ব্যবহারকারী:Munna92/খেলাঘর

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

থাম্ব|একজন বাংলাদেশি বরেণ্য রাজনীতিবিদ, ভাষা সৈনিক, বিশিষ্ট আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষানুরাগী। মুহাম্মদ আয়েন উদ-দীন (জানুয়ারি ১, ১৯৩৭ - নভেম্বর ১৬, ২০০৬) ছিলেন একজন বাংলাদেশি বরেণ্য রাজনীতিবিদ, ভাষা সৈনিক, বিশিষ্ট আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষানুরাগী। মুহাম্মদ আয়েন উদ-দীন ১৯৩৭ সালের ১ জানুয়ারি রাজশাহী জেলার পবা উপজেলাধীন শ্যামপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

মুহাম্মদ আয়েন উদ-দীন পরিবারের ঐতিহ্য অনুযায়ী তিনি বাল্যাবস্থায় ইসলামী শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ১৯৫২ সালে রাজশাহী হাই মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সাথে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করেন। ১৯৬১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন শিক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি।

কর্মসংস্থান[সম্পাদনা]

১৯৬১ সালে রাজশাহী জেলা জজকোর্টে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি সুপ্রীম কোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। ত্রিশ বছরেরও অধিক কাল তিনি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের একজন স্বনামধন্য সিনিয়র এ্যাডভোকেট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার আচরণ সহকর্মী ও সাধারণ জনগণের সঙ্গে ছিল বিনয়নম্র। রাজনৈতিক মতভেদ সত্বেও সুপ্রীম কোর্ট বার এসোসিয়েশান তাকে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী ও আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার উপর ২০০৪ সালের ২১ আগষ্ট নিক্ষিপ্ত বর্বরোচিত বোমা হামলার তদন্ত কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেন।

সমাজকর্ম[সম্পাদনা]

মুহাম্মদ আয়েন উদ-দীন রাজশাহী সরকারি কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি উত্তরবঙ্গ আখচাষী সমিতি গঠন করেন (১৯৫৮-১৯৬৭) এবং তার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে আখচাষীদের দাবী দাওয়া নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই আন্দোলনের সুফল হিসেবে রাজশাহী সুগার মিল প্রতিষ্ঠিত হয়।

ছাত্রাবস্থায় তিনি নিজ গ্রামে একটি যুব সংগঠন গড়ে তোলেন (১৯৫১-১৯৫৭) এবং স্বল্পকালের মধ্যে 'চকবেলঘরিয়া চাষীক্লাব' (১৯৫২-১৯৫৭) নামে আরো একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করত: উভয় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন এবং এলাকার দারিদ্র পীড়িত জনগণের জন্য কাজ করেন। এই ক্লাব এলাকার গরীব মেধাবী ছাত্রদের বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করেন।

ভাষা আন্দোলন[সম্পাদনা]

১৯৫২ সালে সারা পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। মুহাম্মদ আয়েন উদ-দীন ছিলেন রাজশাহীতে এই আন্দোলনের অন্যতম নেতা। বিরতীহীন আন্দোলনের জন্য তাকে ও তার সতীর্থদের সরকার গ্রেফতার করা হয়।

রাজনীতি[সম্পাদনা]

মুহাম্মদ আয়েন উদ-দীন ছাত্র রাজনীতি শুরু করেছিলেন ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে। রাজশাহী জেলার সদর সাবডিভিশনের সভাপতি করা হয় তাকে। মত পার্থক্যের কারণে একসময় ছাত্র ইউনিয়ন ত্যাগ করে ছাত্র শক্তিতে যোগ দেন এবং সুপ্রীম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ফরমানুল্লাহ খান ও আনসার আলির সংস্পর্শে আসেন। এরা ছিলেন ছাত্র শক্তির কেন্দ্রীয় নেতা। নিরলস পরিশ্রম ও সততার কারণে তিনি রাজশাহী জেলা ছাত্র শক্তির সম্পাদক ও একই সাথে সাবেক পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র শক্তির যুগ্ম সম্পাদক (১৯৫২-১৯৫৮) নির্বাচিত হন।

১৯৬৩ সালে মুহাম্মদ আয়েন উদ-দীন মুসলিমলীগে যোগদান করেন। তিনি রাজশাহী জেলা মুসলিমলীগের সাধারণ সম্পাদক (১৯৬৩-১৯৭০) ও পরবর্তীকালে সভাপতি এবং পাকিস্তান মুসলিমলীগের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন (১৯৬৩-১৯৭০)। তিনি প্রথমে বাংলাদেশ মুসলিমলীগের নির্বাচিত প্রচার সম্পাদক ও ১৯৮৮ সালে ব্যালটের মাধ্যমে কাউন্সিলারদের সরাসরি ভোটে বাংলাদেশ মুসলিমলীগের মহাসিচব নির্বাচিত হন।

১৯৮৫ সাল থেকে কয়েক বছর তিনি বাংলাদেশ জমিয়তে আহলে হাদিসের সহসভাপতি হিসেবে কাজ করেন। পরে তিনি ঐ সংগঠন থেকে পদত্যাগ করেন।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন[সম্পাদনা]

