বুরাটিনো


বুরাটিনো হলো আলেক্সেই নিকোলায়েভিচ তলস্তয় রচিত ১৯৩৬ সালের বিখ্যাত রূপকথা ‘দ্য গোল্ডেন কি, বা বুরাটিনোর রোমাঞ্চকর অভিযানের’ প্রধান চরিত্র। এই কাহিনীটি মূলত ১৮৮৩ সালে কার্লো কললোদি রচিত ইতালীয় উপন্যাস ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অফ পিনোকিওর’ ওপর ভিত্তি করে আবর্তিত।[১] বুরাটিনোর উৎপত্তি ঘটেছিল ‘কমিডিয়া ডেল আর্ট’ এর একটি চরিত্র হিসেবে। এর নামকরণ করা হয়েছে ইতালীয় শব্দ ‘বুরাটিনো’ থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘কাঠের পুতুল’।[২] ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই বুরাটিনো চরিত্রটি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের শিশুদের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং আজ অবধি রাশিয়ার অন্যতম প্রিয় ও জনপ্রিয় একটি সাহিত্যিক চরিত্র হিসেবে টিকে আছে। এই কাহিনী অবলম্বনে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে, যার মধ্যে ১৯৫৯ সালের অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র এবং ১৯৭৫ সালের লাইভ-অ্যাকশন চলচ্চিত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
উৎস ও প্রেক্ষাপট
[সম্পাদনা]তলস্তয়ের ভাষ্যমতে, তিনি ছোটবেলায় ‘পিনোকিও’ পড়েছিলেন। পরবর্তীকালে মূল বইটি হারিয়ে ফেলায় তিনি তার সন্তানদের জন্য শোয়ার আগে শোনানোর উদ্দেশ্যে গল্পটি নিজের মতো করে নতুনভাবে সাজিয়ে বলতে শুরু করেন। এর ফলে মূল কাহিনী থেকে আলাদা এক অনন্য রূপকথার জন্ম হয়, যা তার সন্তানদের খুব পছন্দ হয়েছিল। এই অনুপ্রেরণা থেকেই তিনি কাহিনীটি লিপিবদ্ধ ও প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে গবেষকদের মতে এই ব্যাখ্যাটি খুব একটা গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ তলস্তয়ের বয়স যখন বিশের কোঠায়, তখন পিনোকিওর প্রথম রুশ অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। অনেকের মতে, তলস্তয় হয়তো অন্য কোনো ভাষার অনুবাদের মাধ্যমে এই কাহিনীর সংস্পর্শে এসেছিলেন। মীরন পেত্রোভস্কি তার এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, এই বইটি মূলত ১৯২৪ সালে নিনা পেত্রোভস্কায়া কর্তৃক অনুদিত এবং তলস্তয় কর্তৃক সম্পাদিত একটি সংস্করণের ওপর ভিত্তি করে রচিত, যেখানে তলস্তয় মূল কাহিনীর অনেক অপ্রাসঙ্গিক উপাদান বর্জন করেছিলেন।[৩]
কাহিনীর সারাংশ
[সম্পাদনা]পিনোকিওর মতোই বুরাটিনো হলো একটি লম্বা নাক বিশিষ্ট কাঠের পুতুল। গল্পের বর্ণনা অনুযায়ী, পাপা কার্লো (গল্পের ‘জেপেত্তো’) একটি কাঠের গুঁড়ি খোদাই করে তাকে তৈরি করেন এবং সে হঠাৎ করেই প্রাণ ফিরে পায়। পাপা কার্লোর কিছুটা অসতর্ক কাজের ফলে বুরাটিনোর নাক বেশ লম্বা হয়ে যায়। পাপা কার্লো সেটি ছোট করার চেষ্টা করলেও বুরাটিনো তাতে বাধা দেয়।
পাপা কার্লো তার একমাত্র ভালো জ্যাকেটটি বিক্রি করে বুরাটিনোর জন্য পাঠ্যবই কিনে দেন এবং তাকে স্কুলে পাঠান। তবে পথে একটি পুতুলনাচ প্রদর্শনী বা থিয়েটারের বিজ্ঞাপন দেখে সে আকৃষ্ট হয় এবং পাঠ্যবই বিক্রি করে প্রদর্শনীর টিকেট কেনে। সেখানে অন্যান্য পুতুলের সাথে তার বন্ধুত্ব হয়, কিন্তু থিয়েটারের নিষ্ঠুর মালিক কারাবাস বারাবাস (যিনি মূল গল্পের ‘মাঞ্জাফুয়োকো’ চরিত্র) বুরাটিনোর ওপর ক্রুদ্ধ হন কারণ সে প্রদর্শনীতে বিঘ্ন ঘটিয়েছিল।
পরবর্তীতে কারাবাস বারাবাস জানতে পারেন যে পাপা কার্লোর বাড়িতে একটি গোপন দরজা আছে, যা তিনি দীর্ঘকাল ধরে খুঁজছিলেন। বুরাটিনোর কাছে থাকা একটি ‘সোনার চাবি’ সেই গোপন দরজাটি খুলতে সক্ষম। এটি জানার পর কারাবাস তাকে মুক্ত করে দেন এবং পাঁচটি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে তাকে তার বাবার ঘর পাহারা দিতে বলেন।
