)। Indian Food: A Historical Companion। Oxford University Press। আইএসবিএন ৯৭৮০১৯৫৬২৮৪৫৬
  3. Thompson, Krista A. (২০০৮)। Food Culture in the Caribbean। Greenwood Press। আইএসবিএন ৯৭৮০৩১৩৩৪৬০৪০
  4. Mohammed, Patricia (২০০২)। Culinary Cultures of the Caribbean। University of the West Indies Press।
  5. Van Esterik, Penny (২০০৮)। Food Culture in Southeast Asia। ABC-CLIO। পৃ. ৫৮–৫৯। আইএসবিএন ৯৭৮০৩১৩৩৪৪২০৬
  6. Aye, MiMi (২০১৯)। Mandalay: Recipes and Tales from a Burmese Kitchen। Bloomsbury Publishing। আইএসবিএন ৯৭৮১৪৭২৯৫৯৪৮৫
  7. Oseland, James (২০০৬)। Cradle of Flavor: Home Cooking from the Spice Islands of Indonesia, Singapore, and Malaysia। W. W. Norton & Company। আইএসবিএন ৯৭৮০৩৯৩০৫২২০৬
  8. Yule, Henry (১৯০৩)। Hobson-Jobson: A Glossary of Colloquial Anglo-Indian Words and Phrases। John Murray।
  9. Stevens, Patricia Bunning (১৯৯৮)। Rare Bits: Unusual Origins of Popular Recipes। Ohio University Press। আইএসবিএন ৯৭৮০৮২১৪১২৩২৯