মহামুণি বুদ্ধ মন্দির
| মহামুণি বুদ্ধ মন্দির Maha Myat Muni Buddha Image | |
|---|---|
মহামুণি মূর্তি | |
| ২১°৫৭′৬.৭৩″ উত্তর ৯৬°৪′৪৩.০৩″ পূর্ব / ২১.৯৫১৮৬৯৪° উত্তর ৯৬.০৭৮৬১৯৪° পূর্ব | |
| তথ্য | |
| সম্প্রদায় | থেরবাদ বৌদ্ধ ধর্ম |
| প্রতিষ্ঠাকাল | ১৭৮৫, ১৮৮৪ সালের অগ্নিকাণ্ডের পর নতুন করে নির্মাণ করা হয় |
| প্রতিষ্ঠাতা | রাজা বৌদ্ধপায় |
| দেশ | মান্ডালা, মান্ডালা অঞ্চল, বার্মা |
মহামুণি বুদ্ধ মন্দির (বর্মী: မဟာမုနိဘုရားကြီး, বর্মী উচ্চারণ: [məhà mṵnḭ pʰəjádʑí]; (মহামুনি প্যাগোডাও বলা হয়) বার্মার দক্ষিণ-পশ্চিম মান্ডালায়ে অবস্থিত একটি বৌদ্ধ মন্দির এবং প্রধান তীর্থ স্থান।[১] মহামুনি বৌদ্ধ মূর্তিকে এই মন্দিরে পূজা করা হয় এবং মূর্তিটি প্রকৃতপক্ষে আরাকান থেকে আগত।[২] এটিকে বার্মায় গভীর শ্রদ্ধা করা হয় এবং বহু মানুষের জীবনাচরনের মূল, যেহেতু এটিকে বুদ্ধের জীবনের প্রতীকি প্রকাশ হিসাবে দেখা হয়।[৩]
প্রাচীন ঐতিহ্য অনুযায়ী, বুদ্ধের জীবদ্দশায় তার পাচটি প্রতিমূর্তি তৈরী করা হয়েছিলঃ দুটি ভারতে, দুটি স্বর্গে এবং পঞ্চমটি মায়ানমারের মহামুনি বৌদ্ধ মন্দিরে। কিংবদন্তি অনুসারে, খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫৪ অব্দে বুদ্ধ আরাকানের ধানয়াওয়াদি শহরে আসেন।[১][২][৪][৫][৬] রাজা সান্ডা থুরিয়ার নির্দেশে তার একটি মূর্তি নির্মাণ করা হয়। মহামূর্তি বানানোর পর, বুদ্ধ তাতে ফু দিলেন আর তাতে মূর্তিটি মহামুনির একদম সদৃশ্য হয়ে গেল।[৬]
ইতিহাস
[সম্পাদনা]উৎপত্তি
[সম্পাদনা]কিংবদন্তি অনুসারে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের সময় গৌতম বুদ্ধ আরাকানের রাজধানী ধানয়াওয়াদিতে আসেন। তখনকার রাজার ২৬ তম বার্ষিকিতে বুদ্ধ, শিন আনন্দ ও ৫০০ জন শিষ্য সহ খাউকরা শহরের কাছে সালাগিরি পর্বতচূড়ায় এসে পৌছান।[৭] আরাকানের রাজা তার প্রধান রানী সান্ড্রা মালা এবং অনুগত মন্ত্রী, সেনাপতী, কর্মকর্তা সহকারে বুদ্ধকে যথাযথ সম্মান জানান।তারা বুদ্ধের শিক্ষায় গভীর প্রভাবিত হন এবং তার তায়ুথি তে প্রস্থানের সময়, রাজা তাকে অনুরোধ করেন তিনি যেন তার একটি মূর্তি উপাসনার জন্য লোকদের দিয়ে যান।[৮] এই উদ্দেশে তখন বুদ্ধ বোধি বৃক্ষের নিচে এক সপ্তাহ ধ্যানে বসেন। এইসময়ে সহকারী বিশ্বাকাম্মার সহায়তায় সাক্কা, রাজা ও জনগণের দেওয়া অলংকারের সাহায্যে বুদ্ধের নিখুত মূর্তি গড়েন। বলা হয় যে, এই সাত দিন বুদ্ধের থাকা ও উপভোগের জন্য সাক্কা ও বিশ্বাকাম্মা পৃথক পৃথক তাবু তৈরি করেন। নিজের মূর্তি (বিশ্বাস করা হয় তখনকার একমাত্র নিখুত মূর্তি বলে) দেখার পর বুদ্ধ খুশি হন এবং নিজের আধ্যাতিকতার নির্যাসে মূর্তিটিকে রঞ্জিত করে দেন এবং এর নাম দেন কেন্ডাসারা।[৯] তিনি আরও বলেন মূর্তিটি তার প্রতিনিধি হিসাবে ৫০০ বছর টিকে থাকবে।[৬][১০][১১]
