বাফার দ্রবণ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

যে দ্রবণে এসিড ও ক্ষার যুক্ত করার পরেও দ্রবণের ph মানের কোনো পরিবর্তন ঘটে না সেসকল দ্রবণকে বাফার দ্রবণ বলা হয়। এ ধরনের দ্রবণে দ্রবীভূত এসিড ও ক্ষারক প্রশমিত হয়ে যায়। ফলে দ্রবণের ph মান পরিবর্তন হয় না। বাফার দ্রবণসমূহের নির্দিষ্ট ph সীমা রয়েছে যা ph পরিবর্তনের আগে কি পরিমান এসিড/ ক্ষারকে নিরপেক্ষ করা যায় তা নির্দেশ করে। [১] বাফার দ্রবণ দুই প্রকার। অম্লীয় বাফার ও ক্ষারীয় বাফার দ্রবণ।

আবিষ্কার ও ইতিহাস[সম্পাদনা]

বাফার প্রকৃতিতে আগে থেকেই ছিল। ১৯০৮ সালে লরেন্স জোসেফ হ্যান্ডারসন একটি সমীকরন বের করেন যা কার্বনিক এসিডকে প্রাকৃতিক বাফার হিসেবে প্রমাণ করে। পরবর্তীতে লগারিদম ব্যবহার করে সমীকরনটি সংশোধন করেন কার্ল এলবার্ট হ্যাসেলবাগ। এই সূত্রটি এসিড ও ক্ষারকীয় দ্রবণের ক্ষেত্রে দ্রবণের ph মান নির্ণয়ে সক্ষম হয়। এছাড়াও কোন বাফার দ্রবণের ph মান কেমন হবে সেটিও জানা যায় উক্ত সমীকরন থেকে। এই সমীকরনটিকে হ্যান্ডারসন-হেসেলবাগ সমীকরন হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই সূত্রটিকে প্রধান সূত্র ধরে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বাফার প্রস্তুত করা হয়। [২]

অম্লীয় বাফার[সম্পাদনা]

দ্রবণে অম্লীয় পরিবেশ বজায় রাখতে অম্লীয় বাফার ব্যবহার করা হয়। অম্লীয় বাফারসমূহের পিএইচ মান ৭ এর নিচে। অর্থাৎ, এরা এসিডিক। শক্তিশালী ক্ষারের সাথে দুর্বল এসিড ও এর লবণ মিশ্রিত করে অম্লীয় বাফার প্রস্তুত করা হয়। অম্লীয় বাফার দ্রবণের পিএইচ ৭ এর নিচে। যেমনঃ এসিটিক এসিড ও সোডিয়াম এসিটেটের দ্রবণের বাফার একটি অম্লীয় বাফার যার পিএইচ ৪.৭৫। [৩] CH₃COOH উভমুখীভাবে বিয়োজিত হয়ে CH₃COO⁻ ও H⁺ উৎপন্ন করে। অর্থাৎ, CH₃COOH CH₃COO⁻ + H⁺

ক্রিয়া কৌশল : অম্লীয় বাফার দ্রবণের মৃদু এসিডের সাম্যাবস্থার সমীকরণঃ

CH₃COOH CH₃COO⁻ + H⁺

CH₃COOH + CH₃COONa এর ক্ষেত্রে সাম্যাবস্থায় দ্রবণে H⁺, CH₃COO⁻, Na⁺ উপস্থিত থাকে। এক্ষেত্রে বাফার দ্রবণে হাইড্রোজেন আয়ন যোগ করা হলে CH₃COOH উৎপন্ন হয়। এটি একটি মৃদু এসিড হওয়ায় বিক্রিয়ায় উৎপন্ন এসিড আয়নিত হয় না ও পি এইচ মানের কোনো পরিবর্তন হয় না। অন্যদিকে, বাফার দ্রবণটিতে ক্ষারক যোগ করা হলে যে হাইড্রোক্সিল আয়ন উৎপন্ন হয় তা হাইড্রোজেনের সাথে বিক্রিয়া করে পানি উৎপন্ন করে। ফলে দ্রবণের পিএইচ পরিবর্তন হয় না। [৪]

ক্ষারীয় বাফার[সম্পাদনা]

মৃদু ক্ষারের সাথে তীব্র এসিড ও সেই মৃদু ক্ষারের লবণের দ্রবণ মিশিয়ে যে বাফার দ্রবণ প্রস্তুত করা হয় তাকে ক্ষারীয় বাফার বলে। এই দ্রবণের পিএইচ মান ৭ এর উপরে। অর্থাৎ, এরা ক্ষারীয়। যেমনঃ এমোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড ও এমোনিয়াম ক্লোরাইডের বাফার দ্রবণ একটি ক্ষারীয় বাফার দ্রবণ যার পিএইচ ৯.২৫ [৫]

