বিষয়বস্তুতে চলুন

বার্মিংহাম স্নান কুপন্থী ধর্মগোষ্ঠী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

বার্মিংহাম স্নান ধর্মগোষ্ঠী (Birmingham bathing cult) ছিল ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে অবস্থিত একটি তথাকথিত ধর্মীয় সম্প্রদায়। তারা ২০ বছরেরও অধিক সময় ধরে শিশুদের উপর জঘন্য যৌন নির্যাতন চালিয়েছিল। এই গোষ্ঠীর নেতা মাইকেল ওলুরনবি শিশুদের উপর নিপীড়ন চালানোর ছদ্মবেশ হিসেবে "পবিত্র স্নান" নামক একটি প্রথার প্রচলন করেছিল[] এবং পরবর্তীতে তাকে ৩৪ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।[][]

ধর্মগোষ্ঠী

[সম্পাদনা]

নাইজেরিয়ায় জন্মগ্রহণকারী মাইকেল ওলুরনবি ১৯৮৯ সাল থেকে ইংল্যান্ডের বার্মিংহামের একটিগৃহে চেরুবিম অ্যান্ড সেরাফিম চার্চের একটি বিচ্ছিন্ন অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছিল।[][] এই গোষ্ঠীতে আনুমানিক ৪০ জন সদস্য ছিল।[] ওলুরনবি নিজেকে ভবিষ্যদ্বক্তা হিসেবে প্রচার করত এবং পুলিশের ভাষ্যমতে, "উপাসকমণ্ডলীর উপর তার এতটাই প্রভাব ছিল যে, তার প্রতিটি বাক্যকেই তারা বেদবাক্যসম সত্য বলে মনে করত"।[] ওলুরনবির দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার বেশ কয়েকজন সদস্য তাদের এই গোষ্ঠীকে একটি "কাল্ট" বা কুপন্থী ধর্মগোষ্ঠী[] এবং এর নেতাকে "নিয়ন্ত্রণকারী" হিসেবে অভিহিত করেছেন।[]

অপরাধসমূহ

[সম্পাদনা]

মাইকেল ওলুরনবি ১৯৮৯ সাল থেকে[] বার্মিংহাম এবং লন্ডনে ২০ বছরেরও অধিক সময় ধরে শিশুদের উপর যৌন নির্যাতন চালিয়েছিল।[] তার চিহ্নিত ভুক্তভোগীদের মধ্যে ছিল ছয়টি বালিকা এবং একটি বালক; এদের মধ্যে কয়েকজনকে সে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও নির্যাতন অব্যাহত রেখেছিল। তার সর্বকনিষ্ঠ ভুক্তভোগীর বয়স ছিল মাত্র আট বছর।[] পুলিশের ধারণা, ভুক্তভোগীর সংখ্যা আরও অধিক হতে পারে।[]

সে বাড়ির ওপরতলার স্নানাগারে শিশুদের "আধ্যাত্মিক স্নান" করানোর ছলে এই পাপাচার সংঘটিত করত;[] মাঝেমধ্যে এতে তার স্ত্রীও সহায়তা করত।[] এই প্রক্রিয়ার সময় ভুক্তভোগীরা সম্পূর্ণ নগ্ন থাকত অথবা তাদের পরিধানে কেবল একটি রক্তিম উত্তরীয় থাকত।[] নির্যাতনের ধরনগুলোর মধ্যে ছিল শিশুদের জোরপূর্বক সুগন্ধি পান করানো,[] স্নান চলাকালীন যৌন নিগ্রহ এবং পরবর্তীতে ধর্ষণ।[] সে অন্তত ৮৮ বার ধর্ষণ কাণ্ড ঘটিয়েছে।[] সে তার শিশু ভুক্তভোগীদের মনে ভীতিকর বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের নিয়ন্ত্রণ করত; যেমন নির্যাতনের বিরোধিতা করলে তারা পিশাচীতে পরিণত হবে অথবা বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় অকৃতকার্য হবে। সে তার এই জঘন্য অপরাধগুলোকে ঈশ্বরের নির্দেশ[] এবং অশুভ আত্মার কবল থেকে রক্ষার জন্য 'শুদ্ধিকরণ আচার' হিসেবে যুক্তি প্রদর্শন করত।[][] ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিস-এর মতে, "বিবাদীদের প্রভাব ও কর্তৃত্বের কারণে" ভুক্তভোগীরা "সরল বিশ্বাসে মনে করত যে তাদের এই কর্মকাণ্ড ঈশ্বরের পক্ষ থেকেই আদিষ্ট"।[]

পরবর্তীতে এক ভুক্তভোগীর আত্মীয় যখন তার মুখোমুখি হয়, তখন সে দাবি করে যে শয়তান তাকে এই অপরাধ করতে বাধ্য করেছে।[] সে নিজেকে "পশু" হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং বলে, "সবকিছুই আমার দোষ ছিল"।[]