ঐতিহাসিক জুলিয়ান স্কবার খুব সংক্ষেপে বুদ্ধের "জীবন্ত" দ্বৈত মূর্তিকে ঘিরে গড়ে ওঠা কীংবদন্তি ও পূজার উদ্ভব ব্যাখা করেছেন:
বুদ্ধ সম্পর্কিত অন্যান্য গল্পের সদৃশ্য অনুকাহিনীসমূহ এই মূর্তির সাথে সংশ্লিষ্ট সমৃদ্ধ ও জটিল মিথোলজির অন্তর্ভুক্ত...ফলে আচারসমূহ ও মহামুণির মিথসমূহ একইসাথে দুটি লক্ষ্য পূরন করেঃতারা স্থানিয় রচনার বর্ণনা প্রসঙ্গ ও অভিনেতাদের বৈশ্বয়িক বুদ্ধিষ্ট বিশ্বতত্ত্বের ভিতর স্থান দেয় এবং আরাকান ও বার্মার বুদ্ধিষ্ট রাজনীতিতে বুদ্ধের চলমান জীবন-কথার অবস্থান নির্দেশ করে।থেরাভাডা রাজনীতি চরিত্রগতভাবে জীবনিসংক্রান্ত পন্থায় বুদ্ধের উপস্থিতি নতুন করে সৃষ্টি করেছিল এবং এর সাথে রাজা ও মূর্তির অন্য পৃষ্ঠপোশকদের ক্ষমতা সংযুক্ত করেছিল।ফলে সামাজিক-রাজনীতিক ক্ষেত্রে ধর্মিয় পৃষ্ঠপোশকতার স্থানীয় ধারণা থেকে বুদ্ধ মূর্তি পূজা প্রেরনা লাভ করে।[১২]

আরাকানিজ কাহিনীতে বর্নীত আরেকটি কিংবদন্তি মন্দিরে মূর্তি পবিত্র করার সময় এবং বুদ্ধের মৃত্যুর পর ঘটে চলা নয়টি অদ্ভুত ঘটনা সম্পর্কিত। এই ঘটনাগুলো হলঃমূর্তি ধোয়ার জন্য ব্যবহৃত পবিত্র পানি, পাত্র থেকে উপচে পড়ত না, বুদ্ধের মাথা ধোয়ার জন্য যে জলাধার থেকে পানি নেওয়া হত,তার গুনগত মান সারাবছর ঠিক থাকত, সন্ধাবেলা ভক্তরা যখন মূর্তি পূজা করত ছয়রঙা রশ্মি দেখা যেত, অবিশ্বাসীদের উপস্থিতিতে রশ্মি ঝাপসা হয়ে যেত, মন্দিরে যেকোন সংখ্যক ভক্তের সংকুলান হত, গাছের পাতা বুদ্ধমূর্তির দিকে কাত হয়ে থাকত, মন্দিরের উপর দিয়ে পাখি উড়ে যেত না, প্রবেশ পথের পাথরের অভিভাবকরা মন্দ লোকদের উপস্থিতি টের পেত এবং মন্দিরে ঢুকতে তাদের বাধা দিত।
বর্নিত আরেকটি কিংবদন্তি ছয়টি খমের ব্রোঞ্জ মূর্তি সম্পর্কিত, যেগুলো মন্দিরের কোর্টইয়ার্ডের উত্তর প্রান্তে স্থাপিত। এই মূর্তিগুলো আসলে কম্বোডিয়ার আঙ্গওয়াট মন্দির কমপ্লেক্সে ছিল।ভক্তরা বিশ্বাস করে মূর্তিগুলোর আরোগ্যকারী গূন আছে;[১৩] শরীরের নির্দিষ্ট অংশ মূর্তিতে ঘষলে বিভিন্ন অসুস্থতা এবং অসুখ থেকে মূক্তি পাওয়া যায়।[১][২][৬]
মূর্তির ইতিহাস
