মহাকর্ষীয় অদ্বৈত বিন্দু

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

একটি মহাকর্ষীয় অদ্বৈত বিন্দু (gravitational singularity) বা স্থানকাল অদ্বৈত বিন্দু বা সংক্ষেপে অদ্বৈত বিন্দু হচ্ছে স্থানকালের একটি অবস্থান যেখানে সাধারণ আপেক্ষিকতার কারণে মহাবিশ্বের কোন বস্তুর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র অসীম হয়ে যায় (গণনা অনুসারে), এবং এমনভাবে এটা হয় যে এটি আর স্থানাঙ্ক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে না। মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের শক্তি পরিমাপ করার জন্য স্থানকালের স্কেলার ইনভ্যারিয়েন্ট বক্রতাগুলোকে ব্যবহার করা হয়, যার মধ্যে পদার্থের ঘনত্বের পরিমাপও অন্তর্ভূক্ত। যেহেতু এই পরিমাপগুলো অদ্বৈত বিন্দুগুলোর ক্ষেত্রে অসীম হয়ে যায়, তাই স্বাভাবিক স্থানকালের সূত্রগুলো সেক্ষেত্রে আর কাজ করতে পারে না।[১][২]

মহাকর্ষীয় অদ্বৈত বিন্দুকে সাধারণ আপেক্ষিকতার আলোচনায় বিবেচনা করা হয় যেখানে কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রে আপাতভাবে ঘনত্ব অসীম হয়ে যায়। জ্যোতির্পদার্থবিদ্যামহাবিশ্বতত্ত্বের আলোচনায় মহাবিষ্ফোরণ এর সময়কার সর্বপ্রথম দশা হিসেবে মহাকর্ষীয় অদ্বৈত বিন্দুকে বিবেচনা করা হয়। এরকম অদ্বৈতবিন্দুকে গণনা করে পাওয়া যায় বলেই যে এর অস্তিত্ব আসলেই আছে বা ছিল (যেমন মহাবিষ্ফোরণের শুরুতে) তা নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানীগণ একমত হতে পারেন নি। এরকম চরম ঘনত্বে কী হবে তা ব্যাখ্যা করার জন্য বর্তমান জ্ঞান যথেষ্ট নয় এটাও অনেকে বলে থাকেন।

সাধারণ আপেক্ষিকতা ভবিষ্যদ্বাণী করে যে কোনও বস্তুর নির্দিষ্ট মাত্রা অতিক্রম করলে (যেমন কোন নক্ষত্র শোয়ার্জশিল্ড ব্যাসার্ধ অতিক্রম করলে) তা কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হবে, আর তার অভ্যন্তরে মহাকর্ষীয় অদ্বৈত বিন্দু (একটি ঘটনা দিগন্ত দ্বারা আবৃত) তৈরি হবে।[৩] পেনরোজ-হকিং এর অদ্বৈত বিন্দু তত্ত্বগুলি একটি অদ্বৈত বিন্দুকে সংজ্ঞায়িত করে যার জিওডেসিকগুলোকে মসৃণ পদ্ধতিতে বর্ধিত করা যায় না।[৪] এরকম জিওডেসিকের সমাপ্তিকে অদ্বৈত বিন্দু বলে মনে করা হয়।

মহাবিষ্ফোরণ এর শুরুতে মহাবিশ্বের প্রাথমিক অবস্থাকেও আধুনিক তত্ত্বগুলো অদ্বৈত বিন্দু হিসেবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।[৫] এই ক্ষেত্রে মহাবিশ্ব মহাকর্ষীয় পতনের ফলে একটি কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয় নি। কারণ মহাকর্ষীয় পতনের জন্য বর্তমানে পরিচিত গণনা এবং ঘনত্বের সীমাগুলো সাধারণত তুলনামূলকভাবে স্থির আকারের বস্তু (যেমন নক্ষত্র) উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়, মহাবিষ্ফোরণের মত দ্রুত বর্ধনশীল স্থানের ক্ষেত্রে এগুলোকে একই ভাবে প্রযুক্ত নাও হতে পারে। সাধারণ আপেক্ষিকতা বা কোয়ান্টাম বলবিদ্যা কোনটাই বর্তমানে মহাবিষ্ফোরণের শুরুর মুহূর্তগুলোকে বর্ণনা করতে পারে না।[৬] তবে সাধারণভাবে, কোয়ান্টাম বলবিদ্যা কণাগুলোকে তাদের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চেয়ে কম স্থান অধিকার করার অনুমতি দেয়না।[৭]