তথ্য গোপন

[সম্পাদনা]

নির্যাতনের ফলে যখন চারটি বালিকা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে, তখন জোরপূর্বক তাদের গর্ভপাত করানো হয়।[] কখনও ছদ্মনামে গর্ভপাত ক্লিনিকে বুকিং দিয়ে[] অথবা ওলুরনবি কর্তৃক ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে এটি করা হতো।[] একজন সনদপ্রাপ্ত ঔষধ প্রস্তুতকারক হওয়ার সুবাদে ওলুরনবি সহজেই গর্ভপাতক ঔষধ সংগ্রহ করতে সক্ষম ছিল।[] তিনজন ভুক্তভোগীকে একাধিকবার গর্ভপাত করানো হয়; এর মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় একজনকে "পাঁচ বা ছয়বার" গর্ভপাত করানো হয়েছিল।[] ওলুরনবির স্ত্রী জুলিয়ানা কিছু গর্ভপাতের ব্যবস্থা করেছিল।[][]

ভুক্তভোগীদের উপর প্রভাব

[সম্পাদনা]

পুলিশ ভুক্তভোগীদের উপর এই ঘটনার শারীরিক ও মানসিক প্রভাবকে "অত্যন্ত ব্যাপক" হিসেবে বর্ণনা করেছে।[][] একজন ভুক্তভোগী জানিয়েছেন যে এই "ভয়াবহ" অপরাধ "সবার জীবনকে প্রভাবিত করেছে"।[] আরেকজন ভুক্তভোগী বলেন, ওলুরনবি "আমার সতীত্ব, আমার যৌবন এবং একজন শিশু হিসেবে আমার পবিত্রতা হরণ করেছে"; অন্য একজন বলেছেন, "আমি সাবান খেতাম যতক্ষণ না আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তাম, যাতে আমি আমার ভিতর ও বাহির থেকে এই লোকটির কলঙ্ক মুছে ফেলতে পারি"।[] এই নির্যাতন একটি বালিকাকে এতটাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছিল যে সে "জীবন ধারণের সার্থকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিল"।[]

এনএসপিসিসি মন্তব্য করেছে, "বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার মুখোশের আড়ালে মাইকেল ওলুরনবি শিশুদের অকল্পনীয় নির্যাতনের শিকার করতে ভয় ও কারসাজির আশ্রয় নিয়েছিল" এবং তার স্ত্রী জুলিয়ানা "এই শিশুদের উপর ট্রমা বা মানসিক আঘাত সৃষ্টিতে অবদান রেখেছিল।"[]

একজন ভুক্তভোগী পুলিশের কাছে অপরাধের অভিযোগ দায়ের করার পর অবশেষে ওলুরনবি দম্পতি ধরা পড়ে।[] ২০১৮ সালের মে মাসে, মাইকেল ওলুরনবিকে বার্মিংহাম বিমানবন্দরে আটক করা হয়[] যখন সে তার নিজ দেশ নাইজেরিয়ায় পলায়ন করার চেষ্টা করছিল। এর অল্প সময় পূর্বেই একজন ভুক্তভোগী তার মুখোমুখি হয়েছিল। পুলিশ জানিয়েছে, আটকের পূর্ব পর্যন্ত সে যাজক হিসেবে তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল।[]

বিচার

[সম্পাদনা]

মাইকেল ওলুরনবির বিরুদ্ধে ৩২টি অভিযোগ আনা হয়,[] যার সবকটিই সে অস্বীকার করে। সে এবং তার স্ত্রী নয় সপ্তাহ ধরে বিচারের মুখোমুখি হয়, যা ২০২০ সালের জানুয়ারিতে সমাপ্ত হয়।[] সে ২৪টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়, এবং জুরি আরও ছয়টি অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।[]

সংবাদ মাধ্যমের উপর নিষেধাজ্ঞা

[সম্পাদনা]

বিচার চলাকালীন, সংবাদ মাধ্যমকে আদালতের কার্যবিবরণী বা অপরাধ সম্পর্কে সংবাদ প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। ২০২০ সালের ১৪ জানুয়ারি বিচারক আইনি বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করার পরেই কেবল এগুলি প্রকাশ করা সম্ভব হয়,[] যখন ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিস ঘোষণা করে যে তারা পুনঃবিচারের আবেদন করবে না।[]

দণ্ডাদেশ

[সম্পাদনা]