[সম্পাদনা]প্রাচীন আরাকান ইতিহাস পাওয়া যায় পেগানের রাজা আনারাথা (১০৪৪-১০৭৭) পেগানে মূর্তি সরানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যর্থ হন।[১৪] ১৭৮৪ সালে বার্মিজরা, কনবাউং রাজবংশের ক্রাউন প্রিন্স থাডো মিনসোর সামরিক নেতৃত্বে ম্রাউক রাজ্য জয় করে। বুদ্ধা মূর্তিসহ ধর্মিয় পুরানিদর্শনগুলো বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল এবং পুরানো রাজধানী মান্ডালায়ের সীমান্তে, আমারাপূরার মহামুনি মন্দিরে স্থাপন করা হয়েছিল।[১৫] যেহেতু মহামুনি মূর্তিটি একবারে পরিবহন করার জন্য যথেষ্ট বড় ছিল, এটিকে বিভিন্ন অংশে কাটা হয় এবং পরে পুনরায় জোড়া দিয়ে নতুন মন্দিরে স্থাপন করা হয়।[১৬] রাজা মিন্ডং (১৮৫৩-১৮৭৮) এর সময় মান্ডালায় আবার রাজধানী হয়। তার ছেলে থিবাউ(১৮৭৮-১৮৮৫) এর সময়ও এটা রাজধানী ছিল।১৮৮৫ সালে যখন ব্রিটিশরা বার্মা অধিকার করে, যাতে ফরাশিরা বার্মা শাসন করতে না পারে তখন রাজতন্ত্রের সমাপ্তি ঘটে।[১৭] যদিও মহামুনি মূর্তির পূজা অব্যাহত আছে এবং প্রধানত রাখাইন, মন, বর্মন মানুষ সহ অনেক লোক মূর্তিটি পরিদর্শন ও উপাসনা করেছে।[১][২][১৮][১৯]
মন্দির প্রাঙ্গনে সারি বেধে দাড়িয়ে থাকা কয়েকটি মূর্তির যুদ্ধে লূট হওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এগুলো প্রকৃতপক্ষে কম্বোডিয়ার আঙ্গকোরে পাওয়া খমের মূর্তি এবং ১৪৩১ সালে সিয়ামিজরা আয়ুতথায়া নিয়ে গিয়েছিল। ১৫৬৪ সালে বার্মিজ রাজা বায়িন্নাউং আয়ুত্থায়া জয় করে এবং এরকম ত্রিশটি মূর্তি বাগু তে নিয়ে যায়। ১৫৯৯ সালে ম্রাউক এর রাজা রাজাগ্রি বাগু আক্রমণ করে এবং মূর্তিগুলো ম্রাউকে নিয়ে আসে।[২০][২১][২২] সর্বশেষে রাজা থাডো মিনসো এগুলোকে আমারাপুরা নিয়ে আসে ১৭৮৫ সালে। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী এসব মূর্তির অনেকগুলোই আরাকান থেকে আনা হয়েছিল। যদিও রাজা থিবাউ অনেক মূর্তি গলিয়ে কামান তৈরি করেন, প্রাসাদকে নিরাপদ করার জন্য। সিয়াম থেকে আনা বানিনায়ুং এর ত্রিশটি মূর্তির ভিতর কেবল ছয়টি বর্তমানে টিকে আছে এবং মন্দির প্রাঙ্গনে প্রদর্শন করা আছে। এগুলো মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ কারণ মনে করা হয় এগুলোর আরোগ্যকারী গুন আছে।[১][২]
ক্ষয়-ক্ষতি
[সম্পাদনা]১৮৭৯ ও ১৮৮৪ তে মহামুণি মূর্তি এবং এর চারপাশ আগুনে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।রাজা থিবাউ এর সময় যে আগুন লাগে তাতে পাকা মন্দিরের সাত স্তর বিশিষ্ট চূড়া,প্রার্থনা কক্ষ,বাধানো উচু পথ এবং আরো অনেককিছু পুড়ে যায়,যদিও বড় বুদ্ধ মূর্তিটি অক্ষত থাকে।আগুন লাগার পর উদ্ধার করা স্বর্ণ দিয়ে গাউন তৈরি করা হয় যা বর্তমানে মূর্তিটিকে অলংকৃত করছে।১৮৮৭ তে মন্ত্রি কিনউন মিংগি ঐ অঞ্চলের দায়িত্ব নেন এবং রাজা বোদাপায়া নির্মিত আসল মন্দিরের চারপাশে বর্তমান মন্দিরটি তৈরি করেন ১৮৯৬ সালে।
