বেবি টক
বেবি টক (সিডিএস), যা সাধারণ মানুষের কাছে আধো-আধো বুলি (বেবি টক) নামে পরিচিত, হলো এমন এক ধরনের বিশেষ বাকরীতি বা বাচনভঙ্গি যা মূলত কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি শিশু বা নবজাতকের সাথে কথা বলার সময় ব্যবহার করেন।[১] ভাষাবিজ্ঞানের ভাষায় একে 'কেয়ারগিভার রেজিস্টার', 'মাদারিজ' বা 'প্যারেন্টিজ' নামেও অভিহিত করা হয়।[২]
এই বিশেষ ভাষাটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ছন্দময় এবং সুরের মতো বাচনভঙ্গি । অন্যান্য প্রাপ্তবয়স্কদের সাথে কথা বলার সময় মানুষের কণ্ঠস্বর সাধারণত একঘেয়ে বা গম্ভীর থাকলেও, শিশুদের সাথে কথা বলার সময় তা অধিক তীক্ষ্ণ এবং ধীরগতির হয়।[৩] এছাড়া এতে শব্দগুলো ছোট এবং সহজতর করে উপস্থাপন করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই পদ্ধতিতে স্বরবর্ণের অতি-সুস্পষ্ট উচ্চারণ করা হয়, যা শিশুদের দ্রুত ভাষা শিখতে সাহায্য করে।[৪]
পরিভাষা
[সম্পাদনা]'অক্সফোর্ড ইংরেজি অভিধান' অনুযায়ী, 'বেবি টক' শব্দটির প্রথম ব্যবহার পাওয়া যায় ১৮৩৬ সালে।
শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞদের কাছে 'মাদারিজ' বা 'প্যারেন্টিজ' শব্দগুলো অধিক পরিচিত। তবে লিঙ্গ সমতার প্রেক্ষিতে বর্তমানে 'প্যারেন্টিজ' শব্দটি বেশি ব্যবহৃত হয়, কারণ মা-বাবা ছাড়াও অন্য সেবাদানকারীরাও শিশুদের সাথে এই একই ভঙ্গিতে কথা বলেন।
গবেষক এবং মনোবিজ্ঞানীরা সাধারণত 'চাইল্ড-ডিরেক্টেড স্পিচ' (সিডিএস) পরিভাষাটিকেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন।
বৈশিষ্ট্যসমূহ
[সম্পাদনা]বেবি টক হলো শিশুদের সাথে যোগাযোগের একটি পরিষ্কার এবং সরলীকৃত কৌশল। এতে সীমিত শব্দভাণ্ডার ব্যবহার করা হয় এবং প্রতিটি বাক্যের মাঝে দীর্ঘ বিরতি দেওয়া হয়। ব্যাকরণগতভাবে বাক্যগুলো হয় ছোট এবং প্রায়শই একই কথা বারবার বলা হয়।[৫] শিশুদের সাথে কথা বলার সময় প্রাপ্তবয়স্করা মূলত তিন ধরণের পরিবর্তন আনেন:[৬]
- ভাষাগত পরিবর্তন: বিশেষ করে ধ্বনিবিদ্যার পরিবর্তন, যেখানে শব্দগুলো সহজ করা হয় এবং নির্দিষ্ট কিছু ধ্বনির ওপর জোর দেওয়া হয়।
- মনোযোগ আকর্ষণ কৌশল: শিশুর দৃষ্টি ধরে রাখার জন্য শারীরিক ভাষা এবং মুখভঙ্গির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটানো হয়।
- পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া: অভিভাবকরা কেবল ভাষা শেখানোর জন্যই নয়, বরং শিশুর সাথে একটি গভীর ও ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য এই বাচনভঙ্গি ব্যবহার করেন।
উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব
[সম্পাদনা]নবজাতকদের ক্ষেত্রে ব্যবহার
[সম্পাদনা]গবেষণায় দেখা গেছে যে, জন্মের পর থেকেই শিশুরা সাধারণ কথার চেয়ে এই বিশেষ বাচনভঙ্গি বা সিডিএস শুনতে বেশি পছন্দ করে। এটি তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে এবং তা বজায় রাখতে অনেক বেশি কার্যকর। কিছু গবেষক মনে করেন, এটি মা-বাবা এবং সন্তানের মধ্যে আবেগীয় বন্ধন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অফ উইসকনসিনের গবেষণায় দেখা গেছে যে, মৌলিক 'বেবি টক' শিশুদের দ্রুত শব্দ শিখতে সাহায্য করে।[৭]
