বিষয়বস্তুতে চলুন

বৈশাগু

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বৈশাগু
বৈশাগু উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে নৃত্যরত বড়ো তরুণী
পালনকারীবড়ো জনগোষ্ঠী
ধরনসামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়
তারিখচৈত্র মাসের শেষ দিন থেকে বৈশাখ মাসের ৬ তারিখ পর্যন্ত
এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে
সংঘটনবার্ষিক
সম্পর্কিতদক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সৌর নববর্ষ

বৈশাগু (বড়ো: बैसागु; ইংরেজি: Bwisagu) আসামের বড়ো জনগোষ্ঠীর একটি জনপ্রিয় ঋতুভিত্তিক উৎসব। বৈশাগু শব্দের অর্থ নতুন বছরের সূচনা। ‘বৈশা’ শব্দের অর্থ নতুন বছর এবং ‘আগু’ অর্থ শুরু। এই উৎসব চৈত্র মাসের শেষ দিন থেকে বৈশাখ মাসের ষষ্ঠ দিন পর্যন্ত (এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে) সাত দিন ধরে পালিত হয়।[১][২] বহাগ বিহুর সঙ্গে বৈশাগুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।[৩]

শব্দের উৎপত্তি

[সম্পাদনা]

‘বৈশাগু’ শব্দটি বড়ো ভাষার ‘বৈশা’ (বছর) ও ‘আগু’ (সূচনা) শব্দ থেকে এসেছে। অর্থাৎ, এই উৎসব নতুন বছরের সূচনাকে চিহ্নিত করে।[৪]

উদযাপন

[সম্পাদনা]

বৈশাগু সাত দিন ধরে উদযাপিত হয়। প্রথম দিনটিকে বলা হয় ‘মাখাউ’ বা ‘মাচাউ’, যার অর্থ গরু। দ্বিতীয় দিন ‘মানসি’, অর্থাৎ মানুষ। সেদিন বাথৌ দেবতার পূজা ও পূর্বপুরুষদের শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। তৃতীয় দিনটিকে বলা হয় ‘চাইমা’ (কুকুর), চতুর্থ দিন ‘ওমা’ (শূকর), পঞ্চম দিন ‘দাও’ (মুরগি), এবং ষষ্ঠ দিন হাঁস বা অন্যান্য পাখির নামে উদযাপিত হয়। সপ্তম দিনে বড়ো জনগোষ্ঠীর মানুষ আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।[৫]

সঙ্গীত ও নৃত্য

[সম্পাদনা]

সঙ্গীত ও নৃত্য বৈশাগুর অন্যতম অংশ। তরুণ-তরুণীরা একত্রে বৈশাগু নাচে। তরুণরা চিফুং (বাঁশি), খাম (ঢোল), চেরেন্দা (চার তারের বাদ্যযন্ত্র), এবং থোরকা (ফাটা বাঁশের তালবাদ্য) বাজায়; তরুণীরা গোগোনা (একপ্রকার মুখে বাজানো বাদ্য) ও ছোট ঝিল্লি (জথা) বাজায় এবং নৃত্য পরিবেশন করে।[৫]

রীতিনীতি ও বিশ্বাস

[সম্পাদনা]

বৈশাগুর সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি প্রথা ও বিশ্বাস রয়েছে—

  1. বড়ো জনগোষ্ঠী কৃষিনির্ভর। গরুর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাই উৎসবের প্রথম দিনটি গরুর নামে উৎসর্গ করা হয়। গরুকে নদীতে স্নান করানো হয় এবং বিশ্বাস করা হয় এই দিনে গরুর গায়ে লাঠি মারা নিষিদ্ধ। বিকেলে নিকটস্থ বনে গিয়ে বুনো শাকসবজি সংগ্রহ করে বিশেষ তরকারি রান্না করা হয়।
  2. উৎসবের দিনগুলোতে বড়ো জনগোষ্ঠী কৃষিপণ্য ক্রয়-বিক্রয় বা ধান সংগ্রহ করে না।
  3. পরিবারের মহিলারা ঘরে তৈরি ঐতিহ্যবাহী মদ ও মুরগি নিয়ে ওজার (পুরোহিতের) বাড়িতে যান। বর্তমানে অনেকে নগদ অর্থ প্রদান করেন। এর বিনিময়ে ওজা তাবিজ বা কবচ দেন।
  4. বৈশাগু উপলক্ষে চাল দিয়ে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে স্থানীয় মদ প্রস্তুত করা হয়, যা অতিথি আপ্যায়নে ব্যবহৃত হয়। এই মদ তৈরির প্রক্রিয়া ৩–৪ মাস আগে থেকে শুরু হয়।
  5. উৎসবের সময় বড়ো জনগোষ্ঠী ঘরে ঘরে গিয়ে গান ও নৃত্য পরিবেশন করে। বিশ্বাস করা হয়, কোনো পরিবার তাদের ফিরিয়ে দিলে তা অমঙ্গলজনক।[৫]

গবাদি পশুর আচার

[সম্পাদনা]

চৈত্র মাসের শেষ দিনটি গরুর বৈশাগু নামে পরিচিত। সেদিন গরুকে নদী বা পুকুরে স্নান করানো হয়। গরুর শরীরে সরিষার তেল মাখানো হয় এবং শরীরে কালো ছাই ও তেলের মিশ্রণ দিয়ে দাগ টানা হয়। গরুকে করলা ও বেগুনের মালা পরানো হয়। গৃহস্থ গরুকে স্নানের আগে ধান খাওয়ান ও প্রণাম করেন। বিশ্বাস করা হয়, এই আচার পালন করলে গো-সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং অশুভ শক্তি দূর হয়।

ধর্মীয় তাৎপর্য

[সম্পাদনা]

বৈশাগু উপলক্ষে বাথৌ দেবতার পূজা, পূর্বপুরুষদের শ্রদ্ধা নিবেদন, শিক্ষকদের প্রতি সম্মান ও প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়। মানুষ পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরের সমৃদ্ধি ও শান্তি কামনা করে।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. ↑ "Baishagu Festival"। Assam Info। Assam Info। সংগ্রহের তারিখ ২৩ জুলাই ২০২০।
  2. ↑ "Bwisagu Festival of Bodo People"। All About Assam। ১৫ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৩ জুলাই ২০২০। {{ওয়েব উদ্ধৃতি}}: অজানা প্যারামিটার |dead-url= উপেক্ষা করা হয়েছে (|url-status= প্রস্তাবিত) (সাহায্য)
  3. ↑ "Bodoland celebrates spring festival with traditional gaiety"। Northeast Now। সংগ্রহের তারিখ ৩ ডিসেম্বর ২০২০।
  4. ↑ "Baishagu | Baishagu Festival Of Bodos"। www.assaminfo.com। সংগ্রহের তারিখ ২৩ জুলাই ২০২০।
  5. 1 2 3 Bipul Chandra Basumatary। "Customary Belief and Faiths of the Boros in Bwisagu Festival" (পিডিএফ)। International Journal of Research in Humanities and Social Studies। সংগ্রহের তারিখ ৩ ডিসেম্বর ২০২০। [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]