বোম্যান'স ক্যাপসুল
বোম্যান'স ক্যাপসুল (Bowman's capsule), ক্যাপসুলা গ্লোমেরুলি বা গ্লোমেরুলার ক্যাপসুল হলো স্তন্যপায়ী প্রাণীর বৃক্কের (কিডনি) নেফ্রনের নলাকার অংশের শুরুতে অবস্থিত একটি পেয়ালা বা কাপ-সদৃশ থলি। এটি প্রস্রাব তৈরির জন্য রক্ত পরিস্রাবণের (ফিল্ট্রেশন) প্রথম ধাপটি সম্পন্ন করে। এই থলির ভেতরে একটি গ্লোমেরুলাস আবৃত থাকে। গ্লোমেরুলাসের রক্ত থেকে পরিশ্রুত তরল বোম্যান'স ক্যাপসুলে এসে জমা হয়।
গঠন
[সম্পাদনা]ক্যাপসুলের বাইরের দিকে দুটি "মেরু" (pole) রয়েছে:
- ভাস্কুলার মেরু (পোলাস ভাস্কুলারিস): এটি ক্যাপসুলের সেই দিক, যেখানে অ্যাফারেন্ট আর্টেরিওল এবং ইফারেন্ট আর্টেরিওল অবস্থান করে।
- মূত্র মেরু (পোলাস ইউরিনারিয়াস): এটি ক্যাপসুলের সেই দিক, যেখানে প্রক্সিমাল কনভলুটেড টিউবুল যুক্ত থাকে।
ক্যাপসুলের ভেতরের স্তরগুলো বাইরে থেকে ভেতরের দিকে নিম্নরূপ:[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]
- প্যারাইটাল স্তর: এটি এক স্তরবিশিষ্ট সরল স্কোয়ামাস এপিথেলিয়াম দিয়ে গঠিত। এটি পরিস্রাবণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় না।
- বোম্যান'স স্পেস বা বোম্যানের স্থান (বা "মূত্র স্থান", বা "ক্যাপসুলার স্পেস"): এটি ভিসারাল ও প্যারাইটাল স্তরের মধ্যবর্তী খালি স্থান। পরিস্রাবণ স্লিট অতিক্রম করার পর পরিশ্রুত তরল বা ফিল্ট্রেট এখানে প্রবেশ করে।
- ভিসারাল স্তর: এটি পুরু গ্লোমেরুলার বেসমেন্ট মেমব্রেনের ঠিক ওপরে অবস্থিত এবং পডোসাইট কোষ দ্বারা গঠিত। ভিসারাল স্তরের নিচে গ্লোমেরুলার কৈশিক জালিকা বা ক্যাপিলারিগুলো অবস্থান করে।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]
- পরিস্রাবণ বাধা (ফিল্ট্রেশন ব্যারিয়ার): এই বাধাটি গ্লোমেরুলার ক্যাপিলারির ফেনেস্ট্রেটেড (ছিদ্রযুক্ত) এন্ডোথেলিয়াম, এন্ডোথেলিয়াল কোষ ও পডোসাইটের ফিউজড বেসাল লামিনা এবং পডোসাইটের পরিস্রাবণ স্লিট নিয়ে গঠিত। এই বাধাটি রক্তপ্রবাহ থেকে বোম্যানের স্থানে পানি, আয়ন এবং ক্ষুদ্র অণু প্রবেশ করতে দেয়। তবে এটি বড় এবং ঋণাত্মক চার্জযুক্ত প্রোটিনের (যেমন অ্যালবুমিন) প্রবেশ রোধ করে। পরিস্রাবণ বাধার বেসাল লামিনা তিনটি স্তর নিয়ে গঠিত। প্রথম স্তরটি হলো 'লামিনা রারা এক্সটার্না', যা পডোসাইটের প্রবর্ধনগুলোর সাথে সংলগ্ন থাকে। দ্বিতীয় স্তরটি হলো 'লামিনা রারা ইন্টার্না', যা এন্ডোথেলিয়াল কোষের সাথে সংলগ্ন থাকে। শেষ স্তরটি হলো 'লামিনা ডেনসা', যা বেসাল লামিনার একটি অন্ধকার কেন্দ্রীয় অঞ্চল। এটি টাইপ IV কোলাজেন এবং ল্যামিনিনের জালিকা দিয়ে গঠিত, যা একটি নির্বাচনী ম্যাক্রোমোলিকুলার ফিল্টার হিসেবে কাজ করে।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]
কাজ
[সম্পাদনা]বোম্যান'স ক্যাপসুলে রক্ত পরিস্রাবণ প্রক্রিয়াটি আল্ট্রাফিল্টারেশন (বা গ্লোমেরুলার ফিল্টারেশন) নামে পরিচিত। স্বাভাবিক অবস্থায় এই পরিস্রাবণের হার প্রতি মিনিটে ১২৫ মিলিলিটার (১২৫ মিলি/মিনিট), যা দৈনিক মোট রক্তের পরিমাণের প্রায় ৮০ গুণের সমান। গ্লোমেরুলাসসহ বোম্যান'স ক্যাপসুল হলো রক্ত পরিস্রাবণের প্রধান স্থান।
প্রায় ৩০ কিলোডালটনের কম ওজনের যেকোনো প্রোটিন এই ঝিল্লির মধ্য দিয়ে অবাধে পার হতে পারে। তবে বেসমেন্ট মেমব্রেন এবং পডোসাইটের ঋণাত্মক চার্জের কারণে ঋণাত্মক চার্জযুক্ত অণুগুলোর পার হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বাধা থাকে।
পানি, গ্লুকোজ, লবণ (NaCl), অ্যামিনো অ্যাসিড এবং ইউরিয়ার মতো যেকোনো ক্ষুদ্র অণু বোম্যান'স স্পেসে অবাধে প্রবেশ করতে পারে। তবে রক্তকণিকা, প্লেটলেট এবং বড় আকারের প্রোটিনগুলো এর মধ্য দিয়ে যেতে পারে না।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]
এর ফলে, বোম্যান'স ক্যাপসুল থেকে বের হওয়া পরিশ্রুত তরল বা ফিল্ট্রেট যখন প্রক্সিমাল কনভোলিউটেড টিউবুলে প্রবেশ করে, তখন তার গঠন রক্তের প্লাজমার সাথে অনেকটাই মিলে যায়। মূলত প্লাজমা প্রোটিন ছাড়া রক্তের প্লাজমার বাকি সব উপাদানই এই ফিল্ট্রেটে উপস্থিত থাকে।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]
চিকিৎসাগত গুরুত্ব
[সম্পাদনা]