যেসব শিশু সবচেয়ে বেশি উৎসাহ এবং সাড়া পায়, তারা অন্যদের তুলনায় দ্রুত ভাষা শিখতে পারে। এছাড়া এটি শিশুদের মুখের অভিব্যক্তি বুঝতে সাহায্য করার একটি মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, বিষণ্ণতায় আক্রান্ত মায়েদের সন্তানরা অনেক সময় ভাষা শিখতে দেরি করে, কারণ তাদের মায়েরা নিয়মিত এই বিশেষ বাচনভঙ্গি ব্যবহার করেন না।[৮]
অ-শিশুদের ক্ষেত্রে ব্যবহার
[সম্পাদনা]এই বাচনভঙ্গি কেবল শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতিতেও ব্যবহৃত হতে পারে।
অমর্যাদাকর ব্যবহার
[সম্পাদনা]কখনো কখনো একজন প্রাপ্তবয়স্ক অন্যজনের সাথে অবজ্ঞাভরে বা ছোট করার উদ্দেশ্যে শিশুর মতো করে কথা বলতে পারেন। একে এক ধরণের মৌখিক নিগ্রহ হিসেবে গণ্য করা হয়, যার মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে দুর্বল বা বুদ্ধিহীন প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়।
প্রেমপূর্ণ বা আদিখ্যেতাযুক্ত ব্যবহার
[সম্পাদনা]যৌন বা রোমান্টিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সঙ্গীরা একে অপরের প্রতি গভীর অনুরাগ প্রকাশের জন্য অনেক সময় শিশুর মতো আদুরে ভাষায় কথা বলেন। এটি অন্তরঙ্গতার একটি বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হয়।[৯]
পোষা প্রাণীর সাথে কথা বলা
[সম্পাদনা]অনেকে তাদের পোষা কুকুর বা বিড়ালের সাথে এমনভাবে কথা বলেন যেন তারা অন্য কোনো মানুষ। একে অনেক সময় 'ডগেরেল' বলা হয়।[১০] পোষা প্রাণীর সাথে কথা বলার সময় মানুষ সাধারণত বর্তমান কাল ব্যবহার করে এবং ছোট ছোট বাক্যে কথা বলে।
বিশ্বজনীনতা এবং আঞ্চলিক পার্থক্য
[সম্পাদনা]গবেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন যে, শিশুদের সাথে এই বিশেষ ভঙ্গিতে কথা বলা প্রতিটি সংস্কৃতিরই একটি সহজাত অংশ।[১১] তবে এর বিরোধিতাকারী গবেষকরা বলেন যে, বিশ্বের সকল সংস্কৃতিতে এটি সমানভাবে প্রচলিত নয়। যেমন- পাপুয়া নিউগিনির 'কালুলি' উপজাতি এবং সামোয়ার কিছু গোত্রের মানুষ শিশুদের সাথে আলাদা কোনো ভঙ্গিতে কথা বলেন না। তারা বিশ্বাস করেন শিশুদের ভাষা শেখার সহজাত ক্ষমতা রয়েছে এবং প্রাপ্তবয়স্কদের সাথে কথা বলেই তারা তা রপ্ত করবে।
শব্দভাণ্ডার ও গঠন
[সম্পাদনা]ইংরেজিসহ অধিকাংশ ভাষার ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, শিশুদের সাথে কথা বলার সময় ছোট এবং আদিম উৎসের শব্দগুলো বেশি ব্যবহৃত হয়। ল্যাটিনজাত বা জটিল শব্দের পরিবর্তে মা-বাবারা সহজবোধ্য শব্দ ব্যবহার করেন। যেমন- পানির পরিবর্তে 'ম্যাম' বা 'ওয়াহ-ওয়াহ', খাওয়ার পরিবর্তে 'নাম-নাম' ইত্যাদি। এই শব্দগুলো অনেক সময় মা-বাবারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেন অথবা বংশপরম্পরায় চলে আসে।
