ব্যবহারকারী:Sarwar Faruqee

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

মাওলানা ইসমাইল আলম (রহঃ)

শাহ মুহাম্মদ আবুল আযীজ ইসমাইল আলী (রহঃ) ছিলেন কবি, সুবক্তা, স্বাধীনতা-সংগ্রামী এবং শক্তিমান ভাষাবিদ । তাঁর কাব্যনাম ইসমাইল আলম। সঠিক জন্মতারিখ পাওয়া না গেলেও ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দ-ই তার জন্মসাল হিসেবে প্রমাণিত । জন্মস্থান সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বাটইআইল গ্রামে । পিতা মাওলানা আব্দুর রহমান নকশবন্দী ছিলেন খ্যাতিমান সূফিপণ্ডিত । ইসমাইল আলম (রহঃ)-এর পূর্বপূরুষ শাহ তকীউদ্দীন ছিলেন সিলেট-বিজয়ী শাহজালাল (রহ.)-এর অন্যতম সফরসঙ্গী । শাহ তকিউদ্দিনের অধস্তন শাহ কামালউদ্দিন (রহঃ) যিনি ইসমাইল আলম-এর দাদা, সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে তিনি কানাইঘাটের বাটইআইল গ্রামে ইসলাম প্রচার করতে আসেন এবং এখানেই স্থায়ী বসতি গড়েন ।

বাল্যকালে পিতা আব্দুর রহমান কাদরীর কাছে প্রাথমিকের পাঠ সমাপ্তির পর ভর্তি হন তৎকালীন সিলেট তথা আসাম অঞ্চলের প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ফুলবাড়ি মাদ্রাসায় । সেখানে আব্দুল ওহয়াব চৌধুরী (রহঃ)-র মতো খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে তিনি আরবি-ফার্সিতে পাণ্ডিত্ত্ব অর্জন করেন । পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্যে ভর্তি হন কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসায় এবং শিক্ষা সমাপ্তির পাশাপাশি কাব্যে স্বীকৃতি স্বরূপ “বাংলার তুতা” উপাধি প্রাপ্ত হন ।

উর্দু ঐতিহাসিক আবদুল জলিল বিসমিল ‘সিলহেট মে উর্দু’ গ্রন্থে তার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- “গড়নে তিনি লম্বা, বাদামী রং ও লম্বাটে চেহারা ছিল । ঘন-লম্বাদাড়ি এবং লম্বাহাতের অধিকারী ছিলেন । চলাফেরার সময় নিচের দিকে দৃষ্টি রাখতেন । বেশির ভাগ সময় পায়জামা ও জোব্বা পরতেন । গোলটুপির উপর পাগড়ী বাঁধতেন, খুবই মেহমানদারী করতেন । ছোটবড় সকলের সাথে মিলেমিশে সুফিয়ানাভাবে কথা বলতেন এবং এতে কোন বংশীয়-মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রাখতেন না । ছিল ছোটছোট গোফ, সুন্দর চোখ, লাজুক চরিত্র । নিভৃতচারীতাকে পছন্দ করতেন । খোশ মেজাজের ওয়ায়েজ ও উচু মাপের বক্তা ছিলেন । সমসাময়িক খ্যাতিমান আলেমদের মধ্যে তিনি একজন, ছিলেন শক্তিমান ভাষাবিধ । ইসমাঈল আলম আরবী, ফার্সি, উর্দু ভাষায় চমৎকার বক্তব্য দিতেন, তার বক্তব্য ছিল শ্রুতিমধুর । ব্রিটিশবিরোধী খেলাফত আন্দোলনে ভুমিকা রাখেন এবং উজ্জীবনী অনেক সঙ্গিত রচনা করেন । তিনি দক্ষতার সাথে বিচারিক কাজ করতেন ।"