২০২০ সালের ১০ জানুয়ারি, দুই বিবাদীকে একাধিক শিশু যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।[][] মাইকেল ওলুরনবির ২৪টি দণ্ডাদেশের মধ্যে ১৫টি ছিল ধর্ষণের অভিযোগ।[] তার স্ত্রীর তিনটি দণ্ডাদেশই ছিল গর্ভপাত গোপনের আয়োজন করে "ধর্ষণে সহায়তা ও প্ররোচনা" দেওয়ার জন্য।[] ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসের জর্জিনা হিউইন্স বলেন: "এই মামলায় একজন ধর্মীয় নেতা কর্তৃক অসহায় শিশুদের গুরুতর এবং দীর্ঘস্থায়ী যৌন নির্যাতনের ঘটনা জড়িত। ভুক্তভোগীদের অল্প বয়স অপরাধের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।" তিনি ভুক্তভোগীদের "অসীম সাহসিকতার" প্রশংসা করেন যা এই নির্যাতনকারীদের "ঘৃণ্য ও আইনবহির্ভূত আচরণ" প্রকাশ্যে আনতে সক্ষম হয়েছে।[]

ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস পুলিশের ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর ডেভ স্প্রোসন বলেন: "এগুলি ছিল অসুস্থ অপরাধ, যা সেই শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছিল যারা ওলুরনবিকে বিশ্বাস করেছিল এবং তাকে শ্রদ্ধা করত। আমি আশা করি তার দণ্ডাদেশ ভুক্তভোগীদের কিছুটা হলেও মানসিক প্রশান্তি দেবে এবং বিচার চলাকালীন তাদের সাহসিকতার জন্য আমি তাদের ধন্যবাদ জানাতে চাই।"[][]

কারাদণ্ড

[সম্পাদনা]
অপরাধী বয়স দণ্ডাদেশসমূহ শাস্তি
মাইকেল ওলুরনবি (নেতা) ৬০ ধর্ষণ (১৫টি অভিযোগ), যৌন নিগ্রহ (২টি অভিযোগ), অশালীন আচরণ (৭টি অভিযোগ)[] ৩৪ বছর[]
জুলিয়ানা ওলুরনবি (নেতার স্ত্রী) ৫৮ শিশুর ধর্ষণে সহায়তা (২টি অভিযোগ), প্রাপ্তবয়স্কের ধর্ষণে সহায়তা[] ১১ বছর[]

২০২০ সালের ৬ মার্চ, মাইকেল ওলুরনবি এবং তার স্ত্রী জুলিয়ানাকে যথাক্রমে ৩৪ বছর এবং ১১ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। বিচারক সারাহ বাকিংহাম ওলুরনবিকে "উদ্ধত, স্বার্থপর এবং অসার" বলে অভিহিত করেন। দণ্ড ঘোষণার সময় তিনি বলেন: "শিশুরা তোমাকে ভয় পেত এবং এটি তোমাকে তোমার কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সক্ষম করেছিল। তোমার অপরাধ তোমার সকল অভিযোগকারীর ওপর চরম এবং গুরুতর প্রভাব ফেলেছে [...] আমার বিচারে, তোমার অপরাধ আদালতে আসা একাধিক শিশুর যৌন নির্যাতনের নিকৃষ্টতম ঘটনাগুলোর অন্যতম।"[]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 "Michael Oluronbi: Birmingham pastor guilty of raping children"BBC News (ইংরেজি ভাষায়)। ১৪ জানুয়ারি ২০২০। ১৫ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত
  2. 1 2 3 4 "Michael Oluronbi: 'Holy bath' rapist jailed for 34 years"BBC News (ইংরেজি ভাষায়)। ৬ মার্চ ২০২০। ৭ মার্চ ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত
  3. "'Feared' self-styled prophet who sexually abused children and adults over 20 years is jailed"আইরিশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট (ইংরেজি ভাষায়)। ৬ মার্চ ২০২০।
  4. 1 2 3 4 5 6 7 8 "Pastor and wife convicted of historical child abuse"ITV News (ইংরেজি ভাষায়)। ১৪ জানুয়ারি ২০২০। ১৯ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত
  5. 1 2 3 4 5 6 Sharman, Jon (১৪ জানুয়ারি ২০২০)। "'I was an animal': Self-styled prophet claims devil made him rape children and force them to have abortions"The Independent (ইংরেজি ভাষায়)। ১৫ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত
  6. 1 2 3 4 5 6 7 8 Vernalls, Richard; Rodger, James (১৪ জানুয়ারি ২০২০)। "'Feared' Birmingham pastor was multiple rapist who left child victims pregnant"Birmingham Mail (ইংরেজি ভাষায়)। ১৫ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত
  7. 1 2 "Michael Oluronbi: Birmingham pastor raped children after naked 'spiritual bathing'"Sky News (ইংরেজি ভাষায়)। ১৪ জানুয়ারি ২০২০। ১৫ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত
  8. 1 2 "Pastor and wife convicted of historical child abuse"West Midlands Police (ইংরেজি ভাষায়)। ৯ মার্চ ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  9. 1 2 3 4 5 Bentley, David (৬ মার্চ ২০২০)। "Birmingham pastor who sexually abused children and adults over two decades jailed for 34 years"Birmingham Mail (ইংরেজি ভাষায়)। ৯ মার্চ ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত