মিলার-উরের পরীক্ষা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মিলার-উরের পরীক্ষা

মিলার-উরের পরীক্ষা[১] বা মিলারের পরীক্ষা[২] হলো আমেরিকান ভৌত রসায়নবিদ হ্যারল্ড ক্লেটন উরের তত্ত্বাবধানে রসায়নবিদ স্ট্যানলী মিলার কর্তৃক সম্পাদিত ও একটি রাসায়নিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষাটি ১৯৫২ সালে, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পাদিত হয় ও ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হয়। এই পরীক্ষায় ল্যাবরেটরিতে নতুন সৃষ্ট পৃথিবীর পরিবেশের অনুকরণে দেখা যায় যে এই পরিবেশে বিভিন্ন অ্যামিনো অ্যাসিড (প্রোটিনের মনোমার) নিজ থেকেই তৈরী হতে পারে।[৩][৪][৫] পরীক্ষার ফলাফলটি সে সময় ওপারিন-হ্যাল্ডেনের মতবাদকে সমর্থন করে। যদিও আরো সাম্প্রতিক কিছু প্রমাণ অনুযায়ী, নতুন সৃষ্ট পৃথিবীর পরিবেশের গঠন মিলারের পরীক্ষার গ্যাসের গঠনের চেয়ে ভিন্ন ছিলো তবুও, নতুন গঠন ব্যবহার কেরে সম্পাদিত সাম্প্রতিক পরীক্ষায়ও এমন ফলাফল পাওয়া যায় (বরং আরো বৈচিত্র্যময় অণু গঠিত হয়)।[৬][৭]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

অক্সিজেন-১৮ এর উপরে উরের করা কাজ তাকে পৃথিবীতে রাসায়নিক মৌলের প্রাচুর্যের তত্ত্ব সমূহের উন্নতি করার দিকে চালিত করে। তিনি জল্পিত করেন যে শুরুর দিকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল অ্যামোনিয়া, মিথেন ও হাইড্রোজেন দ্বারা গঠিত ছিলো। তিনি এ নিয়ে ১৯৫২ সালে The Planets: Their Origin and Development রচনা করেন।[৮]

আর্থিক সংকটের কারণে, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলি ফ্যাকাল্টির সহায়তায় শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাসিসট্যান্টশিপ পান। তিনি সেখানে একটি পিএইচডি প্রোগ্রামের জন্য নিবন্ধনভুক্ত হন। তিনি প্রথমে এডওয়ার্ড টেলার এর অধীনে [[স্টেলার নিউক্লিওসিন্থেসিস]|মৌলের সংশ্লেষ]] নিয়ে কাজ করতে প্রনোদিত হলেও একটি সেমিনারে হ্যারল্ড উরের সৌর জগৎের জন্ম ও জৈবিক সংশ্লেষ সম্পর্কিত বক্তৃতা শুনে উদ্বুদ্ধ হন এবং টেলারের সাথে এক বছর নিষ্ফল কাজের পর এবং টেলারের হাইড্রোজেন বোমার উপর কাজ করার জন্য শিকাগো ছাড়ার প্রত্যাশার কারণে ১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি একটি নতুন গবেষণা প্রকল্পের জন্য উরের কাছে অভিগমন করেন (যদিও উরে প্রথমে এতে অনাগ্রহী ছিলেন)।[৯][১০]

মিলার তার পরীক্ষার ফলাফল উরেকে দেখালে উরে তা সাথে সাথে প্রকাশ করতে বলেন। উরে এতে সহরচয়িতা হতে অস্বীকৃতি জানান পাছে মিলার যদি কোনো স্বীকৃতিই না পান। বেশ কিছুদিন পার হয়ে গেলেও সায়েন্স সাময়িকী থেকে কনো প্রতিক্রিয়া না পাওয়ায় উরে সেখানে চিঠি পাঠান। এর এক মাস পরেও কোনো প্রতিক্রিয়া না পাওয়ায় উরে পাণ্ডুলিপিটি ফিরিয়ে নেন এবং জার্নাল অভ অ্যামেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটিতে জমা দেন। এসময় সায়েন্সের সম্পাদক মিলারকে চিঠিতে জানান যে পাণ্ডুলিপিটি প্রকাশ হওয়ার কথা ছিলো। এতে, মিলার আবার পাণ্ডুলিপিটি জার্নাল অভ অ্যামেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি থেকে ফিরিয়ে নেন।[১১]

পরীক্ষা[সম্পাদনা]

