বৈদ্যুতিক যন্ত্র

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

তড়িৎ প্রকৌশলে, তাড়িতচৌম্বকীয় শক্তি ব্যবহার করে কাজ করা বিভিন্ন যন্ত্র যেমন বৈদ্যুতিক মোটর, বৈদ্যুতিক জেনারেটর প্রভৃতিই হচ্ছে সাধারণ কথায় বৈদ্যুতিক যন্ত্র। বৈদ্যুতিক যন্ত্র হচ্ছে মূলত ইলেক্ট্রোমেকানিকাল শক্তি রূপান্তরকারী: বৈদ্যুতিক মোটর বিদ্যুৎ শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে এবং বৈদ্যুতিক জেনারেটর যান্ত্রিক শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করে। একটি যন্ত্রের গতিশীল অংশসমূহ ঘূর্ণনশীল (ঘূর্ণন যন্ত্র ) বা রৈখিক ( লিনিয়ার মেশিন ) হতে পারে। বৈদ্যুতিক মোটর ও জেনারেটরের পাশাপাশি একটি তৃতীয় ক্যাটাগরির যন্ত্র হচ্ছে ট্রান্সফরমার, এই যন্ত্রটিও শক্তি রূপান্তরে ব্যবহৃত হয় যদিও এর কোনো গতিশীল অংশ নেই, যন্ত্রটি দ্বারা দিক পরিবর্তী বিদ্যুতের ভোল্টেজ লেভেল পরিবর্তন করা হয়। [১]

বৈদ্যুতিক যন্ত্রসমূহের একটি ভাগ হচ্ছে জেনারেটর যা কার্যত পৃথিবীর সমস্ত বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদন করে এবং অপর ভাগ হচ্ছে বৈদ্যুতিক মোটর যা পৃথিবীতে মোট উৎপাদিত বৈদ্যুতিক শক্তির প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করে। ১৯ শতকের মধ্যভাগে বৈদ্যুতিক যন্ত্রসমূহের বিকাশ শুরু হয়েছিল এবং তখন থেকেই যন্ত্রসমূহ অবকাঠামোর একটি সর্বব্যাপী উপাদান হয়ে উঠেছিল। যে কোনো ধরনের বৈশ্বিক সংরক্ষণ, গ্রিন এনার্জি কিংবা বিকল্প শক্তির কৌশলের জন্য আরো বেশি দক্ষ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপ্রযুক্তির উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জেনারেটর[সম্পাদনা]

বৈদ্যুতিক জেনারেটর.

বৈদ্যুতিক জেনারেটর হচ্ছে এমন একটি যন্ত্র যা যান্ত্রিক শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করে। জেনারেটর একটি বাহ্যিক তড়িৎ বর্তনীর মধ্য দিয়ে ইলেকট্রনের প্রবাহ চালনা করে। এটা কিছুটা পানির পাম্পের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেটি কিনা পানির একটি প্রবাহ তৈরি করে কিন্তু অভ্যন্তরে পানি উৎপন্ন করে না। যান্ত্রিক শক্তির উৎস, প্রাইম মুভার, একটি পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত অথবা এককভাবে টারবাইন বাষ্প ইঞ্জিন, টারবাইন বা জলচালিত চাকার মধ্য দিয়ে পানিপ্রবাহ, অন্তর্দহন ইঞ্জিন, বায়ুকল, হ্যান্ড ক্র্যাঙ্ক, সংকুচিত বায়ু বা যান্ত্রিক শক্তির অন্য যেকোনো উৎস হতে পারে।

একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্রের প্রধান দুটি অংশকে যান্ত্রিক কিংবা বৈদ্যুতিক পরিভাষায় বর্ণনা করা যেতে পারে। যান্ত্রিক পরিভাষায়, একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ঘূর্ণায়মান অংশ হচ্ছে রোটর এবং স্থির অংশকে বলা হয় স্টেটর। অপরদিকে বৈদ্যুতিক পরিভাষায়, বৈদ্যুতিক যন্ত্রের শক্তি উৎপাদনকারী উপাদানটি হচ্ছে আর্মেচার এবং চৌম্বকক্ষেত্র উপাদান হচ্ছে ফিল্ড। আর্মেচারটি স্টেটর অথবা রোটর যেকোনো একটার উপর থাকতে পারে। স্টেটর কিংবা রোটর যেকোনোটার উপরে তড়িতচুম্বক অথবা স্থায়ী চুম্বক স্থাপনের মাধ্যমে চৌম্বকক্ষেত্র তৈরী করা যায়। বৈদ্যুতিক জেনারেটরকে দুইভাগে ভাগ করা যায়, এসি জেনারেটর এবং ডিসি জেনারেটর

এসি জেনারেটর[সম্পাদনা]

এসি জেনারেটর যান্ত্রিক শক্তিকে দিক পরিবর্তী বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করে। এসি জেনারেটরের আর্মেচার সার্কিটে স্থানান্তরিত ক্ষমতার তুলনায়, তড়িতচুম্বক সার্কিটে স্থানান্তরিত ক্ষমতা অনেক কম হওয়ায়, প্রায় সবসময়ই তড়িতচুম্বক তারকুন্ডলী রোটরের উপর এবং আর্মেচার তারকুন্ডলী স্টেটরের উপর থাকে।

এসি জেনারেটরকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।

  • ইন্ডাকশন জেনারেটরে, স্টেটরের চৌম্বক ফ্লাক্সের কারণে রোটরে তড়িৎ প্রবাহ উৎপন্ন হয়। অতঃপর প্রাইম মুভার ইঞ্জিন সিনক্রোনাস গতির চেয়ে অধিক গতিতে রোটরকে চালিত করে, যার ফলে বিরোধী রোটর ফ্লাক্স সৃষ্টি হয় যা স্টেটরের তারকুন্ডলীতে ছেদ করে, ফলে স্টেটর তারকুন্ডলীতে সক্রিয় তড়িৎ প্রবাহ উৎপন্ন হয় এবং এভাবেই বৈদ্যুতিক গ্রিডে পুনরায় শক্তি প্রেরণ করা হয়। যেহেতু ইন্ডাকশন জেনারেটর একটি আন্তঃসংযুক্ত সিস্টেম থেকে রিয়েক্টিভ পাওয়ার টেনে নেয় অতএব এটি শক্তির কোনো বিচ্ছিন্ন উৎস হতে পারে না।
  • সিনক্রোনাস জেনারেটরে (অল্টারনেটর) একটি পৃথক ডিসি কারেন্ট উৎস দ্বারা চৌম্বকক্ষেত্রের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।

ডিসি জেনারেটর[সম্পাদনা]

ডিসি জেনারেটর হচ্ছে এমন একটি যন্ত্র যা যান্ত্রিক শক্তিকে ডাইরেক্ট কারেন্ট বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করে। সাধারণত ডিসি জেনারেটরে স্প্লিট রিং সহ কম্যুটেটর থাকে যেন দিক পরিবর্তী কারেন্টের পরিবর্তে ডিসি কারেন্ট উৎপন্ন হয়।

মোটর[সম্পাদনা]

বৈদ্যুতিক মোটর।

বৈদ্যুতিক মোটর বিদ্যুৎ শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে। এটি বৈদ্যুতিক জেনারেটরের বিপরীত প্রক্রিয়ায় কাজ করে, বেশিরভাগ বৈদ্যুতিক মোটর ঘূর্ণন শক্তি উৎপন্ন করার জন্য চৌম্বকক্ষেত্র এবং তড়িতবাহী পরিবাহীর পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে চালিত হয়। মোটর ও জেনারেটরের মধ্যে অনেক রকম মিল রয়েছে এবং অনেক ধরনের বৈদ্যুতিক মোটর, জেনারেটর হিসেবেও চালানো যায়, একইভাবে উল্টোটিও সত্য। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফ্যান, ব্লোয়ার ও পাম্প, মেশিন সরঞ্জাম, গৃহস্থালি সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ সরঞ্জাম এবং ডিস্ক ড্রাইভের মত বিভিন্ন রকম ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক মোটরের ব্যবহার রয়েছে। বৈদ্যুতিক মোটরকে ডিসি কারেন্ট বা এসি কারেন্ট, যেকোনোটা দ্বারাই চালনা করা যেতে পারে, একারণেই মোটর প্রধানত দুই ধরনের হয়ে থাকেঃ এসি মোটর এবং ডিসি মোটর

