মন্মথ রায়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
মন্মথ রায়
Manmatha roy.jpg
মন্মথ রায়
পেশা নাট্যকার
সময়কাল বাংলার নবজাগরণ


মন্মথ রায় (১৬ জুন ১৮৯৯ - ১৯৮৮) হলেন একজন বাঙালি সাহিত্যিক।

জন্ম ও শিক্ষা জীবন[সম্পাদনা]

১৮৯৯ সালের ১৬ জুন টাঙ্গাইল জেলার গালা গ্রামে তার জন্ম। তাদের স্থায়ী নিবাস ছিল পশ্চিম দিনাজপুরের বালুর ঘাট। সেখানেই তাঁর বাল্যজীবন অতিবাহিত হয়। তিনি পশ্চিম দিনাজপুর স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, রাজশাহী কলেজ থেকে আইএ, স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বিএ (১৯২২) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাস করেন। ১৯২৫ সালে বিএল পাস করে তিনি বালুর ঘাটে ওকালতি শুরু করেন এবং একই সঙ্গে সরকারি দায়িত্বও পালন করেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মন্মথ রায় নাট্যচর্চাও করতেন।[১]

সাহিত্য কীর্তি[সম্পাদনা]

পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মন্মথ রায় নাট্যচর্চাও করতেন। স্বদেশপ্রীতি তাঁর নাট্য রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য নাটকের সংখ্যা প্রায় চল্লিশ। সেগুলির মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে মুক্তির ডাক (১৯২৩)। ১৯২৭ সালে পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে রচিত তাঁর প্রথম নাটক চাঁদ সওদাগর প্রকাশিত হয়। নাটকটি পৌরাণিক হলেও এতে আধুনিক জীবন-সমস্যা প্রতিফলিত হয়েছে। পরে তিনি মহুয়া (১৯২৯), কারাগার (১৯৩০) ও সাবিত্রী (১৯৩১) নাটকত্রয় লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মন্মথ রায় ধর্মঘট (১৯৫৩), সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৯৫৮), অমৃত অতীত (১৯৬০), লালন ফকির (১৯৬৯) ইত্যাদি নাটক রচনা করেন। পাবলিক থিয়েটারে মঞ্চস্থ তাঁর নাটকগুলির মধ্যে অশোক (১৯৩৩), খনা (১৯৩৫), মীর কাশিম (১৯৩৮) ও জীবনটাই নাটক (১৯৫৩) উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালে তিনি রচনা করেন আমি মুজিব নই। তিনি বহু সংখ্যক একাঙ্ক নাটকও রচনা করেন। বাংলা ভাষায় যথার্থ একাঙ্ক নাটক রচনার কৃতিত্ব তাঁরই।