গ্লোমেরুলার পরিস্রাবণ হার (জিএফআর) পরিমাপ করা কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষার একটি অন্যতম ডায়াগনস্টিক পদ্ধতি।[২]
জিএফআর কমে যাওয়া কিডনি বিকল বা অকার্যকর হওয়ার লক্ষণ হতে পারে।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]
এমন অনেক রোগ রয়েছে যা গ্লোমেরুলাসের ক্ষতি করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ: একিউট প্রোলিফারেটিভ (এন্ডোক্যাপিলারি) গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস, মেসাঞ্জিওপ্রোলিফারেটিভ গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস, মেসাঞ্জিওক্যাপিলারি (মেমব্রানোপ্রোলিফারেটিভ) গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস, একিউট ক্রেসেন্টিক গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস, ফোকাল সেগমেন্টাল গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস এবং ডায়াবেটিক গ্লোমেরুলোস্ক্লেরোসিস।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]
ইতিহাস
[সম্পাদনা]ব্রিটিশ সার্জন ও শারীরস্থানবিদ স্যার উইলিয়াম বোম্যানের (১৮১৬–১৮৯২) নামানুসারে বোম্যান'স ক্যাপসুলের নামকরণ করা হয়েছে। [৩] তবে বোম্যানের অনেক আগেই, ১৭৮২ সালে রুশ সাম্রাজ্যের একজন ইউক্রেনীয় সার্জন ও শারীরস্থানবিদ অধ্যাপক আলেকজান্ডার শুমলানস্কি (১৭৪৮–১৭৯৫) তাঁর ডক্টরাল থিসিস "ডি স্ট্রাকচুরা রেনুম" (ল্যাটিন ভাষায় যার অর্থ "কিডনির গঠন সম্পর্কে")-এ প্রথম কিডনির অণুবীক্ষণিক গঠন বর্ণনা করেন, যার মধ্যে নেফ্রনের এই ক্যাপসুলটিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। [৪]
গ্লোমেরুলাসের সাথে একত্রে এটিকে রেনাল কর্পাসকল বা মালপিঘিয়ান কর্পাসকল বলা হয়। ইতালীয় চিকিৎসক ও জীববিজ্ঞানী মার্সেলো মালপিঘির (১৬২৮–১৬৯৪) নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছিল। তবে প্লীহার (Spleen) মালপিঘিয়ান বডির সাথে বিভ্রান্তি এড়াতে বর্তমানে এই নামটি আর ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় না।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]- মেসেঞ্জিয়াম
- গ্লোমেরুলাস (কিডনি)
- রক্ত-মস্তিষ্কের বাধা
- প্রাপ্তবয়স্ক মানবদেহে স্বতন্ত্র কোষের প্রকারের তালিকা
অতিরিক্ত চিত্র
[সম্পাদনা]- গ্লোমেরুলাস।
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Table 4 in: Hodgin, Jeffrey B.; Bitzer, Markus (২০১৫)। "Glomerular Aging and Focal Global Glomerulosclerosis: A Podometric Perspective": ৩১৬২–৩১৭৮। ডিওআই:10.1681/ASN.2014080752। আইএসএসএন 1046-6673। পিএমসি 4657829। পিএমআইডি 26038526।
{{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি journal এর জন্য|journal=প্রয়োজন (সাহায্য) - ↑ Romagnani, Paola; Anders, Hans-Joachim (২০১৯)। "Excretory System"। Oxford Handbook of Evolutionary Medicine। Oxford University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০১৯৮৭৮৯৬৬৬।
- ↑ Bowman, William; Royal Society of London. Philosophical transactions, v. 32, p. 57-80, 1842 (১৮৪২)। On the structure and use of the Malpighian bodies of the kidney: with observations on the circulation through that gland (ইংরেজি ভাষায়)। Taylor। ওসিএলসি 7714131।
{{বই উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: একাধিক নাম: লেখকগণের তালিকা (লিঙ্ক) উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: সাংখ্যিক নাম: লেখকগণের তালিকা (লিঙ্ক) - ↑ Schumlansky, Aleksander (১৭৮২)। Dissertatio Inauguralis Anatomica De Structura Renum Quam Pro Licentia Summos In Medicina Honores Et Privilegia Doctoralia Legitime Obtিনেন্দি ইন ইনক্লিতা আর্জেন্তোরাতেন্সিউম উনিভের্সিতাতে সোলেল্নি এরুদিতোরাম এক্সামিনি সাবমিট্টিত আলেকজান্ডার শুমলানস্কি পোলতাও-রুসাস দিয়ে ১৬. নভেমেব্র. এ. এমডিসিসিএলএক্সএক্সক্সআইআই. (লাতিন ভাষায়)। পৃ. ৯২।
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]- Histology image: 16006loa – Histology Learning System at Boston University
- Diagram at ircc.edu