১৯৯৬ সালে বার্মার সামরিক সরকার মহামুনি প্যাগোডাকে নবরুপ দেওয়ার কাজ হাতে নেয়।এইসময় ১৯৯৭ সালে মহামূনি বুদ্ধর মূর্তি ক্ষতিগ্রসস্থ হয়,মূর্তির পেটে একটি ছিদ্র দেখা দেয়।বিশ্বাস করা হয়,চোর মূর্তির পেটে লুকানো অলংকার চুরির জন্য ছিদ্রটি করেছিল।রিপোর্ট করা হয়েছিল যে একজন সামরিক কর্মকর্তা রাতের বেলা মন্দির খোলার অনুরোধ করেছিল,ফলে ঐ এলাকার সকল প্রধান মঠের সিনিয়র সন্ন্যাসীরা এই ব্যপারে সভা ডাকে।সভা চলাকালিন সময়ে মুসলমান ছেলে দ্বারা বৌদ্ধ মেয়েকে ধর্ষনের ঘটনার দিকে মনোযোগ ঘুরানো হয়।বড় একটা দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে কিন্তু পরে দেখা যায় বৌদ্ধ মেয়েটি আসলে ধর্ষিত হয়নি।এটি ছিল বুদ্ধ মূর্তি থেকে মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে,মূর্তিটি মেরামত করার একটি কৌশল।তবুও রহস্য থেকেই যায়,কোন অলংকার ছিল কিনা এবং বড় মূর্তিটি থেকে সরানো হয়েছিল কিনা।
নির্মাণশৈলী
[সম্পাদনা]প্রধাণ মন্দির/প্যাগোডা
[সম্পাদনা]মহামুনি মন্দির বা প্যাগোডাটি মান্ডালায় থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে চলে যাওয়া রাস্তা বরাবর অবস্থিত স্থাপনা সমূহের সমষ্টি।এটি প্রকৃতপক্ষে রাজা বুদাপায়ার রাজকীয় প্রাসাদ থেকে মন্দিরের পূর্ব গেট পর্যন্ত নির্মিত ইটের রাস্তার উপর অবস্থিত ছিল,যদিও বর্তমানে এই রাস্তাটির ধ্বংসাবেশই দেখা যায়।প্যাগোডার সন্নিকটবর্তি অনেক মঠের মধ্যে থুডাম্মা নিকায়ার ৪০০ সন্ন্যাসীর মঠের শিক্ষালয়টি অন্যতম।মন্দিরের কেন্দ্রীয় তীর্থ ভূমিটি বিস্তৃত ঘাসের লন দিয়ে গঠিত।মূল মন্দিরে যাওয়ার তোরনশোভিত পথে অনেক কিওস্ক,যেগুলো ধর্মিয় সাজ-সরনঞ্জাম যেমন ধুপ-ধুনো,মোমবাতি,জপমালা,ফুল,গাউন,চন্দন ইত্যাদি বিক্রয় করে এবং বিভিন্ন রেস্তোরা ও চায়ের দোকান আছে।বুদ্ধের মূর্তি রখা কক্ষটি ছোট এবং কক্ষের ছাদটি সাত স্তর বিশিষ্ট।ছাদটি মোজাইক করে সাজানো।তোরন শোভিত পথটি সোনালি পদার্থ দিয়ে গিলটি করা এবং সুক্ষ ফ্রেস্কো পদ্ধতীতে খোদাই করা স্তম্ভ দিয়ে সজ্জিত।
মহামুনি মূর্তি
[সম্পাদনা]বুদ্ধ মূর্তিটিকে একটি ছোট ঘরে,সিংহাসনের উপর ভূমিস্পর্শ মুদ্রা নামে পরিচিত স্বর্গীয় ভঙ্গিতে বসানো আছে।এই ভঙ্গি বা মুদ্রা বুদ্ধের মরা পরাভূত করাকে প্রতীকরুপে প্রকাশ করে।পাগুলো ভিতরের দিকে ভাজ করা এবং অতীত কর্মের সাক্ষী স্বরুপ,ডান হাত শাস্ত্রিয় আচারগতভাবে মাটিতে স্পর্শ করা।মূর্তিটি ব্রোঞ্জে গড়া,ওজন সাড়ে ছয় টন,১.৮৪ মিটার(৬ ফুট) উচু বেদীর উপর নির্মিত এবং সবমিলে ৩.৮২ মিটার(১২.৫ ফুট) উচু।এর কাধের পরিমাপ ১.৮৪ মিটার(৬ ফুট) এবং বুকের পরিমাপ ২.৯ মিটার(৯.৫ ফুট)।এটি রাজকিয় পোশাক "ব্রাহমানিক কর্ড" দিয়ে সজ্জিত এবং এর বুকে রাজচিহ্ন বিদ্যমান।মূর্তির মাথায় মুকুট আছে এবং ডায়মন্ড,রুবি,স্যাফায়ার দিয়ে অলংকৃত।বাম হাতটি অস্বাভাবিক বড় দেখায় এবং কোলের উপর তালু উপরে ওঠানো অবস্থায় থাকে।
