মহীশূর চন্দন সাবান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

মহীশূর চন্দন সাবান হল ভারতের অঙ্গরাজ্যে কর্ণাটক সরকারের মালিকানাধীন কর্ণাটক সোপ অ্যান্ড ডেটার্জেন্টস লিমিটেড (কেএসডিএল) দ্বারা উৎপাদিত একটা মার্কামারা সাবান। এই সাবান ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে তৈরি হচ্ছে, যখন মহীশূরের রাজা চতুর্থ নলবাদি কৃষ্ণরাজা ওয়াদেয়ার বেঙ্গালুরু শহরে একটা সাবান কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। [১] এখানে কারখানা গড়ার প্রধান কারণটি হল - প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্যে সেই সময় ইউরোপে কোনো রপ্তানি করা যেতনা, ফলে তখন মহীশূর রাজ্যে চন্দন কাঠ উদ্বৃত্ত হয়ে যেত।[১] ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে কেএসডিএল শিমোগা এবং মহীশূরের সরকারি সাবান কারখানা ও চন্দন তেল কারখানাকে যুক্ত করে একটা নতুন কোম্পানি গঠন করে।[২] মহীশূর চন্দন সাবান হল পৃথিবীর একমাত্র সাবান যেটা ১০০ শতাংশ খাঁটি চন্দন তেল থেকে তৈরি।[১] কেএসডিএল সাবানে একটা ভৌগোলিক নির্দেশক তকমার মালিক, যেটা তাকে গুণমান নিশ্চিত করে মার্কা ব্যবহার করার বৌদ্ধিক অধিকার দিয়েছে, এবং নকল ও অবৈধ প্রস্তুতকারকদের থেকে রক্ষা করবে।[৩] ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় ক্রিকেটার মহেন্দ্র সিং ধোনি চন্দন সাবানের প্রথম ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর মনোনীত হয়েছিলেন।[৪]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

মহীশূর চন্দন সাবান কারখানার প্রতিষ্ঠাতা চতুর্থ নলবাদি কৃষ্ণরাজা ওয়াদেয়ার
জাস্টিস ইংরেজি সাময়িকীতে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে প্রকাশিত (অগস্ট ৩০, ১৯৩৭) মহীশূর চন্দন সাবানের একটা বিজ্ঞাপন

বিশ শতকের প্রথম দিকে ভারতের মহীশূর রাজ্য বিশ্বের বৃহত্তম চন্দন কাঠ উৎপাদনকারী ছিল। এরা চন্দন কাঠের প্রধান রপ্তানিকারকও ছিল, বেশির ভাগ রপ্তানি ইউরোপে করা হোত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে যুদ্ধের কারণে রপ্তানি না-হওয়ায় বিপুল পরিমাণ চন্দন কাঠ জমে যেত। এই সঞ্চয়ের সদ্ব্যবহারের জন্যে মহীশূরের রাজা নলবাদি কৃষ্ণরাজা ওয়াদেয়ার বেঙ্গালুরুতে সরকারি সাবান কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই কারখানা ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে গড়া হয়, চন্দন কাঠের তেল মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে মহীশূর চন্দন সাবান মার্কা নাম দিয়ে উৎপাদন শুরু হয়। একই বছরে মহীশূরে একটা কারখানা গঠন করা হয় যেখানে কাঠ থেকে পাতন করে চন্দন কাঠের তেল তৈরি করা হোত। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে শিমোগাতে আরো একটা চন্দন কাঠের তেলের কারখানা গড়া হয়েছিল।[২] কর্ণাটকের সংযুক্তির পর এই কারখানাগুলো কর্ণাটক সরকারের শাসনাধীনে আসে। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এই কোম্পানিগুলোর সংযুক্তিকরণ করে একটা কোম্পানি হবে, যার নাম কর্ণাটক সোপস অ্যান্ড ডেটার্জেন্টস লিমিটেড। চেহারা সিংহের এবং মাথাটা হাতির মতো, পুরাণ কাহিনি থেকে নেওয়া এইরকম এক প্রাণী শরভকে কোম্পানির লোগো হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল; কারণ এই প্রাণী ইচ্ছাশক্তি, সাহস এবং ক্ষমতার মতো গুণগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে, এবং কোম্পানির দর্শনকে প্রফলিত করে।[২] এই কোম্পানি বহুমুখী ব্যবসা শুরু করার পর, সাবান ছাড়াও ধূপ, ট্যালকম পাউডার এবং কাপড়কাচা সাবান উৎপাদন করছে।

ব্যবসা[সম্পাদনা]