ব্যাখ্যা[সম্পাদনা]

পদার্থবিদ্যার অনেক তত্ত্বে কোন না কোন ধরণের গাণিতিক অদ্বৈত বিন্দু রয়েছে। এই তত্ত্বগুলোর সমীকরণগুলো থেকে এই পূর্বাভাস আসে যে, কিছু পরিমাণ ভর অসীম হয়ে যায় বা সীমা ছাড়াই বৃদ্ধি পায়। সাধারণভাবে এটি সেই তত্ত্বগুলোতে কোন কিছু অনুপস্থিত থাকার চিহ্ন, যেমন অতিবেগুনী বিপর্যয়, পুনঃস্বাভাবিকীকরণ, এবং লারমর এর সূত্র দ্বারা ভবিষ্যদ্বাণী করা হাইড্রোজেনের অস্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে এমনটা দেখা গিয়েছিল।

কিছু তত্ত্ব, যেমন লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি তত্ত্ব নির্দেশ করে যে অদ্বৈত বিন্দুর অস্তিত্ব নাও থাকতে পারে।[৮] কিছু ধ্রুপদী ইউনিফাইড ফিল্ড থিওরি যেমন আইনস্টাইন-ম্যাক্সওয়েল-ডিরাক সমীকরণের ক্ষেত্রেও এটি সত্য। এই ধারণাটিকে কোয়ান্টাম মহাকর্ষের প্রভাবের আকারে বর্ণনা করা যায়। এটা অনুসারে একটি সর্বনিম্ন দূরত্ব থাকে, ভরগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব যার চেয়ে কমলেও মহাকর্ষ আর বৃদ্ধি পায় না। অথবা একে অপরের মধ্যে প্রবেশ করা কণা তরঙ্গগুলো মহাকর্ষীয় প্রভাবকে ঢেকে দেয় যার ফলে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের চেয়ে কম দূরত্বে মহাকর্ষীয় প্রভাব কাজ করে না।

প্রকারভেদ[সম্পাদনা]

বিভিন্ন ধরনের অদ্বৈত বিন্দু রয়েছে। কোন ধরণের তত্ত্ব থেক অদ্বৈত বিন্দুটির ধারণা আসছে তার উপর নির্ভর করে এর বৈশিষ্ট্যগুলো বিভিন্ন হয়। অদ্বৈত বিভিন্ন আকারের হতে পারে যেমন মোচাকার ও বক্র। এই অনুকল্পও রয়েছে যে ঘটনা দিগন্ত ছাড়াও অদ্বৈত বিন্দুর অস্তিত্ব থাকতে পারে, যেখানে ঘটনা দিগন্ত হচ্ছে স্থানকালের সেই অঞ্চল যার ভেতরের কোন ঘটনা তার বাইরের অঞ্চলকে প্রভাবিত করতে পারে না। ঘটনা দিগন্ত ছাড়া অদ্বৈত বিন্দুকে নগ্ন অদ্বৈতবিন্দু বলা হয়।

মোচাকার[সম্পাদনা]

একটি মোচাকার অদ্বৈত বিন্দু তখন দেখা যায় যখন এমন একটি বিন্দু থাকে যার কোন ডিফেওমরফিজম ইনভ্যারিয়েন্ট কোয়ান্টিটি এর সীমাই অসীম নয়। সেক্ষেত্রে সেই সীমার বিন্দুতেও স্থানকাল মসৃণ থাকে না। ফলে স্থানকালকে সেই বিন্দুর চারপাশে শঙ্কু বা মোচা বা কোণকের মত দেখা যায়, যেখানে সেই অদ্বৈত বিন্দু কোণকটির শীর্ষবিন্দুতে অবস্থান করে। এর মেট্রিকও সসীম হতে পারে, সকল ক্ষেত্রেই স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা ব্যবহার করা যায়।

