বেলুচ জাতীয়তাবাদ

বেলুচ জাতীয়তাবাদ বা বালুচ জাতীয়তাবাদ (বেলুচি: بلۏچی راجدۏستی) হলো একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক মতবাদ। এই মতবাদ অনুসারে ইরান, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে বসবাসকারী ইরানীয় জাতিগোষ্ঠী বেলুচদের একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে গণ্য করা হয়।
বেলুচ জাতীয়তা ও জাতীয়তাবাদ
[সম্পাদনা]বেলুচরা মূলত ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে বসবাসকারী একটি ইরানীয় জাতিগোষ্ঠী।
বেলুচ জাতীয়তাবাদের পরিধি বেশ বিস্তৃত। এটি ক্ষুদ্র পরিসরে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকারের দাবি থেকে শুরু করে বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন, এমনকি বেলুচ-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো নিয়ে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম বেলুচিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা পর্যন্ত প্রকাশ করে। এই আন্দোলনটি মূলত ধর্মনিরপেক্ষ এবং শুরুর দিকে এটি মার্ক্সবাদী–লেনিনবাদী স্বাধীনতা আন্দোলন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল।[১]
এই আন্দোলনে ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সুইডেন, নরওয়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে বসবাসকারী প্রবাসী বেলুচদের সমর্থন রয়েছে বলে জানা যায়। পাকিস্তান প্রায়শই অভিযোগ করে থাকে যে, বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের এই আন্দোলনে ভারতের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে।[২] তবে ভারত বরাবরই এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।[৩] একইভাবে, আফগানিস্তানও বেলুচ জাতীয়তাবাদী বিদ্রোহীদের গোপনে সমর্থন দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে। ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে আফগানিস্তান প্রজাতন্ত্র বেলুচ বিদ্রোহীদের আশ্রয় দিয়েছিল। বেলুচ বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ দিতে এবং তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করতে আফগানিস্তান প্রজাতন্ত্র কান্দাহারে প্রশিক্ষণ শিবির স্থাপন করেছিল।[৪][৫] ইরাকের বাথবাদী ইরাকি সরকার ইরানে সক্রিয় বেলুচ গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করত। কিন্তু পাহলভি ইরানের শাহ যখন ইরাকে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করা বন্ধ করে দেন, তখন ইরাকও বেলুচদের সমর্থন দেওয়া বন্ধ করে দেয়।[৬]
আধুনিক বেলুচ জাতীয়তাবাদের ইতিহাস
[সম্পাদনা]
আধুনিক বেলুচ জাতীয়তাবাদের সূত্রপাত ঘটে ইউসুফ আজিজ মাগসি ও আব্দুল আজিজ কুর্দ প্রমুখের নেতৃত্বে ১৯২৯ সালে মাস্তুংয়ে আঞ্জুমান-এ ইত্তিহাদ-এ বালুচান ও বালুচিস্তান (এআইবি) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।[৭] ১৯২৯ সালের নভেম্বর মাসে ইউসুফ আজিজ মাগসি তার প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যগুলো নিয়ে একটি প্রবন্ধে লিখেন, যেগুলো হলো:
- বেলুচিস্তানের একীকরণ ও স্বাধীনতা;
- ইসলামি আদর্শভিত্তিক গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা;
- সর্দারি-জির্গা ব্যবস্থার অবলুপ্তি;
- বেলুচদের জন্য বিনামূল্যের বাধ্যতামূলক শিক্ষা এবং নারীদের জন্য সমানাধিকার;
- বেলুচি সংস্কৃতির বিকাশ।[৭][৮]
আঞ্জুমান প্রতিষ্ঠার সময়েই করাচির বেলুচি বুদ্ধিজীবীরা “বেলুচ লিগ” নামের একটি জাতীয়তাবাদী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।[৮]