একালের বাংলা নাটকে মন্মথ রায় সর্বাপেক্ষা শক্তিমান লেখকদের মধ্যে  অন্যতম। ১৯৩৮ এর পূর্বে তিনি প্রধানত পৌরানিক প্রসঙ্গ এবং বৌদ্ধযুগের কাল্পনিক  তথ্য এবং ইতিহাস  আশ্রয় করে নাটক লিখেছিলেন। ঐ সময় তিনি যে নাটকগুলি লিখেছিলেন, তার মধ্যে প্রধান নাটকগুলি হলো কারাগার,দেবাসুর,চাঁদসওদাগর,মুক্তির ডাক প্রভৃতি।তারপর কয়েকবৎসর তিনি  নাট্য রচনা থেকে  নিজেকে দুরে সরিয়ে রেখেছিলেন। তারপর ১৯৫০ সাল থেকে আমৃত্যু পর্যন্ত তিনি সামাজিক  নাটক লিখেছিলেন।নাট্য জীবনের দুই পর্বেই তিনি একাঙ্কিকা নাটক লিখেছিলেন। বৌদ্ধ প্রসঙ্গ, পৌরানিক বিষয় ,অতীতাশ্রয়ী আরও নানা বিষয় নিয়ে যেমন লিখেছিলেন তেমন আধুনিক, সমাজিক প্রসঙ্গ নিয়েও  নাটক লিখেছিলেন।২০০টির উপর নাটক তিনি রচনা করেছিলেন। তার পৌরানিক নাটকের প্রধান বিশেষত্ব হল ভক্তিরসের  সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই। কখনও কিঞ্চিৎ অতিলৌকিকতা এবং কখনও রহস্যময়তা এর মধ্যে লুকিয়ে আছে,  কিন্তু মূল চরিএগুলি একান্ত মানবিক।  তারা প্রায়ই জটিল এবং অর্ন্তদ্বনধের পাএ।এমনকি পুরানকাহীনিতেও  তিনি এনেছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বদেশপ্রেমের মেজাজ, যা ভারতের স্বাধীনতাকামী মানুষদের উৎসাহিত করেছিল ব্রিটিশ সামাজ্যবাদ থেকে মুক্তির জন্য।  শ্রীবৎস, চাঁদসওদাগর, বৃহ, ইন্দ্র বসুদেব প্রভৃতি চরিএগুলির অভিনয় একসময় বাংলার নাট্যজগতের মঞ্চকে প্রচন্ডভাবে প্রভাবিত করেছিল। শুধু জনপ্রিয়তার দৌলতে নয়, গভীর জীবনবোধ এবং তার মন্থনজাত বেদনা মন্মথ রায়ের নাটকে ছিল প্রধান শক্তি। ঐতিহাসিক এবং সামাজিক নাট্যরচনায় তিনি সর্বকালের শ্রেষ্ট নাট্যকার হিসাবে পরিচিত। মন্মথ রায়কে অনেকেই বাংলা একাঙ্কের প্রথম শিল্পী বলে অভিহিত করা হয়।যদিও ‘পুনর্জন্মে’,(দ্বীজেন্দ্র লাল রায়) এবং রবীন্দ্রনাথের ‘হাস্যকৌতুক’ অনেকগুলি একাঙ্ক নাটক আছে,কিন্তু সেগুলি সবই লঘুরসে সমৃদ্ধ।মন্মথ রায় ১৯২৪ সাল থেকে প্রায় ৫০ বছর ধরে অবিরাম ২০০টির বেশী একাঙ্ক নাটক লিখেছেন। তার নাটকের মধ্যেই জীবনের সকল রস, গাঢ়, গ্রাম্ভীর্য  এমনকি ট্র্যাজিক হাহাকার পর্য্যন্ত তিনি সুষ্টভাবে নাটকের মধ্যে প্রকাশ করেছেন। কাজেই তাকে বাংলার  একাঙ্ক নাটকের আদি লেখক বলা যায়। রবীন্দ্রনাথের কাহিনী’র অন্তর্গত কাব্য নাট্যগুলিও এক অর্থে একাঙ্ক, কিন্তু সেগুলি শুধুমাএ কাব্যনাট্য। মন্মথ রায়ই রীতিমতো অভিনয়যোগ্য একাঙ্ক নাটক প্রথম লেখেন। তাঁর কোন কোন নাটক বিশেষ সাফল্যের সঙ্গে মঞ্চে অভিনীত হয়। তার মধ্যে ‘মুক্তির ডাক’, ‘বিদ্যুৎপর্ণা’, ‘লক্ষহীরা’ প্রভৃতি নাটক অতি উচ্চাঙ্গের লেখা।  উওরকালে তার সামাজিক একাঙ্ক নাটকগুলির মধ্যে মূল্যবোধ ও সংশ্লিষ্ট মানসিক সংকটের ছবি আছে। অতীতকালের কাহিনী আশ্রয়ী একাঙ্কে যেমন তিনি ঘটনার ঘনখটার সমাবেশ করতেন,উওাল জীবনাবেগ ও তীব্র মানসিকতার ও উচ্চকন্ঠ আর্তনাদ প্রকাশ করেছেন,সামাজিকএকাঙ্ক নাটকগুলি কিন্তু অত্যন্ত ঘটনা বিরল। তুলনায় অনুচ্চ-নাটকীয়তা অনেকটা অন্তমুখী।স্বাধীনতার  উওরকালে তিনি সরকারি লোকরঞ্জক শাখার প্রয়োজনে কিছু সামাজিক নাটক রচনা করেছিলেন । এগুলি অনেকটা প্রচারধর্মী। কিন্তু এর মধ্যে প্রগতিশীলতার প্রতি ঝোঁক লক্ষ্য করা যায়- গণনাট্য ভাবনা কিছু প্রতিফলন ও লক্ষনীয়। পরবর্ত্তীকালে ১৯৬০ এর পরে তিনি  যে নাটকগুলি  লেখেন তাঁর মধ্যে  প্রতিবাদী ও বিদ্রোহাত্মক সুরের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে।

