বিষয়বস্তুতে চলুন

বাযান ইবনে সাসান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বাযান ইবনে সাসান
باذان بن شاشان
জন্মসানা, হিমায়ির রাজ্য
মৃত্যু১০ হি./৬৩২ খ্রি.
সানা
পদমর্যাদাগভর্নর
সন্তান

বাযান ইবনে সাসানহ ( আরবি: باذان بن شاشان ) বা বাযাম (আরবি: باذام) ছিলেন মুহাম্মাদের একজন সাহাবি। তিনি পার্সিক বংশোদ্ভূত আবনা সম্প্রদায়ের একজন প্রভাবশালী নেতা ও ইয়েমেনের সাসানীয় গভর্নর ছিলেন। পারস্যের সাসানীয় সম্রাট দ্বিতীয় খসরুর (শাসনকাল ৫৯০–৬২৮ খ্রি.) শাসনামলে তিনি ইয়েমেনের গভর্নর হিসেবে দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি নবি মুহাম্মদের জীবদ্দশাতেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তাই ইসলামের ইতিহাসে তাঁর পরিচয় বিশেষ স্থান পায়। অধিকাংশ মুসলিম ইতিহাসবিদের মতে, বাযান নবি মুহাম্মাদের সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। [][][][][]

জীবনী

[সম্পাদনা]

বাযান সাসানীয় সম্রাট দ্বিতীয় খসরুর ( খসরু পারভেজ) শাসনামলে ইয়েমেনের রাজধানী সানার গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত হন।[] তিনি মূলত পারস্য সম্রাটের প্রতিনিধিত্ব করতেন এবং ইয়েমেনে সাসানীয় প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বজায় রাখতেন। এই সময়েই আরব উপদ্বীপে ইসলামের আগমন ঘটে। নবি মুহাম্মাদ প্রথমে মক্কা ও পরে মদিনায় একত্ববাদ, নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায় ও একক আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। এই নতুন দাওয়াত আরবের পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে থাকলে তার খবর শাসকদের কাছেও পৌঁছায়। ইসলামি ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, বাযানও এই নতুন ধর্মীয় আন্দোলন সম্পর্কে প্রতিবেদন সংগ্রহ করে পারস্য সম্রাট খসরুর কাছে পাঠান। অন্যদিকে, নবি মুহাম্মদ বিভিন্ন দেশের শাসকদের নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে পত্র প্রেরণ করে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় খসরুর কাছেও একটি চিঠি পাঠানো হয়। সেই চিঠিতে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল হিসেবে নবি মুহাম্মাদের পরিচয় উল্লেখ ছিল এবং এতে তাকে ইসলাম গ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হয়। বর্ণনা অনুযায়ী, খসরু চিঠিটি পড়তে শুরু করলে এতে নিজের নামের আগে নবি মুহাম্মাদের নাম লেখা দেখে ক্রোধান্বিত হন এবং তিনি এটিকে নিজের মর্যাদার অবমাননা হিসেবে দেখেন এবং রাগে চিঠিটি ছিঁড়ে ফেলেন। এরপর তিনি ইয়েমেনের গভর্নর বাযানকে নির্দেশ দেন, যেন তিনি দু’জন লোক মদিনায় পাঠিয়ে নবি মুহাম্মাদকে গ্রেফতার করেন এবং তাকে পারস্যের রাজধানী তিসফুনে হাজির করে। বাযান সম্রাটের আদেশ অনুযায়ী মদিনায় দুজন দূত পাঠান। তারা মদিনায় এসে নবি মুহাম্মাদের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং খসরুর নির্দেশ জানায়। নবি তাদের শান্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং জানান যে, অতি শিগগিরই খসরু নিজেই তাঁর পুত্র দ্বিতীয় কুবাদের হাতে সিংহাসনচ্যুত ও নিহত হবেন। আরো বলা হয়, তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, খসরুর রাজ্য সেভাবে ছিন্নভিন্ন হবে, যেভাবে সে আল্লাহর রসুলের চিঠি ছিঁড়ে ফেলেছিল। পাশাপাশি তিনি এই বার্তাও দেন যে, যদি বাযান ইসলাম গ্রহণ করেন, তবে তিনি নিজের শাসনপদে বহাল থাকতে পারবেন।[][]

