মানবহিতৈষণা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(মনুষ্যরূপ থেকে পুনর্নির্দেশিত)
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
লুসিয়ানা তে আমেরিকর্প্স এর স্বেচ্ছাসেবক

মানবহিতৈষণা বা লোকহিতৈষণা(ইংরেজি: Humanitarianism) মানব জীবনে মূল্যবোধের একটি সক্রিয় বিশ্বাস, যার ফলে নৈতিক, নিখুঁত এবং যৌক্তিক কারণে ভাল মানবতার জন্য মানুষ দয়ালু হয় এবং অন্যান্য মানুষকে সহায়তা প্রদান করে। মানব কল্যাণে বিশেষ করে মানব কল্যাণ সম্পর্কিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে বর্ণনা করার জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে মানব জাতি উন্নয়নের লক্ষ্যে আন্দোলনে এটি দার্শনিক বিশ্বাস। এই দর্শন চর্চাকারী পরহিতব্রতী নামে পরিচিত হন।

একটি অনানুষ্ঠানিক মতাদর্শ[সম্পাদনা]

মানবহিতৈষণা অনুশীলন একটি অনানুষ্ঠানিক মতাদর্শ; এটা হল "মানব কল্যাণকে উন্নীত করার জন্য মানুষের কর্তব্যের মতবাদ।"[১]

মানবহিতৈষণা একটি দৃষ্টিভঙ্গির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে সকল মানুষ সম্মান ও মর্যাদার যোগ্য এবং তাদের সাথে সমান আচরণ করা উচিত। অতএব বলা যায়, পরহিতব্রতী ব্যক্তি সমগ্র মানবতার কল্যাণে কাজ করে। এটা উপজাতীয়তা এবং জাতিগত জাতীয়তাবাদকে চিহ্নিতকারক "আমরা বনাম তারা" মানসিকতার বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি।। পরহিতব্রতী দাসত্ব, মৌলিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘন, এবং ত্বকের রঙ, ধর্ম, পূর্বপুরুষ, বা জন্মস্থান স্থান নিয়ে বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বৈষম্য ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে। মানবহিতৈষণা একজন মানুষকে প্রাকৃতিক কিংবা মানসৃষ্ট দুর্যোগে অন্যের জীবন বাঁচানো, দুঃখকষ্ট দূর এবং মানুষের মর্যাদা উন্নীত করতে পরিচালিত করে। আন্দোলন ও রাজনৈতিক বিভিন্ন মাত্রা দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে সাধারণ জনগণ মানবহিতৈষণা গ্রহণ করে। আলবার্ট শোয়াইতজারের উদ্ধৃতি দিয়ে অনানুষ্ঠানিক মতাদর্শের পরিমাপ করা যেতে পারে: "কখনও কোনও উদ্দেশ্যে মানুষকে বিপদে না ফেলাই হচ্ছে মানবহিতৈষণার গঠন উপাদান।"

একটি সর্বজনীন মতবাদ[সম্পাদনা]

জাঁ পিকেটেট, রেড ক্রসের মৌলিক মূলনীতির ব্যাখ্যাতে মানবহিতৈষণার সার্বজনীন বৈশিষ্ট্যের জন্য যুক্তি দেন:

মানবতা নীতির উত্স হল সামাজিক নৈতিকতার সারাংশ। এক কথায়, তোমরা যাহা করিতেছ, তাহাদের প্রতি কি করিতেছ । এই মৌলিক নিয়ম প্রায় একই আকারে ব্রাহ্মণবাদ, বৌদ্ধধর্ম, খ্রিষ্টধর্ম, কনফুসিয়াসিবাদ, ইসলাম, ইহুদী ও তাওবাদ, সমস্ত মহান ধর্মগুলিতে পাওয়া যেতে পারে। এটি ইতিবাচকদের সুবর্ণ নিয়ম, যারা নিজেদের ধর্মকে নিজেদের ধর্ম বলে স্বীকার করে না, কেবলমাত্র অভিজ্ঞতার তথ্য, নামের কারণে। পুরুষদের নিজেদের ভাগ্য উন্নতিতে একসাথে কাজ করার সুবিধাটি সনাক্ত করতে প্রত্যক্ষ বা পরস্পরগত ধারণাগুলির অবলম্বন করার জন্য এটি আসলেই অপরিহার্য নয়। [২].