এই পরীক্ষা করার জন্য ল্যাবরেটরিতে খুব সহজে পৃথিবীর সৃষ্টিলগ্নের অনুরূপ পরিবেশ (তখনকার ধারণা মত) সৃষ্টি করা হয়। পরীক্ষায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিগুলি ছিলো খুব সাধারণ। পরীক্ষার জন্য একটি বদ্ধ কাঁচের যন্ত্র তৈরী করা হয়। যন্ত্রের একটি অংশ ছিলো ৫ লিটার আয়তনের একটি কাঁচের ফ্লাস্ক যেখানে ১০০ mmHg হাইড্রোজেন গ্যাস (H2), ২০০ mmHg অ্যামোনিয়া (NH3) এবং ২০০ mmHg মিথেন (CH4) প্রবেশ করানো হয়। এর মাঝে ছিলো এক জোড়া তড়িৎদ্বার[১২] এর সাথে সংযুক্ত ছিলো ২০০ মিলি লিটার পানি দ্বারা অর্ধপূর্ণ ৫০০ মিলি লিটারের আরেকটি ফ্লাস্ক। এবার পৃথিবীতে সমুদ্রের পানি যেভাবে সূর্যের তাপে বাষ্পিভূত হয়ে পরে বৃষ্টি হিসেবে পতিত হয় তার অনুকরণে ফ্লাস্কের পানিকে ক্রমাগতভাবে তাপ দিয়ে বাষ্প ও আবার সেটাকে শীতন করে তরল করা হয়। সেই বাষ্পকে ৫ লিটারের পাত্রে প্রবেশ করানোরও ব্যবস্থা রাখা হয়। পৃথিবীতে যেরকম বজ্রপাত হয় সেরকম বজ্রপাত সৃষ্টির জন্য তড়িৎদ্বার দ্বয়ের মাঝে ক্রমাগতভাবে বৈদ্যুতিক স্পার্ক পাঠানো হয়।

পরীক্ষার প্রথমদিনেই কাঁচের জারে মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গোলাপী দেখা যায় এবং সপ্তাহ শেষে ঘন তরল দ্রবণটি গাঢ় লাল ও ঘোলা হয়ে যায়। পরীক্ষা শেষে, অনুজীব ঘটিত দূষণ দূর করতে ব্যবহার করা হয় মার্কিউরিক ক্লোরাইডবেরিয়াম হাইড্রক্সাইডসালফিউরিক এসিড ব্যবহার করে সৃষ্ট বিক্রিয়া বন্ধ করা হয় এবং দূষণ দূর করার জন্য পরে এদের বাষ্পিভূত করা হয়। এর পরে, পেপার ক্রোমাটোগ্রাফি ব্যবহার করে মিলার সেই দ্রবণটিতে ৫ টি অ্যামিনো অ্যাসিড সনাক্ত করতে পারে। সেগুলি হলো গ্লাইসিন, আলফা-অ্যালানিন, বিটা অ্যালানিন, অ্যাস্পার্টিক অ্যাসিডআলফা-অ্যামিনোবিউট্রিক এসিড (ক্ষীণ থাকায় অ্যাস্পার্টিক অ্যাসিড ও আলফা-অ্যামিনোবিউট্রিক এসিড ততটা নিশ্চিত ছিলো না)।[৩]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Hill HG, Nuth JA (২০০৩)। "The catalytic potential of cosmic dust: implications for prebiotic chemistry in the solar nebula and other protoplanetary systems"। Astrobiology3 (2): 291–304। ডিওআই:10.1089/153110703769016389পিএমআইডি 14577878বিবকোড:2003AsBio...3..291H 
  2. Balm SP; Hare J.P.; Kroto HW (১৯৯১)। "The analysis of comet mass spectrometric data"Space Science Reviews56 (1–2): 185–9। ডিওআই:10.1007/BF00178408বিবকোড:1991SSRv...56..185B 
  3. Miller, Stanley L. (১৯৫৩)। "Production of Amino Acids Under Possible Primitive Earth Conditions" (PDF)Science117 (3046): 528–9। ডিওআই:10.1126/science.117.3046.528পিএমআইডি 13056598বিবকোড:1953Sci...117..528M। ২০১২-০৩-১৭ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১১-০১-১৭ 
  4. Miller, Stanley L.; Harold C. Urey (১৯৫৯)। "Organic Compound Synthesis on the Primitive Earth"। Science130 (3370): 245–51। ডিওআই:10.1126/science.130.3370.245পিএমআইডি 13668555বিবকোড:1959Sci...130..245M  Miller states that he made "A more complete analysis of the products" in the 1953 experiment, listing additional results.
  5. A. Lazcano; J. L. Bada (২০০৪)। "The 1953 Stanley L. Miller Experiment: Fifty Years of Prebiotic Organic Chemistry"Origins of Life and Evolution of Biospheres33 (3): 235–242। ডিওআই:10.1023/A:1024807125069পিএমআইডি 14515862বিবকোড:2003OLEB...33..235L 
  6. Bada, Jeffrey L. (২০১৩)। "New insights into prebiotic chemistry from Stanley Miller's spark discharge experiments"Chemical Society Reviews42 (5): 2186–96। ডিওআই:10.1039/c3cs35433dপিএমআইডি 23340907 
  7. Brooks D.J.; ও অন্যান্য (২০০২)। "Evolution of amino acid frequencies in proteins over deep time: inferred order of introduction of amino acids into the genetic code"19 (10): 1645–55। পিএমআইডি 12270892। ১৩ ডিসেম্বর ২০০৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২২ অক্টোবর ২০২০ 
  8. Rice, Richard (২০২০-০৪-২৫)। "Harold C. Urey"। Britannica। 
  9. "Biography 26: Stanley Lloyd Miller (1930 - )"। Cold Spring Harbour Laboratory। 
  10. Robertson, Michael (আগস্ট ২০০৭)। "Stanley Miller 1930–2007"। Nature। 
  11. Bada JL, Lazcano A (২০০৩)। "Perceptions of science. Prebiotic soup – revisiting the Miller experiment"Science300 (5620): 745–746। ডিওআই:10.1126/science.1085145পিএমআইডি 12730584 
  12. "Conducting Miller-Urey Experiments"। Journal of Visualized Experiments : JoVE। ২০১৪-০১-২১। 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]