উল্লেখযোগ্য নাটকঃ[সম্পাদনা]

  • মুক্তির ডাক (১৯২৩)
  • সেমিরেমিস (১৯২৫)
  • কাজল রেখা (১৯২৬)
  • চাঁদ সদাগর (১৯২৭)
  • দেবাসুর (১৯২৮)
  • মহুয়া (১৯২৯)
  • কারাগার (১৯৩০)
  • একাঙ্কিকা (১৯৩১)
  • সাবিত্রী (১৯৩১)
  • অশোক (১৯৩৩)
  • খনা (১৯৩৫)
  • বিদ্যুপর্না (১৯৩৭)
  • সতী (১৯৩৭)
  • মীরকাশিম (১৯৩৮)
  • রূপকথা (১৯৩৮)
  • রাজনটী (১৯৩৮)
  • ভাঙাগড়া (১৯৫০)
  • মহাভারতী (১৯৫০)
  • মমতাময়ী হাসপাতাল (১৯৫২)
  • উর্ব্বশী (১৯৫৩)
  • নিরুদ্দেশ (১৯৫৩)
  • পথে বিপথ (১৯৫৩)
  • মীরাবাঈ (১৯৫৪)
  • গুপ্তধন (১৯৫৫)
  • জীবন মরন (১৯৫৫)
  • লাঙ্গল (১৯৫৫)
  • জটাগঙ্গাধর বাঁদ (১৯৫৫)
  • রঘু ডাকাত (১৯৫৫)
  • শ্রীশ্রী মা (১৯৫৫)
  • ছোটোদের একাঙ্কিকা (১৯৫৬)
  • মরা হাতি লাখ টাকা (১৯৫৭)
  • নব একাঙ্কিকা (১৯৫৮)
  • সাওতাল বিদ্রোহ (১৯৫৮)
  • কোটিপতি নিরুদ্দেশ (১৯৫৯)
  • ফকিরের পাথার ও নাট্যগুচ্ছ (১৯৫৯)
  • বন্দিতা (১৯৫৯)
  • মহাপ্রেম (১৯৫৯)
  • অমৃত অতীত (১৯৬০)
  • কৃষাণ (১৯৬১)
  • দুই আঙিনাঃ এক আকাশ (১৯৬১
  • বিচিত্র একাঙ্ক (১৯৬১)
  • স্বর্ণকীট ও জওয়ান (১৯৬২)
  • মহা উদ্বোধন (১৯৬৩)
  • মহা অভিসার (১৯৬৩)
  • দুর্গেশনন্দিনীর জন্ম (১৯৬৫)
  • তারাস শেভচেঙ্কা (১৯৬৫)
  • দিগ্বিজয় (১৯৬৯)
  • দ্বিচারিণী (১৯৭০)
  • লালন ফকির (১৯৭০)

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. দাশগুপ্ত, আনন্দ (৩০ ডিসেম্বর ২০১৪)। "বেতারের নানারকম"অবসর। সংগৃহীত ১৯ জানুয়ারি ২০১৬ 

বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত - ড.অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

  • বাংলা সাহিত্যের সমগ্র ইতিহাস - তপন কুমার চট্টোপাধ্যায়
  • বাংলা সাহিত্যের ইতিকথা - ভূদেব চৌধুরী