এসি মোটর[সম্পাদনা]

এসি মোটর দিক পরিবর্তী বিদ্যুৎ শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে। এটি সাধারণত দুটি প্রাথমিক অংশ নিয়ে গঠিত, প্রথমটি হচ্ছে একটি স্থির স্টেটর যেটি মোটরের বাইরের দিকে থাকে এবং এর কয়েল্গুলোতে দিক পরিবর্তী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় যার ফলে একটি ঘূর্ণনশীল চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি হয়, অপরটি হচ্ছে মোটরের অভ্যন্তরীন রোটর যেটি শ্যাফট-এর সাথে যুক্ত থাকে এবং এতে ঘূর্ণনশীল চৌম্বকক্ষেত্রের সাহায্য টর্ক প্রযুক্ত হয়। রোটরের ধরনের উপর ভিত্তি করে এসি মোটরকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়।

  • ইন্ডাকশন (অ্যাসিনক্রোনাস) মোটর, এক্ষত্রে একটি আবিষ্ট তড়িৎ প্রবাহের ফলে রোটরে চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। এই আবিষ্ট তড়িৎ প্রবাহ সরবরাহ করার জন্য স্টেটরের চৌম্বকক্ষেত্রের তুলনায় রোটরকে কিছুটা ধীর (অথবা দ্রুত) গতিতে ঘুরতে হয়। মোটামুটি তিন ধরনের ইনডাকশন-মোটর রোটর আছে যেগুলো হলো স্কুইরেল-কেজ রোটর, উওন্ড রোটর এবং সলিড কোর রোটর।
  • সিনক্রোনাস মোটর, এটি তড়িৎ আবেশের উপর নির্ভরশীল নয় যার ফলে সরবরাহকৃত কম্পাঙ্কের সমান অথবা এর উপগুণিতকে মোটরটি ঘুরতে পারে। স্লিপ রিং (এক্সাইটার) এর মধ্য দিয়ে ডিসি কারেন্ট সরবরাহ করে কিংবা একটি স্থায়ী চুম্বক দ্বারা রোটরে চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি করা হয়।

ডিসি মোটর[সম্পাদনা]

অভ্যন্তরীণ কম্যুটেটর, স্থির স্থায়ী চুম্বক এবং ঘূর্ণনশীল তড়িতচুম্বক ব্যবহার করে ডিসি পাওয়ার সরবরাহের মাধ্যমে ব্রাশযুক্ত ডিসি বৈদ্যুতিক মোটর সরাসরি টর্ক সৃষ্টি করে। ব্রাশ এবং স্প্রিং বিদ্যুৎ প্রবাহকে কম্যুটেটর থেকে মোটরের অভ্যন্তরের রোটরের ঘুরানো তারকুন্ডলীতে বহন করে আনে। ব্রাশবিহীন ডিসি মোটরগুলির রোটরে একটি ঘূর্ণনশীল স্থায়ী চুম্বক থাকে এবং মোটর হাউজিং এর উপর স্থির তড়িতচুম্বক থাকে। একটি মোটর কন্ট্রোলার ডিসি কে এসিতে রূপান্তরিত করে। ব্রাশযুক্ত মোটরের তুলনায় এর ডিজাইন বেশ সরল কারণ এখানে মোটরের বাইরে থেকে ঘূর্ণনশীল রোটরে শক্তি স্থানান্তরের জটিলতা পরিহার করা হয়েছে। ব্রাশবিহীন সিনক্রোনাস ডিসি মোটরের একটি উদাহরণ হচ্ছে স্টেপার মোটর যা একটি পূর্ণঘূর্ণনকে অনেকগুলো ধাপে বিভক্ত করতে পারে।

