হাজী মুহাম্মদ নছীম
| সর্দার আবুল হোছাইনের 'বাঁ' (বাবা) হাজী মুহাম্মদ নছীম আলী খাঁন | |
|---|---|
| সর্দার, সমাজপতি, জমিদার | |
| জন্ম | ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দ টেকনাফ থানা, কক্সবাজার সাবডিভিশন, চট্টগ্রাম জেলা, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত |
| মৃত্যু | ১৯৭৮ (বয়স ৮৪–৮৫) টেকনাফ থানা, চট্টগ্রাম জেলা, বাংলাদেশ |
| সমাধি | |
| দাম্পত্য সঙ্গী | বিবি শামারুপ কণ্যা (আনু.১৯০২–১৯৯১) |
| বংশধর | সর্দার আবুল হোছাইনের 'বাঁ'র (বাবার) গোষ্ঠী
|
| পিতা | আকবর আলী খাঁন |
| মাতা | হাফসা সুলতান |
| ধর্ম | সুন্নি ইসলাম |
| পেশা | জমিদারি ও ব্যাবসা বাণিজ্য |
মুহাম্মদ নছীম (পূর্ণ নাম:- হাজী মুহাম্মদ নছীম আলী খাঁন জন্ম, আনু. ১৮৯৩-১৯৭৮ খ্রি) কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের একজন বিশিষ্ট ভূস্বামী ও সমাজপতি ছিলেন। একজন প্রভাবশালী এবং ধনবান ব্যক্তি হিসেবেও স্থানীয় জনগণের কাছে পরিচিত ছিলেন। ব্রিটিশ আমলের শেষভাগ হতে বাংলাদেশ স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় পর্যন্ত তার প্রভাব হ্নীলা'র আর্থ-সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে গভীর ছাপ রেখে যায়। হ্নীলা'র একাধিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হাজী মুহাম্মদ নছীম এবং তার উত্তরসূরীদের রাহেলিল্লা ওয়াক্ফ করা জমি রয়েছে। হাজী মুহাম্মদ নছীমের জীবনকর্ম ধর্মীয় শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান এবং সম্পদ বণ্টনের মাধ্যমে জনকল্যাণে নিবেদিত ছিল।
জীবনকাল ও পটভূমি
[সম্পাদনা]জন্ম ও পরিবার
[সম্পাদনা]বর্তমান হ্নীলা'র একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে ১৮৯৩ সালে হাজী মুহাম্মদ নছীম জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শৈশবে তিনি ধর্মীয় ও প্রথাগত শিক্ষায় বেড়ে ওঠেন। ইসলামি শিক্ষা ও প্রথাগত কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রা তাকে ছোটবেলা থেকেই ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্ববান করে তোলে। তার পুর্বপুরুষেরা চট্টগ্রামের সাতকানিয়া এলাকার ভূস্বামী বা জমিদার ছিলেন যারা ইংরেজদের মদদপুষ্ট চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদার নই বরং মোঘল আমলের জায়গীরদারি জমিদার ছিলেন। ইংরেজ কোম্পানী আমলের আগে চট্টগ্রামের অধিকাংশ মুসলিম জমিদার ছিলেন ১৬৬৬ সালে বাংলার নবাব শায়েস্তা খাঁনের পুত্র বুজুর্গ উমেদ খানের সাথে মগ জলদস্যুদের থেকে চট্টগ্রাম পুনরুদ্ধারে সৈনিক প্রধান হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের উত্তরসুরীরা। যাদেরকে বেতনের পরিবর্তে সীমান্ত এলাকার জায়গীর প্রদান করা হতো।