ঐতিহাসিক উদাহরণ[সম্পাদনা]

ঐতিহাসিকভাবে, ১৮০০ এর দশকের শেষ দিকে এবং ১৯০০ এর দশকের প্রথম দিকে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর, মানবহিতৈষণা সার্বজনীনভাবে দেখা গিয়েছিল। গ্রেট ব্রিটেনের ১৯০০-এর দশকে নারীবাদের সঙ্গে জড়িত নারীদের অনেকেই মানবহিতৈষণায় ঐক্য প্রকাশ করেছিল। পরহিতব্রতীদের চাপে সংসদে শিশু ও অপ্রশিক্ষিত শ্রমিকদের কঠিন ঘন্টা এবং কাজের শর্তগুলি অবৈধ ঘোষণা করা হয়। ১৮৩৩ সালের কারখানা আইন এবং ১৮৪৪ সালের কারখানা আইন ছিল শিল্প বিপ্লবের পর সংসদে গৃহীত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক বিল।

১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, জরুরী প্রতিক্রিয়াতে ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল ও হেনরি ডুনান্টের কাজ মানবহিতৈষণা কেন্দ্রিক ছিল এবং পরবর্তীতে এগুলি রেড ক্রসের প্রতিষ্ঠার দিকে পরিচালিত করেছিল।

জরুরী প্রতিক্রিয়া[সম্পাদনা]

আজকের দিনে মানবিক বিপর্যয়ে জরুরী প্রতিক্রিয়ার পিছনে চিন্তা ও মতবাদগুলি মানবহিতৈষণা বর্ণনা করতে ব্যবহৃত হয়। এই ক্ষেত্রে এটি মানবতাবাদী নীতি, বিশেষত মানবতার নীতির উপর ভিত্তি করে মানবহিতৈষী সাহায্যের পক্ষে যুক্তি দেয়। এমএসএফ-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নিকোলাস ডি টোরেন্টে লিখেছেন:

মানবিক কর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা হল মানবতা, নিরপেক্ষতা, স্বাধীনতা এবং সমদর্শিতা। সকল মানুষের মানুষ হওয়ার উত্কর্ষে কেবলমাত্র তাদের প্রয়োজনের ভিত্তিতে প্রাপকদের মধ্যে বৈষম্য ছাড়াই সমান মর্যাদা ব্যক্ত করে। অন্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এক পক্ষের সুবিধা হয়, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, বা অন্যান্য বিষয়ের স্বার্থ কাজ করে এমন যুদ্ধক্ষেত্রে মানবিক সংগঠনের অংশ গ্রহণ বা কর্ম গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

এই মৌলিক নীতিগুলি দুটি প্রয়োজনীয় উদ্দেশ্যে কাজ করে। এক, নিঃশর্তভাবে এবং কোন ভুল উদ্দেশ্য ছাড়াই দুঃখকষ্ট দূর করার জন্য মানবিক পদক্ষেপের একক মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য প্রণয়ন করে। দুই, কার্যকরী কার্যক্রম বিকাশের পিছনে কাজ করে। বিশেষত অত্যন্ত উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে মানবিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি এবং কার্যক্রমের জন্য সম্প্রদায়ের সম্মতি পেতে সাহায্য করে।[৩]

ডিজিটাল মানবহিতৈষণা[সম্পাদনা]

প্যাট্রিক মায়ার, ২০১১ সালের হাইতির ভূমিকম্পের জন্য জনসমর্থন আদায়ে প্রথম 'ডিজিটাল মানবহিতৈষণা' শব্দটির ব্যবহার শুরু করেন।[৪][৫][৬] ২০১১ সালে, পল কনলেই ডিজিটাল মানবহিতৈষণা সম্পর্কে একটি TED আলাপ দেন যেখানে তিনি বলেন মানবহিতৈষণার "উৎস এনালগ যুগে দৃঢ়ভাবে নাস্তানাবুদ হয়েছে" সাথে "একটি বড় পরিবর্তন আসছে"।[৭][৮] ২০১৫ সালে তিনি ডিজিটাল পরহিতব্রতী : কিভাবে বিগ ডেটা মানবীয় প্রতিক্রিয়ার অভিব্যক্তি পরিবর্তন করছে বইটি লেখেন।

ভিনসেন্ট ফাব্রিয়ে উল্লেখ করেন যে "বিস্তৃত কৌশলগত পরিকল্পনা এবং সরবরাহের সংগঠনকে, ভাল পরিস্থিতিগত সচেতনতা প্রদানের জন্য তথ্য প্রদান করে [...] সোশ্যাল মিডিয়া মানবতার ক্ষেত্রে উপকারে আসতে পারে" এবং "২০১০ সালে হাইতির ভূমিকম্পের সময় সঙ্কট ম্যাপিং " "সফটওয়্যার এবং ডিজিটাল মানবিক প্ল্যাটফর্ম" এর সাথে সত্যিই আবির্ভূত হয়েছে যেমন স্ট্যান্ডবাই টাস্ক ফোর্স, রাস্তার উন্মুক্ত মানচিত্র এবং আরও অনেক কিছু" অনেক বিপর্যয়ের সময় সক্রিয় হচ্ছে।[৯]

