মইনুদ্দিন চিশতী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
খাজা মইনুদ্দিন চিশতী
معین الدین چشتی
Bichitr. Shaykh Mu'in al-Din Chishti Holding a Globe, detail of miniature from Minto Album, c. 1610-18, India, Chester Beatty Library, Dublin.jpg
ভারতের আজমেরে মইনুদ্দিন চিশতীর দরগাহ
অন্য নামআতায়ে রাসূল, খাজা গরিব নেওয়াজ, সুলতান উল হিন্দ, নুকতায়ে এশক ওয়া উলুম, আহলে সামা, বুরহানুল আশেকীন, সাহেবে নজরে কিমিয়া, শাম্মায়ে চিশতিয়া, সদরুল আউলিয়া, রওশন জমীর [১]
ব্যক্তিগত
জন্ম১১৩৮
মৃত্যু৬ রজব ১৫ মার্চ ১২৩৫(1235-03-15) (বয়স ৯৬–৯৭)
সমাধিস্থলআজমির শরীফ দরগাহ
ধর্মইসলাম
Flourishedইসলামী স্বর্ণযুগ
আখ্যাসুন্নি[২][৩]
ব্যবহারশাস্ত্রহানাফি
ধর্মীয় মতবিশ্বাসমাতুরিদি
তরিকাচিশতি
অন্য নামআতায়ে রাসূল, খাজা গরিব নেওয়াজ, সুলতান উল হিন্দ, নুকতায়ে এশক ওয়া উলুম, আহলে সামা, বুরহানুল আশেকীন, সাহেবে নজরে কিমিয়া, শাম্মায়ে চিশতিয়া, সদরুল আউলিয়া, রওশন জমীর [১]
মুসলিম নেতা
ভিত্তিকআজমের, উত্তর ভারত
কাজের মেয়াদদ্বাদশ শতাব্দীর শেষদিক ও ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমদিক
পূর্বসূরীউসমান হারুনী
উত্তরসূরীকুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী
পদসুফিবাদ

সুলতান-উল-হিন্দ, খাজা[৪] মইনুদ্দিন চিশতী (উর্দু/معین الدین چشتی) (ফার্সি: چشتی‎‎,উর্দু: چشتی‎‎ - Čištī) (আরবি: ششتى‎‎ - চিশতী) হলেন চিশতীয় ধারার ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত সুফি সাধক। তিনি ১১৩৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন ও ১২৩৫ সালে পরলোকগমন করেন। তিনি গরিবে নেওয়াজ (غریب نواز) নামেও পরিচিত। মইনুদ্দিন চিশতীই উপমহাদেশে প্রথম এই ধারা প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত করেন। তিনি ভারতে চিশতী ধারার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক ধারা বা সিলসিলা এমনভাবে পরিচিত করেন ;পরবর্তীতে তার অনুসারীরা যেমন, কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী, বাবা ফরিদ, নিজামুদ্দিন আউলিয়া সহ (প্রত্যেকে ক্রমানুযায়ী পূর্ববর্তীজনের শিষ্য) আরও অনেকে ভারতের ইতিহাসে সুফি ধারাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।[৫]"[৬]

প্রারম্ভিক জীবন ও নেপথ্য[সম্পাদনা]

