বোম্বেটে জাহাজ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
বোম্বেটে জাহাজ
(Le Secret de la Licorne)
তারিখ ১৯৪৩
সিরিজ দুঃসাহসী টিন‌টিন
প্রকাশক ক্যাস্টরম্যান
সৃজনশীল দল
উদ্ভাবকরা এর্জে
মূল প্রকাশনা
প্রকাশিত হয়েছিল লে সয়ার জেনেস
প্রকাশনার তারিখ ১১ই জুন, ১৯৪২ – ১৪ই জানুয়ারি, ১৯৪৩
ভাষা ফরাসি
আইএসবিএন 2-203-00110-0
অনুবাদ
প্রকাশক আনন্দ পাবলিশার্স
তারিখ ১৯৯৫
অনুবাদক নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
কালপঞ্জি
পূর্ববর্তী আশ্চর্য উল্কা, (১৯৪২)
পরবর্তী লাল বোম্বেটের গুপ্তধন, (১৯৪৪)

বোম্বেটে জাহাজ (ফরাসি: Le Secret de la Licorne) বেলজীয় কার্টুনিস্ট হার্জের দুঃসাহসী টিন‌টিন সিরিজের এগারোতম কমিক বই। বেলজিয়ামের ফরাসিভাষি দৈনিক লে সয়ার-এ ধারাবাহিকভাবে এটি প্রকাশিত হয় ১৯৪২ এর জুন থেকে ১৯৪৩ এর জানুয়ারি পর্যন্ত; যখন বেলজিয়াম দখলে নিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাজি সৈন্যরা।

কমিকসের মূল চরিত্র টিনটিন, কুট্টুস আর ক্যাপ্টেন হ্যাডক ও তার এক পূর্বপুরুষ স্যার ফ্রান্সিস হ্যাডকের রেখে যাওয়ার ধাঁধা নিয়েই কাহিনী আবর্তিত হয়। ধাঁধার সমাধান করে লাল বোম্বেটের গুপ্তধন পেতে তাদের প্রয়োজন ইউনিকর্ন জাহাজের তিনটি মডেল। কিন্তু সেগুলো পাওয়ার জন্য অপরাধীরাও মরিয়া হয়ে ওঠে আর এজন্য তারা কাউকে খুন করতেও দ্বিধা করে না।

বোম্বেটে জাহাজ ব্যবসায়িকভাবে বিরাট সাফল্য লাভ করে। পত্রিকায় প্রকাশের অনতিকাল পরেই কাস্টরম্যান এটি গ্রন্থাকারে ছাপে। এটির পরবর্তী কমিক লাল বোম্বেটের গুপ্তধন এই অভিযানেরই অংশ যাতে টিনটিন, কুট্টুস আর ক্যাপ্টেন হ্যাডক রওনা হয় সমুদ্রের বুকে, গুপ্তধনের খোঁজে। তিব্বতে টিনটিন (১৯৬০) লেখার পূর্বে বোম্বেটে জাহাজ ছিল হার্জের নিজের প্রিয় সৃষ্টি। পরবর্তীতে এর গল্প অবলম্বনে তিনটি এনিমেশন মুভি নির্মিত হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো স্টিভেন স্পিলবার্গ এবং পিটার জ্যাকসনের দি অ্যাডভেঞ্চার্স অব টিনটিন (চলচ্চিত্র) (২০১১)।

কাহিনীসংক্ষেপ[সম্পাদনা]

ব্রুসেলসের পুরনো বাজারে ঘুরতে গিয়ে টিনটিন একটা জাহাজের মডেল কেনে বন্ধু ক্যাপ্টেন হ্যাডকের জন্যে। কিন্তু তখনই জাহাজের মডেল সংগ্রাহক ইভান ইভানোভিচ স্যাখারিন আর অ্যাণ্টিক-সন্ধানী বার্নাবি এসে সেটা কিনতে চায়। তারা বহুগুণ দাম সাধাসাধি করলেও টিনটিন কারো কাছেই সেটা বিক্রি করেনি। বাজারে পুলিশের দুই গোয়েন্দা জনসন ও রনসনকেও দেখা যায়; তারা পকেটমার ধরতে বেরিয়েছে। টিনটিন জাহাজের মডেলটা বাসায় এনে রাখার কিছু পরেই কুট্টুসের ধাক্কায় এটার বড় মাস্তুল ভেঙে যায়। মেরামত করে ক্যাপ্টেন হ্যাডককে দেখানোর পর জানা যায়, এটা ‘ইউনিকর্ন’ জাহাজের মডেল, ক্যাপ্টেনের এক পূর্বপুরুষ ছিলেন যার কমান্ডার।টিনটিন যখন বাড়ির বাইরে, জাহাজের মডেলটা চুরি হয়ে যায়। সেটার খোঁজে টিনটিন স্যাখারিনের বাড়িতে গিয়ে দেখে, তার কাছেও ইউনিকর্নের হুবহু একইরকম আরেকটি মডেল আছে। বাসায় ফিরে টিনটিন খুঁজে পায় গোল করে পাকানো একটুকরো কাগজ যা হয়তো মডেল জাহাজের ভাঙা মাস্তুলের ভেতর ছিল। কাগজে লেখা দুর্বোধ্য একটা ধাঁধা: "তিন ভাই... তিন জাহাজ... দুপুর বেলায় যাত্রা... সূর্য পথ বাতলায়... আলো থেকেই আসে আলো... তাতেই আঁধার কাটে"। [১]