গল্পের পরবর্তী অংশে বুরাটিনো ও তার বন্ধুদের সেই সোনার চাবির সন্ধানে নানা অভিযানের কথা বর্ণিত হয়েছে। তাদের লড়তে হয় খলনায়ক কারাবাস, তার অনুগত বন্ধু দুরেমান এবং দুই ধূর্ত প্রতারক শিয়াল অ্যালিস ও বিড়াল বাসিলিওর বিরুদ্ধে, যারা বুরাটিনোর মুদ্রাগুলো চুরি করতে চায়। মুদ্রাচুরির ঘটনার পর থেকে গল্পের প্রেক্ষাপট কললোদির ‘পিনোকিও’ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা পথে মোড় নেয়।
পিনোকিওর সাথে পার্থক্যসমূহ
[সম্পাদনা]- কললোদির কাহিনীর নীল কেশরতী পরী এখানে তলস্তয়ের সংস্করণে ‘মালভিনা’ নামে একটি পুতুল হিসেবে আবির্ভূত হয়। সে তার নীল চুল এবং ভৃত্য আর্তেমনের (একটি পুডল কুকুর) বৈশিষ্ট্য ধরে রাখলেও তার ভূমিকা কিছুটা আলাদা। মালভিনা বুরাটিনোকে শিয়াল ও বিড়ালের হাত থেকে রক্ষা করে।
- এখানে ‘পিয়েরট’ নামক একটি নতুন চরিত্র আনা হয়েছে, যে মালভিনার প্রেমে মগ্ন। তাকে একজন চিরন্তন কবি হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
- বিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে তলস্তয় মূল গল্পের অনেক ভয়াবহ বা অতিরিক্ত নীতিবাদী অংশ বর্জন করেছেন। যেমন: পিনোকিওর পা পুড়ে যাওয়া, কালো খরগোশদের তাকে কবর দিতে আসার দৃশ্য কিংবা বিশাল সামুদ্রিক মাছের পেটে যাওয়ার ঘটনাগুলো এখানে নেই।
- মূল গল্পের পিনোকিওর মতো বুরাটিনো কখনোই রক্ত-মাংসের মানুষে পরিণত হয় না। বরং প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে এবং একরোখা স্বভাবের হওয়া সত্ত্বেও সে একজন বীর হিসেবে পুরস্কৃত হয়। গল্পের শেষে তাকে পাপা কার্লোর নতুন পুতুল থিয়েটারে আনন্দে খেলতে দেখা যায়।
- বুরাটিনোর মিথ্যা কথা বললে নাক লম্বা হয় না।
জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে
[সম্পাদনা]রাশিয়াসহ সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোতে বুরাটিনো নামটি শিশুদের বিভিন্ন পণ্য ও দোকানের ব্র্যান্ডিং হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘ক্যারামেল’ স্বাদের ‘বুরাটিনো’ কোমল পানীয় এবং ‘গোল্ডেন কি’ নামক টফি।[৪]
এছাড়াও রুশ রকেট লঞ্চার সিস্টেম এর দীর্ঘ সামনের অংশের কারণে এর ডাকনাম দেওয়া হয়েছে ‘বুরাটিনো’।[৫] গল্পের একটি স্থান ‘পলে চুদেস’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রাশিয়ায় বিখ্যাত গেম শো ‘হুইল অফ ফরচুরনের’ রুশ সংস্করণের নামকরণ করা হয়েছে।[৬]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Soyuzmultfilm (১৯৫৯), পিনোকিও এবং সোনার চাবি (বুরাটিনোর রোমাঞ্চকর অভিযান), সংগ্রহের তারিখ ১ নভেম্বর ২০২২
- ↑ "ইংরেজি অভিধানে 'burattino' শব্দের অর্থ"। dictionary.reverso.net।
- ↑ ‘সোনার চাবি’ কী উন্মোচন করে, মীরন পেত্রোভস্কি
- ↑ "রুশ কার্বোনেটেড ড্রিঙ্ক পিনোকিও ০.৫ লিটার"। ruskiwaydeli.com.au (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১ নভেম্বর ২০২২।
- ↑ Administrator। "TOS-1 বুরাটিনো হেভি ফ্লেম থ্রোয়ার ২২০ মিমি রকেট লঞ্চার ডাটা শিট"। www.armyrecognition.com। সংগ্রহের তারিখ ১ নভেম্বর ২০২২।
- ↑ "বিভিন্ন ভাষায় 'হুইল অফ ফরচুন'"। sci.lang.narkive.com। সংগ্রহের তারিখ ১ নভেম্বর ২০২২।
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]- sunbirds.com এ বুরাটিনো
- ইন্টারনেট মুভি ডাটাবেজে বুরাটিনো:
- ইউটিউবে দ্য গোল্ডেন কি (১৯৩৯) - ইংরেজি সাবটাইটেলসহ।