১৯৩৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আঞ্জুমান পুনর্গঠন করে কালাত স্টেট ন্যাশনাল পার্টি (কেএসএনপি) গঠন করা যায়, যা স্বাধীন ও একীভূত বেলুচিস্তান রাষ্ট্র গঠনে আঞ্জুমান-এর উদ্দেশ্যকে ধারণ করে কাজ করতে থাকে। এরা কালাত খানাতের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারণা চালায়। কিন্তু কালাত ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়।[৮] গাউস বকশ বিজেনজো, মির গুল খান নাসির ও আব্দুল আজিজ কুর্দের মতো অধিকতর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও জনতোষণবাদী নেতারা পার্টিতে প্রভাবশালী ছিলেন। কালাতে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে, পার্টি উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।[৮]

২০১৭ সালে বিশ্ব বেলুচ সংস্থা (ডব্লিউবিও) লন্ডনের ট্যাক্সিতে বিজ্ঞাপন যুক্ত করে, যাতে #FreeBalochistan লেখাসহ “stop enforced disappearances” (গুম বন্ধ করো) এবং “save the Baloch people” (বেলুচদের বাঁচাও) প্রভৃতি স্লোগান যুক্ত ছিল। ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডন (টিএফএল) শুরুতে এর অনুমোদন দিলেও, পরবর্তীতে তা বাতিল করে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব ইসলামাবাদে অবস্থিত ব্রিটিশ হাইকমিশনারকে তলব করেন। বিশ্ব বেলুচ সংস্থা (ডব্লিউবিও) দাবি করে, পাকিস্তান সরকারের চাপে পড়ে লন্ডনের ট্যাক্সি থেকে তাদের বিজ্ঞাপন সরিয়ে ফেলা হয়।[৯]
সমীক্ষা
[সম্পাদনা]২০০৯ সালে পিউ রিসার্চ সেন্টার কর্তৃক পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, বেলুচিস্তানের ৫৮% বাসিন্দা নিজেদের প্রাথমিক পরিচয় হিসেবে “পাকিস্তানি” পরিচয়কে বেছে নিয়েছেন, যেখানে ৩২% নিজেকে “বেলুচি” হিসেবে পরিচয় দেন এবং ১০% উভয় পরিচয়কেই সমানভাবে দেখেন।[১০]
২০১২ সালে গ্যালাপ যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগের পক্ষে একটি সমীক্ষা চালায়। এতে দেখা যায়, বেলুচিদের মাত্র ৩৭% স্বাধীনতার পক্ষে। বেলুচিস্তানের পাঠানদের মধ্যে স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান আরও কম, মাত্র ১২%। অন্যদিকে, বেলুচিস্তানের ৬৭% জনগোষ্ঠী পাকিস্তানের অধীনে অধিকতর প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে।[১১][১২]
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]- বেলুচিস্তানে বিদ্রোহ
- বেলুচিস্তান মুক্তিবাহিনী (বিএলএ)
- বেলুচিস্তান লিবারেশন ফ্রন্ট (বিএলএফ)
- বেলুচ রিপাবলিকান গার্ডস (বিআরজি)
- পিপল'স ফাইটার্স ফ্রন্ট (পিএফএফ)
- জয়শ আল-আদল
- পাকিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন
- ইরানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ গ্রারে, ফ্রেডেরিক (১১ এপ্রিল ২০১৩)। "Balochistan: The State Versus the Nation"। কার্নেগি এনডোমেন্ট (ইংরেজি ভাষায়)।
- ↑ "India supporting Baluchistan violence: Pak" (ইংরেজি ভাষায়)। রেডিফ। ৬ জানুয়ারি ২০০৬। সংগ্রহের তারিখ ১৪ অক্টোবর ২০১৪।
- ↑ "US bails out India from Balochistan wrangle"। দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া (ইংরেজি ভাষায়)। ৩১ জুলাই ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ১৪ অক্টোবর ২০১৪।
- ↑ সির্স, ওয়েন (২০১৬)। Pakistan Inter-Services Intelligence Directorate: Covert Action and Internal Operations (ইংরেজি ভাষায়)। রুটলেস। আইএসবিএন ৯৭৮১৩১৭১৯৬০৮২।
- ↑ নিউটন, মাইকেল (২০১৪)। Famous Assassination in World History:An Encyclopedia (ইংরেজি ভাষায়)। এবিসি-সিএলআইও। আইএসবিএন ৯৭৮১৬১০৬৯২৮৬১।
By 1976, while proxy guerilla war with Pakistan, Daoud faced rising Islamic fundamentalists movement led by exiled cleric aided openly by Pakistani prime minister Zulfiqar Ali Bhutto.