পুরুষ ভক্তরা নিয়মিত মহামুনি মূর্তির মুখে গোল্ড লিফ প্রয়োগ করে। ঘন ঘন গোল্ড লিফ প্রয়োগের ফলে মহামুনি মূর্তির সোনার আস্তরনে(পুরুত্ব ১৫ সেন্টিমিটার /৫.৯ ইঞ্চি) আকারহীন রেখা তৈরী হয়েছে।লক্ষ্য করা গিয়েছে যে ডান হাত,মুকুট এবং অন্যান্য রাজকীয় বৈশিষ্ট্যসমূহ সোনার আবরনমুক্ত,যা এমন ধারণা দেয় যে এগুলো আসল মহামুনি মূর্তিতে পরে সংযোজিত।১৯৮৪ সালে যখন প্যাগোডা পুড়ে যায়, ৯১ কিলোগ্রাম(২০১ পাউন্ড) স্বর্ণ ওই এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল,যা ঐতিহাসিকভাবে চলমান পূজা এবং মহামুনির পূজা পদ্ধতীর স্থায়ীত্ব প্রকাশ করে।
অন্য বৈশিষ্টসমূহ
[সম্পাদনা]
মন্দিরের দক্ষিণ-পূর্ব কোনার লম্বা গ্যালারিতে রাজা বুডাপায়ার সংগ্রহ করা বিপুল শিলালিপি দেখা যায়।মার্বেলে গিলটি করা ও বেলে পাথরে তৈরী এসব পাথর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।মন্দিরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকের বিশাল পানির ট্যাংকের মাছ ও কচ্ছপগুলোকে মন্দিরে আসা তীর্থযাত্রিরা চালের পিঠা খেতে দেয়।বুদ্ধ মন্দিরের কাছেই মহামূনি যাদুঘর,যেখানে পুরোটাজুড়ে বৌদ্ধত্বের নানা নিদর্শন প্রদর্শন করা আছে।
প্রাত্যহিক ধর্মিয় আচারসমূহ
[সম্পাদনা]১৯৮৮ সালের ১৭ ই ফেব্রুয়ারি পানয়া ভামসা ও পিটাকা কায়উং সকালে মূর্তির প্রাত্যহিক মুখ ধোয়ার আচার প্রবর্তন করেন।সন্নাসীদের দ্বারা বুদ্ধ মূর্তির মুখ ধোয়া ও দাঁত পরিষ্কারের এই আচার প্রতিদিন সকাল ৪ টা বা ৪.৩০ এ শুরু হয়।এটি একটি বিশদ আচার যা সাদা পোশাক পরা ও প্রথানুযায়ি পাগড়ি পরা কয়েকজন সহকারীর সহায়তায় ,সন্নাসীর পোশাক পরা বয়োজেষ্ঠ সন্নাসী ঘণ্টাব্যাপি পালন করেন।যখন ড্রামে আঘাত পড়ে,তখন সংলগ্ন মঠে বাস করা সিনিয়র সন্ন্যাসী পবিত্র স্থানে প্রবেশ করেন এবং প্রথাগত মুখ পরিষ্কারের আচার শুরু করেন।এরপর তিনি বড় ব্রাশ দিয়ে মহামুনির দাঁত পরিষ্কার করেন।এরপরপর তোয়ালে দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করেন।এরপর মূর্তিতে চন্দনের পেষ্ট দেওয়া হয় এবং তোয়ালে দিয়ে আবার পরিষ্কার করা হয় এবং সবশেষে সুগন্ধি পানি ছিটানো হয়।অনুষ্ঠান শেষ হবার পর ব্যবহৃত তোয়ালেগুলো ভক্তদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়,তারা এগুলো ভক্তির সাথে নিজ মঠে রেখে দেয়।