অন্যান্য তাড়িতচৌম্বকীয় যন্ত্র[সম্পাদনা]

অন্যান্য তাড়িতচৌম্বকীয় যন্ত্রের মধ্যে রয়েছে এমপ্লিডাইন, সিনক্রো, মেটাডাইন, এডি কারেন্ট ক্লাচ, এডি কারেন্ট ব্রেক, এডি কারেন্ট ডায়নামোমিটার, হিস্টেরেসিস ডায়নামোমিটার, রোটারি কনভার্টার এবং ওয়ার্ড লিওনার্ড সেট । রোটারি কনভার্টার হচ্ছে কিছু মেশিনের সমন্বিত রূপ যেগুলো মেকানিকাল রেক্টিফায়ার, ইনভার্টার বা ফ্রিকোয়েন্সি কনভার্টার হিসেবে কাজ করে। ওয়ার্ড লিওনার্ড সেট হচ্ছে এমন সব মেশিনের সমন্বয় যা গতি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবহৃত হয়। অন্যান্য যান্ত্রিক সমবায়ের মধ্যে রয়েছে ক্রেমার এবং শেরবিয়াস সিস্টেম।

ট্রান্সফর্মার[সম্পাদনা]

ট্রান্সফর্মার।

ট্রান্সফর্মার বলতে সাধারণত চার-প্রান্ত বিশিষ্ট একটি যন্ত্রকে বোঝায় যেখানে দুটি (বা আরো বেশি) ম্যাগনেটিকালি কাপল্‌ড তারকুন্ডলী থাকে।[২]

এটি মূলত হচ্ছে একটি স্থির যন্ত্র যা দিক পরিবর্তী বিদ্যুতের কম্পাঙ্কের কোনোরূপ পরিবর্তন না করে এক ভোল্টেজ লেভেল থেকে অন্য ভোল্টেজ লেভেলে (উচ্চ বা নিম্ন) রূপান্তরিত করে। একটি ট্রান্সফর্মারে ইন্ডাকটিভ্লি কাপল্‌ড পরিবাহী তারকুন্ডলী থাকে এবং এর মাধ্যমে একটি তড়িৎ বর্তনী থেকে অপর একটি বর্তনীতে বিদ্যুৎ শক্তি স্থানান্তরিত হয়। ট্রান্সফর্মারের প্রাইমারি তারকুন্ডলীতে পরিবর্তনশীল তড়িৎ প্রবাহের ফলে ট্রান্সফর্মারের কোরে একটি পরিবর্তনশীল চৌম্বক ফ্লাক্স সৃষ্টি হয় এবং এভাবেই সেকেন্ডারি তারকুন্ডলীতেও পরিবর্তনশীল চৌম্বকক্ষেত্র তৈরী হয়। এই পরিবর্তনশীল চৌম্বকক্ষেত্র ট্রান্সফর্মারের সেকেন্ডারি তারকুন্ডলীতে একটি পরিবর্তনশীল তড়িচ্চালক শক্তি আবিষ্ট করে। এই প্রভাবটিকে পারস্পরিক আবেশ বলা হয়।

তিন ধরনের ট্রান্সফর্মার রয়েছেঃ

  1. স্টেপ-আপ ট্রান্সফরমার
  2. স্টেপ-ডাউন ট্রান্সফর্মার
  3. বিচ্ছিন্ন ট্রান্সফরমার

কাঠামোর উপর ভিত্তি করে চার ধরনের ট্রান্সফর্মার রয়েছেঃ

  1. কোর টাইপ
  2. শেল টাইপ
  3. পাওয়ার টাইপ
  4. ইন্সট্রুমেন্ট টাইপ

ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক-রোটর মেশিন[সম্পাদনা]

ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক-রোটর মেশিন গুলোর রোটরে এক ধরনের বিদ্যুৎ প্রবাহ থাকে যার ফলে একটি চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি হয় যা স্টেটরের তারকুন্ডলীর সাথে প্রতিক্রিয়া করে। রোটরের এই বিদ্যুৎ প্রবাহ একটি স্থায়ী চুম্বকের(পিএম মেশিন) অভ্যন্তরীন বিদ্যুৎ প্রবাহ হতে পারে অথবা ব্রাশের মাধ্যমে রোটরে সরবরাহকৃত বিদ্যুৎ হতে পারে (ব্রাশযুক্ত মেশিন) অথবা পরিবর্তনশীল চৌম্বকক্ষেত্রের মাধ্যমে রোটরের বদ্ধ কুন্ডলীতে উৎপন্ন বিদ্যুৎ হতে পারে (ইন্ডাকশন মেশিন)।

স্থায়ী চুম্বক যন্ত্র[সম্পাদনা]

পিএম (পার্মানেন্ট ম্যাগনেট । স্থায়ী চুম্বক) মেশিনগুলির রোটরে স্থায়ী চুম্বক থাকে যা চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি করে। একটি তামার কুন্ডলীতে যতটুকু ম্যাগনেটোমোটিভ বল সৃষ্টি হওয়া সম্ভব তার তুলনায় সাধারণত অনেক বেশি বল সৃষ্টি হয় একটি স্থায়ী চুম্বকে (নির্দিষ্ট ঘূর্ণন সম্পন্ন ইলেকট্রনের আবর্তনের ফলে সৃষ্টি হয়)। যাহোক, তামার তারকুণ্ডলীটি একটি ফেরোম্যাগনেটিক পদার্থ দিয়ে পূরণ করা যেতে পারে, যা কুন্ডলীটির চৌম্বকীয় বাঁধা (ম্যাগনেটিক রিলাকটেন্স) অনেকটাই কমিয়ে আনবে। তা সত্ত্বেও আধুনিক স্থায়ী চুম্বকগুলি ( নিওডিয়ামিয়াম চুম্বক ) দ্বারা সৃষ্ট চৌম্বকক্ষেত্র আরও বেশি শক্তিশালী, এর অর্থ হচ্ছে, নিরবিচ্ছিন্নভাবে সক্রিয় থাকাকালীন সময়ে রোটর কয়েলযুক্ত মেশিনগুলির তুলনায় পিএম মেশিনগুলির আরো ভাল টর্ক/আয়তন এবং টর্ক/ওজন অনুপাত রয়েছে। রোটরে অতিপরিবাহী ব্যবহার করা হলে এই বিষয়টির পরিবর্তন ঘটতে পারে।

যেহেতু পিএম মেশিনের স্থায়ী চুম্বকগুলি ইতিমধ্যেই যথেষ্ট পরিমাণে চৌম্বকীয় বাঁধার সৃষ্টি করে, যার ফলে এয়ার-গ্যাপ (বায়ু-ফাঁক) ও কয়েল কর্তৃক সৃষ্ট চৌম্বকীয় বাঁধা তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ। একারণে পিএম মেশিন ডিজাইন করার সময় যথেষ্ট স্বাধীনতা পাওয়া যায়।

সাধারণত বৈদ্যুতিক যন্ত্রগুলিকে অল্প সময়ের জন্য ওভারলোড করা সম্ভব যতক্ষণ না পর্যন্ত যন্ত্রের কয়েলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রবাহের কারণে তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে যন্ত্রের ক্ষতিসাধন হয়। পিএম মেশিনগুলি এধরনের ওভারলোডে কম মাত্রায় ব্যবহার করা যেতে পারে কারণ মেশিনের কয়েলে যদি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় তাহলে স্থায়ী চুম্বকগুলোকে বিচুম্বকায়িত করার মত যথেষ্ট শক্তিশালি চৌম্বকক্ষেত্র তৈরী হতে পারে।

