বিষয়বস্তুতে চলুন

বেনিতো মুসোলিনির মৃত্যু

স্থানাঙ্ক: ৪৫°৫৮′৫২″ উত্তর ৯°১২′১২″ পূর্ব / ৪৫.৯৮১১১° উত্তর ৯.২০৩৩৩° পূর্ব
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মুসোলিনি এবং তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী
বেনিতো মুসোলিনি (১৮৮৩  ১৯৪৫)
ওয়াল্টার অডিসিও, সেই ইতালীয় পার্টিজান যাকে সাধারণভাবে মুসোলিনির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী হিসেবে মনে করা হয় (১৯৬৩ সালের ছবি)

বেনিতো মুসোলিনি (২৯ জুলাই ১৮৮৩ – ২৮ এপ্রিল ১৯৪৫) ছিলেন একজন ইতালীয় রাজনীতিবিদ এবং সাংবাদিক।ইতালির ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিবাদী একনায়ক বেনিতো মুসোলিনি ১৯৪৫ সালের ২৮ এপ্রিল উত্তর ইতালির জিউলিনো দি মেজেগ্রা গ্রামে একজন ইতালীয় পার্টিজানের হাতে সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। সাধারণভাবে গৃহীত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মুসোলিনিকে গুলি করে হত্যা করেন কমিউনিস্ট পার্টিজান ওয়াল্টার অডিসিও। তবে যুদ্ধের পর থেকে মুসোলিনির মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা এবং হত্যাকারীর পরিচয় নিয়ে ইতালিতে বিতর্ক ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।

১৯৪০ সালে মুসোলিনি তার দেশকে নাৎসি জার্মানির পক্ষ নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করান, কিন্তু শীঘ্রই তার সেনাবাহিনী সামরিক ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়। ১৯৪৩ সালের শেষার্ধে তিনি উত্তর ইতালিতে জার্মান নিয়ন্ত্রিত একটি তাবেদার রাষ্ট্রের প্রধান হয়ে পড়েন এবং একদিকে মিত্রশক্তির অগ্রযাত্রা ও অন্যদিকে পার্টিজানদের ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধের মুখে পড়েন। ১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাসে যখন মিত্রশক্তি উত্তর ইতালিতে জার্মান বাহিনীর প্রতিরক্ষা ভেদ করছিল এবং শহরগুলোতে পার্টিজানদের বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছিল তখন মুসোলিনির অবস্থান বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ২৫ এপ্রিল, তিনি মিলান থেকে পালিয়ে সুইস সীমান্তের দিকে রওনা হন। ২৭ এপ্রিল তিনি ও তার প্রেমিকা ক্লারেটা পেতাচ্চি উত্তর ইতালির ডোঙ্গো গ্রামে পার্টিজানদের হাতে ধরা পড়েন। পরদিন বিকেলে, তাদের দুজনকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় যা হিটলারের আত্মহত্যার দুই দিন আগে ঘটে।

মুসোলিনি ও পেতাচ্চির মৃতদেহ মিলানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পিয়াজ্জালে লোরেতো নামক একটি জনবহুল স্কয়ারে রেখে দেওয়া হয় যেখানে ক্ষুব্ধ জনতা তাদের দেহের প্রতি অবমাননাকর আচরণ করে। পরে একটি গ্যাস স্টেশনের ধাতব বিমের ওপর তাদের দেহ উল্টো করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। প্রথমদিকে মুসোলিনিকে একটি অচিহ্নিত কবরস্থানে সমাহিত করা হয়েছিল, কিন্তু ১৯৪৬ সালে তার মৃতদেহ ফ্যাসিবাদী সমর্থকদের দ্বারা চুরি হয়ে যায়। চার মাস পর কর্তৃপক্ষ তার দেহ উদ্ধার করে এবং ১১ বছর ধরে গোপন স্থানে সংরক্ষণ করে। অবশেষে, ১৯৫৭ সালে তার দেহ প্রেদাপ্পিও শহরে মুসোলিনি পরিবারের সমাধিস্থলে পুনরায় সমাহিত করার অনুমতি দেওয়া হয়। তার কবরটি নব্য ফ্যাসিবাদীদের জন্য এক ধরনের তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে এবং তার মৃত্যুর বার্ষিকী নব্য-ফ্যাসিবাদী সমাবেশের মাধ্যমে পালিত হয়।

যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মুসোলিনির মৃত্যুর "সরকারি"[note ১] ব্যাখ্যা নিয়ে ইতালিতে সন্দেহ ও বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে (যদিও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এটি সাধারণভাবে গৃহীত)। কিছু সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও ইতিহাসবিদ অডিসিওর বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং মুসোলিনির মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা ও দায়ী ব্যক্তিদের সম্পর্কে নানা তত্ত্ব ও অনুমান উপস্থাপন করেছেন। অন্তত বারো জনকে বিভিন্ন সময়ে মুসোলিনির মৃত্যুর জন্য দায়ী বলে দাবি করা হয়েছে, যার মধ্যে লুইজি লঙ্গো এবং সান্দ্রো পার্তিনি রয়েছেন যারা পরবর্তীতে যথাক্রমে ইতালীয় কমিউনিস্ট পার্টির মহাসচিব এবং ইতালির রাষ্ট্রপতি হন। কিছু লেখক মনে করেন, মুসোলিনির মৃত্যুর পেছনে ব্রিটিশ স্পেশাল অপারেশনস এক্সিকিউটিভ জড়িত ছিল, যার লক্ষ্য ছিল মুসোলিনির কাছে থাকা উইনস্টন চার্চিলের সাথে গোপন চুক্তি ও চিঠিপত্র উদ্ধার করা। তবে "সরকারি" ব্যাখ্যাই এখনো সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয় যেখানে অডিসিওকেই মুসোলিনির প্রধান মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী বলা হয়।

পূর্ববর্তী ঘটনা

[সম্পাদনা]
ইতালীয় সামাজিক প্রজাতন্ত্র:
  ডিসেম্বর ১৯৪৩-এ
  সেপ্টেম্বর ১৯৪৪-এ

পটভূমি

[সম্পাদনা]

১৯২২ সাল থেকে মুসোলিনি ইতালির ফ্যাসিবাদী নেতা ছিলেন যিনি প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবং ১৯২৫ সালে স্বৈরশাসকের ক্ষমতা দখলের পর ইল দুচে উপাধি গ্রহণ করেন। জুন ১৯৪০ সালে, তিনি ইতালিকে অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বাধীন নাৎসি জার্মানির পক্ষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রবেশ করান।[] ১৯৪৩ সালের জুলাইয়ে মিত্রবাহিনীর সিসিলি অভিযানের পর, মুসোলিনিকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং তাকে বন্দি করা হয়; এরপর ইতালি ক্যাসিবিলের অস্ত্রবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে।[]

অস্ত্রবিরতি চুক্তির পরপরই, মুসোলিনিকে বিশেষ জার্মান বাহিনী গ্রান সাসো অভিযান চালিয়ে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে এবং হিটলার তাকে ইতালীয় সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের নেতা হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। এটি একটি জার্মান তাবেদার রাষ্ট্র ছিল যা উত্তর ইতালিতে লেক গার্দার কাছে সালো শহরে রাজধানী স্থাপন করে।[] ১৯৪৪ সালের মধ্যে এই "সালো প্রজাতন্ত্র" মিত্রশক্তির দক্ষিণ দিক থেকে অগ্রসর হওয়া এবং ইতালীয় ফ্যাসিবিরোধী পার্টিজানদের অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়, যা ইতালীয় গৃহযুদ্ধ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।[]

মিত্রবাহিনী ধীরে ধীরে ইতালীয় উপদ্বীপ ধরে উত্তর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ১৯৪৪ সালের গ্রীষ্মে তারা রোম এবং ফ্লোরেন্স দখল করে এবং একই বছরের শেষের দিকে উত্তর ইতালিতে প্রবেশ করে। ১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাসে ইতালির বসন্ত অভিযান শুরু হলে জার্মান বাহিনীর গথিক রেখা ভেঙে পড়ে এবং সালো প্রজাতন্ত্র ও তার জার্মান মিত্রদের চূড়ান্ত পরাজয় নিশ্চিত হয়ে ওঠে।[]