বিশেষ উপলক্ষ,যেমন উপসাথার দিনে,সভাপতিত্বকারী সন্ন্যাসী একটি কমলা রেশমি কাপড় মূর্তির কাধের পাশে রাখেন এবং বাতাস করেন।ভক্তদের বিশাল সমাবেশ ধর্মিয় আচারটি প্রত্যক্ষ করে;কিছুলোক প্রবেশপথের সামনে বসে যদিও নারী ও শিশুওসহ অন্যরা মাঝে ও ফয়ারের শেষ প্রান্তে বসে।আচার চলার সময় ভক্তরা ট্রেতে করে আনা খাবার ও অন্যান্য দ্রব্য দেবতাকে উৎসর্গ করে এবং প্রার্থনা সুর করে আবৃত্তি করে।শীতের সময়ে মূর্তিটি সন্নাসীদের উপযোগী আলখিল্লা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।
বার্মিজ রাজার শাসনামলে,মহামূর্তির প্রতি উৎসর্গ করা হত প্রথাগতভাবে ।রাষ্ট্রের কার্যকারী প্রধান হিসাবে মন্ত্রির সম্মানে,রাজকীয় সাদা ছাতার নিচে খাবার ও অন্যান্য উৎসর্গকৃত জিনিস নিয়ে প্রাসাদ থেকে শোভাযাত্রা বের করা হত।
উৎসব
[সম্পাদনা]প্যাগোডার ইতিহাস উদযাপন করার জন্য,ফেব্রুয়ারির শুরুতে,বৌদ্ধিস্ট উপবাসের শেষে "মহামুনি পায়া পিউই" (পিউই অর্থ উৎসব)নামে পরিচিত প্রধান বাৎসরিক প্যাগোডা উৎসব পালিত হয়।এই উৎসবের সময় প্রাত্যহিক আচার ছাড়াও "বুক অব কন্ডিশনাল রিলেশন" বই থেকে "পাতথানা" আবৃত্তি করা হয়।বইটি দর্শনের পুথি,যাতে টাভাটিসমা স্বর্গে বুদ্ধের মাকে দেওয়া বুদ্ধের ধর্মোপদেশ আছে এবং পালি ভাষার একটি পবিত্র ধর্মগ্রন্থ।পাটথানা আবৃত্তি একটি বিশেষ অনুষ্ঠান,যা কয়েকদিন ধরে চলে।দুই-তিন জনের দলে ভাগ হয়ে সন্ন্যাসীরা ধর্মগ্রন্থ থেকে আবৃত্তি করে।উৎসবে বিনোদন অনুষ্ঠানের নানা ধরন যেমন নাচ,গান,মঞ্চ নাটক অন্তর্ভুক্ত থাকে এবং পরিবার-পরিজনও বন্ধুদের পরস্পর কে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য একটি সামাজিক অনুষ্ঠান থাকে।উৎসবের মৌসুমে তীর্থযাত্রীদের বিশাল দল আকৃষ্ট হওয়ায়,প্রহরীদের মহামূর্তির কাছে রাখা হয় এবং মন্দিরের চারপাশে বিভিন্ন অংশে ভিডিও ক্যামেরা স্থাপন করা হয় এটিকে রক্ষার জন্য।
টীকা
[সম্পাদনা]- 1 2 3 4 5 Reid, Robert; Michael Grosberg (২০০৫)। Mahamuni Pagoda, Mandalay। Lonely Planet। পৃ. ২৩৪। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৭৪০৫৯-৬৯৫-৪। সংগ্রহের তারিখ ২২ মার্চ ২০১০।
- 1 2 3 4 5 Keown, Damien (২০০৩)। A dictionary of Buddhism। Oxford University Press US। পৃ. ১৬৪–১৬৫। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৯-৮৬০৫৬০-৭। সংগ্রহের তারিখ ২৪ মার্চ ২০১০।
{{বই উদ্ধৃতি}}:|কর্ম=উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য) - ↑ Johnston, p.1351
- ↑ Schober, Juliane (২০০২)। Sacred biography in the Buddhist traditions of South and Southeast Asia। Motilal Banarsidass Publ.। পৃ. ২৫৯–২৭৩। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২০৮-১৮১২-৫। সংগ্রহের তারিখ ২২ মার্চ ২০১০।