- ↑ জংম্যান, এজে (২০১৭)। Political Terrorism: A New Guide to Actors, Authors, Concepts, Data Bases, Theories, and Literature। পৃ. ৫৭৮। আইএসবিএন ৯৭৮১৩৫১৪৯৮৬১৬।
- 1 2 খোসা, তারিক (২০ জুলাই ২০২০)। "Baloch Nationalism"। ডন (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১১ জানুয়ারি ২০২৩।
- 1 2 3 4 ব্রিসিগ, তাজ মোহাম্মদ (২০০৪)। Baloch Nationalism: Its Origin and Development (ইংরেজি ভাষায়)।
- ↑ মর্টিমার, ক্যারোলাইন (৬ নভেম্বর ২০১৭)। "TfL removes 'Free Balochistan' adverts from London black cabs after pressure from Pakistani government"। দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট (ইংরেজি ভাষায়)। যুক্তরাজ্য। সংগ্রহের তারিখ ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭।
- ↑ "Pakistani Public Opinion – Chapter 2. Religion, Law, and Society"। পিউ রিসার্চ সেন্টার (ইংরেজি ভাষায়)। ১৩ আগস্ট ২০০৯। ৬ মে ২০২৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
In Baluchistan, the southwestern territory with rugged terrain and sparse population, 32% say they identify themselves first by their ethnicity and 58% say they identify themselves first as Pakistanis.
- ↑ গ্রারে, ফ্রেডেরিক (১১ এপ্রিল ২০১৩)। "Balochistan: The State Versus the Nation"। কার্নেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস (ইংরেজি ভাষায়)। ১৯ আগস্ট ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
According to a July 2012 survey, only 37 percent of the Baloch favor independence, and a mere 12 percent of Balochistan's Pashtuns favor that option. However, 67 percent of the total population supports greater provincial autonomy.
- ↑ "Only 37% Baloch favour independence: UK survey"। খালিজ টাইমস (ইংরেজি ভাষায়)। ১৫ আগস্ট ২০১২। ১৯ আগস্ট ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
আরও পড়ুন
[সম্পাদনা]- হ্যারিসন, সেলিগ (১৯৮১)। In Afghanistan's Shadow: Baluch Nationalism and Soviet Temptations (ইংরেজি ভাষায়)। নিউইয়র্ক: কার্নেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস।
- হ্যারিসন, সেলিগ (শীতকাল ১৯৮০–১৯৮১)। "Baluch Nationalism and Superpower Rivalry"। ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি (ইংরেজি ভাষায়)। ৫ (৩): ১৫২–১৬৩। ২৫ অক্টোবর ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
- টিটাস, পল; সুইডলার, নিনা (ফেব্রুয়ারি ২০০০)। "Knights, Not Pawns: Ethno-Nationalism and Regional Dynamics in Post-Colonial Balochistan"। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মিডল ইস্ট স্টাডিজ (ইংরেজি ভাষায়)। ৩২ (১): ৪৭–৬৯। ৩১ জুলাই ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৯ আগস্ট ২০২৬।
{{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: বট: মূল ইউআরএলের অবস্থা অজানা (লিঙ্ক)
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]- গ্রারে, ফ্রেডরিক (জানুয়ারি ২০০৬)। "The Resurgence of Baluch Nationalism, Paper No. 65" (ইংরেজি ভাষায়)। কার্নেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস। ২৩ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১০ আগস্ট ২০২৬।
{{ওয়েব উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: বট: মূল ইউআরএলের অবস্থা অজানা (লিঙ্ক) - "Balochistan's history of insurgency" (ইংরেজি ভাষায়)। ৬ এপ্রিল ২০০৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১০ আগস্ট ২০২৬।
- "Pakistan: The Worsening Conflict in Balochistan, Asia Report No. 119" (ইংরেজি ভাষায়)। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ। ১৪ সেপ্টেম্বর ২০০৬।