বিষয়বস্তুতে চলুন

মাওয়াদ্দার আয়াত

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মাওয়াদ্দার আয়াত হুসাইন ইবনে আলীর সমাধীর ওপর খোদাই করা রয়েছে।

মাওয়াদ্দার আয়াত (আরবি: آية الْمَوَدَّة, অর্থাৎ ‘স্নেহ বা ভালবাসার আয়াত’) বলতে ইসলামের প্রধান আসমানী কিতাব কুরআনের সূরা আশ-শূরার ২৩ নম্বর আয়াতকে বোঝানো হয়। এই আয়াতটি প্রায়শই শিয়া ইসলামে ইসলামের নবী মুহাম্মাদের পরিবার, যারা আহল আল-বাইত নামে পরিচিত, তাদের উচ্চ মর্যাদা সমর্থন করার জন্য উল্লেখ করা হয়। অধিকাংশ সুন্নি লেখক শিয়া মতামত প্রত্যাখ্যান করেন এবং বিভিন্ন বিকল্প ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন, যার মধ্যে প্রধান হলো—এই আয়াতটি সাধারণভাবে আত্মীয়স্বজনের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের নির্দেশ দেয়। মাওয়াদ্দার আয়াতে নিচের অংশটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে,

قُل لَّآ أَسْـَٔلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا ٱلْمَوَدَّةَ فِى ٱلْقُرْبَىٰ ۗ وَمَن يَقْتَرِفْ حَسَنَةًۭ نَّزِدْ لَهُۥ فِيهَا حُسْنًا ۚ إِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٌۭ شَكُورٌ
(হে মুহাম্মদ!) বলুন, “আমি এর জন্য তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না, শুধু আত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া (আল-কুরবা)।” আর যে কেউ কোনো সৎকাজ করে, আমি তার জন্য তাতে আরও কল্যাণ বৃদ্ধি করি। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, কৃতজ্ঞ।[]

সুন্নি দৃষ্টিভঙ্গি

[সম্পাদনা]

কিছু সুন্নি তাফসিরকারক শিয়া মতের সাথে একমত পোষণ করেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন আল-রাযি (মৃত্যু: ১২০৯), বায়জাবী (মৃত্যু: ১৩১৯)[] এবং ইবনে আল-মাঘাযিলি।[] শিয়া ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে শিয়া লেখক মুহাম্মদ রায়শাহরি (মৃত্যু: ২০২২) সুন্নি পণ্ডিত ইবন হাম্বল (মৃত্যু: ৮৫৫), আল-বুখারি (মৃত্যু: ৮৭০), আল-তিরমিজি (মৃত্যু: ৮৯২), আল-যামাখশারী (মৃত্যু: ১১৪৩) এবং আল-সুয়ুতি (মৃত্যু: ১৫০৫)–এর উদ্ধৃতি প্রদান করেন।[] তবে অধিকাংশ সুন্নি লেখক শিয়া মতের বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন ব্যাখ্যা পেশ করেন।[] উদাহরণস্বরূপ, আল-তাবারি চারটি ভিন্ন প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করেন এবং এর মধ্যে তিনি যে ব্যাখ্যাটিকে সমর্থন করেন তা হলো, মাওয়াদ্দার আয়াতে মুসলমানদের নির্দেশ দেয় যে, তারা যেন মুহাম্মদকে তার রক্তের সম্পর্কের কারণে ভালোবাসেন।[][] ম্যাডলুং এই ব্যাখ্যাকে প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ তার মতে এই আয়াত সম্ভবত মদিনায় অবতীর্ণ হয়, যেখানে অধিকাংশ মুসলমানেরই নবী মুহাম্মদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক ছিল না।[] তদুপরি, আল-বাকির যুক্তি দেন যে, মুসলমানরা আল্লাহর রাসুল হিসেবে বিশ্বাসের কারণে স্বাভাবিকভাবেই নবী মুহাম্মদকে ভালোবাসেন।[] এর পরিবর্তে ম্যাডলুংয়ের অভিমত হলো, মাওয়াদ্দার আয়াতটি সাধারণভাবে আত্মীয়স্বজনের প্রতি ভালোবাসার আহ্বান জানায়,[] যা সুন্নি দৃষ্টিভঙ্গির প্রচলিত সাধারণ ব্যাখ্যা হিসেবেই বিবেচিত হয়।[][] ফলে, এই ব্যাখ্যাটি আহল আল-বাইতের প্রতি ভালোবাসার গুরুত্বকে কমিয়ে দেয়।[]

আরেকটি সুন্নি মত হলো, মাওয়াদ্দার আয়াতটি সূরা সাবার ৪৭ নং আয়াত দ্বারা রহিত (বাতিল) করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, "বলুন, 'যদি আমি তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চাই। তবে তা তোমাদেরই জন্য; আমার পুরস্কার তো আছে কেবল আল্লাহর কাছে এবং তিনি সব কিছু প্ৰত্যক্ষকারী।'" বিকল্পভাবে, আল-বাকির সূরা সাবার ৪৭ নম্বর আয়াতকে এইভাবে ব্যাখ্যা করেন: “বলুন, ‘আমি যা কিছু প্রতিদান হিসেবে তোমাদের কাছে চাই, তা তো মূলত তোমাদেরই জন্য।’” অর্থাৎ, তার মতে, যদি এই আয়াতটি মাওয়াদ্দার আয়াতের পরে অবতীর্ণ হয়ে থাকে, তবুও এটি পূর্ববর্তী আয়াতটির গুরুত্বকেই জোর দিয়ে তুলে ধরে। এতে বোঝানো হয়েছে, আত্মীয়দের প্রতি যে ভালোবাসা দাবি করা হয়েছে, তা মূলত বিশ্বাসীদেরই কল্যাণের জন্য, মুহাম্মদ (সা.) এর ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়।[] আল-তাবারির উল্লেখ করা আরেকটি মত হলো, মাওয়াদ্দার আয়াতে মুসলমানদেরকে বলা হয়েছে যেন তারা নিজেদের আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করে[] এবং তাকে ভালোবাসে; এই ব্যাখ্যাটি হাসান আল-বসরিও সমর্থন করেন।[] আল-বাকিরের একটি যুক্তি এই ব্যাখ্যার বিপক্ষে অবস্থান করে, কারণ তার মতে, এটি আয়াতে উল্লেখিত 'ভালোবাসা' (মাওয়াদ্দা) এবং 'প্রতিদান' শব্দগুলোকে অপ্রয়োজনীয় করে তোলে।[]

শিয়া দৃষ্টিভঙ্গি

[সম্পাদনা]

এই আয়াতে আল-কুরবা (আরবি: ٱلْقُرْبَىٰ) শব্দটি শিয়া ব্যাখ্যায় নবী মুহাম্মদের আত্মীয়স্বজন, অর্থাৎ আহল আল-বাইত (আরবি: أَهْل ٱلْبَيْت, অর্থ: 'পরিবারের সদস্যগণ') হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।[১০] এই প্রেক্ষিতে, শিয়া-ঘেঁষা ইতিহাসবিদ ইবনে ইসহাক (মৃত্যু ৭৬৭) বর্ণনা করেন যে, নবী মুহাম্মদ আল-কুরবা শব্দটি দ্বারা তার কন্যা ফাতিমা, তার জামাতা আলি, এবং তাদের দুই পুত্র হাসানহুসাইনকে বোঝাতে চেয়েছেন।[]অন্যান্যদের মধ্যে, সুন্নি ঐতিহাসিক আল বালাজুরি (মৃত্যু ৮৯২) তার আনসাব আল-আশরাফ গ্রন্থে বর্ণনা করেন যে, ৬৬১ সালে তার পিতা আলীর গুপ্তহত্যার পর খলিফা হিসেবে হাসান তার উদ্বোধনী বক্তৃতায় 'মাওয়াদ্দা' আয়াতটির কথা উল্লেখ করেন।

আমি সেই নবী পরিবারের (আহল আল-বাইত) একজন, যাদের থেকে আল্লাহ সকল অপবিত্রতা দূর করে পবিত্র করেছেন। আল্লাহ তার কিতাবে (কুরআন) আমাদের প্রতি ভালোবাসা বাধ্যতামূলক করেছেন। যেমন তিনি বলেন, 'যে ব্যক্তি কোনো সৎকর্ম করে, আমি তার জন্য তাতে কল্যাণ বাড়িয়ে দিই।' একটি সৎকর্ম হলো আমাদের, নবী পরিবারের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করা।[১১]