ধারণা করা হয়, খাজা মইনুদ্দিন চিশতী ৫৩৭ হিজরী/১১৩৮ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব পারস্যের শকস্থান রাজ্যের চিশতীতে জন্মগ্রহণ করেন।[৭] তিনি পারস্যে বেড়ে উঠেন। পনেরো বছর বয়সে তার পিতা-মাতা মৃত্যুবরণ করেন। তার পিতার নাম গিয়াসউদ্দিন এবং মাতার নাম বিবি উম্মালওয়ারা (ওরফে বিবি মাহে-নূর), ছিলেন সৈয়দ বা মুহাম্মদ (দ.)-এর বংশধর, তার নাতি হাসান এবং হোসাইনের মাধ্যমে।[৮] তিনি তার পিতার কাছ থেকে একটি বাতচক্র (উইন্ডমিল) ও একটি ফলের বাগান উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেন। কিংবদন্তি অনুসারে, একদিন তিনি তার ফলবাগানে জল দিচ্ছিলেন তখন তার ফলবাগানে আসেন বিখ্যাত সুফি শেখ ইবরাহিম কুন্দুজী (কুন্দুজী নামটি জন্মস্থান কুন্দুজ থেকে এসেছে)। যুবক মইনুদ্দিন তটস্থ হয়ে যান এবং কুন্দুজীকে কিছু ফল দিয়ে আপ্যায়ন করেন। এর প্রতিদানস্বরূপ কুন্দুজী মইনুদ্দিনকে এক টুকরা রুটি দেন ও তা খেতে বলেন। এর পর তিনি তার সম্পত্তি এবং অন্যান্য জিনিসপত্র গরীবদের মাঝে বিতরণ করে দেন। এরপর তিনি বিশ্বের মায়া ত্যাগ করে জ্ঞানার্জন ও উচ্চ শিক্ষার জন্য বুখারার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।[৯]তিনি বুখারা এবং সমরকন্দের সেমিনারিতে ভর্তি হন এবং (সম্ভবত) মুহাম্মদ আল-বুখারি (মৃত্যু ৮৭০) এবং আবু মনসুর আল-মাতুরিদি (মৃত্যু ৯৪৪) এর মাজার পরিদর্শন করেন, যা ইসলামি বিশ্বের ব্যাপকভাবে সম্মানিত ব্যক্তিত্ব।

ইরাক ভ্রমণের সময়, নিশাপুর জেলায়, তিনি বিখ্যাত সুন্নি রহস্যবাদী খাজা উসমান-এর সাথে দেখা করেছিলেন, যিনি তাকে দীক্ষা দিয়েছিলেন।[৬]বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তার আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকের সাথে পরবর্তী অঞ্চল থেকে অঞ্চলে ভ্রমণে, মঈনুদ্দিন সেই সময়কালে তার নিজস্ব স্বাধীন আধ্যাত্মিক ভ্রমণও চালিয়ে যান।[৬] তার স্বাধীন বিচরণে মঈনুদ্দিন সেই যুগের অনেক উল্লেখযোগ্য সুন্নি রহস্যবাদীদের সাথে সাক্ষাৎ করেন, যার মধ্যে ছিলেন আবদুল কাদের জিলানী (মৃত্যু ১১৬৬) এবং নাজমুদ্দিন কুবরা (মৃত্যু ১২২১), পাশাপাশি নাজিব আল-দীন আবদ-আল-কাহির সোহরাওয়ার্দী, আবু সাঈদ তাবরিজি, এবং আবদ আল-ওয়াহিদ গজনবীও ছিলেন, যাদের সবাই সুন্নি ঐতিহ্যের সবচেয়ে সম্মানিত সুফি সাধক ছিলেন।[৬]

দক্ষিণ এশিয়ায়[সম্পাদনা]

ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে দক্ষিণ এশিয়ায় পৌঁছে মঈনুদ্দিন বিখ্যাত সুন্নি রহস্যবাদী এবং আইনজ্ঞ আলী হুজভিরি (মৃত্যু ১০৭২) এর মাজারে ধ্যান করার জন্য প্রথম লাহোরে যান।[৬]

সুফি দীক্ষা[সম্পাদনা]

খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী বোখারা থেকে নিশাপুরে আসেন। সেখানে চিশতীয়া তরীকার অপর প্রসিদ্ধ সুফি সাধক খাজা উসমান হারুনীর নিকট মুরীদ হন/শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তার সেবায় ২০ বছর একাগ্রভাবে নিয়োজিত ছিলেন। পরে উসমান হারুনী তাকে খিলাফত বা সুফি প্রতিনিধিত্ব প্রদান করেন।[৪]

ভ্রমণ[সম্পাদনা]

খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী বহু দেশ ভ্রমণ করেন। তৎকালীন বিভিন্ন জ্ঞানী, গুণী, পণ্ডিত, দার্শনিকসহ অসংখ্য সুফি সাধকের সাথে সাক্ষাত করেন বলে নানা গ্রন্থে তথ্য পাওয়া যায়। তিনি ইরাকের বাগদাদে আবদুল কাদির জিলানীর সাহচর্যে ৫৭ দিন অবস্থান করেন। তার জীবনীতে বর্ণিত আছে যে, এ সময় আব্দুল কাদির জিলানী তাকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন, ইরাকের দায়িত্ব শায়েক শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দীকে আর হিন্দুস্থানের দায়িত্ব আপনাকে দেওয়া হলো। তিনি আরব হতে ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান হয়ে প্রথমে লাহোর পরে দিল্লী হয়ে আজমিরে বসতি স্থাপন করেন।[১০]

ধর্ম প্রচার[সম্পাদনা]

খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারে কিংবদন্তিতুল্য একজন ঐতিহাসিক সুফি ব্যক্তিত্ব। তিনি স্বীয় পীর উসমান হারুনীর নির্দেশে ভারতে আগমন করে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং তারই মাধ্যমে বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করেন।[৪][১০] তার বিখ্যাত একটি গ্রন্থ হল "আনিসুল আরওয়াহ"।

আধ্যাত্মিক ধারা[সম্পাদনা]

  1. মুহাম্মদ
  2. আলী বিন আবি তালিব (মৃত্যু ৬৬১)
  3. হাসান আল-বসরী (মৃত্যু ৭২৮)
  4. আব্দুল ওয়াহিদ বিন যায়েদ (মৃত্যু ৭৮৬)
  5. আল-ফুযাইল বিন ʿইয়াদ (মৃত্যু ৮০৩)
  6. ইব্রাহিম ইবনে আদহাম আল-বলখী (মৃত্যু ৭৮৩)
  7. হুজাইফা আল-মার'শি (মৃত্যু ৮৯০)
  8. আবু হুবায়রা আল-বসরী (মৃত্যু ৯০০)
  9. খাজা মুমশাদ উলু আল দিনাওয়ারী (মৃত্যু ৯১১)
  10. আবু ইসহাক শামী (মৃত্যু ৯৪১)
  11. আবু আহমদ আবদাল চিশতি (মৃত্যু ৯৬৬)
  12. আবু মুহাম্মদ চিশতী (মৃত্যু ১০২০)
  13. আবু ইউসুফ ইবনে সামান মুহাম্মদ সামআন চিশতী (মৃত্যু ১০৬৭)
  14. মওদুদ চিশতী (মৃত্যু ১১৩৩)
  15. শরীফ জান্দানি (মৃত্যু ১২১৫)
  16. উসমান হারুনী (মৃত্যু ১২২০)

খেলাফত প্রদান[সম্পাদনা]

তিনি কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকীকে খিলাফতের দায়িত্ব অর্পণ[১০] করে সিলসিলার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী ৬৩৩ হিজরীর ৫ রজব দিবাগত রাত অর্থাৎ ৬ রজব সূর্যোদয়ের সময় ইনতিকাল করেন। তখন তার বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর। বড় ছেলে খাজা ফখরুদ্দীন চিশতী তার নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন। প্রতিবছর ১লা রজব হতে ৬ রজব পর্যন্ত আজমির শরীফে তার সমাধিস্থলে ওরস অনুষ্ঠিত হয়। নানা ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ হতে সমবেত হয়।[১১]

উপদেশ[সম্পাদনা]

→যে ব্যক্তি তরিকতের পথে চলতে চায় তার উচিৎ, প্রথম দুনিয়া ও দুনিয়ার সকল বস্তুকে ত্যাগ করে, তারপর নিজের নফসকে তিন তালাক দেয়, তারপর আহলে সুলুকের পথে পা রাখে। তা না হলে সব কিছুই মিথ্যা।