বস্তুত, ডিজিটাল মানবিক প্রচেষ্টায় সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ২০১০ সালের গ্রীষ্মের সময় যখন রাশিয়ার জুড়ে উন্মুক্ত আগুন ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন ধোঁয়াশায় শ্বাসগ্রহণ করে অনেকে মারা যায়,[১০] সোশ্যাল মিডিয়া ডিজিটাল মানবতাবাদীদের বিপদগ্রস্থ এলাকাগুলি ম্যাপ করার অনুমতি দেয়। ফলে রাশিয়ানরা, যারা নিখোঁজ হয়েছে ভেবেছিল, তারা তাদের অবস্থা সম্পর্কে অনলাইনে পোস্ট করেছিল যা হাজার হাজার রাশিয়ান ব্লগারকে ত্রাণ তৎপরতাগুলির সমন্বয় সাধনে উৎসাহিত করেছিল।[১০] রাশিয়ার ডিজিটাল মানবিক প্রচেষ্টা, ২০১০ সালে অগ্নিকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, রাশিয়ান সরকারের এই ধরনের বড় আকারের দুর্যোগ মোকাবেলা করার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না। [১০]

ডিজিটাল মানবহিতৈষণায়, বিগ ডাটা ডিজিটাল মানবিক কাজকে উন্নত করার প্রচেষ্টা দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছে এবং একটি সঙ্কট প্রসারের সীমিত উপলব্ধি সৃষ্টি করে। আনুষ্ঠানিক মানবিক ক্ষেত্র এবং সংকটের শিকার উভয়েই ডিজিটাল মানবতাবাদীদের সেবা এবং শ্রম প্রয়োজন।[১১] তাই বলা যায়, সামাজিক সম্পর্কে বিগ ডেটার প্রয়োজন আছে।

২০০৫ এর আগে, উইকিপিডিয়াকে ডিজিটাল মানবহিতৈষণায় দেখা যেতে পারে কিনা- এই প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়েছিল।[১২][১৩]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "humanitarianism." WordNet 3.0. Princeton University. 2 June 2007[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  2. Pictet (1979) Humanity
  3. de Torrent (2004)
  4. Shringarpure, Bhakti (১৮ জুন ২০১৫)। "The rise of the digital saviour: can Facebook likes change the world?"। The Guardian। সংগ্রহের তারিখ ৬ জানুয়ারি ২০১৭ 
  5. "Crisis Mapping Pioneer Focuses On Humanitarian Uses For Drones"। NPR। সংগ্রহের তারিখ ৬ জানুয়ারি ২০১৭ 
  6. Meier, Patrick (২ জুলাই ২০১২)। "How Crisis Mapping Saved Lives in Haiti"। National Geographic Society (blogs)। ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৬ জানুয়ারি ২০১৭ 
  7. "Digital Humanitarianism"। World Bank Group। সংগ্রহের তারিখ ৬ জানুয়ারি ২০১৭ 
  8. Collins, Katie। "How AI, Twitter and digital volunteers are transforming humanitarian disaster response"। WIRED UK। সংগ্রহের তারিখ ৬ জানুয়ারি ২০১৭ 
  9. Illingworth, Sarah (৫ এপ্রিল ২০১৬)। "Is Digital Humanitarianism All Good?"। The Huffington Post। সংগ্রহের তারিখ ৬ জানুয়ারি ২০১৭ 
  10. Meier, Patrick (২০১৫)। Digital Humanitarians। New York: Routledge। পৃষ্ঠা 49। 
  11. Burns, Ryan (৯ অক্টোবর ২০১৪)। "Rethinking big data in digital humanitarianism: practices, epistemologies, and social relations" (PDF)GeoJournal80 (4): 477–490। doi:10.1007/s10708-014-9599-x। সংগ্রহের তারিখ ৬ জানুয়ারি ২০১৭ 
  12. Pink, Daniel H.। "The Book Stops Here"। WIRED। সংগ্রহের তারিখ ৬ জানুয়ারি ২০১৭ 
  13. Koerner, Brendan I.। The Best of Technology Writing 2006 (ইংরেজি ভাষায়)। University of Michigan Press। আইএসবিএন 0472031953। সংগ্রহের তারিখ ৬ জানুয়ারি ২০১৭