হাসান ইবনে আলি

ইসমাইলি ফকিহ আল-কাদি আন-নু'মান (মৃত্যু ৯৭৪) লেখেন, সুন্নি পণ্ডিত হাসান আল-বসরি (মৃত্যু ৭২৮) একসময় প্রখ্যাত মুফাস্‌সির ইবনে আব্বাস (মৃত্যু আনুমানিক ৬৮৭)–এর বরাত দিয়ে বর্ণনা করেন যে, মহানবী মুহাম্মদ (সা.) ঐ আয়াতে আল-কুরবা বলতে আলি, ফাতিমা ও তাদের সন্তানদেরই উদ্দেশ্য করেছেন। পরবর্তীতে, আল-নু'মান উল্লেখ করেন যে, আল-বসরি আয়াতটির ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন; যার অর্থ হলো আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে তার নৈকট্য লাভ করা। এর ফলে শিয়া ইমাম মুহম্মদ আল-বাকির (মৃত্যু আনুমানিক ৭৩২) তাকে "আল্লাহর বাণীকে ভুলভাবে ব্যাখ্যাদানকারী" হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন।

প্রকৃতপক্ষে, মাওয়াদ্দার আয়াতের এই এবং অন্যান্য প্রচলিত সুন্নি ব্যাখ্যা আল-বাকিরের আরোপিত একটি ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তির মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।[] অন্যদিকে, ইসলামি ইতিহাসবিদ উইলফ্রেড ম্যাডেলুং (মৃত্যু ২০২৩) মত দেন যে, মাওয়াদ্দার আয়াতের ভাষা শিয়া ব্যাখ্যার সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ নয়।[] সুন্নি পন্ডিত আল-তাবারিও (মৃত্যু: ৯২৩) একই মন্তব্য করেন, যদি শিয়া ব্যাখ্যাটি সঠিক হতো, তবে আয়াতটি (মাওয়াদ্দাতুল কুরবা, অর্থ: ‘আত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা’)—এই শব্দবন্ধ দিয়ে শেষ হওয়া উচিত ছিল। সুফি পণ্ডিত আহমদ ইবনে আজিবা (মৃত্যু ১৮০৯) এর পাল্টা বক্তব্য হলো, বর্তমান শেষাংশ (মাওয়াদ্দাত ফি আল-কুরবা, অর্থ: ‘আত্মীয়দের মধ্যে ভালোবাসা’)—আয়াতটিকে আরও জোরালোভাবে নবী মুহাম্মদের আত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসার আদেশ হিসেবে উপস্থাপন করে।[]

ইসনা আশারিয়া মতবাদে, এই ভালোবাসা আহল আল-বাইতের প্রতি আনুগত্যকেও বোঝায়, কারণ তারা জাহেরি (বাহ্যিক) এবং বাতেনি (গূঢ়) উভয় প্রকার দ্বীনি পথনির্দেশের উৎস।[১২][১০] এই আনুগত্যকে সর্বপ্রথম মুমিনদেরই কল্যাণের জন্য উপকারী বলে গণ্য করা হয়।[] কারণ, কুরআনের সূরা সাবা (৩৪:৪৭)–তে আল্লাহ বলেন: “বলুন, ‘আমি তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না; সেটি তো তোমাদেরই জন্য (ফাহুয়া লাকুম)।’”[১৩]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

গ্রন্থপঞ্জি

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. 1 2 3 Nasr et al. 2015, পৃ. 2691।
  2. Momen 1985, পৃ. 152।
  3. 1 2 3 Mavani 2013, পৃ. 41, 60।
  4. Shah-Kazemi 2007, পৃ. 61n19।
  5. 1 2 3 4 Madelung 1997, পৃ. 13।
  6. 1 2 3 4 Gril
  7. 1 2 3 Lalani 2000, পৃ. 67।
  8. Marlow
  9. 1 2 Lalani 2000, পৃ. 66  67।
  10. 1 2 Lalani 2000, পৃ. 66।
  11. Madelung 1997, পৃ. 311  312।
  12. Mavani 2013, পৃ. 41।
  13. Nasr et al. 2015, পৃ. 2361।