- ↑ "Mahamuni Pagoda, Mandalay"। Asia explorers। ৫ জানুয়ারি ২০১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২২ মার্চ ২০১০।
- 1 2 3 4 "Places of Peace and Power"। Sacredsites.com। ২২ জুলাই ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২২ মার্চ ২০১০।
- ↑ The Buddhist art of ancient Arakan: an eastern border state beyond ancient India, east of Vanga and Samatata। Volume 43, Issue 4 of Burmese cultural microfilm collection, Daw Saw Saw। ১৯৭৯। পৃ. ৪।
- ↑ Schober, p.267
- ↑ O'Reilly, p.32
- ↑ Aung, Myo; H.Kraft। Upper Myanmar Mandalay Pyin Oo Lwin Sagaing Monywa Mingun Mogok Shwebo। Books on Asia। পৃ. ৪–৫। আইএসবিএন ৯৭৯-৯৭৪-৯২৯০৮-৫-৮। সংগ্রহের তারিখ ২৪ মার্চ ২০১০।
{{বই উদ্ধৃতি}}:|কর্ম=উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য) - ↑ Schober, p.268
- ↑ Schober, p.260
- ↑ Abbott, p.33
- ↑ Schober p.260
- ↑ Schober p.266
- ↑ Thant Myint-U (২০০৬)। The River of Lost Footsteps--Histories of Burma। Farrar, Straus and Giroux। পৃ. ১০৯–১১০। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৩৭৪-১৬৩৪২-৬।
- ↑ Shulman, p.84
- ↑ Schober, p.260-261
- ↑ Fink, Christina (২০০১)। Living silence: Burma under military rule। Zed Books। পৃ. ২১৮–২১৯। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৮৫৬৪৯-৯২৬-২। সংগ্রহের তারিখ ২৪ মার্চ ২০১০।
- ↑ উদ্ধৃতি ত্রুটি:
<ref>ট্যাগ বৈধ নয়;Greenwood, p.128নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি - ↑ Harvey, G.E. (১৯২৫)। "Toungoo Dynasty: IIIrd Siege of Ayuthia"। History of Burma। London: Frank Cass & Co. Ltd.। পৃ. ১৬৮।
- ↑ Tan, p.310
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- Abbott, Gerry (১৯৯৮)। The traveller's history of Burma। Orchid Press। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৭৪-৮২৯৯-২৮-০।
{{বই উদ্ধৃতি}}:|কর্ম=উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য) - Aung, Myo; H.Kraft। Upper Myanmar Mandalay Pyin Oo Lwin Sagaing Monywa Mingun Mogok Shwebo। Books on Asia। পৃ. ৪–৫। আইএসবিএন ৯৭৯-৯৭৪-৯২৯০৮-৫-৮। সংগ্রহের তারিখ ২৪ মার্চ ২০১০।
{{বই উদ্ধৃতি}}:|কর্ম=উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য) - Eliot, Joshua (১৯৯৩)। Thailand, Indochina & Burma handbook। Trade & Travel Publications। আইএসবিএন ০-৮৪৪২-৯৯৮১-২।