১৯৬২ সালে নির্দলীয় ও সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান সংসদে রাজশাহী থেকে তিনি নির্বাচিত হন এবং নির্বাচনের পর তাকে কৃষি, বন, মৎস ও পশুসম্পদ বিভাগের পার্লামেন্টারী সেক্রেটারীর দায়িত্ব প্রদান করা হয়। ১৯৬৫ সালে তিনি রাজশাহী সদর থেকে পুনরায় তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পুনরায় কৃষি, বন, মৎস ও পশুসম্পদ বিভাগের পার্লামেন্টারী সেক্রেটারীর দায়িত্ব ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পালন করেন। ঐ সময় একজন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৬৬-৬৭ সালের বাজেট অধিবেশনে তিনি যে সুচিন্তিত ভাষণ দেন-তাতে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কৃষি ও কৃষকদের উন্নয়ন ব্যতীত কোন অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এর ফলে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার জনাব মাহতাব উদ্দীন সরকারের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেন যা পরবর্তীতে " অধিক খাদ্য ফলাও" অভিযানে পরিণত হয়।

এই সংসদেই তিনি যমুনা নদীর উপরে একটি সেতু নির্মাণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই সেতু নির্মাণের ফলে নদীর উভয় পার্শ্বের জনগণের চলাচল এ মালামাল পরিবহন সহজ, সুলভ ও দ্রুততর হবে।

মুহাম্মদ আয়েন উদ-দীন ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের নির্বাচনী এলাকা ৫৪ (রাজশাহী-৪) থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং সংসদে মুসলিমলীগ সংসদীয় দলনেতা হিসেবে তার দায়িত্ব কৃতিত্বের সাথে পালন করেন। স্বল্প সময়ে জাতীয় সংসদে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর- যার মধ্যে ছিল নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ - তার নীতি নির্ধারনী বক্তব্য সুধিমহলে ব্যাপক প্রশংসা লাখ করেন এবং একজন অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে তার দক্ষতা আবার প্রমাণিত হয়।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ[সম্পাদনা]

মুহাম্মদ আয়েন উদ-দীন ছিলেন বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ। বিশেষত: সংবিধানের সপ্তম সংশােধনীর উপর তার জ্ঞানগর্ভ ভাষণ দেশে বিদেশে সমাদৃত হয় এবং পুস্তক ও পত্র-পত্রিকায় এই ভাষণের রেফারেন্স উল্লেখ করা হয়। ১৯৮৭/৮৮ সালের বাজেট অধিবেশের বাজেটের উপর তার বক্তৃতা জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

শিক্ষানুরাগী[সম্পাদনা]

তিনি ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি। নারী শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করে তিনি ১৯৬২ সালে মেয়েদের জন্য রাজশাহী শহরে একটি পৃথক মহিলা কলেজ স্থাপন করেন এবং এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঐ কলেজের প্রভূত উন্নতি সাধন করেন। ----- এছাড়াও তিনি প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বানেশ্বর ডিগ্রী কলেজ (১৯৬৪-১৯৭০) ও আড়ানী ডিগ্রী কলেজ (১৯৬৫-১৯৭০) প্রতিষ্ঠা করেন। দরিদ্র ও কর্মজীবী জনগণের শিক্ষার জন্য তিনি রাজশাহী শহরে নৈশ হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন (১৯৬৪-১৯৭০)। রাজশাহী আইন কলেজেরও তিনি প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তাহিরপুর ডিগ্রী কলেজ প্রতিষ্ঠাতেও বিশেষ ভূমিকা রাখেন তিনি। তিনি এই কলেজের সদস্য (১৯৬৬-১৯৭০), রাজশাহী নৈশ কলেজেরও সদস্য ছিলেন (১৯৬৩-১৯৬৮)।

সাত বছর রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের তিনি সদস্য ছিলেন (১৯৬৩-১৯৬৯) এবং দীর্ঘ আট বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সদস্য (১৯৬৩-১৯৬৯) হিসেবে সুচারুভাবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজশাহীকে শিক্ষা নগরী হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মুহাম্মদ আয়েন উদ-দীনের ভূমিকা নি:সন্দেহে অনন্য। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ স্থাপনেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

১৯৮৬ সালে সরকার যে জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করেন, তিনি ছিলেন তার সদস্য। এই কমিশন সাফল্যজনকভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালন শেষে রাষ্ট্রপতির নিকট রিপোর্ট পেশ করেন।

বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব[সম্পাদনা]

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৮৭ সালে ভারতের দিল্লীতে অনুষ্ঠিত 'Global Parliamentarians Conference on Apartheid ' সম্মেলনে যোগদান করেন তিনি এবং বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়ে জোরালো ভাষণ দেন।

পারিবারিক জীবন[সম্পাদনা]

ব্যক্তিজীবনে তার স্ত্রী সরকারী কলেজের অধ্যাপক। তাদের দুই পুত্র এবং এক কন্যা সন্তান রয়েছে। তিনি পরিবার নিয়ে অত্যন্ত সহজ ও সুখী জীবন অতিবাহিত করেছেন।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

বিপুল প্রাণশক্তির এই মানুষটি ছিলেন অসম্ভব পরিশ্রমী। একই সঙ্গে এত ভিন্নধর্মী কাজ তিনি কিভাবে করতেন সেটা ভেবে তার আপনজনেরা বিস্মিত হত। বক্তা হিসেবেও তিনি ছিলেন অগ্নিবর্ষী। যে কোনো বিষয়ের উপর অনর্গল বক্তৃতা দিতে পারতেন তিনি। শেষ জীবনে তিনি ডায়াবেটিস ও কিডনী সংত্রান্ত জটিল রোগে ভূগছিলেন। ২০০৬ সালের ১৬ই নভেম্বর ২ রা অগ্রহায়ণ ১৪১৩ বঙ্গাব্দ, ২৩ শে শাওয়াল ১৪২৭ হিজরী বৃহস্পতিবার ঢাকা উত্তরার একটি ভাড়া বাসায় ফজরের আজানের সময় ভোর পাঁচটায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।