বিষয়বস্তুতে চলুন

মজিদ খান শিক্ষা কমিশন, ১৯৮৩

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

মজিদ খান শিক্ষা কমিশন ছিল ১৯৮৩ সালে সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ-এর সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের উদ্দেশ্যে গঠিত একটি জাতীয় কমিশন।[][] তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা ড. আবদুল মজিদ খান-এর নেতৃত্বে এই কমিশন শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষার লক্ষ্য ও কাঠামো পুনর্গঠন এবং জাতীয় চাহিদার সাথে সংগতি রেখে আধুনিকীকরণে একাধিক প্রস্তাব ও সুপারিশ পেশ করে। কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৯৮৩ সালের "মজিদ খান শিক্ষানীতি" নামে একটি নতুন শিক্ষানীতি ঘোষণা করা হয়, যা পরে ব্যাপক বিতর্ক ও আন্দোলনের জন্ম দেয়।[][][][]

পটভূমি

[সম্পাদনা]

১৯৭৫ সালের পর সামরিক শাসন চলাকালে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে বিভিন্ন ধরনের সংকট, যেমন মান-অবনতি, বৈষম্য, ও আধুনিক যুগের চাহিদার সঙ্গে অসামঞ্জস্যতার অভিযোগ উঠতে থাকে। এরশাদ সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে ড. আবদুল মজিদ খান-এর নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করে। কমিশনের উদ্দেশ্য ছিল দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা, মূল্যবোধ ও উন্নয়ন কৌশল অনুযায়ী শিক্ষা কাঠামো ঢেলে সাজানো।[][]

কমিশনের গঠন ও কাজ

[সম্পাদনা]

কমিশনে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাবিদ, সরকারি কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কমিশন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে, পর্যালোচনা করে এবং বিভিন্ন স্তরের মানুষের মতামত নেয়। কমিশন ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বরে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করে।

প্রধান সুপারিশ ও বৈশিষ্ট্য

[সম্পাদনা]

কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য কিছু সুপারিশ ছিল—

  • প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার কাঠামো পুনর্বিন্যাস: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মেয়াদ বাড়িয়ে ১২ বছর নির্ধারণের প্রস্তাব।
  • ভাষা শিক্ষা: বাংলা ও আরবি ভাষা প্রথম শ্রেণি থেকে এবং ইংরেজি দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব।
  • উচ্চশিক্ষায় আর্থিক অংশগ্রহণ: বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার খরচের ৫০% শিক্ষার্থীর নিজস্ব অর্থায়নে বহনের সুপারিশ, যাতে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়।
  • ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব বৃদ্ধি: সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্তি এবং নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর।
  • কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা বিস্তারের সুপারিশ।
  • শিক্ষার উদ্দেশ্য নির্ধারণ: ব্যক্তিত্বের বিকাশ, দেশপ্রেম, এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে শিক্ষার লক্ষ্য সংযুক্তকরণ।[]

প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা

[সম্পাদনা]

কমিশনের সুপারিশ ও প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি প্রকাশের পরপরই শিক্ষাবিদ, ছাত্রসমাজ এবং শিক্ষক সংগঠনের মধ্যে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকের মতে, এই শিক্ষানীতিতে শিক্ষার বৈষম্য, বাণিজ্যিকীকরণ ও ধর্মীয়ীকরণের ঝুঁকি ছিল, যা দেশের জনস্বার্থ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিপন্থী।[১০][১১] বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় অর্থনৈতিক সামর্থ্যকে প্রধান্য দেওয়া এবং ধর্মীয় বিষয়বস্তু বাড়ানোর সিদ্ধান্তগুলো সর্বাধিক বিতর্কের জন্ম দেয়।[][১২][১৩]

উত্তরাধিকার ও মূল্যায়ন

[সম্পাদনা]

মজিদ খান শিক্ষা কমিশন বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ হলেও এর সুপারিশের ভিত্তিতে গৃহীত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং নীতিটি স্থগিত করা হয়।[] এরপরও কমিশনের বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ পরবর্তী সময়ে শিক্ষা-নীতি সংশোধন ও উন্নয়নে বিবেচনা করা হয়েছে। এই কমিশনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের শিক্ষা-নীতি প্রণয়নে গণতান্ত্রিক আলোচনার গুরুত্ব এবং শিক্ষাব্যবস্থার সমতা ও সর্বজনীনতা রক্ষার বিষয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।[১৪][১৫]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

গ্রন্থপঞ্জি

[সম্পাদনা]
  • হাসান, মাহফুজ (২০১৮)। বাংলাদেশের শিক্ষা আন্দোলন। ঢাকা: মুক্তধারা।
  • Van Schendel, Willem (2009). A History of Bangladesh. Cambridge University Press.
  • Kabir, B.M.M. (1999). Politics of Military Rule and the Dilemmas of Democratization in Bangladesh. New Delhi.

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. 1 2 "শিক্ষা কমিশন - বাংলাপিডিয়া"bn.banglapedia.org। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০২৫
  2. [[official PDF link] Report of the Majid‑Khan Education Policy Formulation Committee] (প্রতিবেদন)। Ministry of Education, Bangladesh। ১৯৮৩। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০২৫ {{প্রতিবেদন উদ্ধৃতি}}: |url= মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য)
  3. "Majid Khan Education Policy"। Ministry of Education, Government of Bangladesh। ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৮২। সংগ্রহের তারিখ ৮ জুলাই ২০২৫
  4. Maniruzzaman, T. (২০০৪)। Group Interest and Political Changes: Studies of Pakistan and Bangladesh। Dhaka University Press।
  5. 1 2 "Former Education Minister Majid Khan is no more"The Daily Post (ইংরেজি ভাষায়)। ২৭ এপ্রিল ২০২৩। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০২৫
  6. TBS Report (২৭ এপ্রিল ২০২৩)। "Former education minister Majeed Khan passes away"The Business Standard (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০২৫
  7. "In 1983, during a protest rally by students against the education policy of Dr. Majid Khan eight people were killed"দ্য ডেইলি স্টার (ইংরেজি ভাষায়)। ২২ নভেম্বর ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০২৫
  8. "বাংলাদেশের শিক্ষা কমিশন"studypress.org (ইংরেজি ভাষায়)। ২৯ অক্টোবর ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১০ অক্টোবর ২০২২
  9. "Majid Khan education policy proposed introduction of Arabic and English in primary curriculum"ঢাকা ট্রিবিউন (ইংরেজি ভাষায়)। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১১। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০২৫
  10. ""Feb 14: The day of resistance against autocracy""ঢাকা ট্রিবিউন। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৪। সংগ্রহের তারিখ ৮ জুলাই ২০২৫
  11. Suykens, Bert (২০১৮)। ""A Hundred Per Cent Good Man Cannot Do Politics": Violent Self‑Sacrifice, Student Authority, and Party‑State Integration in Bangladesh"। Modern Asian Studies৫২ (3): ৮৮৩–৯১৬।
  12. "Majid Khan education policy proposed the introduction of Arabic and English in the curriculum of the primary education"ঢাকা ট্রিবিউন (ইংরেজি ভাষায়)। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১১। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০২৫
  13. TBS Report (২৭ এপ্রিল ২০২৩)। "Former education minister Majeed Khan passes away"The Business Standard (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০২৫[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  14. হাসান, মাহফুজ (২০১৮)। বাংলাদেশের শিক্ষা আন্দোলন। মুক্তধারা।
  15. "Dissent and the price of freedom"দ্য ডেইলি স্টার (ইংরেজি ভাষায়)। ২২ নভেম্বর ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০২৫