বৌদ্ধ সংকর সংস্কৃত ভাষা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

বৌদ্ধ সংকর সংস্কৃত ভাষা একটি আধুনিক ভাষাগত শ্রেণি যা বিভিন্ন ভারতীয় বৌদ্ধ সাহিত্য যেমন প্রজ্ঞাপারমিতার সূত্র প্রভৃতি নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়। এটিকে মধ্য ইন্দো-আর্য ভাষার অন্তর্ভুক্ত মনে করা হয়। কখনও এটিকে বৌদ্ধ সংস্কৃত বা মিশ্র সংস্কৃত বলা হয়ে থাকে।

উৎস[সম্পাদনা]

সংস্কৃত বৈয়াকরণ পাণিনি কর্তৃক খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতকে মূল সংস্কৃত হতে বৌদ্ধ সংকর সংস্কৃতের উদ্ভব হয়। প্রাচীন বৈদিক ভাষা সংস্কার করে পাণিনি যে ভাষাটি প্রমিত করেন তা “সংস্কৃত” নামে পরিচিত, এর অর্থ ‘সংস্কারকৃত’, ‘পূর্ণতাপ্রাপ্ত’, ‘একত্র’ এবং ‘নির্মিত’। এর আগে ব্রাহ্মণসমাজের ভাষায় বৌদ্ধ পাঠ সংরক্ষিত হতে জানা যায় না। গৌতম বুদ্ধ এর সময় এই ভাষার নির্দেশনাগুলো কেবল দ্বিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।[১] গৌতম বুদ্ধ বর্তমানে সংস্কৃত বলতে যে ভাষাটি বোঝায় তার সাথে পরিচিত হলেও তার পাঠগুলো প্রথমে আঞ্চলিক ভাষাতেই রক্ষিত হয়। একসময় তিনি তার পাঠগুলো বৈদিক ভাষায় রূপান্তরে নিষেধ করেন। তিনি বলেন এটা করা হবে বোকামি কেননা বৈদিক ভাষা সাবেকী এবং অপ্রচলিত।[২] পাণিনির কাজের পর ভারতে সাহিত্য এবং দর্শনের প্রধানতম ভাষা হয়ে ওঠে সংস্কৃতবৌদ্ধ ভিক্ষুগণ ভাষাটি কিছুটা গ্রহণ করেন এবং বাকিটা পূর্ব মৌখিক প্রাকৃত ভাষার ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত রূপের প্রভাবান্বিত ছিল।[৩] যদিও এ ভাষার সাথে পালি ভাষার সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে তবু এটা নিশ্চিত যে পালি ভাষার সাথে এর সম্পর্ক সংস্কৃতের চেয়ে বেশি। [৪][৫][৬]

কে. আর. নরম্যান এর মতানুযায়ী পালিকে বৌদ্ধ সংকর সংস্কৃত ভাষার একটি রূপ মনে করা যায়।[৭] ফ্রাঙ্কলিন এডগারটন বলেন পালি ভাষার সারমর্ম হল প্রাকৃত[৩]

সংস্কৃত এবং পালির সাথে সম্পর্ক[সম্পাদনা]

বহুক্ষেত্রে বৌদ্ধ সংকর সংস্কৃত ভাষা, সংস্কৃতের সাথে মেলে না বরং এটি পালি ভাষার কাছাকাছি বা অনুরূপ। [৮] পালি বা অন্যান্য ভাষার অনুবাদে নয়, এ ভাষার কাজগুলো মৌলিকভাবে এ ভাষাতেই রচিত হয়েছিল। মহাসাংঘিক বিদ্যাপীঠ এবং অন্যান্য প্রাচীন কাজগুলোয় একপ্রকার মিশ্র সংস্কৃত ব্যবহৃত হত যেখানে প্রাকৃত ভাষাকে আংশিক সংস্কৃতে রূপায়ন করা হয়েছিল। ধ্বনিতত্ত্বগত দিকগুলো সংস্কৃতে পরিবর্তিত হয়েছিল তবে প্রাকৃত ব্যাকরণ অক্ষুণ্ন ছিল। যেমন ভিক্ষু শব্দের প্রাকৃত একবচন ভিক্ষুসা, সংস্কৃত ভিক্ষো তে পরিবর্তিত হয় নি বরং ভিক্ষুস্য তে পরিণত হয়।[৯] এই নামটির ব্যবহার এবং সংজ্ঞা ফ্রাঙ্কলিন এডগারটনের কাজ থেকে বেশি পাওয়া যায়। অধুনা বিশ্বে বৌদ্ধ সংকর সংস্কৃত ভাষাটি বৌদ্ধ পাঠ এবং ইন্দো আর্য ভাষাসমূহের আলোচনায় চর্চা করা হয়। পালি এবং শুদ্ধ সংস্কৃতের তুলনায় বৌদ্ধ সংকর সংস্কৃতের চর্চা কম হয়েছে; কিছুটা এতে প্রাপ্ত রচনার সংখ্যা কম বলে এবং কিছুটা কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ভাষাটিকে সংস্কৃত হতে দূরবর্তী একটি স্বতন্ত্র ভাষা মনে করেন না বলে। এডগারটন বলেন একজন বৌদ্ধ সংকর সংস্কৃত ভাষার পাঠক “কদাচিৎ কোন শব্দ বা অভিব্যক্তি দেখতে পাবেন যা ব্যাকরণসম্মত নয় অথবা ব্যাকরণমতে অশুদ্ধ। যেমন মহাকব্যিক সংস্কৃত যা পাণিনির ধরাবাঁধা নিয়ম মেনে চলে না। তথাপি প্রতিটি অনুচ্ছেদ এমন শব্দ বা প্রকাশভঙ্গি বহন করে যা অতীতে আপত্তিজনক ছিল না........... যা বৌদ্ধ নন এমন কোন ব্যক্তি কখনও ব্যবহার করতেন না।”[১০]