ব্রাশযুক্ত যন্ত্র[সম্পাদনা]

ইলেক্ট্রিক স্লট কার ট্র্যাকের গাড়িতে যেভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় ঠিক একইভাবে ব্রাশযুক্ত যন্ত্রের ক্ষেত্রে ব্রাশের মাধ্যমে রোটরের কয়েলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। গ্রাফাইট বা তরল ধাতু দিয়ে অধিকতর টেকশই ব্রাশ তৈরি করা সম্ভব। এমনকি "ব্রাশযুক্ত যন্ত্র" এর ব্রাশগুলি পরিহার করা সম্ভব যদি স্টেটর ও রোটরের একটি অংশকে ট্রান্সফর্মার হিসেবে ব্যবহার করা যায় যা কোনোরূপ টর্ক সৃষ্টি না করেই বিদ্যুৎ স্থানান্তরিত করবে। ব্রাশ এবং কম্যুটেটরের মধ্যে কোনোভাবেই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা যাবে না। এখানে পার্থক্যটা হলো ব্রাশ শুধুমাত্র একটি গতিশীল রোটরে বিদ্যুৎ প্রবাহ সরবরাহ করে যেখানে কম্যুটেটর একইসাথে বর্তনীর বিদ্যুৎ প্রবাহের দিকও পরিবর্তন করে।

রোটরের কয়েল্গুলির মাঝে লোহা (সাধারণত শীট ধাতু দিয়ে তৈরী লেমিনেটেড স্টিল কোর) থাকে এবং স্টেটর কয়েলগুলির পিছনে কালো লোহা থাকার সাথে সাথে স্টেটর কয়েলগুলির মাঝেও লোহার তৈরী দাঁত থাকে। রোটর এবং স্টেটরের মধ্যবর্তী ফাঁকাস্থানটি যতটা সম্ভব ছোট করা হয়। এই সবকিছুই করা হয় চৌম্বকীয় সার্কিটের চৌম্বকীয় বাঁধা কমানোর জন্য, এই চৌম্বকীয় সার্কিটের ভেতর দিয়েই রোটর কয়েল দ্বারা সৃষ্ট চৌম্বকক্ষেত্র পরিবাহিত হয়, এটি এসকল যন্ত্রের নিখুঁতিকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলিতে সবথেকে বেশি ব্যবহৃত জেনারেটর হচ্ছে বড় ব্রাশযুক্ত যন্ত্রগুলি যেগুলো স্টেটর কুন্ডলীতে ডিসি বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে সিনক্রোনাস গতিতে চালিত হয়, এর কারণ হচ্ছে যন্ত্রগুলি বৈদ্যুতিক গ্রিডে রিয়েকটিভ পাওয়ার সরবরাহ করে এবং এগুলিকে টার্বাইন দ্বারা চালু করা সম্ভব এবং কোনোরকম কন্ট্রোলার ছাড়াই এই সিস্টেমের যন্ত্রগুলি স্থির গতিতে শক্তি উৎপাদন করতে সক্ষম। এ ধরনের যন্ত্রকে প্রায়শই সাহিত্যে সিনক্রোনাস মেশিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

স্টেটর কয়েলকে গ্রিডের সাথে সংযুক্তকরণ এবং ইনভার্টার থেকে রোটরে এসি বিদ্যুৎ সরবরাহকরণের মাধ্যমেও এই যন্ত্রটি চালনা করা যেতে পারে। এখানে সুবিধাটি হচ্ছে একটি আংশিক রেটেড ইনভার্টারের সাহায্যে যন্ত্রের ঘূর্ণন গতিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যখন যন্ত্রটিকে এভাবে চালনা করা হয় তখন একে ব্রাশযুক্ত ডাবল ফিড "ইন্ডাকশন" মেশিন বলা হয়। এখানে "ইন্ডাকশন" শব্দটি বিভ্রান্তিকর কারণ এই যন্ত্রে তড়িৎ আবেশের মাধ্যমে উৎপন্ন কোনো কার্যকর বিদ্যুৎ নেই।