ধাঁধাটা শুনে ক্যাপ্টেন জানায় যে, তার পূর্বপুরুষ স্যার ফ্রান্সিস হ্যাডক ছিলেন ১৭শ শতকের রণতরী ‘ইউনিকর্ন’-এর ক্যাপ্টেন। জলদস্যু লাল বোম্বেটে তাঁর জাহাজ কবজা করে তাকে বন্দি করে আর সেখানে জমায় তাদের লুট করা সব সম্পদ। রাতের আঁধারে স্যার ফ্রান্সিস নিজেকে মুক্ত করে লাল বোম্বেটের সাথে ডুয়েলে তাকে হত্যা করেন আর জাহাজের অস্ত্রাগারে আগুন লাগিয়ে দেন। বিস্ফোরণের পূর্বেই তিনি জাহাজ থেকে নেমে আসতে পেরেছিলেন। পরবর্তীতে তিনিই আবার ইউনিকর্নের ৩টি মডেল বানিয়ে তাঁর পুত্রদের দিয়ে যান। এদিকে সেই বার্নাবি টিনটিনের সাথে দেখা করতে এসে বাসার দরজায় গুলিবিদ্ধ হয়। অজ্ঞান হবার আগে সে কিছু বলতে না পারলেও একঝাঁক চড়ুইপাখির দিকে রহস্যময় ইঙ্গিত করে। আসলে তার আততায়ী ছিল দুই বার্ড ভাই, অ্যান্টিক ব্যবসায়ী; ইউনিকর্নের ৩য় মডেল ও ধাঁধা পেয়ে তারা ধাঁধার অপর দুই টুকরো হাত করার চেষ্টা করছে। প্রথমে বার্নাবি তাদের হয়ে একাজ করলেও এখন বনিবনা না হওয়ায় সে টিনটিনের কাছে আসে আর তারাও তার পিছু নেয়। যাইহোক, বার্ড ভাইয়েরা পরবর্তীতে টিনটিনকেও বন্দী করে তাদের কাউন্টি মার্লিনসস্পাইক হলের ভূগর্ভস্থ গুদামে। টিনটিন সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হয় আর জনসন-রনসন বার্ড ভাইদের গ্রেপ্তার করে। বার্ড ভাইদের কাছে তখন ধাঁধার শুধু একটা টুকরো ছিল। অপর দুটুকরো তাদের মানিব্যাগের সাথে চুরি হয়েছে। টিনটিনের সাহায্যে মাণিকজোড় খুঁজে বের করে সেই পকেটমার: মিঃ সিল্ক, চুরি করা যার পেশা নয়, লোকের মানিব্যাগ সংগ্রহ করা তার বাতিক। তার কাছে বার্ডদের মানিব্যাগ ও তাতে অপর দুটুকরো কাগজ পাওয়া যায়। এবার তিনটি কাগজ একত্রে আলোর সামনে ধরলে জানা যায় সেই স্থানের অক্ষ ও দ্রাঘিমা যেখানে ডুবেছিল ইউনিকর্ন আর বোম্বেটের ধনসম্পদ। সেসব উদ্ধার করতে সমুদ্রযাত্রার পরিকল্পনা করতে থাকে টিনটিন আর হ্যাডক।[২]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

প্রেক্ষাপট[সম্পাদনা]

