বিভব পতন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

বিভব পতন বলতে কোনো তড়িৎ বর্তনীতে তড়িৎ প্রবাহের পথে তড়িৎ শক্তির হ্রাস কে বুঝায়। তড়িৎ উৎসের অভ্যন্তরীণ রোধ, তড়িৎ পরিবাহী, বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং সংযোজক উপাদানসমূহে ঘটা বিভব পতনগুলো অনাকাঙ্ক্ষিত কারণ এখানে সরবরাহকৃত তড়িৎ শক্তির কিছু অংশের অপচয় ঘটে। একটি বৈদ্যুতিক লোডের মধ্য দিয়ে বিভব পতন তার মাঝে থাকা ব্যবহারযোগ্য তড়িৎ শক্তির সমানুপাতিক যা কিনা অন্যান্য শক্তিতে রূপান্তরিত হতে সক্ষম।

উদাহরণস্বরূপ, ধরা যাক একটি বৈদ্যুতিক চুলার রোধ দশ ওহম, যে তারের মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ ঘটবে সেটির রোধ ০.২ ওহম। যদি এটি সম্পূর্ণ বর্তনীর রোধের ২ শতাংশ হয় তাহলে বলা যায় সরবরাহকৃত তড়িৎ শক্তির প্রায় ২ শতাংশ সেই তারের মধ্যেই অপচয় হবে। এরকম অতিরিক্ত বিভব পতনের ফলাফল হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলার কর্মক্ষমতা অসন্তোষজনক হতে পারে এবং বৈদ্যুতিক তার সহ বর্তনী সংযোজক উপাদানসমূহ অত্যধিক গরম হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

বৈদ্যুতিক তারের মধ্য দিয়ে সর্বোচ্চ বিভব পতনের মাত্রা নির্ধারণ করতে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে বৈদ্যুতিক কোড সম্বলিত নীতিমালা বা নিয়মকানুন রয়েছে যাতে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির সঠিক পরিচালনা ও সুদক্ষ বণ্টন নিশ্চিত হয়। বিভব পতনের এই সর্বোচ্চ অনুমোদিত মাত্রা বিভিন্ন দেশে বিভিন্নরকম। [১] বিভব মাত্রা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বড় বড় তড়িৎ বর্তনীর নকশা করার সময় বা বিদ্যুৎ শক্তি স্থানান্তরে বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করা হয়। এক্ষেত্রে বিভব পতন কমানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে বর্তনীর বৈদ্যুতিক উৎস ও উপাদানের মাঝে পরিবাহীর দূরত্ব বাড়ানো, যার ফলে সামগ্রিকভাবে রোধের মাত্রা কমে যায়। আবার বিদ্যুৎশক্তি স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় উচ্চ বিভব পার্থক্য ব্যবহারের মাধ্যমে বিভব পতন কমানো যায়। এছাড়া আরো বাস্তবধর্মী প্রক্রিয়া হিসেবে বর্তনীতে এমন উপাদান ব্যবহার করা যায় যা তড়িৎ শক্তি উৎপাদন বা সরবরাহ করে, ফলে অতিরিক্ত বিভব পতনের ক্ষতিপূরণ হয়। এসকল উপাদানকে বর্তনীতে একটিভ উপাদান বলে।

একমুখী বা একদিকবর্তী তড়িৎ প্রবাহে বিভব পতনঃ রোধ[সম্পাদনা]

ধরা যাক ৯ ভোল্ট বিভব পার্থক্যবিশিষ্ট একটি একদিকবর্তী তড়িৎ উৎসের বর্তনীতে তিনটি রোধ- ৬৭ ওহম, ১০০ ওহম ও ৪৭০ ওহম এবং একটি লাইট বাল্ব সিরিজ সংযোগে সংযুক্ত আছে। একদিকবর্তী তড়িৎ উৎস, তড়িৎবাহী তার, রোধ এবং লাইট বাল্ (এখানে লোড) প্রত্যেকের নিজস্ব রোধকত্ব আছে এবং প্রত্যেকে সরবরাহকৃত তড়িৎ শক্তি ব্যবহার বা অপচয় করে। এদের গাঠনিক বৈশিষ্ট্য এই ব্যবহৃত বা অপচয়কৃত শক্তির পরিমাণ নির্ধারণ করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি তড়িৎবাহী তারের রোধ তারটির দৈর্ঘ্য, প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল, গাঠনিক উপাদান ও তাপমাত্রার উপর নির্ভরশীল।