ইন্ডাকশন মেশিন[সম্পাদনা]

ইন্ডাকশন মেশিনগুলিতে শর্ট সার্কিটেড রোটর কয়েল থাকে যেখানে আবেশের মাধ্যমে বিদ্যুৎ প্রবাহ সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এখানে আবশ্যিক শর্ত হচ্ছে, রোটর সিনক্রোনাস গতির চেয়ে ভিন্ন গতিতে ঘুরতে হবে যাতে করে স্টেটর কয়েল দ্বারা সৃষ্ট পরিবর্তনশীল চৌম্বকক্ষেত্র রোটর কয়েলের উপর ক্রিয়াশীল হয়। ইন্ডাকশন মেশিন হচ্ছে এক ধরনের অ্যাসিনক্রোনাস মেশিন।

বৈদ্যুতিক যন্ত্রের একটি দুর্বল অংশ হচ্ছে ব্রাশের প্রয়োজনীয়তা এবং ইন্ডাকশন এই প্রয়োজনকে অপসারণ করেছে। পাশাপাশি ইন্ডাকশন মেশিনগুলির ডিজাইনগত দিকের কারণে, রোটর উৎপাদন করা অনেক বেশি সহজ হয়ে গিয়েছে। একটি ধাতব সিলিন্ডার রোটর হিসেবে কাজ করতে পারে, কিন্ত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সাধারণত "স্কুইরেল কেজ" রোটর অথবা বদ্ধ কুন্ডলীবিশিষ্ট রোটর ব্যবহৃত হয়ে থাকে। লোডের পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে অ্যাসিনক্রোনাস ইন্ডাকশন মেশিনের গতি কমতে থাকে কারণ রোটরে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিদ্যুৎ ও চৌম্বকক্ষেত্র স্থাপনের জন্য স্টেটর ও রোটরের মধ্যে একটি বড় গতিপার্থক্য প্রয়োজন। এসি গ্রিডের সাথে সংযুক্ত করে অ্যাসিনক্রোনাস ইন্ডাকশন মেশিন তৈরী সম্ভব যেখানে মেশিনগুলো কোনোরকম নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই চালিত হবে কিন্ত এক্ষেত্রে প্রারম্ভিক টর্ক খুব কম হয়।

ইন্ডাকশন মেশিনের একটি বিশেষ ক্ষেত্র হচ্ছে যখন রোটরে অতিপরিবাহী ব্যবহার করা হবে। তড়িৎ আবেশের ফলে অতিপরিবাহীতে বিদ্যুৎ তৈরী হবে কিন্ত রোটরটি সিনক্রোনাস গতিতে চলবে কারণ এক্ষেত্রে রোটরে বিদ্যুৎপ্রবাহ বজার রাখতে স্টেটরের চৌম্বকক্ষেত্র এবং রোটরের ঘূর্ণনের মধ্যে কোনোরকম গতিপার্থক্যের প্রয়োজনীয়তা নেই।

আর একটি বিশেষ উদাহরণ হল ব্রাশবিহীন ডাবল ফেড ইন্ডাকশন মেশিন, যার স্টেটরে একটি ডাবল সেট কয়েল রয়েছে। যেহেতু এর স্টেটরে দুটি গতিশীল চৌম্বক ক্ষেত্র রয়েছে সুতরাং এক্ষেত্রে সিনক্রোনাস বা অ্যাসিনক্রোনাস গতি সম্পর্কে বলাটা নিরর্থক।

রিলাকটেন্স মেশিন[সম্পাদনা]