১৮  ২৭ এপ্রিল ১৯৪৫

[সম্পাদনা]

১৮ এপ্রিল ১৯৪৫ সালে মুসোলিনি সালো শহরের কাছে অবস্থিত গার্গনানো গ্রাম থেকে তার সম্পূর্ণ সরকার সমেত মিলান শহরে স্থানান্তরিত হন এবং শহরের প্রিফেকচারে অবস্থান নেন।[][] এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য ছিল চূড়ান্ত পরাজয়ের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। নতুন অবস্থান তাকে মিলানের আর্চবিশপ কার্ডিনাল শুস্টারের কাছাকাছি রাখবে, যাকে তিনি মিত্রশক্তি ও পার্টিজানদের সাথে আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। এছাড়াও এটি সুইস সীমান্তের কাছাকাছি থাকায় পালানোর সম্ভাবনা উন্মুক্ত রাখার একটি কৌশল ছিল।[]

মিলানে পৌঁছানোর পরের সপ্তাহজুড়ে এবং সামরিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকায় মুসোলিনি বিভিন্ন বিকল্পের মধ্যে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। তিনি ইতালীয় আল্পসের ভালতেলিনা উপত্যকায় (তথাকথিত রিপাবলিকান আলপাইন সন্দেহ পরিকল্পনা) এক শেষ প্রতিরোধ গড়ে তোলার, সুইজারল্যান্ডে পালানোর, বা উত্তর ইতালির জাতীয় মুক্তি কমিটির[note ২] নেতৃত্বের কাছে শান্তিপূর্ণ আত্মসমর্পণের চেষ্টা করার মতো বিকল্প বিবেচনা করছিলেন অথবা মিত্র বাহিনীর সাথে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন।[১০][১১][১২]

জার্মান বাহিনী পিছু হটতে থাকলে, উত্তর ইতালির জাতীয় মুক্তি কমিটি প্রধান উত্তরাঞ্চলীয় শহরগুলোতে সাধারণ বিদ্রোহের ডাক দেয়।[১৩] একইসঙ্গে এটি একটি ফরমান জারি করে জনগণের আদালত প্রতিষ্ঠা করে। এর বিধানগুলোর মধ্যে একটি কার্যত মুসোলিনির মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে:[১৪]

মিলান থেকে পলায়ন
২৫ এপ্রিল ১৯৪৫ সালের বিকেলে মিলানের প্রিফেকচারে মুসোলিনি (এটি তার জীবিত অবস্থায় শেষ ছবি বলে মনে করা হয়)
                     মুসোলিনির পালানোর পথ                      সুইস সীমান্ত পারাপার                      ভালতেলিনার সরাসরি পথ

ফ্যাসিবাদী সরকারের সদস্য এবং জেরার্কি[note ৩] যারা সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করেছে, জনগণের স্বাধীনতা ধ্বংস করেছে, ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে, দেশের ভাগ্যকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং বর্তমান বিপর্যয়ে অবদান রেখেছে, তাদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে; কম গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হবে।

সিএলএনএআই, ২৫ এপ্রিল ১৯৪৫-এ জারি করা ফরমান, অনুচ্ছেদ ৫[১৪]

২৫ এপ্রিলের বিকেলে,[১৬] কার্ডিনাল শুস্টার তার বাসভবনে মুসোলিনি এবং উত্তর ইতালির জাতীয় মুক্তি কমিটির প্রতিনিধিদের মধ্যে শান্তি আলোচনা আয়োজন করেন যা ব্যর্থ হয়।[১৭][১৮] সেই সন্ধ্যায়,[১৯] যখন উত্তর ইতালিতে জার্মান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণের দ্বারপ্রান্তে ছিল এবং উত্তর ইতালির জাতীয় মুক্তি কমিটি মিলানের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করছিল তখন মুসোলিনি শহর থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন।[১৩][২০] রাত ৮ টার দিকে তিনি লেক কোমোর দিকে রওনা হন। এটি স্পষ্ট নয় যে তার উদ্দেশ্য সুইস সীমান্ত পার হওয়া ছিল, নাকি ভালতেলিনাতে যাওয়া; যদি দ্বিতীয়টি হয়ে থাকে, তবে তিনি তার হাজার হাজার সমর্থককে পিছনে ফেলে শহর ত্যাগ করছিলেন যারা তার শেষ প্রতিরোধের জন্য আল্পস-এর দিকে যাওয়ার উদ্দেশ্যে যারা মিলানে জড়ো হয়েছিল।[২১]

কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২৬ এপ্রিলে উপপত্মী ক্লারেত্তা পেতাচ্চির সঙ্গে থাকা মুসোলিনি সুইস সীমান্ত পার হওয়ার জন্য কয়েকবার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন। যাই হোক, ২৭ এপ্রিলে তিনি একদল পশ্চাদপসরণরত লুফটওয়াফে বাহিনীর সঙ্গে একত্রিত হন যারা কনভয়ে করে জার্মানির দিকে যাচ্ছিল।[২২]

বন্দি ও গ্রেপ্তার

[সম্পাদনা]

২৭ এপ্রিল ১৯৪৫, স্থানীয় একদল কমিউনিস্ট পার্টিজান লেক কোমোর উত্তর-পশ্চিম উপকূলের দোঙ্গো গ্রামের কাছে মুসোলিনি ও পেতাচ্চির কনভয়ের উপর হামলা চালায় এবং সেটিকে থামতে বাধ্য করে। কনভয়টিতে বেশ কয়েকজন ইতালীয় ফ্যাসিস্ট নেতা উপস্থিত ছিলেন। পার্টিজানদের নেতা পিয়ের লুইজি বেলিনি দেলে স্তেলে এবং উরবানো লাজ্জারো প্রথমে একটি পরিচিত ফ্যাসিস্ট নেতাকে শনাক্ত করেন, তবে তখনো তারা মুসোলিনিকে চিনতে পারেননি। তারা জার্মানদেরকে সমস্ত ইতালীয়দের হস্তান্তর করতে বাধ্য করে, বিনিময়ে জার্মানদের নিরাপদে চলে যাওয়ার অনুমতি দেয়। শেষ পর্যন্ত মুসোলিনিকে কনভয়ের একটি গাড়িতে নুয়ে পড়া অবস্থায় পাওয়া যায়।[২৩] লাজ্জারো পরে বলেন:

তার মুখ মোমের মতো নিস্তেজ ছিল এবং দৃষ্টি ছিল কাচের মতো স্থির, তবে অন্ধের মতো শূন্য। আমি চরম ক্লান্তি দেখেছিলাম, তবে কোনো ভয় ছিল না ... মুসোলিনি যেন সম্পূর্ণ ইচ্ছাশক্তিহীন, মানসিকভাবে মৃত।[২৩]

পার্টিজানরা মুসোলিনিকে গ্রেপ্তার করে দোঙ্গোতে নিয়ে যায় যেখানে তিনি রাতের একটি অংশ স্থানীয় ব্যারাকে কাটান।[২৩] দোঙ্গোতে মুসোলিনির অনুরোধে তাকে পেতাচ্চির সঙ্গে পুনরায় মিলিত করা হয় যা ঘটে ২৮ এপ্রিল রাত ২:৩০ টায়।[২৪][২৫] মোট ৫০ জনেরও বেশি ফ্যাসিস্ট নেতা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের কনভয়ে পাওয়া যায় এবং পার্টিজানরা তাদের গ্রেপ্তার করে। মুসোলিনি ও পেতাচ্চি ছাড়া ১৬ জন শীর্ষস্থানীয় ফ্যাসিস্ট নেতাকে দোঙ্গোতে পরদিনই গুলি করে হত্যা করা হয় এবং আরও ১০ জনকে পরবর্তী দুই রাতে হত্যা করা হয়।[২৬]

মুসোলিনির উপপত্নী ক্লারেত্তা পেতাচ্চি, যাকে তার সঙ্গে বন্দি ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