যদি একদিকবর্তী তড়িৎ উৎস ও প্রথম রোধের(৬৭ ওহম) মধ্যকার বিভব পার্থক্য পরিমাপ করা হয়, এই বিভব শক্তির পরিমাণ ৯ ভোল্টের চেয়ে অল্প কিছু কম হবে। যেহেতু উৎস থেকে প্রথম রোধ অব্দি তড়িৎবাহী তারের মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হয়, সেহেতু সরবরাহকৃত তড়িৎশক্তির কিছু অংশ অপচয় হবে কারণ তড়িৎবাহী তারের নিজস্ব কিছু রোধকত্ব আছে। এভাবে বর্তনীর তড়িৎ সরবরাহ ও ফেরত আসা- উভয় পথেই তড়িৎবাহী তারে বিভবশক্তির অপচয় ঘটবে। প্রতিটি রোধের মধ্য দিয়ে বিভব পতন পরিমাপ করা হলে সেটি বর্তনীতে রোধ দ্বারা ব্যবহারকৃত তড়িৎ শক্তির পরিমাণ নির্দেশ করে। রোধের মান যত বড়, রোধ দ্বারা ব্যবহারকৃত তড়িৎশক্তির মান তত বেশি, রোধের মধ্যে বিভব পতনের মানও তত বেশি হবে।

এই বিভব পতন যাচাই করার একটি চমৎকার সূত্র হচ্ছে ওহম সূত্র । একদিকবর্তী তড়িৎ বর্তনীতে বিভব পতন, তড়িৎ এর মান ও রোধের মানের গুণফলের সমান, . আবার কার্শফের সূত্র অনুযায়ী একদিকবর্তী তড়িৎ প্রবাহে বর্তনীর প্রতিটি উপাদানে বিভব পতনের সমষ্টি হবে বর্তনীতে সরবরাহকৃত বিভব পার্থক্যের সমান।

দ্বিমুখী বা দিকপরিবর্তী তড়িৎ প্রবাহে বিভব পতনঃ ইমপিডেন্স[সম্পাদনা]

দিকপরিবর্তী তড়িৎ প্রবাহে একমুখী প্রবাহের মতই রোধের কারণে তড়িৎ প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়। আবার দিকপরিবর্তী প্রবাহে দ্বিতীয় এক প্রকার বাধা দেখতে পাওয়া যায় যাকে রিএকট্যান্স বলে। এই ধরনের দিকপরিবর্তী প্রবাহে বাধাদানকারী রোধ এবং রিএকট্যান্স এর সমষ্টিকে ইমপিডেন্স বলে ।

সাধারণত দিকপরিবর্তী তড়িৎ প্রবাহের একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে পরিমাপপূর্বক বৈদ্যুতিক ইমপিডেন্স কে Z চলক দ্বারা প্রকাশ করা হয় যার একক ওহম । এটিকে বর্তনীর রোধ, ক্যাপাসিটিভ রিএকট্যান্সইনডাকটিভ রিএকট্যান্স এর ভেক্টর সমষ্টিরূপে পরিমাপ বা প্রকাশ করা হয়।

একটি দিকপরিবর্তী তড়িৎবর্তনী তে ইমপিডেন্সের মান ঐ প্রবাহের কম্পাঙ্কের উপর, তড়িৎবাহী তারের চৌম্বক প্রবেশ্যতা ও বৈদ্যুতিকভাবে বিচ্ছিন্ন উপাদানসমূহের উপর নির্ভর করে। অর্থাৎ উপাদানসমূহের আকার, আকৃতি ও পরস্পরের মধ্যবর্তী দূরত্বের প্রভাবে ইমপিডেন্স পরিবর্তিত হয়।

একমুখী তড়িৎ বর্তনীতে ওহম সূত্র যেভাবে প্রয়োগ করা যায়, দিকপরিবর্তী তড়িৎ বর্তনীতেও একইভাবে বৈদ্যুতিক ইমপিডেন্স কে প্রকাশ করা যায় . অর্থাৎ, একটি দিকপরিবর্তী তড়িৎ বর্তনীতে বিভব পতন ঐ বর্তনীতে তড়িৎ প্রবাহ ও বর্তনীর ইমপিডেন্স এর গুণফলের সমান।

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Archived copy"। ২০১০-০৩-০৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১০-০৩-০৬ 
  • Electrical Principles for the Electrical Trades (Jim Jennesson) 5th edition

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]