দুই দূত ইয়েমেনে ফিরে গিয়ে বাযানকে সব ঘটনা জানায়। বাযান তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত না নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন, যেন খসরুর ব্যাপারে বলা ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা যাচাই করা যায়। কিছুদিন পর পারস্য থেকে সংবাদ আসে যে, খসরু সত্যিই তার পুত্র দ্বিতীয় কুবাদের হাতে ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হয়েছেন। এই সংবাদ নবির কথার সত্যতা প্রমাণ করে বলে বাযান উপলব্ধি করেন। এরপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তার অনুসারী পারসিক বংশোদ্ভূত অনেক কর্মকর্তাও ইসলাম গ্রহণ করে। এভাবে গোটা ইয়েমেনে শান্তিপূর্ণভাবে ইসলামের বিস্তার ঘটে এবং বাযান ইসলামি শাসনব্যবস্থার অধীনে তার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। এই ঘটনা ইসলামি ঐতিহ্যে নবুয়তের সত্যতার একটি নিদর্শন ও নবি মুহাম্মাদের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। []

বাযানকে অনুসরণ করে ইয়েমেনেইয়েমেনের বাইরে বসবাসকারী দুইজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিসহ অনেক পারসিক ব্যক্তিও ইসলাম গ্রহণ করে। এরপর বাযান নবি মুহাম্মদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে তাঁর ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি অবহিত করেন। ইসলাম গ্রহণের পর বাযান আশেপাশের একাধিক অঞ্চলের শাসকদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছান। তিনি বাণিজ্যিক যোগাযোগ থাকা বিভিন্ন ইয়েমেনি আরব বসতি ও বিভিন্ন রাজ্যে বার্তা প্রেরণ করেন। এসব স্থানের মধ্যে সিলনে (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) অবস্থিত পারসিক চৌকি, মালয়া, মালায়ানা, বেত্তেলা (পোতালা), কিলাকারাই প্রভৃতি স্থান অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ঐসব এলাকায় মসজিদ নির্মাণের নির্দেশও দিয়েছিলেন। []

প্রাচীন মুসলিম ইতিহাসবিদদের মধ্য ইবনে হিশাম, তাবারি ও অনেকেই তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা উল্লেখ করেছেন। ইবনে সা'দ তাঁর গ্রন্থে মুহাম্মদ ইবনে উমরের সূত্রে বর্ণনা করেছেন:

"আল্লাহর রাসুল আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাইফাকে দূত হিসেবে পারস্যের সম্রাটের কাছে পাঠান এবং তাঁর সঙ্গে একটি পত্রও দেন। আবদুল্লাহ বলেন, আমি চিঠিটি সম্রাটের হাতে পৌঁছে দিলে সেটি তার সামনে পাঠ করা হলো। তারপর তিনি চিঠিটি হাতে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলেন। এই খবর নবির কাছে পৌঁছলে তিনি দোয়া করেন: “হে আল্লাহ, তার রাজত্ব টুকরো টুকরো করে দিন।”এরপর কিসরা ইয়েমেনে তার গভর্নর বাযানের কাছে লিখে পাঠাল: “হিজাজে যে লোকটি ( নবি মুহাম্মাদ) আছে, তার সম্পর্কে খবর আনার জন্য তোমার পক্ষ থেকে দুইজন শক্তিশালী ও সাহসী লোক পাঠাও। বাযান তার বিশ্বস্ত কর্মচারী কাহরামান ও আরেক ব্যক্তিকে পাঠান এবং তাদের সঙ্গে একটি পত্রও দেন। তারা মদিনা এসে বাযানের চিঠি নবির হাতে দেয়। তিনি মুচকি হাসেন এবং তাদের ইসলামের দিকে আহ্বান করলেন। তখন তাদের শরীর ভয়ে কাঁপছিল। তাই তিনি বললেন, আজ তোমরা ফিরে যাও। আগামীকাল এসো, তখন আমি তোমাদের জানাবো আমি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরদিন তারা আবার এলে তিনি তাদের বললেন: তোমরা নিজোদের প্রভুকে (বাযান) জানিয়ে দিও যে, আমার রব গতরাতে তোমাদের প্রভু কিসরাকে হত্যা করেছেন। সেদিন সপ্তম হিজরি সনের জমাদিউল আউয়াল মাসের মঙ্গলবারের রাত ছিল। আল্লাহ তাআলা তার ছেলে শিরুয়াইহকে ক্ষমতাবান করেছেন এবং সে-ই তাকে হত্যা করেছে। তারা এই সংবাদ নিয়ে বাযানের কাছে ফিরে যায়। সংবাদটি সত্য প্রমাণিত হলে বাযান নিজেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁর ছেলে যাদাওয়াইও সবাই ইসলাম গ্রহণ করে। তবে ইসলাম গ্রহণের পরের বছরই বাযান মৃত্যুবরণ করেন।[১০]