ব্রাসেলসের ফ্লিয়া বাজার যেখান থেকে টিনটিন জাহাজের মডেলটি কিনেছিল।

১৯৪০ সালে হার্জের লে সয়ারে যোগদান করার সময় এটি ছিল বেলজিয়ামের সর্ববৃহৎ ফরাসীভাষী পত্রিকা। লে সয়ারের শিশুতোষ ক্রোড়পত্র লে সয়ার জেনেস-এর খ্যাতিমান সম্পাদক হয়ে ওঠেন হার্জ। সহকারী ছিলেন তাঁর পুরনো বন্ধু পল জেমিওন এবং কার্টুনিস্ট জ্যাক ভ্যান মেল্কবিকি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে জার্মানি বেলজিয়াম দখল করে, লে সয়ার পত্রিকাও বাজেয়াপ্ত হয়। পরে তা আবার প্রকাশিত হয় জার্মান যুদ্ধনীতি ও ইহুদিবিদ্বেষের সমর্থনে।[৩] এরূপ জার্মান নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও লে সয়ারের বিপুল পাঠকগোষ্ঠী (প্রায় ৬ লক্ষ)[৪] থাকায় হার্জ তা ছাড়তে পারেননি। তবে এরপর থেকে তিনি কমিকসে আর স্পষ্টভাবে সমকালীন রাজনৈতিক ঘটনা ব্যবহার না করে নিরপেক্ষতা অবলম্বন করতে থাকেন।[৫] লেখক হ্যারি থম্পসনের পর্যবেক্ষণে, তখন রাজনৈতিক ব্যঙ্গ বা প্রহসনের বদলে "হার্জ বেশি মনোযোগ দিচ্ছিলেন [কমিকসের] কাহিনীতে এবং নতুনভাবে চরিত্রগুলোতে রসসৃষ্টিতে। পাঠকেরা তা ভালোভাবে নিয়েছিলেন।"[৬]

বোম্বেটে জাহাজ ছিল টিনটিন সিরিজের প্রথম কমিকস যেটাতে হার্জ এবং ভ্যান মেল্কবিকি লক্ষণীয় মাত্রায় যৌথকাজ করেছেন। জীবনীকার বেনয়েট পিটারের মতে, ভ্যান মেল্কবিকিকে কমিকসটির সহ-কাহিনীকার হিসেবে বিবেচনা কর উচিত।[৭] তার সাথে আলোচনার ফলেই হার্জ আগের চেয়ে আরো জটিল একটি গল্প সৃস্টিতে হাত দিয়েছিলেন।[৭] ভ্যান মেল্কবিকি গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন জুল ভার্ন এবং পল দেল্ভয়ের দ্বারা, যা কমিকসটিতে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।.[৭] মেল্কবিকির পরামর্শেই হার্জ এতে ৩টি লুকানো কাগজের ধাঁধা সৃষ্টি করেন, জুল ভার্নের দ্য চিলড্রেন অফ ক্যাপ্টেন গ্র্যান্ট(১৮৬৭)-এর মতো।[৮] ভ্যান মেল্কবিকির অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ হার্জ তাঁর একটি ছবি এঁকে দেন কমিকসে শুরুর বাজারের দৃশ্যে। ছবিটা বিশেষ করে সার্থক হয়েছিল কারণ মেল্কবিকি ছোটবেলায় সেই বাজার থেকেই তার বইপত্র কিনেতেন।[৯]

বোম্বেটে জাহাজ ছিল সেই অভিযানের প্রথম অংশ যা শেষ হয় লাল বোম্বেটের গুপ্তধনেফারাওয়ের চুরুটনীলকমলের পর এটিই ছিল হার্জের প্রথম দুই-অংশবিশিষ্ট গল্প।[১০] অবশ্য টিনটিনবিদ মাইকেল ফার মন্তব্য করেছেন,ফারাওয়ের চুরুটনীলকমল ছিল অনেকবেশি "আত্মগত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ", সে তুলনায় বোম্বেটে জাহাজলাল বোম্বেটের গুপ্তধনের মাঝে সংযোগ বহুদূর ঘনিষ্ঠ।[১১]

