বেরিকেন্দ্র

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

বেরিকেন্দ্র নামে পরিচিত একটি সাধারণ অক্ষ রয়েছে, যার সাপেক্ষে পৃথিবী এবং চন্দ্রের ঘূর্ণনের হয়। যার ফলে যে মহাকর্ষীয় আকর্ষণ এবং কেন্দ্রবিমুখী বল সৃষ্টি হয়, তা পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির জন্য অনেকটাই দায়ী।

-জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির জন্য যে পরিমাণ শক্তি শোষিত হয় তার কারণে বেরিকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে পৃথিবী-চাঁদের যে কক্ষপথ রয়েছে তাতে বিভব শক্তি কমে যায়। এর কারণে এই দুটি জ্যোতিষ্কের মধ্যে দূরত্ব প্রতি বছর ৩.৮ সেন্টিমিটার বেড়ে যায়।

-যতদিন না পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটার ওপর চাঁদের প্রভাব সম্পূর্ণ প্রশমিত হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত চাঁদ দূরে সরে যেতেই থাকবে এবং যেদিন প্রশমনটি ঘটবে সেদিনই চাঁদের কক্ষপথ স্থিরতা পাবে।

-গড় ব্যাসার্ধ- ১,৭৩৭.১০৩ কিমি (পৃথিবীর ০.২৭৩ গুণ)

-বিষুবীয় ব্যাসার্ধ- ১,৭৩৮.১৪ কিমি (পৃথিবীর ০.২৭৩ গুণ)

-মেরু ব্যাসার্ধ- ১,৭৩৫.৯৭ কিমি (পৃথিবীর ০.২৭৩ গুণ)

-পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল- ৩.৭৯৩.১০৭ কিমি (পৃথিবীর ০.০৭৪ গুণ)

-আয়তন- ২.১৯৫৮.১০১০ কিমি (পৃথিবীর ০.০২০ গুণ)

জোয়ার-ভাটা[সম্পাদনা]

সমুদ্র ও উপকূলবর্তী নদীর জলরাশি প্রতিদিন কোন একটি সময়ে ধীরে ধীরে ফুলে ওঠে ও আবার কিছুক্ষণ পরে আবার তা ধীরে ধীরে নেমে যায়। জলরাশির এরকম ফুলে ওঠাকে জোয়ার (Tide) বা নেমে যাওয়াকে ভাটা ( Ebb )বলে

পৃথিবীর বাইরের মহাকর্ষীয় শক্তি (বিশেষ করে চাঁদ) প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি নিয়মিত বিরতিতে ফুলে ওঠাকে জোয়ার ও নেমে যাওয়ার ঘটনাকে ভাঁটা (একত্রে জোয়ার-ভাটা) বলা হয়। জোয়ার-ভাটার ফলে সমুদ্রে যে তরঙ্গের সৃষ্টি হয়, তাকে জোয়ার তরঙ্গ (tidal waves) বলে। জোয়ারের পানি উপকূলের দিকে অগ্রসর হলে পানি সমতলের যে উত্থান ঘটে, তাকে জোয়ারের পানির সর্বোচ্চ সীমা (high tide water) এবং ভাটার পানি সমুদ্রের দিকে নেমে যাওয়ার সময় পানি সমতলের যে পতন ঘটে, তাকে জোয়ারের পানির সর্বনিম্ন সীমা (low tide water) বলে।

জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির প্রধান কারণ হল-

·        সূর্য ও প্রধানত চাঁদ দ্বারা পৃথিবীর ওপর প্রযুক্ত মহাকর্ষ বল।

·        পৃথিবীর ওপর কার্যকরী অভিকেন্দ্র বল।

পৃথিবীর যে পাশে চাঁদ থাকে সে পাশে চাঁদ দ্বারা পৃথিবীপৃষ্ঠের সমুদ্রের জল তার নিচের মাটি অপেক্ষা বেশি জোরে আকৃষ্ট হয়। এ কারণে চাঁদের দিকে অবস্থিত জল বেশি ফুলে উঠে। একই সময়ে পৃথিবীর যে অংশ চাঁদের বিপরীত দিকে থাকে, সেদিকের সমুদ্রের নিচের মাটি তার উপরের জল অপেক্ষা চাঁদ কর্তৃক বেশি জোরে আকৃষ্ট হয়। আবার চাঁদ থেকে জলের দূরত্ব মাটি অপেক্ষা বেশি থাকায় জলের উপর চাঁদের আকর্ষণ কম থাকে। ফলে সেখানকার জলও ফুলে উঠে। ফলে একই সময়ে চাঁদের দিকে এবং চাঁদের বিপরীত দিকে পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠের জলের এই ফুলে উঠাকে জোয়ার বলে।