দোঙ্গো অঞ্চলের আশেপাশে তখনও লড়াই চলছিল। মুসোলিনি ও পেতাচ্চিকে ফ্যাসিস্ট সমর্থকরা উদ্ধার করতে পারে এই আশঙ্কায় পার্টিজানরা রাতের মাঝখানে তাদেরকে কাছের একটি কৃষক পরিবার দে মারিয়ার খামারে নিয়ে যায়; তারা বিশ্বাস করেছিল যে এটি একটি নিরাপদ স্থান হবে। মুসোলিনি ও পেতাচ্চি সেখানে রাতের বাকি সময় এবং পরবর্তী দিনের বেশিরভাগ অংশ কাটান।[২৭]

মুসোলিনিকে বন্দি করার সন্ধ্যায় উত্তর ইতালির সমাজতান্ত্রিক পার্টিজান নেতা সান্দ্রো পের্তিনি রেডিও মিলানো লিবের্তাতে তার গ্রেপ্তারের ঘোষণা দেন:[২৮]

সুইস সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টাকারী এই অপরাধীদের প্রধান ক্ষোভ ও ভয়ে হলুদ হয়ে যাওয়া মুসোলিনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে জনগণের আদালতের হাতে তুলে দিতে হবে যাতে দ্রুত বিচার করা যায়। আমরা এটি চাই, যদিও আমরা মনে করি যে ফায়ারিং স্কোয়াডও এই ব্যক্তির জন্য অত্যন্ত সম্মানজনক হবে। সে এক অস্থির কুকুরের মতো মরতে উপযুক্ত।[২৯]

মৃত্যুদণ্ডের আদেশ

[সম্পাদনা]

মুসোলিনির তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টির মহাসচিব পালমিরো তোলিয়াত্তি দাবি করেন যে তিনি মুসোলিনির মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ তার বন্দি হওয়ার আগেই দিয়েছিলেন। তোলিয়াত্তি বলেন যে তিনি এটি করেছিলেন ২৬ এপ্রিল ১৯৪৫ সালে এক রেডিও বার্তার মাধ্যমে, যেখানে তিনি বলেছিলেন:

শুধুমাত্র একটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে যে তারা [মুসোলিনি ও অন্যান্য ফ্যাসিস্ট নেতারা] বিনিময়ে তাদের জীবনের মূল্য পরিশোধ করবে: সেটি হলো তাদের পরিচয়।[৩০]

তিনি আরও দাবি করেন যে তিনি এই আদেশ দিয়েছিলেন রোমের উপপ্রধানমন্ত্রী ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হিসেবে। তবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইভানো বনোমি পরবর্তীতে এই আদেশকে তার সরকারের অনুমোদন বলে প্রত্যাখ্যান করেন।[৩০]

লুইজি লোঙ্গো (বাঁয়ে) ও পালমিরো তোলিয়াত্তি যুদ্ধ-পরবর্তী কমিউনিস্ট পার্টি কংগ্রেসে

মিলানের একজন ঊর্ধ্বতন কমিউনিস্ট নেতা লুইজি লোঙ্গো বলেন যে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ পার্টিজান সামরিক ইউনিটের সাধারণ কমান্ডের পক্ষ থেকে এসেছিল যা "উত্তর ইতালির জাতীয় মুক্তি কমিটির একটি সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন" ছিল।[৩০] পরবর্তীতে লোঙ্গো আরেকটি ভিন্ন বক্তব্য দেন; তিনি বলেন যে যখন তিনি ও অ্যাকশন পার্টির (যা উত্তর ইতালির জাতীয় মুক্তি কমিটির অংশ ছিল) একজন সদস্য ফের্মো সোলারি [it] মুসোলিনির গ্রেপ্তারের খবর শুনলেন, তারা সঙ্গে সঙ্গেই সিদ্ধান্ত নেন যে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত এবং লোঙ্গো এই আদেশ দেন।[৩০] উত্তর ইতালির জাতীয় মুক্তি কমিটির প্রতিনিধি লিও ভালিয়ানির মতে ২৭/২৮ এপ্রিল রাতের মধ্যে মুসোলিনির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যেখানে তিনি, সান্দ্রো পের্তিনি ও কমিউনিস্ট নেতা এমিলিও সেরেনিলুইজি লোঙ্গো উপস্থিত ছিলেন।[২৯] উত্তর ইতালির জাতীয় মুক্তি কমিটি পরে ঘোষণা করে যে মুসোলিনিকে তাদের নির্দেশে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।[২০]

যাই হোক, লোঙ্গো সাধারণ কমান্ডের একজন কমিউনিস্ট পার্টিজান ওয়াল্টার অডিসিওকে অবিলম্বে দোঙ্গোতে গিয়ে আদেশ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। লোঙ্গোর মতে তিনি বলেছিলেন "যাও ও তাকে গুলি করো"।[৩১] লোঙ্গো আরও একজন পার্টিজান আলদো লাম্প্রেদি [it]কে সঙ্গে যেতে বলেন, কারণ লাম্প্রেদির মতে লোঙ্গো মনে করেছিলেন অডিসিও "দুর্বিনীত, অত্যন্ত অনমনীয় এবং তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা সম্পন্ন"।[৩১]

গুলি করে হত্যা

[সম্পাদনা]
মৃত্যুর স্থান: ভিলা বেলমন্টের প্রবেশদ্বার
মোরেত্তির এমএএস-৩৮ সাবমেশিন গান যা অডিসিও ব্যবহার করেছিলেন বলা হয়।

যদিও যুদ্ধের পর মুসোলিনি ও পেতাচ্চির মৃত্যুর ব্যাপারে বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী মত ও তত্ত্ব প্রচলিত হয়েছে, অন্তত তার প্রধান উপাদানসমূহ তথা ওয়াল্টার অডিসিওর বিবরণ সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য বলে বিবেচিত হয় এবং এটি ইতালিতে "সরকারি সংস্করণ" হিসেবেও পরিচিত।[৩২][৩৩][৩৪]

এটি আলদো লাম্প্রেদির একটি বিবরণ দ্বারা অনেকাংশে নিশ্চিত হয়েছিল[৩৫] এবং ১৯৬০-এর দশকে বেল্লিনি দেল্লে স্তেলে, উরবানো লাজ্জারো এবং সাংবাদিক Franco Bandini [it] কর্তৃক লেখা বইগুলোতে প্রচলিত বিবরণ প্রতিষ্ঠিত হয়।[] যদিও এই বিবরণগুলোর মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে, প্রধান ঘটনাসমূহের ক্ষেত্রে তারা একমত।[৩৩]

অডিসিও ও লাম্প্রেদি ২৮ এপ্রিল ১৯৪৫ সালের সকালে মিলান থেকে ডঙ্গোর উদ্দেশ্যে রওনা দেন, অডিসিওর নেতৃত্বে তিনি লঙ্গোর দেওয়া আদেশ কার্যকর করতে যাচ্ছিলেন।[৩৬][৩৭] ডঙ্গো পৌঁছে তারা স্থানীয় পার্টিজান কমান্ডার বেল্লিনি দেল্লে স্তেলের সাথে সাক্ষাৎ করেন যিনি তাদের কাছে মুসোলিনিকে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করেন।[৩৬][৩৭] অডিসিও তার মিশনে যুদ্ধের নাম হিসেবে "কলোনেল ভালেরিও" ছদ্মনাম ব্যবহার করেছিলেন।[৩৬][৩৮]

বিকেলে অডিসিও ও অন্যান্য পার্টিজানরা মুসোলিনি ও পেতাচ্চিকে নিতে দে মারিয়া পরিবারের খামারবাড়িতে যান যাদের মধ্যে আলদো লাম্প্রেদি ও মিশেল মোরেত্তি ছিলেন।[৩৯][৪০] তারা দুজনকে নিয়ে ২০ কিলোমিটার (১২ মাইল) দক্ষিণে Giulino di Mezzegra গ্রামে গিয়ে থামেন।[৪১] গাড়িটি ভিলা বেলমন্টের প্রবেশপথে এসে দাঁড়ায় যেটি ভিয়া ২৪ ম্যাজজিও নামে পরিচিত একটি সরু রাস্তার পাশে অবস্থিত। এরপর মুসোলিনি ও পেতাচ্চিকে নামিয়ে দেয়ালে দাঁড় করানো হয়।[৩৬][৪১][৪২]