এডগারটন বলেন সংস্কৃতে লেখা বৌদ্ধপাঠগুলো, অন্তত একটি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত, একটি চলন্ত ও সুপ্রশস্ত একক ভাষাগত ঐতিহ্য বহন করে। এই কাজগুলোর ভাষা, ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃত হতে আলাদা এবং তা যেন শেষপর্যন্ত একটি অর্ধসংস্কৃতায়নকৃত শাস্ত্রীয় প্রাকৃত। বৌদ্ধ সংকর সংস্কৃতের বিচিত্র বৌদ্ধ শব্দমালা, শুদ্ধ সংস্কৃত হতে এর স্বতন্ত্রতার একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন(এডগারটন আরও কিছু নিদর্শন খুঁজে পেয়েছেন)। [১১] ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃত ব্যবহারকারী বৌদ্ধ লেখকের সংখ্যা ছিল খুব কম। এই দলটি গঠিত হয়েছিল তাদের দ্বারা যারা বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণের পূর্বে কৈশোরে সনাতন ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃত অধ্যয়ন করেছিলেন যেমন অশ্বঘোষ[৩]

অনেক সংস্কৃত শব্দ বা শব্দের বিশিষ্টার্থে প্রয়োগ কেবল বৌদ্ধ রচনায় পাওয়া যায়। পালি ভাষাতেও এমন বহু শব্দ দেখা যায়। এডগারটনের মতে এসব শব্দের অধিকাংশই শাস্ত্রীয় বৌদ্ধ প্রাকৃত হতে আগত।[১২]

বৌদ্ধ সাহিত্যে শুদ্ধ সংস্কৃত চর্চা[সম্পাদনা]

বৌদ্ধদের ব্যবহৃত সব সংস্কৃত পাঠ সংকর অবস্থায় ছিল না, কিছু অনুবাদ (যেমন সর্বাস্তিবদ) বিশুদ্ধ সংস্কৃতে ছিল। পরবর্তী কিছু কাজ সরাসরি সংস্কৃতে করা হয়েছিল এবং শুদ্ধ সংস্কৃত অপেক্ষা কিছু সহজ ভাষায় করা হয়েছিল যেমন বুদ্ধচরিত কাব্য।[৯]

তুলনীয়[সম্পাদনা]

বৌদ্ধ পাঠের অনুবাদের বিচিত্র ধারার ভাষায় ‘বৌদ্ধ সংকর চীনা ভাষা[১৩] এবং ‘বৌদ্ধ সংকর ইংরেজি[১৪] এই নাম দুটিও ব্যবহৃত হয়েছে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Hazra, Kanai Lal. Pāli Language and Literature; a systematic survey and historical study. D.K. Printworld Ltd., New Delhi, 1994, page 12.
  2. Hazra, page 5.
  3. Edgerton, Franklin. The Prakrit Underlying Buddhistic Hybrid Sanskrit. Bulletin of the School of Oriental Studies, University of London, Vol. 8, No. 2/3, page 503.
  4. Edgerton, Franklin. The Prakrit Underlying Buddhistic Hybrid Sanskrit. Bulletin of the School of Oriental Studies, University of London, Vol. 8, No. 2/3, page 502. "Pāli is itself a middle-Indic dialect, and so resembles the protocanonical Prakrit in phonology and morphology much more closely than Sanskrit."
  5. Students' Britannica India। Popular Prakashan। ২০০০। পৃষ্ঠা 145–। আইএসবিএন 978-0-85229-760-5 
  6. Hazra, pages 15, 19, 20.
  7. Jagajjyoti, Buddha Jayanti Annual, 1984, page 4, reprinted in K. R. Norman, Collected Papers, volume III, 1992, Pāli Text Society, page 37
  8. Edgerton, Franklin. The Prakrit Underlying Buddhistic Hybrid Sanskrit. Bulletin of the School of Oriental Studies, University of London, Vol. 8, No. 2/3, page 502.
  9. T. Burrow (১৯৬৫), The Sanskrit language, পৃষ্ঠা 61, আইএসবিএন 978-81-208-1767-8 
  10. Edgerton, Franklin. The Prakrit Underlying Buddhistic Hybrid Sanskrit. Bulletin of the School of Oriental Studies, University of London, Vol. 8, No. 2/3, page 503. Available on JSTOR here.
  11. Edgerton, Franklin. The Prakrit Underlying Buddhistic Hybrid Sanskrit. Bulletin of the School of Oriental Studies, University of London, Vol. 8, No. 2/3, pages 503-505.
  12. Edgerton, Franklin. The Prakrit Underlying Buddhistic Hybrid Sanskrit. Bulletin of the School of Oriental Studies, University of London, Vol. 8, No. 2/3, page 504.
  13. Macmillan Encyclopedia of Buddhism (Volume One), page 154
  14. Paul J. Griffiths, Journal of the Pāli Text Society, Volume XXIX, page 102

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]