আবার পৃথিবী ও চাঁদের ঘুর্ণনের কারণে একসময় ফুলে ওঠা জল নেমে যায়। জলের এই নেমে যাওয়াকে ভাটা বলে। পৃথিবী যে সময়ের মধ্যে নিজ অক্ষের চারদিকে একবার আবর্তন করে (এক দিনে) সে সময়ের মধ্যে পৃথিবীর যেকোন অংশ একবার চাঁদের দিকে থাকে এবং একবার চাঁদের বিপরীত দিকে থাকে। এ কারণে পৃথিবীর যেকোন স্থানে দুইবার জোয়ার এবং দুইবার ভাটা হয়।

জোয়ার-ভাটার জন্য সূর্যের আকর্ষণও অনেকাংশে দায়ী। তবে অনেক দূরে থাকায় সূর্যের আকর্ষণ চাঁদের আকর্ষণের থেকে কম কার্যকর। সূর্য এবং চাঁদ যখন সমসূত্রে পৃথিবীর একই দিকে বা বিপরীত দিকে অবস্থান করে তখন উভয়ের আকর্ষণে সর্বাপেক্ষা উঁচু জোয়ার হয়, জোয়ারের জল বেশি ছাপিয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে ভরা কাটাল বা উঁচু জোয়ার বলা হয়। আর পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্য এবং চাঁদের মধ্য কৌণিক দূরত্ব যখন এক সমকোণ পরিমাণ হয় তখন একের আকর্ষণ অন্যের আকর্ষণ দ্বারা প্রশমিত হয়। তাই সবচেয়ে নিচু জোয়ার হয় যাকে মরা কাটাল বলে আখ্যায়িত করা হয়।

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা[সম্পাদনা]

নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র অনুযায়ী মহাকাশের বিভিন্ন গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র একে অপরকে আকর্ষণ করে। এমনি ভাবে সূর্য ও চাঁদ পৃথিবীকে আকর্ষণ করে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, পৃথিবীর উপর সূর্য অপেক্ষা চাঁদের আকর্ষণ বল বেশী হয়। কেননা সূর্যের ভর চাঁদের ভরের চেয়ে কম হলেও চাঁদ সূর্যের চেয়ে পৃথিবীর নিকটে অবস্থান করে। তাই, চাঁদের আকর্ষণেই প্রধানত সমুদ্রের জল ফুলে ওঠে ও জোয়ার হয়।পৃথিবী ও চাঁদের ঘূর্ণনের কারণে চাঁদ পৃথিবী থেকে দূরে সরে গেলে ফুলে ওঠা পানি নেমে যায়। পানির এই নেমে যাওয়াকে ভাটা বলে। পৃথিবী যে সময়ের মধ্যে নিজ অক্ষের চারদিকে একবার আবর্তন করে (এক দিনে) সে সময়ের মধ্যে পৃথিবীর যেকোন অংশ একবার চাঁদের দিকে থাকে এবং আরেকবার চাঁদের বিপরীত দিকে থাকে। এ কারণে পৃথিবীর যেকোন স্থানে দুইবার জোয়ার এবং দুইবার ভাটা হয়।

সূর্যের আকর্ষণে জোয়ার ততটা জোরালো হয় না। তবে চাঁদ ও সূর্য একই সরলরেখায় অবস্থান করলে উভয়ের আকর্ষণে জোয়ার অনেক প্রবল হয়। সূর্য এবং চাঁদ যখন পৃথিবীর একই দিকে বা বিপরীত দিকে অবস্থান করে তখন উভয়ের আকর্ষণে সর্বাপেক্ষা উঁচু জোয়ার হয় ও  জোয়ারের পানি বেশি ছাপিয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে ভরা কাটাল বা উঁচু জোয়ার বলা হয়। আর পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্য এবং চাঁদের মধ্য কৌণিক দূরত্ব যখন এক সমকোণ পরিমাণ হয় তখন একের আকর্ষণ অন্যের আকর্ষণ দ্বারা প্রশমিত হয়। তাই, সবচেয়ে নিচু জোয়ার হয় যাকে মরা কাটাল বলা হয়।  