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

[সম্পাদনা]

বাযান ইবনে সাসান ৬৩২ সালে মারা যান। এরপর তাঁর পুত্র যাদাওয়াই (শাহর) তার স্থলাভিষিক্ত হয়ে স্বল্প সময়ের জন্য সানার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আবু বকরের শাসনামলে মিথ্যা নবুয়তের দাবিদার আসওয়াদ আনসির বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিহত হন। আনসি একজন বিদ্রোহী ছিল, যে নবি মুহাম্মদের অসুস্থতার পর নিজেকে নবি হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। আনসি সানায় আক্রমণ চালান এবং শাহরকে হত্যা করেন। পরে তিনি শাহরের বিধবা স্ত্রীকে বিবাহ করেন এবং নিজেকে ইয়েমেনের শাসক হিসেবে ঘোষণা করেন। [১১] []

তাঁর অপর পুত্র মেহরান ইসলাম গ্রহণ করেননি এবং তিনি বুওয়াইবের যুদ্ধে পারসিক বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সে যুদ্ধেই মেহরান নিহত হন।[১২]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

গ্রন্থপঞ্জি

[সম্পাদনা]
  • Zakeri, Mohsen (১৯৯৫)। Sāsānid Soldiers in Early Muslim Society: The Origins of ʿAyyārān and Futuwwa। Wiesbaden: Otto Harrassowitz। আইএসবিএন ৯৭৮-৩-৪৪৭-০৩৬৫২-৮
  • Bosworth, C.E. (১৯৮৩)। "Abnāʾ"। Encyclopaedia Iranica, Vol. I, Fasc. 3। পৃ. ২২৬–২২৮।
  • Potts, Daniel T. (২০১২)। "ARABIA ii. The Sasanians and Arabia"। Encyclopaedia Iranica
  • Bosworth, C.E. (২০১২)। "Bādhām, Bādhān"। Bearman, P.; Bianquis, Th.; Bosworth, C.E.; van Donzel, E.; Heinrichs, W.P. (সম্পাদকগণ)। Encyclopedia of Islam, Second Editionডিওআই:10.1163/1573-3912_islam_SIM_8385আইএসবিএন ৯৭৮৯০০৪১৬১২১৪
  • Fayda, Mustafa (১৯৯২)। "BÂZÂN"টিডিবি ইসলাম আনসিক্লোপেদিসি, Vol. 5 (Balaban – Beşi̇r Ağa) (তুর্কি ভাষায়)। ইস্তাম্বুল: তুর্কিয়ে দিয়ানেত ফাউন্ডেশন, সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজ। পৃ. ২৮৩–২৮৪। আইএসবিএন ৯৭৮৯৭৫৩৮৯৪৩২৬

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Chosroes and Badhan
  2. الطبري السلسلة الأولى، ص1575
  3. ابن هشام، ج1، ص91–93
  4. المسعودي، 1967، ص259
  5. مُجمل التواريخ، ص172
  6. Bosworth 2012
  7. 1 2 "Chosroes II, Siroes and Prophet Muhammad (628 C.E.)"www.cyberistan.org। সংগ্রহের তারিখ ২৭ জানুয়ারি ২০২৬
  8. "مدى صحة قصة إسلام باذان عامل الفرس على اليمن"www.islamweb.net (আরবি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২৭ জানুয়ারি ২০২৬
  9. 1 2 Michael M.J. Fischer, Mehdi Abedi (১৯৯০)। Debating Muslims: Cultural Dialogues in Postmodernity and TraditionUniversity of Wisconsin Press। পৃ. ১৯৩, ১৯৪। আইএসবিএন ৯৭৮০২৯৯১২৪৩৪২
  10. ইবনে সা'দআল-তাবাকাত আল-কুবরা। পৃ. বাযানের জীবনী।
  11. Fayda 1992, পৃ. 283-284।
  12. রেহান, ইসমাইল (ফেব্রুয়ারী ২০২১)। মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, খন্ড ৩। মাইমুন, মুজাহিদুল ইসলাম কর্তৃক অনূদিত। ইসলামী টাওয়ার, বাংলাবাজার, ঢাকা: মাকতাবাতুল ইত্তিহাদ