২০০৬ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসের তথ্য অনুযায়ী ভারতে মোট উৎপন্ন এবং বাজারজাত ৪,৫০,০০০ টন সাবানের মধ্যে ৬,৫০০ টন মহীশূর চন্দন সাবান উৎপাদন হয়েছিল।[৪] বেঙ্গালুরুতে কেএসডিএলের কারখানা মহীশূর চন্দন সাবান তৈরি করে, ভারতে সমগোত্রের বৃহত্তম কারখানা, যেটা বছরে ২৬,০০০ টন সাবান উৎপাদনক্ষম।[২] কেএসডিএল ২০০৪-২০০৫ বছরে ১১৫ কোটি টাকার (প্রায় ২৮.৭৫ লক্ষ মার্কিন ডলার) বিক্রি করেছিল, মহীশূর চন্দন সাবানের গড় মাসিক বিক্রি প্রায় ৭৫ লক্ষ টাকা (প্রায় ১.৮৭ লক্ষ মার্কিন ডলার)। ঐতিহ্যগতভাবে এই সাবান সেরকম উচ্চ পর্যায়ে বিপণন হোতনা এবং শুধুমাত্র ২০০৬ সময়কালে ভারতীয় ক্রিকেটার মহেন্দ্র সিং ধোনি মহীশূর চন্দন সাবানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর মনোনীত হয়েছিলেন। অন্যান্য বিপণন কৌশলের মধ্যে ছিল একটা প্রকল্প, যেখানে যে সমস্ত সরবরাহকারী তাঁদেরকে দেওয়া বিক্রয়ের লক্ষ্য পূরণ করতেন তাঁরা রুপো অথবা সোনার মুদ্রা জিতে নিতেন। সাবানের ৮৫ শতাংশ বিক্রি দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তামিলনাডু থেকে হয়। এই সাবানের বেশিরভাগ ব্যবহারকারীর বয়স ৪০ বছরের বেশি, এবং ভারতে যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে এখনো এই সাবানের গ্রহণযোগ্যতা হয়নি। নিয়মিত মহীশূর চন্দন সাবানের পাশাপাশি বাজার পাওয়ার জন্যে কেএসডিএল মহীশূর মাইশোর স্যান্ডাল বেবী সোপ বাজারে এনেছে। যাইহোক, কেএসডিএল নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, যেমন, চন্দন কাঠের ঘাটতি, যার ফলে কোম্পানি মাত্র ২৫ শতাংশ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে, এবং স্বভাবতই উৎপাদন কমছে। এর আসল কারণ হল কর্ণাটকে চন্দন কাঠের অরণ্য হ্রাস

এই অবস্থা কাটিয়ে উঠতে কেএসডিএল খোলা বাজারে চন্দন কাঠ সংগ্রহের জন্যে আদেশ দিয়েছে এবং এমনকি বিদেশ থেকে কাঠ আমদানি করছে।[১] কর্ণাটকে চন্দন কাঠের স্থায়িত্ব কমে যাওয়ার ফলে পুরাবির্ভাবের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এটাই একটা রাজ্যের পক্ষে বিড়ম্বনা যে, এক সময়ে গড়ে ওঠা কারখানার জন্যে বিস্তর সংরক্ষণ এবং আস্তিনে দুটো ভৌগোলিক নির্দেশ তকমা এই মূল্যবান কাঠের সঙ্গে তার সংযোগ বোঝায়।

২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ১০ মে কোম্পানি তার শতবর্ষ উদ্‌যাপন করল। এরা বছরটাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যে পরিকল্পনা করেছে এবং এই উপলক্ষ্যে মহীশূর চন্দন শতাব্দী সাবান চালু করেছে। কর্ণাটক সাবান ১০ মে, ২০১৬ শততম বছর স্মরণে একটা অনুষ্ঠান করেছে।

মহীশূর চন্দন সাবান প্রস্তুতকারকরা ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ৪ নভেম্বর একটা নতুন সাবানের বাক্সতে বিভিন্ন জিনিস দিয়ে সাজিয়ে বের করেছে; এতে আছে: রোজ মিল্ক ক্রিম, জেসমিন মিল্ক ক্রিম, অরেঞ্জ লাইম, কোলোন ল্যাভেন্ডার, এবং ফ্রুটি ফ্লোরা। প্রত্যেক আলাদা মোড়কে চিরন্তন ভারতীয় নারীর ঐতিহ্যপূর্ণ চাহনির দেখা পাওয়া যায়। সাবানের ওজন ১০০ গ্রাম।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Bageshree S. (২০০৬-১০-২৮)। "Scent of the region"Online Edition of The Hindu, dated 2006-10-28। Chennai, India: The Hindu। ২০০৭-১০-০১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০০৭-০৭-৩১ 
  2. "Profile"Online webpage of the Karnataka Soaps and Detergents Limited। ১৬ জুলাই ২০০৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০০৭-০৭-৩১ 
  3. P. Manoj (২০০৬-০৩-০৫)। "GI certificate for Mysore Sandal Soap"Online Edition of The Hindu, dated 2006-03-05। Chennai, India: The Hindu। ২০০৭-১০-০১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০০৭-০৭-৩১ 
  4. Madhumathi D. S.। "A whiff of cricket"Online Edition of The Hindu Business Line, dated 2006-03-30। The Hindu Business Line। সংগ্রহের তারিখ ২০০৭-০৭-৩১