আমরা জানি, পৃথিবী তার নিজ মেরুরেখার চারিদিকে অনবরত ঘুরে। এই আবর্তনের কারণে বিকর্ষণ শক্তির সৃষ্টি হয়। এই বিকর্ষণ শক্তির প্রভাবে পৃথিবীর প্রতিটা বস্তু মহাকর্ষ শক্তির বিপরীত দিকে ছিটকে যায়। এই বিকর্ষণ শক্তির প্রভাবে যেখানে জোয়ারের সৃষ্টি হয় তার বিপরীত দিকে সমুদ্রের জল বিক্ষিপ্ত হয়েও জোয়ারের উদ্ভব হয়।

জোয়ার ভাটার শ্রেণীবিভাগ[সম্পাদনা]

১. মুখ্য জোয়ার: আবর্তনকালে পৃথিবীর যে অংশ চাঁদের সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী হয়, সেখানে চাঁদের সর্বাধিক মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে সৃষ্টি হয়।

২. গৌণ জোয়ার: মুখ্য জোয়ারের প্রতিপদ স্থানে মূলত কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাবে সৃষ্টি হয়।

৩. ভরা কোটাল: আবর্তনকালে পূর্ণিমা ও অমাবস্যা তিথিতে যখন সূর্য, চন্দ্র ও পৃথিবী এক সরলরেখায় অবস্থান (সিজিগি) করে তখন যে জোয়ারের সৃষ্টি হয়। এই সিজিগি অবস্থান মূলত দু’ধরনের—

ক. সংযোগ: অমাবস্যা তিথিতে চাঁদ ও সূর্যের পৃথিবীর একই দিকে সরল রৈখিক অবস্থান। তাই পূর্ণিমার দিন অপেক্ষা অমাবস্যার দিনে জোয়ারের বেগ সর্বাধিক হয়।

খ. প্রতিযোগ: পূর্ণিমা তিথিতে সরলরৈখিকভাবে সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে পৃথিবী অবস্থান করে।

৪. মরা কোটাল: কৃষ্ণ ও শুক্ল পক্ষের অষ্টমী তিথিতে পৃথিবীর সঙ্গে চাঁদ ও সূর্যের সমকৌণিক অবস্থানের ফলে চাঁদ ও সূর্যের আকর্ষণ পরস্পর বিরোধী হওয়ায় সৃষ্ট কম তীব্র জোয়ার।

৫. অ্যাপোজি জোয়ার: চাঁদের কেন্দ্র যখন পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে সবচেয়ে দূরে থাকে (৪,০৭,০০০ কিমি) অর্থাৎ অ্যালোগি অবস্থানে সৃষ্ট কম প্রাবল্যের জোয়ার।

৬. পেরিজি জোয়ার: চাঁদের কেন্দ্র যখন পৃথিবীর কেন্দ্রের সবচেয়ে কাছে থাকে (৩,৫৬,০০০ কিমি) অর্থাৎ পেরিজি অবস্থানে সৃষ্ট অত্যন্ত প্রবল জোয়ার।

 জোয়ার ভাটার ব্যবধান: যে দ্রাঘিমা রেখাটি চাঁদের সামনে আছে, ২৪ ঘণ্টা পরে ৩৬০° অতিক্রম করে সেই দ্রাঘিমা রেখাটি তার পূর্ব অবস্থানে ফিরে আসার মধ্যে চাঁদ ১৩° পথ এগিয়ে যায়। ওই দ্রাঘিমা রেখাটিকে পুনরায় চাঁদের সামনে আসতে অতিরিক্ত ৫২ মিনিট সময় (১° অতিক্রম করতে ৪ মিনিট সময়) লাগে। তাই পৃথিবীর কোনও নির্দিষ্ট স্থানে প্রত্যেক মুখ্য বা গৌণ জোয়ারের পরবর্তী মুখ্য বা গৌণ জোয়ার ২৪ ঘণ্টা ৫২ মিনিট পরে হয়।

 বান ডাকা: ভরাকোটালের সময় সমুদ্রের জল নদীর মোহনা দিয়ে নদী প্রবাহের বিপরীত দিকে নদীখাতের মধ্য দিয়ে প্রবল জলোচ্ছ্বাস ঘটিয়ে প্রবেশ করাকে বান ডাকা বলে।

সুবিধা ও অসুবিধা[সম্পাদনা]

সুবিধা—

ক. সমুদ্রগামী জাহাজগুলি নদী বন্দরে ঢুকতে পারে,

খ. নদীজল স্বচ্ছ ও পরিষ্কার থাকে

গ. নদী মোহনা পলিযুক্ত হয়

ঘ. বিদ্যুৎ উৎপাদনে সুবিধা হয়।

 অসুবিধা—

ক. নদীর জল লবণাক্ত হয়,

খ. নৌকাডুবির আশঙ্কা থাকে।