হার্জের আঁকা- স্যার ফ্রান্সিস হ্যাডক লড়ছেন লাল বোম্বেটের জলদস্যুদের সাথে

পূর্বের কমিকসগুলো আঁকতে হার্জ ব্যবহার করেছেন পত্রিকার কাটিং, তার নিজের ছবির সংগ্রহ এবং অন্য অনেক উৎস। কিন্তু বোম্বেটে জাহাজের বেলায় বিভিন্ন দৃশ্য ও চরিত্র আঁকতে হার্জকে ব্যবহার করতে হলো অনেক নতুন ও বিচিত্র ধরনের উৎস।[১২] পুরোনো জাহাজের ছবি আঁকতে হার্জ প্রথমে বইপত্র ঘাঁটলেন, বিশেষত তৎসম্প্রতি প্রকাশিত আলেকজান্ডার বের্কমেনের ল'আর্ট এট ল মের (সমুদ্র ও শিল্প)।[১৩] এরপর আরো নিখুঁত প্রতিকৃতি পেতে তিনি তার বন্ধু জেরার্ড লাইগার-বেলেয়ারের সাথে দেখা করলেন। ব্রুসেলসে জেরার্ডের একটি দোকান ছিল জাহাজের মডেল সংগ্রহের। জেরার্ড হার্জের জন্যে একটি জাহাজের নকশা করে দিলেন, ১৭-শতকীয় পনের-কামানওয়ালা ফরাসী জাহাজ: লে ব্রিলান্ট; ১৬৯০ সালে ফ্রান্সের লে আভর-এ জাহাজটি নির্মাণ করে স্যালিকন এবং সাজসজ্জা করেন জাঁ বেরেইন দি এল্ডার।[১৪]

১৭-শতকীয় জাহাজের নকশা আরো ভালোভাবে বোঝার জন্যে, হার্জ সেযুগের অন্যসব জলযান নিয়ে অধ্যয়ন শুরু করলেন, যেমন লে সলায়েল রয়েল, লা কোরাওন, লা রয়েল এবং লে রিয়েল ডি ফ্রান্স। শেষোক্ত জাহাজ থেকে তিনি ইউনিকর্নের নৌকাটির ধারণা পেয়েছিলেন।[১৫] ফরাসি নৌবাহিনীর বর্ষপঞ্জীতে ইউনিকর্ন নামে কোনো জাহাজ ছিল না। হার্জ এই নামটি নিয়েছিলেন ১৮ শতকের একটি ব্রিটিশ ফ্রিগেট থেকে। কমিকসে জাহাজের অগ্রভাগে যে ইউনিকর্নের মূর্তিটি দেখা যায় সেটাও ফ্রিগেটের অনুসরণে আঁকা।[১৫]

হার্জ লাল বোম্বেটে (রেড রেকহাম) চরিত্রের কিছুটা অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন জিন রেকহাম থেকে। দিমাঞ্চে-ইলাস্ট্রের নভেম্বর (১৯৩৮) সংখ্যায় এই কাল্পনিক জলদস্যু ও তার দুজন সহচরী অ্যান বনিমেরি রিডকে একটি গল্প ছাপা হয়, যেটা হার্জের নজর কাড়ে।[১৬] লাল বোম্বেটের চেহারা ও পোশাকের অনুপ্রেরণা ছিল সি এস ফরেস্টারের উপন্যাস দ্য ক্যাপ্টেন ফ্রম কানেকটিকাটের চরিত্র লোরুজ এবং ১৭-শতকী ফরাসী বুকানিয়ার ড্যানিয়েল মন্টবার্স।[১৭] বেলজিয়ামের শহর সার্ট-মৌলিনের নামানুসারে মৌলিনসার্ট তথা মার্লিনস্পাইক হলের নামকরণ করা হয়।[১৮] আর বাড়িটির আদত নকশা করা হয় ফরাসী দুর্গ শ্যাতো দি শীভার্নির উপর ভিত্তি করে, একটু পরিবর্তনসহ।[১৯] গল্পে ফ্রান্সিস হ্যাডক চরিত্র এনে হার্জ ক্যাপ্টেন হ্যাডককে করে দিলেন সিরিজের একমাত্র চরিত্র (জয়লন ওয়াগ ব্যতীত) যার কিনা পরিবার ও বংশবৃত্তান্ত আছে।[২০] বোম্বেটে জাহাজের পুরো কাহিনী ঘটে বেলজিয়ামে এবং পান্না কোথায় লেখার পূর্ব পর্যন্ত এটি ছিল সেখানে টিনটিনের শেষ অভিযান।[২১] তিব্বতে টিনটিন (১৯৬০) লেখার পূর্বে বোম্বেটে জাহাজ ছিল হার্জের নিজের প্রিয় সৃষ্টি।[২২]

ঐতিহাসিক সাদৃশ্য[সম্পাদনা]

