মজিদ খান শিক্ষা কমিশন, ১৯৮৩
মজিদ খান শিক্ষা কমিশন ছিল ১৯৮৩ সালে সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ-এর সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের উদ্দেশ্যে গঠিত একটি জাতীয় কমিশন।[১][২] তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা ড. আবদুল মজিদ খান-এর নেতৃত্বে এই কমিশন শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষার লক্ষ্য ও কাঠামো পুনর্গঠন এবং জাতীয় চাহিদার সাথে সংগতি রেখে আধুনিকীকরণে একাধিক প্রস্তাব ও সুপারিশ পেশ করে। কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৯৮৩ সালের "মজিদ খান শিক্ষানীতি" নামে একটি নতুন শিক্ষানীতি ঘোষণা করা হয়, যা পরে ব্যাপক বিতর্ক ও আন্দোলনের জন্ম দেয়।[৩][৪][৫][৬]
পটভূমি
[সম্পাদনা]১৯৭৫ সালের পর সামরিক শাসন চলাকালে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে বিভিন্ন ধরনের সংকট, যেমন মান-অবনতি, বৈষম্য, ও আধুনিক যুগের চাহিদার সঙ্গে অসামঞ্জস্যতার অভিযোগ উঠতে থাকে। এরশাদ সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে ড. আবদুল মজিদ খান-এর নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করে। কমিশনের উদ্দেশ্য ছিল দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা, মূল্যবোধ ও উন্নয়ন কৌশল অনুযায়ী শিক্ষা কাঠামো ঢেলে সাজানো।[৭][৮]
কমিশনের গঠন ও কাজ
[সম্পাদনা]কমিশনে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাবিদ, সরকারি কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কমিশন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে, পর্যালোচনা করে এবং বিভিন্ন স্তরের মানুষের মতামত নেয়। কমিশন ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বরে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করে।
প্রধান সুপারিশ ও বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য কিছু সুপারিশ ছিল—
- প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার কাঠামো পুনর্বিন্যাস: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মেয়াদ বাড়িয়ে ১২ বছর নির্ধারণের প্রস্তাব।
- ভাষা শিক্ষা: বাংলা ও আরবি ভাষা প্রথম শ্রেণি থেকে এবং ইংরেজি দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব।
- উচ্চশিক্ষায় আর্থিক অংশগ্রহণ: বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার খরচের ৫০% শিক্ষার্থীর নিজস্ব অর্থায়নে বহনের সুপারিশ, যাতে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়।
- ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব বৃদ্ধি: সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্তি এবং নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর।
- কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা বিস্তারের সুপারিশ।
- শিক্ষার উদ্দেশ্য নির্ধারণ: ব্যক্তিত্বের বিকাশ, দেশপ্রেম, এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে শিক্ষার লক্ষ্য সংযুক্তকরণ।[৯]
প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা
[সম্পাদনা]কমিশনের সুপারিশ ও প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি প্রকাশের পরপরই শিক্ষাবিদ, ছাত্রসমাজ এবং শিক্ষক সংগঠনের মধ্যে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকের মতে, এই শিক্ষানীতিতে শিক্ষার বৈষম্য, বাণিজ্যিকীকরণ ও ধর্মীয়ীকরণের ঝুঁকি ছিল, যা দেশের জনস্বার্থ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিপন্থী।[১০][১১] বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় অর্থনৈতিক সামর্থ্যকে প্রধান্য দেওয়া এবং ধর্মীয় বিষয়বস্তু বাড়ানোর সিদ্ধান্তগুলো সর্বাধিক বিতর্কের জন্ম দেয়।[৫][১২][১৩]
উত্তরাধিকার ও মূল্যায়ন
[সম্পাদনা]মজিদ খান শিক্ষা কমিশন বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ হলেও এর সুপারিশের ভিত্তিতে গৃহীত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং নীতিটি স্থগিত করা হয়।[১] এরপরও কমিশনের বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ পরবর্তী সময়ে শিক্ষা-নীতি সংশোধন ও উন্নয়নে বিবেচনা করা হয়েছে। এই কমিশনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের শিক্ষা-নীতি প্রণয়নে গণতান্ত্রিক আলোচনার গুরুত্ব এবং শিক্ষাব্যবস্থার সমতা ও সর্বজনীনতা রক্ষার বিষয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।[১৪][১৫]
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]গ্রন্থপঞ্জি
[সম্পাদনা]- হাসান, মাহফুজ (২০১৮)। বাংলাদেশের শিক্ষা আন্দোলন। ঢাকা: মুক্তধারা।
- Van Schendel, Willem (2009). A History of Bangladesh. Cambridge University Press.
- Kabir, B.M.M. (1999). Politics of Military Rule and the Dilemmas of Democratization in Bangladesh. New Delhi.
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 "শিক্ষা কমিশন - বাংলাপিডিয়া"। bn.banglapedia.org। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০২৫।
- ↑ [[official PDF link] Report of the Majid‑Khan Education Policy Formulation Committee] (প্রতিবেদন)। Ministry of Education, Bangladesh। ১৯৮৩। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০২৫।
{{প্রতিবেদন উদ্ধৃতি}}:|url=মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য) - ↑ "Majid Khan Education Policy"। Ministry of Education, Government of Bangladesh। ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৮২। সংগ্রহের তারিখ ৮ জুলাই ২০২৫।
- ↑ Maniruzzaman, T. (২০০৪)। Group Interest and Political Changes: Studies of Pakistan and Bangladesh। Dhaka University Press।
- 1 2 "Former Education Minister Majid Khan is no more"। The Daily Post (ইংরেজি ভাষায়)। ২৭ এপ্রিল ২০২৩। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০২৫।
- ↑ TBS Report (২৭ এপ্রিল ২০২৩)। "Former education minister Majeed Khan passes away"। The Business Standard (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০২৫।
- ↑ "In 1983, during a protest rally by students against the education policy of Dr. Majid Khan eight people were killed"। দ্য ডেইলি স্টার (ইংরেজি ভাষায়)। ২২ নভেম্বর ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০২৫।
- ↑ "বাংলাদেশের শিক্ষা কমিশন"। studypress.org (ইংরেজি ভাষায়)। ২৯ অক্টোবর ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১০ অক্টোবর ২০২২।
- ↑ "Majid Khan education policy proposed introduction of Arabic and English in primary curriculum"। ঢাকা ট্রিবিউন (ইংরেজি ভাষায়)। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১১। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০২৫।
- ↑ ""Feb 14: The day of resistance against autocracy""। ঢাকা ট্রিবিউন। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৪। সংগ্রহের তারিখ ৮ জুলাই ২০২৫।
- ↑ Suykens, Bert (২০১৮)। ""A Hundred Per Cent Good Man Cannot Do Politics": Violent Self‑Sacrifice, Student Authority, and Party‑State Integration in Bangladesh"। Modern Asian Studies। ৫২ (3): ৮৮৩–৯১৬।
- ↑ "Majid Khan education policy proposed the introduction of Arabic and English in the curriculum of the primary education"। ঢাকা ট্রিবিউন (ইংরেজি ভাষায়)। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১১। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০২৫।
- ↑ TBS Report (২৭ এপ্রিল ২০২৩)। "Former education minister Majeed Khan passes away"। The Business Standard (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০২৫।[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
- ↑ হাসান, মাহফুজ (২০১৮)। বাংলাদেশের শিক্ষা আন্দোলন। মুক্তধারা।
- ↑ "Dissent and the price of freedom"। দ্য ডেইলি স্টার (ইংরেজি ভাষায়)। ২২ নভেম্বর ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০২৫।