→মানুষ যখন আমিত্বের খোলস ত্যাগ করে তখন নিগুঢ়ভাবে চিন্তা করলে দেখবে প্রেম, প্রেমিক, প্রেমাষ্পদ সবই এক।

→আরিফের নিম্নতম স্তর হল সৃষ্টিজগতকে নিজের দু'আঙ্গুলের ফাঁকের মাঝে অবলোকন করা।

→যে ব্যাক্তি আল্লাহর প্রেমিক সে দুনিয়াদারীকে ঘৃণা করে। দুনিয়ার ঐশ্বর্য বন্ধুর প্রেম হতে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। যার মাঝে অর্থে মোহ আছে সে আল্লাহর প্রেমিক নয়।

→মৃত্যু বন্ধুর সাথে মিলনসেতু

[১২]

চিত্রশালা[সম্পাদনা]

খাজা মইনুদ্দীন চিশতীর মধ্যবয়সের একটি চিত্র

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

উদ্ধৃতি[সম্পাদনা]

  1. হজরত খাজা, মুঈনুদ্দিন চিশতী (রঃ)। আনিসুল আরওয়াহ বা রূহের বন্ধু। চিশতী, কফিলউদ্দিন আহমদ কর্তৃক অনূদিত। চিশতীয়া পাবলিকেশন্স। 
  2. Francesca Orsini and Katherine Butler Schofield, Telling and Texts: Music, Literature, and Performance in North India (Open Book Publishers, 2015), p. 463
  3. Arya, Gholam-Ali and Negahban, Farzin, "Chishtiyya", in: Encyclopaedia Islamica, Editors-in-Chief: Wilferd Madelung and, Farhad Daftary: "The followers of the Chishtiyya Order, which has the largest following among Sufi orders in the Indian subcontinent, are Ḥanafī Sunni Muslims."
  4. আবুলউলায়ী, ড. শাহ্ কাওসার মুস্তাফা চিশ্তী (২০১৩-০৫-১৭)। "সুলতানুল হিন্দ গরীবেনাওয়ায (রাহ.)-এরজীবনদর্শন"www.ittefaq.com.bd। দৈনিক ইত্তেফাক। ২০১৬-০৩-১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১১-০৮ 
  5. Bhakti poetry in medieval India By Neeti M. Sadarangani . Pg 60
  6. Nizami, K.A., "Čis̲h̲tī", in: Encyclopaedia of Islam, Second Edition, Edited by: P. Bearman, Th. Bianquis, C.E. Bosworth, E. van Donzel, W.P. Heinrichs.
  7. Official Dargah Sharif's website ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৪ আগস্ট ২০১১ তারিখে. Other accounts say that he was born in the city of Isfahān, in Iran.
  8. Shah Baba, Nawab Gudri, Muinul Arwahʾ (2009)
  9. "Embodiment of syncretic traditions- Mohammed Iqbal"। ৫ নভেম্বর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৬ ডিসেম্বর ২০১৩ 
  10. উফিয়াআনহু, মাওলানা সাইয়্যিদ আব্দুল্লাহ (২০১২-০৫-২৯)। "সুলতানুল হিন্দ, গরীবে নেওয়াজ, হাবীবুল্লাহ হযরত খাজা মঈনুদ্দীন হাসান চিশতী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ফাযায়িল-ফযীলত"দৈনিক আল ইহসান 
  11. উফিয়াআনহু, মাওলানা সাইয়্যিদ আব্দুল্লাহ (২০১৩-০৮-৩০)। "আজমির শরীফ দর্শন"বেঙ্গলীনিউজ টুয়েন্টিফোর ডট কম। ২০১৩-০৯-০১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  12. হজরত খাজা, মুঈনুদ্দিন চিশতী (রঃ)। আনিসুল আরওয়াহ বা রূহের বন্ধু। চিশতী, কফিলউদ্দিন আহমদ কর্তৃক অনূদিত। চিশতীয়া পাবলিকেশন্স। 

গ্রন্থপঞ্জি[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

উইকিমিডিয়া কমন্সে মইনুদ্দিন চিশতী সম্পর্কিত মিডিয়া দেখুন।