মুদরিক ইবনুল মুহাল্লাব
মুদরিক ইবনুল মুহাল্লাব ইবন আবি সুফরা (আরবি: مدرك بن المهلب بن أبي صفرة) ছিলেন উমাইয়া খিলাফতের অধীনে একজন আরব সেনাপতি। তিনি উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান (শা. ৬৮৫–৭০৫) ও সুলেমান ইবনে আব্দুল মালিকের (শা. ৭১৫–৭১৭) আমলে সক্রিয় ছিলেন। উমাইয়া যুগে বৃহত্তর খোরাসান ও মধ্য এশিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে যে সামরিক অভিযান ও বিদ্রোহ দমন কার্যক্রম চলছিল, মুদরিক সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
জীবনী
[সম্পাদনা]মুদরিক খোরাসানে জন্ম গ্রহণ করেন এবং তিনি মুহাল্লাবি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাঁর পিতা ছিলেন খুরাসানের প্রসিদ্ধ উমাইয়া গভর্নর আল-মুহাল্লাব ইবনে আবি সুফরা। তাঁর ভাই মুফাজ্জল ইবনুল মুহাল্লাবও খোরাসানের গভর্নর ছিলেন এবং তিনি প্রায় নয় মাসের মতো গভর্নর হিসেবে পালন করেন। যখন তার ভাই মুফাজ্জল ইবনুল মুহাল্লাব গর্ভনর নিযুক্ত হন, তখন মুদরিকের সামরিক দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। তখন মুদ্রিকের সদর দপ্তর ছিল বালকা শহরে। বিদ্রোহী সেনাপতি মুসা ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে কাজিম যখন বিদ্রোহ ঘোষণা করে তিরমিজে অবস্থান গ্রহণ করেন, তখন তার বিরুদ্ধে একটি সামরিক অভিযানে মুদরিককে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই অভিযানে তার সহকারী সেনাপতি ছিলেন উসমান ইবনে মাসউদ।[১]
অভিযানে মুদরিককে বিশেষভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়; তাঁকে উসমান ইবন মাসউদের প্রতি নজর রাখা এবং তার নেতৃত্বাধীন তামিমি গোত্রভুক্ত সৈন্যদের আনুগত্য নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কারণ পূর্বে উসমান তাঁর পিতা মুহাল্লাব ইবনে আবি সুফরা ও তার ভাই ইয়াযিদ ইবনে আবি সুফরার কাছ থেকে কঠোর আচরণের শিকার হন। তাই তাকে সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করা হয়নি এবং মুদরিকের উপস্থিতি ছিল এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা।[২]
মুদরিক ও উসমান মিলে তিরমিজ শহরের চারপাশে থাকা ছোট ছোট অমুসলিম রাজ্যগুলির সঙ্গে কূটনৈতিক জোট গড়ে তোলেন। এই জোটের ফলে তারা বিদ্রোহী মুসা ইবন আবদুল্লাহর বাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। উল্লেখ্য যে, মুফাজ্জালের আগের অনেক গভর্নরই এই বিদ্রোহ দমন করতে ব্যর্থ হন; কিন্তু মুদরিক ও উসমানের এই অভিযানটি সফল হয়।[২]
যুদ্ধক্ষেত্রে মুসা নিহত হওয়ার পর তার ভাতিজা নাদর ইবনে সুলায়মান ইবনে আবদুল্লাহ তিরমিজ দুর্গ আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেন। তবে তিনি শর্ত দেন যে, তিনি কেবল মুদ্রিকের কাছেই আত্মসমর্পণ করবেন; উসমানের কাছে নয়। মুদ্রিক সেই শর্ত মেনে নেন এবং নাদরকে নিরাপদে দুর্গ ত্যাগ করার অনুমতি দেন।[৩]
মুদ্রিক যে পরিবারে জন্মান, সেই মুহাল্লাবি পরিবার উমাইয়া যুগে অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিল। কিন্তু খলিফা প্রথম আল-ওয়ালিদের (শাসনকাল ৭০৫–৭১৫) শাসনামলে শক্তিশালী গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ মুহাল্লাবিদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেন এবং তাদের ওপর নানা চাপ সৃষ্টি করেন।[৩]
তবে ৭১৫ সালে যখন খলিফা সুলায়মান ক্ষমতায় আসেন, তখন মুহাল্লাবি পরিবারের ভাগ্য পুনরায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মুদরিকের ভাই ইয়াজিদ ইবনুল মুহাল্লাবকে ইরাক, খুরাসান ও খিলাফতের পূর্বাঞ্চলের গভর্নর করা হয়। এরপর ইয়াযিদ তার ভাই মুদরিককে সিস্তান অঞ্চলের প্রথম লেফটেনেন্ট গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন। পরবর্তীতে মুদ্রিককে সেই পথ থেকে অপসারণ করে তার ভাই ইয়াজিদের পুত্র মুয়াবিয়াকে নিয়োগ করা হয়।[৪]
১০২ হিজরিতে তিনি তার ভাই ইয়াজিদ ইবনুল মুহাল্লাবের সাথে বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধে পরাজিত হলে তিনি সিন্ধু অঞ্চলের কান্দাবিলে পালিয়ে যান। ১০৩ হিজরি সালে সংঘটিত কান্দাবিলের যুদ্ধে তিনি নিহত হন।[৩]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]গ্রন্থপঞ্জি
[সম্পাদনা]- Crone, Patricia (১৯৮০)। Slaves on Horses: The Evolution of the Islamic Polity। Cambridge: Cambridge University Press। আইএসবিএন ০-৫২১-৫২৯৪০-৯।
- Hinds, Martin, সম্পাদক (১৯৯০)। The History of al-Ṭabarī, Volume XXIII: The Zenith of the Marwānid House: The Last Years of ʿAbd al-Malik and the Caliphate of al-Walīd, A.D. 700–715/A.H. 81–95। SUNY Series in Near Eastern Studies.। Albany, New York: State University of New York Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮৮৭০৬-৭২১-১।
- Shaban, M. A. (১৯৭০)। The Abbasid Revolution। Cambridge University Press। আইএসবিএন ০-৫২১-২৯৫৩৪-৩।