{{বই উদ্ধৃতি}}:|কর্ম=উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য) - Fink, Christina (২০০১)। Living silence: Burma under military rule। Zed Books। পৃ. ২১৮–২১৯। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৮৫৬৪৯-৯২৬-২। সংগ্রহের তারিখ ২৪ মার্চ ২০১০।
- Greenwood, Nicholas (১৯৯৩)। Guide to Burma। Bradt Travel Guides।
- Johnston, William M. (২০০০)। Encyclopedia of Monasticism, Volume 1। Fitzroy Dearborn। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৫৭৯৫৮-০৯০-২।
- Keown, Damien (২০০৩)। A dictionary of Buddhism। Oxford University Press US। পৃ. ১৬৪–১৬৫। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৯-৮৬০৫৬০-৭। সংগ্রহের তারিখ ২৪ মার্চ ২০১০।
{{বই উদ্ধৃতি}}:|কর্ম=উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য) - O'Reilly, Dougald J. W. (২০০৭)। Early civilizations of Southeast Asia, Archaeology of Southeast Asia। Information and Interdisciplinary Subjects Series, Rowman Altamira। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৭৫৯১-০২৭৯-৮।
- Reid, Robert; Michael Grosberg (২০০৫)। Mahamuni Pagoda, Mandalay। Lonely Planet। পৃ. ২৩৪। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৭৪০৫৯-৬৯৫-৪। সংগ্রহের তারিখ ২২ মার্চ ২০১০।
- Schober, Juliane (২০০২)। Sacred biography in the Buddhist traditions of South and Southeast Asia। Motilal Banarsidass Publ.। পৃ. ২৫৯–২৭৩। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২০৮-১৮১২-৫। সংগ্রহের তারিখ ২২ মার্চ ২০১০।
- Shulman, Frank Joseph (১৯৮৬)। Burma: an annotated bibliographical guide to international doctoral dissertation research, 1898-1985। University Press of America। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮১৯১-৫৪৫৯-০।
- Tan, Teck Meng (১৯৯৬)। Business opportunities in Myanmar। Nanyang Technological University। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৩-৭১৩২০৮-৯।
{{বই উদ্ধৃতি}}:|কর্ম=উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য) - Thant Myint-U (২০০৬)। The River of Lost Footsteps--Histories of Burma। Farrar, Straus and Giroux। পৃ. ১০৯–১১০। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৩৭৪-১৬৩৪২-৬।
- Vella, Walter Francis (১৯৫৭)। Siam under Rama III, 1824-1851। J.J. Augustin।
{{বই উদ্ধৃতি}}:|কর্ম=উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য)