১৭ শতকে আঁকা স্যার রিচার্ড হ্যাডকের ছবি

বইটি প্রকাশের পর হার্জ জানতে পারেন যে বাস্তবেই হ্যাডক নামে একজন নৌসেনাপতি বৃটিশ রয়েল নেভীতে ১৭-১৮শ শতকে কাজ করেছেন: স্যার রিচার্ড হ্যাডক (১৬২৯-১৭১৫)। তৃতীয় অ্যাংলো-ডাচ যুদ্ধের প্রথম নৌসমর ছিল ব্যাটল অব সোলবে (১৬৭২)। এ যুদ্ধে রিচার্ড হ্যাডকের দায়িত্বে ছিল আর্ল অব স্যান্ডউইচের প্রধান রণতরী রয়্যাল জেমস। যুদ্ধে তিনি আহত হন, ডাচরা তাঁর জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেয়, সাগরে লাফিয়ে পড়ে তিনি প্রাণ বাঁচান। যুদ্ধে বীরত্বের জন্যে বৃটিশ রাজা দ্বিতীয় চার্লস তাকে সন্মানিত করেন। পরবর্তীতে তিনি রয়্যাল চার্লসের কমান্ডার হন আর শেষজীবন কাটান নৌ-প্রশাসক হিসেবে।[২৩] উল্লেখ্য, অ্যাডমিরাল হ্যাডকের দাদার নামও ছিল রিচার্ড, যিনি যুদ্ধজাহাজ এইচ এম এস ইউনিকর্ন পরিচালনা করেছেন রাজা প্রথম চার্লসের আমলে।[২৪]

সেসময় ক্যাপ্টেন হ্যাডক নামে আরো এক ব্যক্তির কথা জানা যায়। ইনি অ্যানি অ্যান্ড ক্রিস্টোফার নামে একটি অগ্নিজাহাজ পরিচালনা করেন। ডেভিড অগ লিখেছেন যে, এই ক্যাপ্টেন দলছুট হয়ে তার জাহাজ নিয়ে চলে যান মালাগায় এবং সেখানকার মালামাল ব্রিটেনে নিয়ে বহুগুণ মুনাফায় বিক্রি করেন। এই কাজের জন্যে ১৬৭৪ সালে তাকে নৌ-ট্রাইবুনালে জবাবদিহি করতে হয়। এর শাস্তিস্বরূপ তার পুরো মুনাফা বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং তাকে ৬ মাসের জন্যে বরখাস্ত করা হয়।[২৩]

প্রকাশনা[সম্পাদনা]

লে সয়ার পত্রিকায় Le Secret de la Licorne নিয়মিত প্রকাশ শুরু হয় ১১ জুন ১৯৪২।[২৫] ফরাসী ক্যাথলিক পত্রিকা Cœurs Vaillants-এ টিনটিনের আগের বইগুলোর সাথে এটিও ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ১৯ মার্চ ১৯৪৪ থেকে।[২৫] বেলজিয়ামের খ্যাতনামা প্রকাশনী ক্যাস্টরম্যান কমিকসটি ১৯৪৩ সালে ৬২-পৃষ্ঠার বই ফরম্যাটে প্রকাশ করে।[২৫] পুরো রঙিন বইটির জন্য নতুন প্রচ্ছদ এঁকে দেন হার্জ,[২৬] ততদিনে মূল কাহিনীর ক্রমবিন্যাস তিনি সম্পূর্ণ করেছেন, সঙ্গে ছয়টি বড়মাপের রঙিন চিত্র। [২৭][২৮] ফরাসিভাষী বেলজিয়ামে বইটির প্রথম মুদ্রণের ৩০,০০০ কপি বিক্রি হয়।[২৯]

দুঃসাহসী টিনটিন সিরিজে বোম্বেটে জাহাজলাল বোম্বেটের গুপ্তধন কমিকসদুটোই প্রথম ইংরেজিতে অনূদিত হয়। ক্যাস্টরম্যান প্রকাশিত সংস্করণদুটির বিক্রি খুব কম হয় এবং এখন কেবল অল্প কয়েকজনের সংগ্রহে তা আছে।[৩০] সাত বছর পর ম্যাথুয়েন গল্পদুটি পুনর্প্রকাশ করে, অনুবাদ করেন লেসলি লন্সডেল-কুপার এবং মাইকেল টার্নার।[৩১] ইংরেজি অনুবাদে দেখা যায়, স্যার ফ্রান্সিস হ্যাডক রাজা দ্বিতীয় চার্লসের কাজ করেন, কিন্তু মূল ফরাসি সংস্করণে তাকে ফরাসীরাজ চতুর্দশ লুইয়ের হয়ে কাজ করতে দেখা যায়।[৩২]

কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে বোম্বেটে জাহাজের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করে তাদের শিশুতোষ ক্রোড়পত্র আনন্দমেলায়।[৩৩] অনুবাদ করেছিলেন ক্রোড়পত্রের সম্পাদক কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী[৩৪] কমিকসটি ১৯৯৬ সালের এপ্রিলে আনন্দ পাবলিশার্স বই হিসেবে প্রকাশ করে।

সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ[সম্পাদনা]

টিনটিনের প্রথম দিকের কমিকসগুলোর আঁকার শৈলি, রঙ এবং বিষয়ের ব্যবহার ফুটে উঠেছে বোম্বেটে জাহাজে। সেজন্যে হ্যারি থম্পসন এটিকে বলেছেন "প্রশ্নাতীতভাবে" ১৯৩০-এর সৃষ্টিগুলোর অন্তর্গত এবং "হার্জের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ গোয়েন্দা রহস্য"।[২১] তার মতে, বোম্বেটে জাহাজ এবং লাল বোম্বেটের গুপ্তধন গল্পদুটো ছিল 'টিনটিনের ক্যারিয়ারে' তৃতীয় এবং কেন্দ্রীয় ধাপ। কারণ, নতুন রাজনৈতিক পরিবেশে মানিয়ে নেয়ার স্বার্থে, রিপোর্টার টিনটিন এখানে হয়ে ওঠে অভিযাত্রী।[১০] তিনি আরো মনে করেন যে, এটিই ছিল 'টিনটিনের সবচেয়ে সফল অভিযান'।[২১]

জিন-মার্ক লফিশিয়ার এবং র‍্যান্ডি লফিশিয়ারের বর্ণনায়, ক্যাপ্টেন হ্যাডক ছিল গল্পের ‘সবচেয়ে জীবন্ত চরিত্র’; বিপরীতদিকে বার্ড ভাইয়েরা ছিল ‘অপেক্ষাকৃত অনুজ্জ্বল খলনায়ক’।[৩৫] তারা আরো মন্তব্য করেন যে, বোম্বেটে জাহাজলাল বোম্বেটের গুপ্তধন ধারাগল্পটি টিনটিন সিরিজের 'একটি সন্ধিক্ষণ', যেহেতু এটি পাঠকের মনোযোগ টিনটিন থেকে হ্যাডকের দিকে ঘুরিয়ে দেয়, পরবর্তীতে যে হয়ে ওঠে 'সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্র'।[৩৫] তারা বোম্বেটে জাহাজের 'প্রকৃতই চমৎকার গল্পকথনের' প্রশংসা করেছেন এবং পরিশেষে একে ৫ এর মধ্যে ৪ রেটিং দিয়েছেন।[৩৬] ফিলিপ গডিন মন্তব্য করেন, গল্পের যে দৃশ্যে হ্যাডক তার পূর্বপুরুষের কাহিনী বর্ণনা করে সেখানে পাঠক "অভিক্ষিপ্ত হয় একে একে বর্তমান ও অতীতে, বিস্ময়কর কুশলতায়। পর্বগুলো অন্তর্বন্ধিত, একে অন্যকে সমৃদ্ধ করেছে, বিস্তারিত হয়েছে এবং মিলে গিয়েছে আশ্চর্য সাবলীলতায়। হার্জ তার প্রতিভার সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছিলেন।"[৩৭]

এক মধ্যবয়সী ব্যক্তি মাইক্রোফোনে কথা বলছেন।
হার্জের জীবনীকার বেনওয়া পিটারসের বিবেচনায় বোম্বেটে জাহাজ হার্জের অন্যতম "শ্রেষ্ঠ বর্ণনামূলক সাফল্য"।

হার্জের জীবনীকার বেনওয়া পিটারস মতপ্রকাশ করেন যে, বোম্বেটে জাহাজ এবং লাল বোম্বেটের গুপ্তধন উভয়ই দুঃসাহসী টিনটিন সিরিজে এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে’ কারণ তারাই ‘টিনটিনের জগত’ গড়ে তুলেছে এর মূল চরিত্রগুলোর সমাবেশে।[৭] পূর্বের কমিকসগুলোর আলোকে তিনি একে বলেছেন হার্জের অন্যতম "শ্রেষ্ঠ বর্ণনামূলক সাফল্য", যে ভঙ্গীতে তিনটি পৃথক কাহিনীকে এখানে একত্রে বুনে দেয়া হয়েছে।[৭] তার পর্যবেক্ষণে, ধর্মীয় উপাদান পূর্বের গল্পগুলোতে থাকলেও বোম্বেটে জাহাজ-এ তা ছিল আরো জোরালো এবং লাল বোম্বেটের গুপ্তধনেও, যার কৃতিত্ব তিনি দিচ্ছেন ভ্যান মেল্কবিকিকে।[৭] অন্যত্র তিনি বলেছেন যে, এটি গল্পের সূচনাকে "এক অসাধারণ বর্ণনামূলক নিপুণতায় উন্মোচিত করেছে।"[৩৮]