এরকম মোচাকার অদ্বৈত বিন্দুর একটি উদাহরণ হচ্ছে কসমিক স্ট্রিং এবং শোয়ার্জশিল্ড কৃষ্ণগহ্বর[৯]

বক্রতা[সম্পাদনা]

সাধারণ আপেক্ষিকতার সমীকরণগুলোর সমাধান বা মহাকর্ষের অন্যান্য তত্ত্বগুলো (যেমন সুপারগ্র্যাভিটি) থেকে প্রায়ই এমন বিন্দু পাওয়া যায় যেগুলোর মেট্রিক অসীম হয়ে যেতে পারে। যাই হোক, এই বিন্দুগুলোর অনেকগুলো সম্পূর্ণ মসৃণ, আর সেক্ষেত্রে সেই অসীমগুলো নিছকই সেই বিন্দুতে কোন অনুপযুক্ত স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা ব্যবহারের ফল। একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে একটি অদ্বৈত বিন্দু রয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য অবশ্যই সেই বিন্দুতে ডিফেওমরফিজম ইনভ্যারিয়েন্ট কোয়ান্টিটিস (অর্থাৎ স্কেলার) অসীম হতে হবে। এই কোয়ান্টিটিগুলো প্রত্যেকটি স্থানাঙ্ক ব্যবস্থাতেই একই। তাই সেই অসীমগুলো স্থানাঙ্ক ব্যবস্থাগুলোর পরিবর্তন করলেই বাতিল হবে না।

অঘুর্ণায়মান কৃষ্ণগহ্বর ও এর অদ্বৈত বিন্দুর একটি সরল চিত্র

শোয়ার্জশিল্ড সমাধানের একটি উদাহরণ হচ্ছে অ-ঘূর্ণমান ও আধানহীন কৃষ্ণগহ্বর। কৃষ্ণগহ্বর থেকে দূরের অঞ্চলগুলো নিয়ে কাজ করার উপযোগী স্থানাঙ্কব্যবস্থায় ঘটনা দিগন্তে মেট্রিকের একটি অংশ অসীম হয়ে যায়, কিন্তু ঘটনা দিগন্তের স্থানকাল মসৃণই থাকে। মেট্রিক সম্পূর্ণ মসৃণ এরকম অন্য স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা (যেমন ক্রুসকাল স্থানাঙ্ক) ব্যবহার করলে এই মসৃণত্ব সুস্পষ্ট হয়। অন্য দিকে, কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রে এরপরও মেট্রিক অসীম থাকে। এই সমাধানগুলো নির্দেশ করে যে এখানে অদ্বৈত বিন্দুর উপস্থিত। এখানে ক্রেটশম্যান স্কেলার রাইনম্যান টেনসরের অর্থাৎ এর বর্গ হওয়ার দ্বারা অদ্বৈত বিন্দুর অস্তিত্বকে যাচাই করে যাচাই করা যেতে পারে, যেখানে ক্রেটসম্যান স্কেলার একটি ডিফেওমরফিজম ইনভ্যারিয়েন্ট, যার মান অসীম।

অ-ঘূর্ণায়মান কৃষ্ণগহ্বরের ক্ষেত্রে একটি একক বিন্দুতে অদ্বৈত বিন্দু দেখা যায় যাকে "বিন্দু অদ্বৈত বিন্দু" বা "পয়েন্ট সিংগুলারিটি" বলা হয়। কিন্তু একটি ঘুর্ণায়মান কৃষ্ণগহ্বর, যা কার কৃষ্ণগহ্বর নামে পরিচিত তাতে অদ্বৈত বিন্দু একটি রিং বা বলয় আকারে (বৃত্তাকার রেখা) গঠিত হয়, এবং একে "বলয় অদ্বৈতবিন্দু" বা "রিং সিংগুলারিটি" বলে। এরকম অদ্বৈত বিন্দু তাত্ত্বিকভাবে ক্ষুদ্রবিবর বা ওয়ার্মহোলেও পরিণত হয়।[১০]