রচনাবলীঃ উর্দু এবং ফার্সিতে কবিতা লিখেছেন । তাঁর রচিত কেতাবের মধ্যে ‘দিওয়ানে আলম’ ব্যতিত আর কোনটিই পাওয়া যায় না । “দিওয়ানে আলম” প্রকাশ হয় : ১৩২৮হিজরি, ১৯১০খ্রিস্টাব্দ; কাইয়ুমী, ওয়াকিয়ী মহল্লা, টিকাপুর, জেলা: কানপুর, উত্তরপ্রদেশ, ভারত থেকে । গ্রন্থখানা সিলেট সরকারী আলীয়া মাদ্রাসা লাইব্রেরি ও কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট-এ সংরক্ষিত থাকায় আমাদের পর্যন্ত পৌঁছে । 'দেওয়ানে আলম' কাব্য ফারসি-উর্দুর অপূর্ব সমন্বয়ে মহানবী (সঃ)-এর সীরাত ও উচ্চাঙ্গের না’ত সমৃদ্ধ । দিওয়ানে আলম কাব্য তিনটি অধ্যায়ে বিভক্ত; প্রথমাংশে একটি হামদ ও বাকী সবই না’ত । দ্বিতীয়াংশে আহলে-বাইত ও সাহাবায়ে কেরামের প্রসংসা, বিষাদ সংগীত আর তৃতীয়াংশ গজল । তিনি ছিলেন সহজাত কবি । কবিতা লিখতে 'আলম' নাম ব্যবহার করতেন বলে পরবর্তীতে আলম নামেই অধিক পরিচিত হন । কলকাতা আলীয়ায় অধ্যয়নকালে মির্জা গালিবের কাব্যধারার প্রেমে পড়েন, ফলে তাঁর কাব্যে গালিবি ঢং প্রকাশ পায় । কাব্যে দক্ষতার স্বীকৃতি সরূপ কলকাতা আলীয়ার প্রিন্সিপাল আলেকজান্ডার হেমিল্টন হারলী মাওলানা ইসমাইল আলমকে ‘বাংলার তুতা’ উপাধিতে ভূষিত করেন । ইসমাঈলী কাব্যের পরিচয় পেতে দেওয়ানে আলম হতে একটি কাব্যানুবাদঃ “যখন রাব্বুল আলামীনের প্রশংসা করি সারা জাহানেই যেন শোরগুল সৃষ্টি হয় । হে জমিন-বিছানার কারিগর তুমিই উচু আরশ সৃষ্টিকারী । যে আপন নিয়তি আলোকময় করেছে; পদাঘাতে সে-ই অধীন করেছে তামাম জমিন ।

না’তের মাধ্যমে বাচিয়ে রাখে নাম সারা জাহান। তিনি রিযেকদাতা, তিনিই অগ্নিপুজা থেকে বাচিয়ে রাখেন। বাতাসে জটিলতা মুছে যায় ইহজগত কাউকে রাখে না । এখনই তাঁর ঘর জিয়ারত করব এমনই আমার মনের ইরাদা । উৎসর্গ হোক আলমের হৃদয় তাঁর রহমত সমূহের উপর তিনিই আমাদের শাহানশাহ । আলমের সকল প্রশংসা আল্লাহ, তাঁর সৌন্দর্যের স্থিতি আখেরি নবীর উপর॥"- দেওয়ানে আলম। বাংলাভাষী উর্দু কাব্য রচয়িতার মধ্যে সিলেট সরকারী আলীয়ার তৎকালীন শিক্ষক মাওলানা আনজব আলী ছিলেন অন্যতম। কবি আনজব আলী বলেন, "উর্দু কাব্যে আমার শিক্ষাগুরু 'দিওয়ানে আলম' রচয়িতা মাওলানা ইসমাইল আলম (রঃ)"।

খ্যাতিমান তার্কিক হিসেবে ইসমাইল আলম নিজেকে পরিচিত করেন। কলকাতায় এক পাদ্রী তাঁকে লক্ষ্য করে বলেন, “দেখ, আমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, কারণ আমাদের মধ্যে না আছে অনৈক্য না নিজেদের মধ্যে কোন ঝগড়াঝাটি, এমনকি বর্ণেও আমরা ফর্সা ৷ বিপরীতে, তোমাদের নিজেদের মধ্যে ফিৎনা-ফাসাদে ভরপুর৷” ইসমাইল আলমের জবাব ছিল, 'হ্যা, সৃষ্টির মধ্যে নিকৃষ্ট প্রাণী শূকর, তারা একইরকম, আর শ্রেষ্ঠপ্রাণী ঘোড়া বহুরঙ্গের- এমনকি যোদ্ধের ময়দানে একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়ে ৷' এমন জওয়াবে পাদ্রী লাজওয়াব হয়ে যান ।