১৮৫৭ সালে ইংরেজ বিরোধী সিপাহী বিদ্রোহের সময় দেশীয় সিপাহীদের পরাজয় ঘটলে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য একাধিক মুসলিম জমিদারদের ন্যায় তাদের জমিদারিও দেশীয় সিপাহীদেরকে সাহায্যের অভিযোগ তুলে নানা ধরনের দোষ মামলা চাপিয়ে দিয়ে ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে নেই। যার কারণে মুহাম্মদ নছীমের তৃতীয়তম পুর্বপুরুষ মীর মুহাম্মেদ ফজর আলী খাঁন ঐ এলাকা ছেড়ে বর্তমান হ্নীলা'য় এসে বসতি স্থাপন করেন। মুহাম্মদ নছীমের পিতা আকবর আলী খাঁন একজন সম্মানিত ভূমিমালিক ছিলেন, যা পরবর্তীতে হাজী নছীমের সম্পদ ব্যবস্থাপনার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
জমিজমা
[সম্পাদনা]মুহাম্মদ নছীম পিতৃপুরুষদের নিকট পাওয়া জমি আর তার নিজ খরিদকৃত জমির দ্বরা জমিদারিত্ব চালিয়েছিলেন। বর্তমান হ্নীলা'র পশ্চিম সিকদার পাড়া ও লেচুয়াপ্রাং এলাকায় বিশাল কৃষি এবং পাহাড়ি এলাকা তার অধীনে ছিল। হ্নীলা'র "আবুল হোছাইনের বাঁ'R ঘোনা" নামক পাহাড়ি এলাকাটি এখনো তার পরিচয় বহন করে চলেছে। (স্থানীয় ভাষায় আবুল হোছাইনের "বা যা আবুল হোছাইনের বাবা হাজী মুহাম্মদ নছীমকে বোঝায়)। এই সমস্ত জমির অধিকাংশ মুহাম্মদ নছীম পিতার কাছ হতে উত্তারাধিকাসুত্রে প্রাপ্ত বাকিগুলো তার করিদকৃত। মুহাম্মদ নছীমের তৃতীয়তম পুর্বপুরুষ খাঁন ১৮৬০ সালের দিকে টেকনাফ এলাকার তৎকালীন মগ জমিদার চারিপ্রু চৌধুরী কাছ হতে ৩৬০ কানি জমি ক্রয় করেন এইসমস্ত জমি মূলত তারই অংশবিশেষ।
হাজী মুহাম্মদ নছীম জমিদার হিসেবে হ্নীলা'র পশ্চিম সিকদার পাড়া, লেচুয়াপ্রাং এলাকা ও আশেপাশের গ্রামে জমি ও কৃষির দেখাশোনা করতেন। জমিদারি জীবনকালে তিনি কৃষকদের সঙ্গে স্নেহশীল আচরণ করতেন এবং কৃষক-মজুরদের উন্নয়নে সহযোগিতা দিতেন। তিনি জমি ব্যবস্থাপনায় ন্যায্যতা বজায় রাখতেন এবং সাধারণ কৃষকদের কল্যাণকে গুরুত্ব দিতেন।
বাণিজ্যিক সম্পত্তি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড
[সম্পাদনা]হ্নীলা'র বাজারে ২ একরেরও বেশি সুপার মার্কেট ও গোডাউনের মালিকানা তার অর্থনৈতিক প্রভাবের সাক্ষ্য দেয়। নাফ নদীর মাছ তুলে শুঁটকি উৎপাদন আর হালচাষ (নিজ জমিদাররী) থেকে উৎপন্ন চাল মিয়ানমারের মংডু, আকিয়াবে রপ্তানি হতো।
স্মরণ ও অবদান
[সম্পাদনা]ধর্মীয় ও সামাজিক