জীবনীকার পিয়ের অ্যাসোলিন লিখেছেন যে, গল্পটি ছিল "স্পষ্টতই প্রভাবিত – রবার্ট লুইস স্টিভেনসনের ট্রেজার আইল্যান্ড দ্বারা, পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণে না হলেও মূল প্রেরণায়, বিবর্ণ জীবন হতে এর পলায়নবাদী মানসিকতায়।"[৩৯] তিনি এই অভিযানকে বর্ণনা করেছেন 'হার্জের সৃষ্টিকর্মে এক নতুন উন্নতি' হিসেবে, "একটি যাত্রা, সমসাময়িকতা থেকে জলদস্যুদের মহাকাব্যিক অভিযানে, দূর দিগন্তে।"[৩৯] অ্যাসোলিন এই পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেন যে, স্যার ফ্রান্সিস হ্যাডকের পূর্বপুরুষ অবয়ব প্রতিফলিত করছে গল্পে হার্জের এই পারিবারিক গুপ্তকথা যুক্ত করার চেষ্টা যে, তিনি ছিলেন একজন অভিজাতের বংশধর।[৪০]

মাইকেল ফার মনে করেন যে বইটির "সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য" লক্ষণীয় বিষয় ছিল এতে স্যার ফ্রান্সিস হ্যাডকের পরিচয়দান; বিশেষত, তার অঙ্গভঙ্গি এবং চিত্রায়ণে তিনি ক্যাপ্টেন হ্যাডক থেকে 'খুব সামান্যই প্রভেদযোগ্য'।[৪১] তিনি আলোকপাত করেন সেই দৃশ্যগুলোতে যখন ক্যাপ্টেন হ্যাডক তার পূর্বপুরুষের কাহিনী শোনায়, যা মিলিয়ে দিতে থাকে স্বপ্ন ও বাস্তবকে, হার্জ যার পরীক্ষা চালিয়েছিলেন কাঁকড়া রহস্যআশ্চর্য উল্কায়[৪১] তবে আশ্চর্য উল্কাতে যেমন যুদ্ধ বা দখলের প্রতি ইঙ্গিত আছে এই দুই-বইয়ের ধারাগল্পে তা প্রায় নেই’, উল্লেখ করেছেন ফার। তিনি ধারাগল্পটির কাহিনীবর্ণনার প্রশংসা করেছেন যা 'নিখুঁতভাবে এগিয়েছে, কোনো তাড়াহুড়ো ছাড়া' হার্জের শুরুর কিছু কাজের মতোই।[৪১]

রূপায়ণ[সম্পাদনা]

১৯৫৭ সালে অ্যানিমেশন কোম্পানি বেলভিশিয়ান স্টুডিওস তৈরি করে হার্জে'স অ্যাডভেঞ্চারস অফ টিনটিন, হার্জের কমিকস অবলম্বন করে কার্টুন সিরিজ। পুরো রঙিন এই সিরিজটি প্রতিদিন ৫ মিনিট করৈ দেখানো হতো। এর দ্বিতীয় পর্বে ৪র্থ কার্টুন হিসেবে বোম্বেটে জাহাজ রূপায়িত হয়। সিরিজটির পরিচালনা করেন রে গুসেন এবং কাহিনী লেখেন সুপরিচিত কার্টুনিস্ট গ্রেগ, পরে যিনি টিনটিন ম্যাগাজিনের প্রধান সম্পাদক হয়েছিলেন।[৪২]

১৯৯১ সালে ফরাসি স্টুডিও এলিপস এবং কানাডীয় অ্যানিমেশন কোম্পানি নেলভানা যৌথভাবে টিনটিনের ২১টি গল্প নিয়ে সিরিজ তৈরি করে। বোম্বেটে জাহাজ এ সিরিজের ৯ম গল্প হিসেবে দুটি ৩০ মিনিটের এপিসোডে দেখানো হয়। স্টিফেন বের্নাসকোনি পরিচালিত সিরিজটি প্রশংসা পায় মূল কমিকসের প্রতি "সাধারণভাবে বিশ্বস্ত" থাকার জন্যে; এতটাই বিশ্বস্ত যে, সরাসরি হার্জের আঁকা প্যানেল থেকে অ্যানিমেশনটি তুলে আনা হয়েছিল।[৪৩]