অডিসিও মোরেত্তির কাছ থেকে ধার করা সাবমেশিন গান দিয়ে বিকেল ৪:১০ মিনিটে তাদের গুলি করেন, কারণ তার নিজের অস্ত্রটি অচল হয়ে গিয়েছিল।[৩৬][৪০][৪৩]

লাম্প্রেদি ও অডিসিওর বিবরণে কিছু পার্থক্য ছিল। অডিসিও মুসোলিনিকে মৃত্যুর আগে কাপুরুষোচিত আচরণ করতে দেখেছেন বলে উল্লেখ করেন, অন্যদিকে লাম্প্রেদি তা উল্লেখ করেননি। অডিসিও বলেন তিনি মৃত্যুদণ্ডের আদেশ পড়ে শুনিয়েছিলেন, কিন্তু লাম্প্রেদি এটি বলেননি। লাম্প্রেদি জানান মুসোলিনির শেষ কথা ছিল "আমার হৃদয়ে নিশানা করো", কিন্তু অডিসিওর মতে তিনি মৃত্যুর ঠিক আগে বা সময় কোনো কথা বলেননি।[৪৩][৪৪]

লাজ্জারো ও বেল্লিনি দেল্লে স্তেলের মতো অন্যান্যদের বিবরণেও পার্থক্য ছিল। বেল্লিনি দেল্লে স্তেলের মতে ডঙ্গোতে অডিসিও তার কাছে আগের দিন বন্দি করা ফ্যাসিস্টদের একটি তালিকা চান এবং মুসোলিনি ও পেতাচ্চির নাম মৃত্যুদণ্ডের জন্য চিহ্নিত করেন। বেল্লিনি দেল্লে স্তেলে প্রশ্ন করেন কেন পেতাচ্চিকেও মারা হবে, যার উত্তরে অডিসিও বলেন, তিনি মুসোলিনির উপদেষ্টা ছিলেন এবং তার নীতিগুলোকে প্রভাবিত করেছিলেন, তাই তিনি সমানভাবে দায়ী। কোনো আনুষ্ঠানিক বিচার বা আলোচনা ছাড়াই তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।[৪৫]

অডিসিও ভিন্ন দাবি করেন। তিনি বলেন, ২৮ এপ্রিলে ডঙ্গোতে তিনি একটি "যুদ্ধ ট্রাইব্যুনাল" গঠন করেন যেখানে লাম্প্রেদি, বেল্লিনি দেল্লে স্তেলে, মিশেল মোরেত্তি ও লাজ্জারো উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি নিজেই সভাপতিত্ব করেন। এই ট্রাইব্যুনালে মুসোলিনি ও পেতাচ্চির মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয় এবং কেউ কোনো আপত্তি করেননি।[৪৫] কিন্তু উরবানো লাজ্জারো এ দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন:

আমি বিশ্বাস করতাম মুসোলিনি মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার যোগ্য... কিন্তু আইন অনুযায়ী তার বিচার হওয়া উচিত ছিল। এটি অত্যন্ত বর্বর ছিল।[৪৫]

১৯৭০-এর দশকে লেখা একটি বইতে অডিসিও যুক্তি দেন যে ২৮ এপ্রিলে ডঙ্গোতে পার্টিজান নেতাদের সভায় নেওয়া মৃত্যুদণ্ডের সিদ্ধান্ত, সিএনএলএআইয়ের যুদ্ধ আদালত সংক্রান্ত অধ্যাদেশের ১৫ অনুচ্ছেদের অধীনে বৈধ ট্রাইব্যুনাল রায় হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।[৪৬] তবে কোনো বিচারক বা কমিসারিও দি গুয়েরার (যাকে অধ্যাদেশ অনুযায়ী উপস্থিত থাকতে হতো) অনুপস্থিত থাকায় এ দাবির যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।[৪৭][note ৪]

সমসাময়িক ঘটনাবলী

[সম্পাদনা]

মুসোলিনির একনায়কতন্ত্রের সময় তার দৈহিক উপস্থাপনা ফ্যাসিবাদী প্রচারের একটি কেন্দ্রীয় অংশ ছিল, যেমন শারীরিক শ্রমে নিযুক্ত অবস্থায় তার ছবি যেখানে তিনি খালি গায়ে বা অর্ধনগ্ন ছিলেন। তার মৃত্যুর পরেও তার দেহ একটি শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে থেকে যায় যা সমর্থকদের জন্য শ্রদ্ধার বস্তু হয়ে ওঠে অথবা বিরোধীদের দ্বারা অবমাননা ও অসম্মানের শিকার হয়। এটি আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক তাৎপর্য অর্জন করে।[৪৯][৫০]

পিয়াজ্জালে লোরেতো

[সম্পাদনা]
১৯৪৫ সালে মিলানে মুসোলিনির মৃতদেহ (বামে থেকে দ্বিতীয়) পেতাচ্চি (মাঝখানে) এবং অন্যান্য নিহত ফ্যাসিস্টদের সাথে পিয়াজ্জালে লোরেতো

২৮ এপ্রিলে সন্ধ্যায় মুসোলিনি, ক্লারা পেতাচ্চি ও অন্যান্য নিহত ফ্যাসিস্টদের মৃতদেহ একটি ভ্যানে তুলে মিলানের দক্ষিণ দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। ২৯ এপ্রিল ভোরে শহরে পৌঁছে মৃতদেহগুলো পিয়াজ্জালে লোরেতো নামে পরিচিত একটি চত্বরে ফেলে দেওয়া হয়। এই স্থানটি প্রধান রেলওয়ে স্টেশনের কাছে অবস্থিত ছিল।[৫১][৫২] এই স্থানটি পরিকল্পিতভাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল কারণ আগস্ট ১৯৪৪ সালে এখানে প্রতিশোধমূলকভাবে ১৫ জন পার্টিজানকে গুলিতে হত্যা করা হয়েছিল এবং তাদের মৃতদেহ জনসমক্ষে রেখে দেওয়া হয়েছিল। সে সময় মুসোলিনি বলেছিলেন, "পিয়াজ্জালে লোরেতোর রক্তের জন্য আমাদের চরম মূল্য দিতে হবে"।[৫২]

তাদের মৃতদেহ একসাথে স্তূপ করে ফেলে রাখা হয় এবং সকাল ৯টার মধ্যেই বিশাল জনতা সেখানে জড়ো হয়। মৃতদেহগুলোর উপর সবজি ছোড়া হয়, লাথি মারা হয়, প্রস্রাব করা হয়, এমনকি গুলিও করা হয়; মুসোলিনির মুখমণ্ডল মারধরের ফলে বিকৃত হয়ে যায়।[৫৩][৫৪] সকাল গড়ানোর সাথে সাথে মিত্র বাহিনী শহরে প্রবেশ করতে শুরু করে এবং একজন মার্কিন প্রত্যক্ষদর্শী জনতাকে "ভয়ঙ্কর, বিকৃত ও নিয়ন্ত্রণহীন" বলে বর্ণনা করেন।[৫৪] কিছু সময় পর, মৃতদেহগুলো একটি অপূর্ণ নির্মিত পেট্রোল স্টেশনের ধাতব কাঠামোতে উল্টো করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।[৫৩][৫৪][৫৫]

উত্তর ইতালিতে মধ্যযুগ থেকেই এভাবে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মাধ্যমে অপরাধীদের "অপমান" প্রকাশ করা হতো। তবে যারা মুসোলিনি ও অন্যদের ঝুলিয়েছিল, তারা দাবি করেছিল যে এটি মূলত জনতার হাত থেকে মৃতদেহগুলো রক্ষা করার জন্য করা হয়েছিল। ঘটনাটির ভিডিও ফুটেজও এই দাবিকে সমর্থন করে।[৫৬]