ব্রিটিশবিরোধী খেলাফত আন্দোলনে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং উজ্জীবনী-সঙ্গিত রচনা করেন ৷ আন্দোলনের অংশ হিসেবে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে মার্চ কানাইঘাট মাদ্রাসা ময়দানে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ পুলিশ জনসভায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ক্রোধান্বিত জনতা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করলে পুলিশের গুলিতে ময়দানেই শাহাদাত লাভ করেন ছয়জন বীর স্বাধীনতা-সংগ্রামী। মাওলানা ইসমাইল আলম ছিলেন উক্ত জনসভা আয়োজকদের অন্যতম এবং ময়দানে সরাসরি লড়াইকারী ।

উঁচুমানের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছিলেন তিনি। তার ব্যক্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায় একটি বর্ণনা থেকে। সম-সময়ে বিভিন্ন স্থানে গ্রামে গ্রামে (স্থানীয় ভাষায় বলা হতো ঘোরয়-ঘোরয়) ঝগড়া লেগেই থাকতো ৷ তখন দুর-দুরান্ত হতে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হতো এ উদ্দেশ্যে যে, তিনি উপস্থিত হলে কেউ আর বেয়াদবি করবে না, এবং রক্তারক্তি এড়ানো সম্ভব হবে ৷ কিন্তু শেষ-বয়সে তিনি অন্ধ হয়ে যান এবং চলার শক্তি হারিয়ে ফেলেন, তখন লোকেরা তার লাটি নিয়ে দুই পক্ষের মাঝে রেখে দিত ৷ এমনও হয়েছে, প্রবল উত্তেজনাকর পরিস্তিতিতে বিবদমান দু'গ্রুপের মাধ্যখানে তার লাটি নিয়ে রেখে দেয়া হয়েছে- তখন লাটির সম্মানার্থে দু-পক্ষই বিবাদ থেকে নিজেদের নিবৃত রেখেছে ৷ এসব ঘটনা সমাজে তাঁর মর্যাদাই স্মরণ করায় ৷

মাওলানা ইসমাইল আলম (রহঃ) উচু পর্যায়ের ইলহামী-জ্ঞান অর্জন করেন । তিনি ছিলেন ফজলুর রহমান গঞ্জে মুরাদাবাদী (রঃ)-র বিশিষ্ট খলিফা ।

জীবনের শেষ তেরো বছর অন্ধ ছিলেন। ১৩৪৪ বাংলা, ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে নিভৃতচারী এ মনিষী ইন্তেকাল করেন । তার অছিওত পালনার্থে এবং মুরিদানের ভালবাসার দাবীতে নিজবাড়ী থেকে বিশ কিলোমিটার দূর সড়কেরবাজার (কানাইঘাট) সংলগ্ন ঈদগাহ-গোরস্তানে দাফন করা হয় ।

তথ্য সূত্রঃ- ১/ মাদ্রাসা-ই-আলীয়ার ইতিহাস, প্রকাশক: ইসলামিক ফাউণ্ডেশন ২/ নূরের ঝংকার- প্রকাশকাল ১৯৬০ইং, সিলেট। ৩/ সিলহেট মে উর্দু, লেখক: আব্দুল জলিল বিসলিম, করাচী। ৪/ জালালাবাদের ইতিকতা, দেওয়ান নুরুল আনোয়ার চৌধুরী, প্রকাশক: বাংলা একাডেমী, ঢাকা। ৫/ স্মৃতির পাতায় জালালাবাদ, লেখক: শহিদ চৌধুরী, প্রকাশক: জালালাবাদ ফোরাম, জাপান, ১৯৯৪। ৬/ হস্থলিখিত কিছু প্রাচীন ডায়েরী।