রিলাকটেন্স মেশিনগুলির রোটরে কোনো তারকুন্ডলী থাকে না, শুধু একটি ফেরোম্যাগনেটিক পদার্থ এমনভাবে গঠিত থাকে যেন স্টেটরে থাকা "তড়িতচুম্বকগুলো" রোটরের দাঁতগুলোকে আঁকরিয়ে ধরতে পারে এবং এটি সামান্য অগ্রসর হতে পারে। এরপর এই তড়িতচুম্বকগুলোকে বন্ধ করা হয়, অন্যদিকে আরো এক সেট তড়িতচুম্বক চালু করা হয় এবং রোটরটি আরো কিছুটা অগ্রসর হয়। এছাড়া আছে স্টেপ মোটর যা ধীর গতি ও সঠিক অবস্থান নিয়ন্ত্রণের জন্য উপযুক্ত। কর্মক্ষমতা উন্নতির জন্য রিলাকটেন্স মেশিনগুলোর স্টেটরে স্থায়ী চুম্বক স্থাপন করা যেতে পারে। এরপর কয়েলে ঋণাত্মক বিদ্যুৎ প্রেরণের মাধ্যমে "তড়িতচুম্বক" বন্ধ করা হয়। যখন বিদ্যুতের মান ধনাত্মক তখন চুম্বক এবং বিদ্যুৎ একসাথে একটি অধিক শক্তিশালি চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে যা কারেন্টের সর্বোচ্চ পরম মান বৃদ্ধি না করেই মেশিনের সর্বোচ্চ টর্ককে আরো উন্নত করে।

ইলেকট্রোস্ট্যাটিক মেশিন[সম্পাদনা]

ইলেকট্রোস্ট্যাটিক মেশিনে, রোটর এবং স্টেটরে থাকা বৈদ্যুতিক চার্জের আকর্ষণ ও বিকর্ষণ বল দ্বারা টর্ক সৃষ্টি হয়।

ইলেকট্রোস্ট্যাটিক জেনারেটর বৈদ্যুতিক চার্জ গঠনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। শুরুর দিকের মেশিনগুলি ছিল ঘর্ষণ মেশিন, পরবর্তীতে আসলো ইলেকট্রোস্ট্যাটিক ইন্ডাকশন দ্বারা প্রভাবিত মেশিনগুলি। ভ্যান ডি গ্রাফ জেনারেটর হচ্ছে একটি ইলেকট্রোস্ট্যাটিক জেনারেটর যা আজও বিভিন্ন গবেষণামূলক কাজে ব্যবহৃত হয়।

হোমোপোলার মেশিন[সম্পাদনা]

হোমোপোলার মেশিন হচ্ছে সত্যিকারের ডিসি মেশিন যেখানে ব্রাশের মাধ্যমে একটি ঘূর্ণনশীল চাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। চাকাটি একটি চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে স্থাপন করা হয় এবং চাকাটির কিনারা থেকে কেন্দ্রে চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহের ফলে টর্ক সৃষ্টি হয়।

বৈদ্যুতিক যন্ত্র পদ্ধতি[সম্পাদনা]

বৈদ্যুতিক যন্ত্রসমূহের নিখুঁত অথবা ব্যবহারিক প্রয়োগের জন্য, আজকের দিনের বৈদ্যুতিক যান্ত্রিক পদ্ধতির পরিপূরক হচ্ছে ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • চ্যাপম্যান, স্টিফেন জে। 2005। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি মৌলিক। ৪ র্থ এড। নিউ ইয়র্ক: ম্যাকগ্রা হিল।
  1. Flanagan. Handbook of Transformer Design and Applications, Chap. 1 p1.
  2. Fundamentals of Electric Circuits। McGraw Hill Education। ২০০৭। পৃষ্ঠা 568 

আরও পড়া[সম্পাদনা]

  • চিসাম, হিউ, সম্পাদক (১৯১১)। "Electrical Machine"। ব্রিটিশ বিশ্বকোষ9 (১১তম সংস্করণ)। কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস। পৃষ্ঠা 176–179। [[বিষয়শ্রেণী:উইকিসংকলনের তথ্যসূত্রসহ ১৯১১ সালের এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা থেকে উইকিপিডিয়া নিবন্ধসমূহে উদ্ধৃতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে]] This has a detailed survey of the contemporaneous history and state of electric machines.