মর্গ ও ময়নাতদন্ত

[সম্পাদনা]
মিলানের পৌর মর্গে মুসোলিনি ও পেটাচ্চির মৃতদেহের ছবি, যা একজন মার্কিন সেনা চিত্রগ্রাহক তুলেছেন

২৯ এপ্রিলে বিকাল ২:০০ টার দিকে সদ্য আগত মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ আদেশ দেয় যে মৃতদেহগুলো নামিয়ে শহরের মর্গে নিয়ে যেতে হবে যেখানে ময়নাতদন্ত করা হবে। একজন মার্কিন সেনা চিত্রগ্রাহক মর্গে যান এবং মৃতদেহগুলোর ছবি তোলেন, যার মধ্যে একটি ছবিতে মুসোলিনি এবং পেটাচ্চিকে এমনভাবে সাজানো হয় যেন তারা বাহুতে বাহু রেখে দাঁড়িয়ে আছেন।[৫৭]

৩০ এপ্রিলে মিলানের লিগ্যাল মেডিসিন ইনস্টিটিউটে মুসোলিনির ময়নাতদন্ত করা হয়। পরবর্তী প্রতিবেদনের একটি সংস্করণে উল্লেখ করা হয় যে তাকে নয়টি গুলিতে হত্যা করা হয়েছিল, তবে অন্য একটি সংস্করণে সাতটি গুলির কথা বলা হয়। তার হৃদয়ের কাছে চারটি গুলি মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে গুলির ক্যালিবার নির্ধারণ করা হয়নি।[৫৮] মুসোলিনির মস্তিষ্কের নমুনা সংগ্রহ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয় যেখানে পরীক্ষা করে দেখা হয়েছিল যে সিফিলিস তার মানসিক অস্থিরতার কারণ কিনা, তবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।[৫৯] মুসোলিনির দেহে সিফিলিসের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি এবং পেটাচ্চির কোনো ময়নাতদন্ত করা হয়নি।[৬০]

হিটলারের ওপর প্রভাব

[সম্পাদনা]

২৯ এপ্রিলের বিকেলে আডলফ হিটলার মুসোলিনির মৃত্যুর খবর পান, তবে তার কাছে কতটুকু বিশদ তথ্য পৌঁছেছিল তা জানা যায়নি।[৬১][৬২] সেদিন আগেই হিটলার তার শেষ ইচ্ছা ও উইল লিখে গিয়েছিলেন, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে তিনি শত্রুর হাতে বন্দি হওয়ার চেয়ে আত্মহত্যা করতে পছন্দ করবেন এবং "ইহুদিদের দ্বারা পরিচালিত এক প্রদর্শনীতে" পরিণত হতে চান না।[৬৩] পরদিন, বার্লিন রেড আর্মির দখলে যাওয়ার আগেই হিটলার আত্মহত্যা করেন।[৬৪] তার আগেই নির্দেশ অনুসারে হিটলারের দেহ পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়, ফলে তার প্রায় কোনো অবশিষ্টাংশই থাকেনি।[৬৫]

কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন যে মুসোলিনির সাথে যা ঘটেছিল তা হিটলারের আত্মহত্যার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল।[৬৬] অ্যালান বুলক বলেছেন যে মুসোলিনির পরিণতির খবর হিটলারের বন্দি না হওয়ার সিদ্ধান্তকে আরও দৃঢ় করেছিল।[৬৭] উইলিয়াম এল. শিরার মনে করেন, মুসোলিনির মৃত্যুর ঘটনা হিটলারের আত্মহত্যার সিদ্ধান্তকে আরও নিশ্চিত করেছিল যাতে তিনি জনসমক্ষে লাঞ্ছিত না হন।[৬১] তবে হিউ ট্রেভর-রোপার মনে করেন, এটি অবিশ্বাস্য কারণ কেননা হিটলারের কাছে সম্পূর্ণ তথ্য পৌঁছানোর সম্ভাবনা কম এবং তাছাড়া তিনি আগেই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।[৬৮] ইয়ান কেরশো মন্তব্য করেছেন যে হিটলার মুসোলিনির মৃত্যুর বিস্তারিত জেনেছিলেন কিনা তা অনিশ্চিত, তবে:

যদি তিনি সম্পূর্ণ ভয়ংকর কাহিনী জেনে থাকেন, তাহলে তা কেবল তার আত্মহত্যার ইচ্ছাকে আরও দৃঢ় করেছিল এবং নিশ্চিত করেছিল যে শত্রুরা যে তার দেহ দখল করতে না পারে।[৬৯]

সমাধিস্থল ও মৃতদেহ চুরি

[সম্পাদনা]

মৃত্যু ও মিলানে মৃতদেহ প্রদর্শনের পর মুসোলিনির দেহ চিহ্নহীন কবর হিসেবে শহরের উত্তরে অবস্থিত মুসকোকো কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। ২১ এপ্রিল ১৯৪৬ সালে পুনরুত্থান পার্বণের দিলে একজন তরুণ ফ্যাসিস্ট ডোমেনিকো লেচিসি তার দুই বন্ধুর সহায়তায় মুসোলিনির কবর খুঁজে বের করে দেহ চুরি করেন।[৭০] ষোলো সপ্তাহ ধরে মৃতদেহটি বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে রাখা হয় যার মধ্যে ছিল একটি ভিলা, একটি মঠ ও একটি কনভেন্ট।[৭১] অবশেষে, আগস্ট মাসে মৃতদেহ (একটি পা ছাড়া) চেরতোসা দি পাভিয়া নামক একটি মঠে পাওয়া যায় যা মিলানের কাছাকাছি ছিল। দুইজন ফ্রান্সিসকান সাধু লেচিসিকে মৃতদেহ লুকাতে সাহায্য করার অভিযোগে অভিযুক্ত হন।[৭০][৭২]

পরবর্তীতে, কর্তৃপক্ষ মৃতদেহটিকে কাপুচিন মঠে লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করে যা চেরো ম্যাজোরে নামক ছোট্ট শহরে অবস্থিত ছিল। সেখানে এটি পরবর্তী এগারো বছর গোপন রাখা হয়, এমনকি মুসোলিনির পরিবারের কাছেও এর অবস্থান জানানো হয়নি।[৭৩] ১৯৫৭ সালের মে মাসে নতুন প্রধানমন্ত্রী আদোনে জোলি সিদ্ধান্ত নেন যে মুসোলিনির দেহ তার জন্মস্থান প্রেদাপ্পিওতে পুনরায় সমাহিত করা হবে। জোলি নিজেও প্রেদাপ্পিওর বাসিন্দা ছিলেন এবং মুসোলিনির স্ত্রী রাচেলের পরিচিত ছিলেন। তৎকালীন সরকার সংসদে ডানপন্থী সমর্থনের উপর নির্ভরশীল ছিল, যার মধ্যে লেচিসিও ছিলেন যিনি তখন নব্য-ফ্যাসিবাদী দলের একজন সংসদ সদস্য ছিলেন।[৭৪]

সমাধি ও মৃত্যুবার্ষিকী

[সম্পাদনা]
মুসোলিনির পারিবারিক গুহাচিত্রে তার সমাধি, প্রেদাপিও

১ সেপ্টেম্বর ১৯৫৭ সালে প্রেদাপিওতে মুসোলিনির পারিবারিক সমাধিক্ষেত্রে পুনরায় সমাহিতকরণ সম্পন্ন হয়। এই অনুষ্ঠানে তার সমর্থকরা উপস্থিত থেকে ফ্যাসিবাদী অভিবাদন প্রদান করেন। মুসোলিনিকে একটি বড় পাথরের সারকোফাগাসে সমাহিত করা হয়।[note ৫]

সমাধিটি ফ্যাসিবাদী প্রতীক দ্বারা সজ্জিত এবং এতে মুসোলিনির একটি বৃহৎ মার্বেলের মূর্তি রয়েছে। সমাধির সামনে একটি নিবন্ধন বই রয়েছে যেখানে শ্রদ্ধা জানাতে আসা দর্শনার্থীরা স্বাক্ষর করেন। এটি একটি নব্য-ফ্যাসিবাদী তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন এখানে কয়েক ডজন থেকে শত শত মানুষ স্বাক্ষর করেন এবং বিশেষ বার্ষিকীতে সেই সংখ্যা হাজারে পৌঁছায়। প্রায় সমস্ত মন্তব্যই মুসোলিনির সমর্থনে থাকে।[৭৪]

২৮ এপ্রিলে মুসোলিনির মৃত্যুর বার্ষিকী নব্য-ফ্যাসিবাদী সমর্থকদের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিনের একটি। শহরের কেন্দ্র প্রেদাপিওতে থেকে কবরস্থানে একটি মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানে সাধারণত হাজারো সমর্থক অংশ নেন এবং এতে বক্তৃতা, গান ও ফ্যাসিবাদী অভিবাদন অন্তর্ভুক্ত থাকে।[৭৬]

যুদ্ধ-পরবর্তী বিতর্ক

[সম্পাদনা]

ইতালির বাইরে মুসোলিনির মৃত্যুর বিষয়ে অডিসিওর বিবরণ সাধারণভাবে স্বীকৃত বিতর্কিত নয়।[৭৭] তবে ইতালির অভ্যন্তরে ১৯৪০-এর দশকের শেষ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এটি ব্যাপক বিতর্ক ও মতভেদের বিষয় হয়ে উঠেছে এবং মুসোলিনির মৃত্যুর বিভিন্ন তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়েছে।[২০][৭৭] কমপক্ষে ১২ জন ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন।[৭৭] এই বিতর্কের তুলনা করা হয়েছে জন এফ কেনেডির হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সাথে,[২০] এবং এটিকে ইতালীয় সংস্করণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।[৭৭]

অডিসিওর বিবরণের গ্রহণযোগ্যতা

[সম্পাদনা]

১৯৪৭ সাল পর্যন্ত অডিসিওর সম্পৃক্ততা গোপন রাখা হয়েছিল এবং প্রথমদিকের বিবরণগুলোয় (১৯৪৫ সালের শেষের দিকে কমিউনিস্ট পার্টির সংবাদপত্র এল'উনিটিয়া-তে প্রকাশিত একটি ধারাবাহিক প্রতিবেদনে) যিনি গুলি চালিয়েছিলেন তাকে কেবল "কলোন্নেলো ভালেরিও" নামে উল্লেখ করা হয়।[৭৭]

অলদো লাম্প্রেদি অডিসিওর সঙ্গে অভিযানে ছিলেন এবং ১৯৭২ সালে এ নিয়ে একটি বিবরণ লিখেছিলেন।

১৯৪৭ সালের মার্চ মাসে ইল টেম্পো পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো অডিসিওর নাম প্রকাশ করা হয় এবং পরবর্তীতে কমিউনিস্ট পার্টি তার সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করে। অডিসিও নিজে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি যতক্ষণ না তিনি মার্চ মাসে এল'উনিটিয়া-তে পাঁচটি নিবন্ধের ধারাবাহিকের মাধ্যমে তার বর্ণনা প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি এই বিষয়ে একটি বই লেখেন যা ১৯৭৫ সালে তার মৃত্যুর দুই বছর পর প্রকাশিত হয়।[৩৮] আরও অনেক বিকল্প বিবরণ প্রকাশিত হয়, যার মধ্যে ১৯৬০-এর দশকের দুটি বইও রয়েছে যা এই ঘটনার "ধ্রুপদী" বর্ণনা উপস্থাপন করে: লাজারো ও বেল্লিনি দেল্লে স্তেল্লের ডোঙ্গো, লা ফিন দি মুসোলিনি এবং ফ্রাঙ্কো বান্দিনির লে আল্টিমে ৯৫ অর দি মুসোলিনি[] শীঘ্রই লক্ষ্য করা যায় যে এল'উনিটিয়া-তে প্রকাশিত অডিসিওর মূল বিবরণের সাথে তার পরবর্তী সংস্করণগুলোর এবং অন্যান্যদের দ্বারা বর্ণিত ঘটনাগুলোর অসঙ্গতি রয়েছে। যদিও এগুলো তার বিবরণ সম্ভবত প্রকৃত ঘটনাবলির উপর ভিত্তি করে তৈরি, এটি যে অতিরঞ্জিত করা হয়েছিল তা নিশ্চিত।[৭৮] এই অসঙ্গতি ও সুস্পষ্ট অতিরঞ্জনের পাশাপাশি কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে হত্যার দায় স্বীকারের জন্য মনোনীত করার বিশ্বাসের কারণে ইতালির অনেকেই মনে করেছিলেন যে তার গল্প সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে অসত্য।[৭৮]

১৯৯৬ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সংরক্ষণাগারের জন্য ১৯৭২ সালে লেখা আলদো লাম্প্রেদির পূর্বে অপ্রকাশিত একটি ব্যক্তিগত বিবরণ এল'উনিটিয়া-তে প্রকাশিত হয়। এতে লাম্প্রেদি অডিসিওর গল্পের মূল সত্যতা অতিরঞ্জন ছাড়া নিশ্চিত করেছিলেন। লাম্প্রেদি নিশ্চিতভাবেই একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন এবং যেহেতু তিনি তার বিবরণ প্রকাশনার উদ্দেশ্যে লেখেননি বরং দলীয় নথির জন্য তৈরি করেছিলেন, তাই এটি বিশ্বাস করা হয়েছিল যে তিনি কেবল সত্যটাই বলার চেষ্টা করেছিলেন। তদুপরি তিনি নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং ব্যক্তিগতভাবে অডিসিওকে অপছন্দ করতেন। এই সমস্ত কারণেই তার বিবরণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয় কারণ এটি মূলত অডিসিওর কাহিনির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। লাম্প্রেদির বিবরণ প্রকাশিত হওয়ার পর বেশিরভাগ ইতিহাসবিদ এটি বিশ্বাসযোগ্য বলে মেনে নেন, কিন্তু সবাই নয়। ইতিহাসবিদ জিওর্জিও বোক্কা মন্তব্য করেছিলেন:

এটি ৫০ বছর ধরে ফ্যাসিবাদের দুচে-এর শেষ নিয়ে নির্মিত সমস্ত অপ্রয়োজনীয় কল্পকাহিনী দূর করে দেয় ... এত বছর ধরে প্রচারিত হাস্যকর সংস্করণগুলোর সত্য হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না ... সত্যটি এখন নির্ভুলভাবে স্পষ্ট।[৭৯]

লাজারোর দাবি

[সম্পাদনা]
উরবানো লাজারো, ভিলা বেলমন্তের প্রবেশপথের কাছে একটি বুলেটের চিহ্ন দেখাচ্ছেন ১৯৪৫।

১৯৯৩ সালে প্রকাশিত তার বই ডোঙ্গো: হাফ অ্যা সেঞ্চুরি অফ লাইস-এ পার্টিজান নেতা উরবানো লাজারো পূর্বে করা একটি দাবি পুনরায় উত্থাপন করেন যে লুইজি লোঙ্গো অডিসিও নয়, আসল "কলোন্নেলো ভালেরিও" ছিলেন। তিনি আরও দাবি করেন যে মুসোলিনি দুর্ঘটনাবশত আহত হয়েছিলেন যখন পেতাচ্চি এক পার্টিজানের বন্দুক ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন, এতে পেতাচ্চি নিহত হন এবং পরে মিখেল মোরেত্তি মুসোলিনিকে গুলি করে হত্যা করেন।[৮০][৮১][৮২]

"ব্রিটিশ তত্ত্ব"

[সম্পাদনা]

মুসোলিনির মৃত্যুর জন্য ব্রিটেনের গোপন যুদ্ধকালীন অভিযানের ইউনিট বিশেষ অভিযান কার্যনির্বাহী (এসওই) দায়ী ছিল বলে একাধিক দাবি উঠেছে। এমনকি এটি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল কর্তৃক আদিষ্ট ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। অনুমান করা হয়, এটি ছিল একটি "প্রচ্ছন্ন অভিযান" যার লক্ষ্য ছিল মুসোলিনির কাছে থাকা "গোপন চুক্তি" ও স্পর্শকাতর চিঠিপত্র উদ্ধার করা যা তিনি পার্টিজানদের দ্বারা আটক হওয়ার সময় বহন করছিলেন। বলা হয়, এই চিঠিপত্রে চার্চিলের পক্ষ থেকে মুসোলিনিকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল যে তিনি যদি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে পশ্চিমা মিত্রশক্তির সাথে নাৎসি জার্মানির জোট গঠনে হিটলারকে রাজি করাতে পারেন, তবে তাকে শান্তি চুক্তি ও কিছু ভূখণ্ডের ছাড় দেওয়া হতে পারে।[৮৩][৮৪]

এই তত্ত্বের সমর্থকদের মধ্যে ছিলেন ইতিহাসবিদ রেনজো দে ফেলিচে[৮৫] এবং পিয়েরে মিলজা[৮৬] এবং সাংবাদিক পিটার টম্পকিনস[৮৪]লুসিয়ানো গারিবালদি [it];[৮৭] তবে অনেক ইতিহাসবিদ এই তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।[৮৩][৮৪][৮৫] ১৯৯৪ সালে, প্রাক্তন পার্টিজান নেতা ব্রুনো লোনাতি একটি বই প্রকাশ করেন যেখানে তিনি দাবি করেন যে তিনিই মুসোলিনিকে গুলি করেছিলেন এবং তার সাথে অভিযানে ছিলেন "জন" নামে এক ব্রিটিশ কর্মকর্তা যিনি পেতাচ্চিকে হত্যা করেন।[২০][৮৮] টম্পকিনস দাবি করেন যে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে "জন" ছিলেন রবার্ট ম্যাকারোনে, একজন ব্রিটিশ এসওই এজেন্ট যিনি সিসিলীয় বংশোদ্ভূত ছিলেন। লোনাতির মতে তিনি ও "জন" ২৮ এপ্রিল সকালে দে মারিয়া খামারবাড়িতে যান এবং সকাল প্রায় ১১:০০ টায় মুসোলিনি ও পেতাচ্চিকে হত্যা করেন।[৮৪][৮৯]

২০০৪ সালে ইতালির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল রাদিওতেলেভিজিয়োনে ইতালিয়ানা টম্পকিনসের সহ-প্রযোজনায় একটি তথ্যচিত্র সম্প্রচার করে যেখানে এই তত্ত্ব উপস্থাপন করা হয়। লোনাতি তথ্যচিত্রে সাক্ষাৎকার দেন এবং দাবি করেন যে যখন তিনি খামারবাড়িতে পৌঁছান:

পেতাচ্চি বিছানায় বসে ছিলেন ও মুসোলিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। "জন" আমাকে বাইরে নিয়ে গিয়ে বলেন যে তার নির্দেশ দুজনকেই হত্যা করা, কারণ পেতাচ্চি অনেক কিছু জানতেন। আমি বললাম যে আমি পেতাচ্চিকে গুলি করতে পারব না, তাই জন বললেন যে তিনি নিজেই তাকে গুলি করবেন তবে মুসোলিনিকে অবশ্যই একজন ইতালীয়র হাতে নিহত হতে হবে।[৮৪]

তারা দুজনকে বাড়ির বাইরে নিয়ে যায় এবং কাছাকাছি একটি গলির মোড়ে নিয়ে গিয়ে এক ফেন্সের সামনে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়। তথ্যচিত্রে দোরিনা মাজ্জোলার একটি সাক্ষাৎকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যেখানে তিনি বলেন যে তার মা এই গুলির ঘটনাটি দেখেছিলেন। তিনি আরও বলেন যে তিনি নিজেও গুলির শব্দ শুনেছিলেন এবং তখন তিনি ঘড়ির দিকে তাকান—সেটি প্রায় ১১টা বাজে। তথ্যচিত্রটি দাবি করে যে পরে ভিলা বেলমন্তেতে যে গুলি চালানোর ঘটনা দেখানো হয়েছিল তা মূলত এই হত্যাকাণ্ড আড়াল করার জন্য সাজানো হয়েছিল।[৮৪]

এই তত্ত্বটি গুরুতর প্রমাণের অভাবে সমালোচিত হয়েছে, বিশেষত চার্চিলের সঙ্গে মুসোলিনির কথিত গোপন চিঠিপত্রের অস্তিত্বের কারণে।[৮৩][৯০] ২০০৪ সালে রাদিওতেলেভিজিয়োনে ইতালিয়ানার তথ্যচিত্র সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে এসওইর সরকারি ইতিহাসের গবেষক ক্রিস্টোফার উডস এই দাবিগুলোকে উড়িয়ে দিয়ে বলেন যে "এটি কেবল ষড়যন্ত্র তৈরি করার প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।"[৮৪]

অন্যান্য "আগে নিহত হওয়া" সংক্রান্ত তত্ত্ব

[সম্পাদনা]
দে মারিয়া খামারবাড়ি, আনু.১৯৪৫

কিছু ব্যক্তি, বিশেষ করে নব্য-ফ্যাসিস্ট সাংবাদিক জিওর্জিও পিসানোর মতে মুসোলিনি ও পেতাচ্চিকে আসলে দে মারিয়া খামারবাড়ির কাছে সকালেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল এবং জিউলিনো দি মেজেগ্রাতে প্রদর্শিত হত্যাকাণ্ডটি মূলত মৃতদেহের উপর গুলি করার অভিনয় করা হয়েছিল।[৯১][৯২] প্রথমবার এই দাবি তুলেছিলেন ১৯৭৮ সালে ফ্রাংকো বান্দিনি।[৯৩]

অন্যান্য তত্ত্ব

[সম্পাদনা]

অন্য কিছু তত্ত্বও প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে অভিযোগ রয়েছে যে শুধু যুদ্ধের পর ইতালির কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হওয়া লুইজি লোঙ্গোই নয়, পরবর্তীতে হওয়া ইতালির রাষ্ট্রপতি সান্দ্রো পের্তিনিও গুলি করেছিলেন। কিছু দাবিতে বলা হয় যে মুসোলিনি (বা মুসোলিনি ও পেতাচ্চি একসঙ্গে) সায়ানাইড ক্যাপসুল খেয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন।[৯৪]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

নোটসমূহ

[সম্পাদনা]
  1. প্রকৃতপক্ষে, ইতালির কোনো সরকারি বা বিচারিক সংস্থা কখনো মুসোলিনির মৃত্যুর নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যাকে চূড়ান্তভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে, সাধারণভাবে গৃহীত এই বিবরণটিকে প্রায়ই "সরকারি সংস্করণ" বলা হয়। এই অনিশ্চয়তার প্রতিফলন হিসেবে বিভিন্ন উৎস এই শব্দগুচ্ছকে উদ্ধৃতিচিহ্নের মধ্যে ব্যবহার করেছে। বিস্তারিত দেখুন Moseley 2004, পৃ. 275
  2. সিএলএনএআই বা কমিটেটো দি লিবারেজিওন নাজিনোল আল্টা ইতালিয়া (উত্তর ইতালির জাতীয় মুক্তি কমিটি) ছিল উত্তর ইতালিতে সক্রিয় প্রধান পার্টিজান গোষ্ঠীগুলোর সম্মিলিত রাজনৈতিক-সামরিক নেতৃত্ব। এটি পাঁচটি প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত ছিল: ইতালীয় কমিউনিস্ট পার্টি, অ্যাকশন পার্টি, ইতালীয় সমাজতান্ত্রিক দল, ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটস এবং লিবারেল পার্টি। প্রতিটি দল একটি পার্টিজান বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করত, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিল কমিউনিস্টদের, তারপর অ্যাকশন পার্টির। সিএলএনএআই জানুয়ারি ১৯৪৪ সালে এই পার্টিজান গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম সমন্বয় করতে গঠিত হয়েছিল, তবে শীঘ্রই এটি উত্তর ইতালির বৈধ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে দাবি করে। প্রথমদিকে মিত্রশক্তির প্রতিরোধ থাকলেও, তারা শেষ পর্যন্ত এই দাবিকে স্বীকৃতি দেয় এবং মুক্ত অঞ্চলগুলোর জননিরাপত্তার দায়িত্ব সিএলএনএআইয়ের উপর ছেড়ে দেয়। ১৯৪৫ সালের মার্চ মাসে সিএলএনএআইয়ের অধীনে ৮০,০০০ পার্টিজান ছিল যা এপ্রিলের শেষে ২,৫০,০০০-এ পৌঁছায়।[]
  3. জেরার্কি বলতে ফ্যাসিস্ট নেতাদের বোঝানো হয়।[১৫] দেখুন Gerarca
  4. যুদ্ধের পর ক্লারেত্তা পেতাচ্চির পরিবার ওয়াল্টার অডিসিওর বিরুদ্ধে তার অবৈধ হত্যার জন্য দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা করে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর, ১৯৬৭ সালে একজন তদন্তকারী বিচারক মামলাটি বন্ধ করে দেন এবং শত্রু দখলকালে যুদ্ধের সময় জার্মান ও ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে সংঘটিত কাজ হিসেবে বিবেচনা করে অডিসিওকে খুন ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন।[৪৮]
  5. উল্লেখযোগ্যভাবে, ১৯৬৬ সালে মুসোলিনির মস্তিষ্কের টিস্যুর নমুনাগুলি যা তার ময়নাতদন্তের সময় নেওয়া হয়েছিল, ওয়াশিংটন ডিসির সেন্ট এলিজাবেথ মানসিক হাসপাতাল থেকে তার বিধবা স্ত্রীর কাছে ফেরত দেওয়া হয়। ১৯৪৫ সাল থেকে এই নমুনাগুলো ওই হাসপাতালে সংরক্ষিত ছিল।[৫৯] মুসোলিনির বিধবা স্ত্রী এগুলো সমাধির একটি বাক্সে রেখে দেন। ইতিহাসবিদ জন ফুট মন্তব্য করেন যে, "অবশেষে, মৃত্যুর উনিশ বছর পর বেনিতো মুসোলিনির দেহাবশেষ মোটামুটি এক খণ্ডে আবার একত্রিত হলো।"[৭১] ২০০৯ সালে, ময়নাতদন্তের সময় চুরি হয়ে যাওয়া মুসোলিনির মস্তিষ্ক ও রক্তের নমুনা ইবেতে ১৫,০০০ ইউরোতে বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত হয়। তবে ইবে দ্রুত তালিকাটি সরিয়ে ফেলে এবং কেউ এতে নিলাম করতে পারেনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় যে ১৯৪৭ সালে সমস্ত নমুনা ধ্বংস করা হয়েছিল।[৭৫]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. BBC History
  2. Blinkhorn 2006, পৃ. 51
  3. Quartermaine 2000, পৃ. 14, 21
  4. Payne 1996, পৃ. 413
  5. Sharp Wells 2013, পৃ. 191–194
  6. 1 2 3 Di Bella 2004, পৃ. 49
  7. Clark 2014a, পৃ. 320
  8. Morgan 2008, পৃ. 223
  9. Clark 2014b, পৃ. 375–378
  10. Clark 2014a, পৃ. 319–320
  11. Neville 2014, পৃ. 208–211
  12. Moseley 2004, পৃ. 236–237
  13. 1 2 Quartermaine 2000, পৃ. 130–131
  14. 1 2 Moseley 2004, পৃ. 238
  15. Garibaldi 2004, পৃ. 79, 86
  16. Moseley 2004, পৃ. 240
  17. Clark 2014a, পৃ. 320–321
  18. Neville 2014, পৃ. 209–210
  19. Moseley 2004, পৃ. 246
  20. 1 2 3 4 5 O'Reilly 2001, পৃ. 244
  21. Clark 2014a, পৃ. 321–323
  22. Clark 2014a, পৃ. 321–322
  23. 1 2 3 Bosworth 2014, পৃ. 31
  24. Neville 2014, পৃ. 224
  25. Moseley 2004, পৃ. 272
  26. Roncacci 2003, পৃ. 391, 403
  27. Neville 2014, পৃ. 212
  28. Di Rienzo 2023, পৃ. 196
  29. 1 2 Moseley 2004, পৃ. 282
  30. 1 2 3 4 Moseley 2004, পৃ. 280–281
  31. 1 2 Moseley 2004, পৃ. 281, 283, 302
  32. Cavalleri 2009, পৃ. 11
  33. 1 2 Roncacci 2003, পৃ. 404
  34. Moseley 2004, পৃ. 275–276, 290, 306
  35. Moseley 2004, পৃ. 301
  36. 1 2 3 4 5 Audisio 1947
  37. 1 2 Moseley 2004, পৃ. 302–304
  38. 1 2 Moseley 2004, পৃ. 289
  39. Moseley 2004, পৃ. 290–292; 302–304
  40. 1 2 Bosworth 2014, পৃ. 31–32
  41. 1 2 Moseley 2004, পৃ. 290–291; 304
  42. Di Bella 2004, পৃ. 50
  43. 1 2 Moseley 2004, পৃ. 304
  44. Luzzatto 2014, পৃ. 54
  45. 1 2 3 Moseley 2004, পৃ. 286
  46. Audisio 1975, পৃ. 371
  47. Baima Bollone 2005, পৃ. 165
  48. Baima Bollone 2005, পৃ. 123
  49. Foot 1999
  50. Luzzatto 2014, পৃ. 5–17
  51. Moseley 2004, পৃ. 311–313
  52. 1 2 Bosworth 2014, পৃ. 332–333
  53. 1 2 Luzzatto 2014, পৃ. 68–71
  54. 1 2 3 Moseley 2004, পৃ. 313–315
  55. Garibaldi 2004, পৃ. 78
  56. Di Bella 2004, পৃ. 51
  57. Luzzatto 2014, পৃ. 74–75
  58. Moseley 2004, পৃ. 320
  59. 1 2 Bosworth 2014, পৃ. 334
  60. Moseley 2004, পৃ. 321
  61. 1 2 Shirer 1960, পৃ. 1131
  62. Goeschel 2018, পৃ. 289
  63. Kershaw 2008, পৃ. 949–950
  64. Kershaw 2001, পৃ. 823.
  65. Kershaw 2008, পৃ. 954–956
  66. Soloway 2015
  67. Bullock 1962, পৃ. 798
  68. Trevor-Roper 1995, পৃ. 174
  69. Kershaw 2001, পৃ. 1299
  70. 1 2 Moseley 2004, পৃ. 350–352
  71. 1 2 উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; "Foot" নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  72. Duggan 2013, পৃ. 428–429
  73. Moseley 2004, পৃ. 355–356
  74. 1 2 Duggan 2013, পৃ. 429–430
  75. Squires 2009
  76. Duggan 2013, পৃ. 430
  77. 1 2 3 4 5 Moseley 2004, পৃ. 275
  78. 1 2 Moseley 2004, পৃ. 275, 289–293
  79. Moseley 2004, পৃ. 301–306
  80. Lazzaro 1993, পৃ. 145ff.
  81. Moseley 2004, পৃ. 299
  82. Hooper 2006
  83. 1 2 3 Bailey 2014, পৃ. 153–155
  84. 1 2 3 4 5 6 7 Owen 2004
  85. 1 2 Bompard 1995
  86. Samuel 2010
  87. Garibaldi 2004, পৃ. 138ff.
  88. Lonati 1994, পৃ. 1ff.
  89. Tompkins 2001, পৃ. 340–354
  90. Moseley 2004, পৃ. 341
  91. Bosworth 2014, পৃ. 32
  92. Moseley 2004, পৃ. 297–298
  93. Bandini 1978, পৃ. 1ff.
  94. Moseley 2004, পৃ. 298

গ্রন্থপঞ্জি

[সম্পাদনা]

বইসমূহ

[সম্পাদনা]

সংবাদপত্র, জার্নাল এবং ওয়েবসাইট

[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]