আরো সাধারণভাবে, একটি স্থানকালকে নিয়মিত বা স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেয়া হয় যদি তার জিওডেসিক অসমাপ্ত হয়ে থাকে, অর্থাৎ অবাধে পতনশীল কণাগুলির গতিবিধি একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরে আর নির্ধারণ করা যায় না, সেই নির্দিষ্ট সময়টি হচ্ছে অদ্বৈত বিন্দু। উদাহরণস্বরূপ, একটি অ-ঘূর্ণায়মান কৃষ্ণগহ্বরের ঘটনা দিগন্তের ভেতরে থাকা যেকোন পর্যবেক্ষক একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রে পতিত হবে। মহাবিষ্ফোরণ এর মডেলের ধ্রুপদী সংস্করণ অনুযায়ী মহাবিশ্ব তার উৎপত্তি সময়ে (t = 0) একটি কার্যকারণগত অদ্বৈত বিন্দু ধারণ করে, যেখানে সকল টাইম-লাইক জিওডেসিকেরই এই উৎপত্তি সময়ের অতীতে কোনরকম সম্প্রসারণ নেই। সেই অনুকল্পিত সময়ের পূর্বে সময়কে এক্সট্রাপোলেট করা হলে দেখা যায় সকল স্থানগত মাত্রার আকার শূন্য এবং ঘনত্ব, তাপমাত্রা ও স্থানকালের বক্রতা অসীম।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

প্রাসঙ্গিক অধ্যয়ন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Blackholes and Wormholes" 
  2. Claes Uggla (২০০৬)। "Spacetime Singularities"Einstein Online2 (1002)। 
  3. Curiel, Erik & Peter Bokulich। "Singularities and Black Holes"Stanford Encyclopedia of Philosophy। Center for the Study of Language and Information, Stanford University। সংগ্রহের তারিখ ২৬ ডিসেম্বর ২০১২ 
  4. Moulay, Emmanuel। "The universe and photons" (PDF)। FQXi Foundational Questions Institute। সংগ্রহের তারিখ ২৬ ডিসেম্বর ২০১২ 
  5. Wald, p. 99
  6. Hawking, Stephen। "The Beginning of Time"Stephen Hawking: The Official WebsiteCambridge University। সংগ্রহের তারিখ ২৬ ডিসেম্বর ২০১২ 
  7. Zebrowski, Ernest (২০০০)। A History of the Circle: Mathematical Reasoning and the Physical Universe। Piscataway NJ: Rutgers University Press। পৃষ্ঠা 180। আইএসবিএন 978-0813528984 
  8. Rodolfo Gambini; Javier Olmedo; Jorge Pullin (২০১৩)। "Quantum black holes in Loop Quantum Gravity"। Classical and Quantum Gravity31 (9): 095009। arXiv:1310.5996অবাধে প্রবেশযোগ্যdoi:10.1088/0264-9381/31/9/095009বিবকোড:2014CQGra..31i5009G 
  9. Copeland, Edmund J; Myers, Robert C; Polchinski, Joseph (২০০৪)। "Cosmic F- and D-strings"। Journal of High Energy Physics2004 (6): 013। arXiv:hep-th/0312067অবাধে প্রবেশযোগ্যdoi:10.1088/1126-6708/2004/06/013বিবকোড:2004JHEP...06..013C 
  10. If a rotating singularity is given a uniform electrical charge, a repellent force results, causing a ring singularity to form. The effect may be a stable wormhole, a non-point-like puncture in spacetime that may be connected to a second ring singularity on the other end. Although such wormholes are often suggested as routes for faster-than-light travel, such suggestions ignore the problem of escaping the black hole at the other end, or even of surviving the immense tidal forces in the tightly curved interior of the wormhole.