ক্রিয়া কৌশল: NH₄OH ও NH₄Cl এর দ্রবণ ক্ষারীয় বাফারের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এ দ্রবণের সাম্যাবস্থায় NH₄⁺, Cl⁻ ও OH⁻ আয়ন উপস্থিত। এখন এই দ্রবণে হাইড্রোজেন আয়ন যোগ করলে তা হাইড্রোক্সিল আয়নের সাথে বিক্রিয়া করে প্রশমিত হয়ে যায়। অন্যদিকে, ক্ষার যোগ করলে তা এমোনিয়া আয়নের সাথে যুক্ত হয়ে এমোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড উৎপন্ন করে। উৎপন্ন এমোনিয়া হাইড্রোক্সাইড মৃদু ক্ষার হওয়ায় দ্রবণের পিএইচ এর কোনো পরিবর্তন হয় না। [৪]

বাফার দ্রবণের ph গণনা[সম্পাদনা]

হেন্ডারসন হ্যাসেলবাখ সমীকরণ থেকে যেকোনো অজানা দ্রবণের পিএইচ মান বের করা যায়। সমীকরণটি হলোঃ

pH = pKₐ + log [লবণ] / [এসিড]

যেখানে, pkₐ হলো এসিড বিয়োজন ধ্রুবক। এটি এসিডের শক্তিমত্তা যাচাই করে। যে এসিডের বিয়োজন ধ্রুবক কম সেটি তত বেশি শক্তিশালী। [৬] [লবণ] ও [এসিড] দ্বারা লবণ ও এসিডের ঘনমাত্রা প্রকাশ করা হয়। এই সমীকরনটি থেকে লবন আর এসিডের ঘনমাত্রা হতে কোনো বাফার দ্রবণের অজানা pH এর মান বের করা যায়। [৭]

ব্যবহার[সম্পাদনা]

বাফার দ্রবণসমূহ গাঁজন, খাদ্য সংরক্ষণ, ওষুধ সরবরাহ, তড়িৎক্ষেত্র, এনজাইমের ক্রিয়াকলাপের জন্য ব্যবহার হয়। মানবদেহে রক্ত একটি বাফার দ্রবণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। [৮] দেহে ক্ষারের চেয়ে এসিড বেশি উৎপন্ন হয়। রক্তে HCO3 - ও ফসফেট বাফার অতিরিক্ত এসিড (হাইড্রোজেন আয়ন) প্রতিরোধে সহায়তা করে। [৯] ছোট বাচ্চাদের বেবি লোশনে বাফার দ্রবণ ব্যবহার করে পিএইচ মান ৬ রাখা হয়। ফলে ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমণ হতে ত্বক রক্ষা পায়। অন্যান্য কিছু ত্বক পরিচর্যার ক্রিমে এরূপ পিএইচ মান নির্দিষ্ট রেখে শরীরকে ব্যাক্টেরিয়া প্রতিরোধক করা হয়। এছাড়াও, রং কারখানায় বাফার দ্রবণ ব্যবহৃত হয়। [১০] কৃষিক্ষেত্রে অনুকূল পিএইচ মান ৭.০ থেকে ৮.০। তাই কৃষির অনুকূল পরিবেশ রাখার জন্য বাফার সিস্টেম প্রয়োগ অপরিহার্য। মানবদেহে রক্তের পিএইচ মান ৬.৮ থেকে ৭.৮ এর ভেতরে না হলে দৈহিক স্বাস্থ্যে বিঘ্ন ঘটে। এরূপ অবস্থা যেন না হয় সেজন্যে শরীরে কার্বনেট বাফার, ফসফেট বাফার ও প্রোটিন বাফার সিস্টেম কাজ করে। [৪]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

Buffer solution

Introduction to Buffers

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Introduction to Buffers
  2. Buffers through time
  3. Acidic Buffers
  4. উচ্চ মাধ্যমিক রসায়ন ১ম পত্র, (লেখকঃ ড. গাজী মোঃ আহসানুল কবির) চতুর্থ অধ্যায়)
  5. Alkaline Buffers
  6. pkₐ definition in Chemistry
  7. Buffer solutions
  8. Buffer Solution
  9. উচ্চ মাধ্যমিক জীববিজ্ঞান (লেখকঃ গাজী আসমত), ষষ্ঠ সংস্করণ, পৃষ্ঠা ১৯৫
  10. What are the applications of a buffer