২০১১ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে মুক্তি পায় মোশন ক্যাপচার চলচ্চিত্র দি অ্যাডভেঞ্চার্স অফ টিনটিন: দ্য সিক্রেট অফ দি ইউনিকর্ন; পরিচালক ছিলেন স্টিভেন স্পিলবার্গ এবং প্রযোজক পিটার জ্যাকসনকাঁকড়া রহস্য, বোম্বেটে জাহাজলাল বোম্বেটের গুপ্তধন - এই তিনটি কমিক বই অবলম্বনে মূলত ছবিটি তৈরি হয়েছে।[৪৪] এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি ভিডিও গেমও পরের মাসে মুক্তি দেয়া হয়।[৪৫]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. হার্জ ১৯৫৯, পৃ. 1–12।
  2. হার্জ ১৯৫৯, পৃ. 12–62।
  3. অ্যাসোলিন ২০০৯, pp. 70–71; পিটারস ২০১২, pp. 116–118.
  4. অ্যাসোলিন ২০০৯; পিটারস ২০১২.
  5. থম্পসন ১৯৯১, p. 99; ফার ২০০১, p. 95.
  6. থম্পসন ১৯৯১
  7. পিটারস ২০১২
  8. লফিশিয়ার & লফিশিয়ার ২০০২; গডিন ২০০৯.
  9. লফিশিয়ার & লফিশিয়ার ২০০২, p. 54; পিটারস ২০১২, p. 143.
  10. থম্পসন ১৯৯১, পৃ. 112।
  11. ফার ২০০১, পৃ. 105।
  12. ফার ২০০১, পৃ. 112।
  13. গডিন ২০০৯, পৃ. 104।
  14. অ্যাসোলিন ২০০৯, p. 88; ফার ২০০১, p. 111; পিটারস ২০১২, pp. 144–145.
  15. পিটারস ১৯৮৯, p. 75; ফার ২০০১, p. 111.
  16. ফার ২০০১, pp. 108–109; হোরাও ২০০৪, pp. 38–39.
  17. হোরাও ২০০৪, পৃ. 39।
  18. পিটারস ১৯৮৯, p. 77; থম্পসন ১৯৯১, p. 115; ফার ২০০১, p. 106; লফিশিয়ার & লফিশিয়ার ২০০২, p. 53.
  19. পিটারস ১৯৮৯, p. 76; থম্পসন ১৯৯১, p. 115; ফার ২০০১, p. 106; লফিশিয়ার & লফিশিয়ার ২০০২, p. 53.
  20. পিটারস ১৯৮৯, p. 75; থম্পসন ১৯৯১, p. 115.
  21. থম্পসন ১৯৯১, পৃ. 113।
  22. থম্পসন ১৯৯১, p. 113; ফার ২০০১, p. 105.
  23. ফার ২০০১, পৃ. 111।
  24. লেভারি ২০০৩; ডেভিস ২০০৪.
  25. লফিশিয়ার ও লফিশিয়ার ২০০২, পৃ. 52।
  26. গডিন ২০০৯, পৃ. 113।
  27. গডিন ২০০৯, পৃ. 124।
  28. গডিন ২০০৯, পৃ. 114।
  29. পিটারস ২০১২, পৃ. 145।
  30. থম্পসন ১৯৯১, p. 121; ফার ২০০১, p. 106.
  31. ফার ২০০১, পৃ. 106।
  32. হোরাও ২০০৪, পৃ. 18।
  33. হার্জ ১৯৯৬
  34. "In Another Tongue"দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া। ১৫ ডিসেম্বর ২০১১। সংগৃহীত ২ আগস্ট ২০১৫ 
  35. লফিশিয়ার ও লফিশিয়ার ২০০২, পৃ. 53।
  36. লফিশিয়ার ও লফিশিয়ার ২০০২, পৃ. 54–55।
  37. গডিন ২০০৯, পৃ. 110।
  38. পিটারস ১৯৮৯
  39. অ্যাসোলিন ২০০৯, পৃ. 88।
  40. অ্যাসোলিন ২০০৯, পৃ. 88–89।
  41. ফার ২০০১
  42. লফিশিয়ার ও লফিশিয়ার ২০০২, পৃ. 87–88।
  43. লফিশিয়ার ও লফিশিয়ার ২০০২, পৃ. 90।
  44. দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ: মাইকেল ফার 2011
  45. IGN ২০১১

গ্রন্থপঞ্জী[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]