শব্দদ্বৈত বা দ্বিত্ব
[সম্পাদনা]বেবি টক অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো একই শব্দের বারবার উচ্চারণ। যেমন- মা-মা, বাবা-বা, হিস-হিস, পি-পি ইত্যাদি। এগুলো মূলত শিশুর প্রথম উচ্চারিত শব্দগুলোর অনুকরণেই তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রাণীর ডাককে দ্বিত্ব শব্দের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়, যেমন-'মু-মু' (গরু) বা 'ভউ-ভউ' (কুকুর)।
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Kubaník, Pavel (২০১৭)। "BABY TALK"। Karlík, Petr; Nekula, Marek; Pleskalová, Jana (সম্পাদকগণ)। Nový encyklopedický slovník češtiny (চেক ভাষায়)।
- ↑ Matychuk, Paul (মে ২০০৫)। "The role of child-directed speech in language acquisition: a case study"। Language Sciences। ২৭ (3): ৩০১–৩৭৯।
- ↑ Fernald, Anne (এপ্রিল ১৯৮৫)। "Four-month-old infants prefer to listen to motherese"। Infant Behavior and Development। ৮ (2): ১৮১–১৯৫।
- ↑ Lam, C; Kitamura, C (২০১২)। "Mommy, speak clearly: induced hearing loss shapes vowel hyperarticulation"। Developmental Science। ১৫ (2): ২১২–২২১। পিএমআইডি 22356177।
- ↑ Harley, Trevor (২০১০)। Talking the Talk: Language, Psychology and Science। Psychology Press। পৃ. ৬০–৬২। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৮৪১৬৯-৩৩৯-২।
- ↑ McLeod, Peter J. (১৯৯৩)। "What studies of communication with infants ask us about psychology: Baby-talk and other speech registers."। Canadian Psychology। ৩৪ (3): ২৮২–২৯২। ডিওআই:10.1037/h0078828।
- ↑ Boyles, Salynn (১৬ মার্চ ২০০৫)। "Baby Talk May Help Infants Learn Faster"। WebMD।
- ↑ Kaplan, Peter S.; Dungan; Jessica K.; Zinser; Michael C. (২০০৪)। "Infants of Chronically Depressed Mothers Learn in Response to Male, But Not Female, Infant-Directed Speech."। Developmental Psychology। ৪০ (2): ১৪০–১৪৮। পিএমআইডি 14979756।
- ↑ Leon F Seltzer Ph.D (২০১৩)। "The Real Reason Why Couples Use Baby Talk"। Psychology Today।
- ↑ Hirsh-Pasek; Treiman; Rebecca (১৯৮২)। "Doggerel: motherese in a new context"। Journal of Child Language। ৯ (1): ২২৯–২৩৭।
- ↑ Grieser, DiAnne L.; Kuhl, Patricia K. (১৯৮৮)। "Maternal speech to infants in a tonal language: Support for universal prosodic features in motherese."। Developmental Psychology। ২৪ (1): ১৪–২০।
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]আধো-আধো বুলির ব্যবহার ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ তারিখে - এরিক ক্লিয়ারিংহাউস অন ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড লিঙ্গুইস্টিকস।