[সম্পাদনা]তিনি এলাকায় ধর্মীয় ও সামাজিক কাজেও সক্রিয় ছিলেন। স্থানীয় মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে অবদান রেখেছেন। মুহাম্মদ নছীমের মৃত্যুর পর তার ইচ্ছানুসারে সন্তানেরা ১৯৮৩ সালে হ্নীলা বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠা এবং একইসাথে জমি এবং অর্থায়ন করেন, যা হ্নীলা'র মতো ব্যাস্ততম বাজারে দুর-দুরান্ত থেকে আসা মুসল্লীদের দুর্ভোগ কমায় এছাড়াও তার উত্তর-সুরীরা নিজ এলাকয় আরো দুটি মসজিদ, হেফজখানা এবং নুরানি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে, দক্ষিণ চট্টলার অন্যতম প্রাচীন কাওমিয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আল-জামেয়া দারুস্ সুন্নাহ'র নামে কৃষি জমি এবং হ্নীলা বাজারে হাজী নছীম মার্কেটের দক্ষিণ সংলগ্ন মাদ্রাসা মার্কেটের জমি ওয়াক্ফ করেন। তার উদ্যোগে কিছু রাস্তা, পুকুর ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে বলে স্থানীয়রা তাকে স্মরণ করে থাকে।
হাজী মুহাম্মদ নছীম ছিলেন সাদাসিধে, উদার, ন্যায়পরায়ণ ও ধর্মপ্রাণ মানুষ। জনগণ তাকে একজন অভিভাবকের মতো মানতো। তার নেতৃত্বে এলাকায় শান্তি ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয়। প্রতি মাসে গ্রামের গরিব মিসকিনদের মাঝে চাল বিতরণ এবং "চিন্ডি" (বৃহত্তর চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সেমাই) এর ব্যবস্থা করতেন। মুহাম্মদ নছীম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সমাজ পাকিস্তান আমলের শুরু থেকে ২০১০ এর দশক পর্যন্ত হ্নীলা এলাকার সমাজের মাঝে সবচেয়ে বড় এবং উল্লেখযোগ্য ছিল এই সমাজের সদস্য সংখ্যা ছিল ৫০০ টিরও অধিক পরিবার যেগুলো টেকনাফের দমদমিয়া থেকে উত্তরে হ্নীলা'র মৌলবরবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, যা 'সর্দার আবুল হোছাইনের বা'R সমাজ' নামে সর্বাধিক পরিচিত। একইভাবে হ্নীলা অঞ্চলে মুহাম্মদ নছীমের বংশদরদের সর্দার আবুল হোছাইনের বা'R (অর্থাৎ আবুল হোছাইন সর্দারের বাবার) গোষ্ঠী নামে অবহিত করা হয়ে থাকে।
ব্যক্তিগত জীবন
[সম্পাদনা]১৯২০ সালের দিকে হ্নীলা'র সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের মেয়ে শামারুপ কণ্যার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন,যিনি পরবর্তীতে বিবি শামারুপ নামে পরিচিত হন। তাদের চার ছেলে ও চার মেয়ে। চার সন্তান্দের প্রত্যেকে এলাকার প্রাধান ব্যক্তি হিসবে মুহাম্মদ নছীমের মৃত্যুর পর থেকে ২০১০-এর দশক পর্যন্ত সর্দারের দায়িত্ব চালিয়েছিল। তাদের মৃত্যুর পরবর্তী সময়েও এই সমাজের সর্দারি দায়িত্ব তাদের বংশধরদের উপর ন্যাস্ত রয়েছে।
মুহাম্মদ নছীমের চার সন্তানেরা হলেন ―
- সরদার আবুল হোছাইন (১ম সন্তান)
- সর্দার আবু শামাহ্ (২য় সন্তান)
- আবু কাশিম (৩য় সন্তান)
- আবুল মঞ্জুর সর্দার (৪র্থ সন্তান)
শেষ জীবন
[সম্পাদনা]জীবনের শেষ সময়ে তিনি তার জমিদারির দায়িত্ব কিছুটা সন্তানদের হাতে তুলে দেন। শেষ বয়সে শরীরে নানান সমস্যার সাথে চোখের সমস্যা এবং বয়সের ভারে দুর্বল হলেও স্থানীয় সমাজে তার প্রভাব এবং সমর্থন ছিল অটুট।