বিষয়বস্তুতে চলুন

বাইজেন্টাইন নৌবাহিনী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বাইজেন্টাইন নৌবাহিনী
নেতাবাইজেন্টাইন সম্রাট (সর্বাধিনায়ক);
ড্রোওনগারিয়াস টও প্লোয়িমো এবং থিম্যাটিক ষ্ট্রেটিগোস (৮ম–১১ শতক),
মেগাস ডউক্স ( আনু.১০৯২ এর পর)
অপারেশনের তারিখ৩৩০–১৪৫৩
সদরদপ্তরকনস্টান্টিনোপল
সক্রিয়তার অঞ্চলভূমধ্যসাগর, ড্যানিউব, কালো সাগর
আকারআনু.৪২০০০ পুরুষ ৮৯৯ সালে []
আনু.৩০০ ৯ম-১০ম শতাব্দীতে যুদ্ধজাহাজ।[] গ. ম্যানুয়েল কমনেনোস এর অধীনে ১৫০ টি যুদ্ধজাহাজ
এর অংশবাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য
মিত্রভেনিস, গিনি, পিসা, ক্রুসেডার রাষ্ট্রসমূহ, আইডিনিডস
বিপক্ষভান্ডালস, অস্ট্রোগথস, সাসানিডস, উমাইয়াদ এবং আব্বাসিদ খিলাফত, ক্রিটের এমিরেট, ফাতিমিদের, স্লাভস, বুলগারিয়ানস, স্লাভস, বুলগেরিয়ানস
খণ্ডযুদ্ধ ও যুদ্ধজাস্টিনিয়ান যুদ্ধ, রোমান-পার্সিয়ান যুদ্ধ এর শেষার্ধ, আরব-বাইজান্টাইন যুদ্ধ, বাইজান্টাইন-বুলগেরিয়ান যুদ্ধ, রুশ-বাইজান্টাইন যুদ্ধ, বাইজান্টাইন-নর্মান যুদ্ধ, ক্রুসেড এবং বাইজান্টাইন-অটোমান যুদ্ধ
পূর্বসূরী
রোমান নৌবাহিনী

বাইজেন্টাইন নৌবাহিনী বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বাইজেন্টাইন রাজ্যের প্রতিরক্ষা এবং টিকে থাকার ক্ষেত্রে অনেক বেশি ভূমিকা পালন করেছিল। বাইজেন্টাইন নৌবাহিনী বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। পরবর্তীতে, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য একজন রোমান পূর্বসূরীর প্রত্যক্ষ ধারাবাহিকতার মাধ্যমে পূর্ববর্তী সংস্করণের তুলনায় নতুন সাম্রাজ্যে হয়েছিল। যদিও রোমান সাম্রাজ্যের নৌবহরগুলি খুব কম নৌ হুমকির সম্মুখীন হয়েছিল। তবে, রোমান সেনাবাহিনীর তুলনায় ক্ষমতা এবং মর্যাদার দিক থেকে অত্যন্ত অবহেলিত পুলিশ বাহিনী হিসেবেও নৌবাহিনীর সদস্যরা কাজ করেছিল। পরবর্তীতে,বাইজেন্টাইন রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনেক ঐতিহাসিক একে "সামুদ্রিক সাম্রাজ্য" বলেও অভিহিত করেছেন। [] [] ৫ম শতাব্দীতে,ভূমধ্যসাগরে রোমান আধিপত্যের জন্য প্রথম হুমকি ছিল ভ্যান্ডালরা। কিন্তু ষষ্ঠ শতাব্দীতে জাস্টিনিয়ান প্রথম যুদ্ধের মাধ্যমে তাদের এই হুমকির অবসান ঘটান। একই সময়ে স্থায়ীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা নৌবহরের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ড্রোমন গ্যালির প্রবর্তন করা হয়। এই সময় থেকেই বাইজেন্টাইন নৌবাহিনী তার শেষ রোমান পরিচয় থেকে সরে যেতে শুরু করে এবং নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগত পরিচয় বিকাশ করতে শুরু করে। ৭ম শতাব্দীতে প্রাথমিক মুসলিম বিজয়ের সূচনার সাথে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগত পরিচয় প্রকাশের প্রক্রিয়া আরও জোরদার হয়। লেভান্ট এবং পরবর্তীকালে আফ্রিকার পরাজয়ের পর, ভূমধ্যসাগর একটি "রোমান হ্রদ" বাইজেন্টাইন এবং মুসলিম রাষ্ট্রগুলির কয়েকটি রাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধক্ষেত্রে রূপান্তরিত হয়। এই সংগ্রামে বাইজেন্টাইন নৌবহরগুলি কেবল ভূমধ্যসাগরীয় অববাহিকার আশেপাশে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের দূরবর্তী সম্পত্তির প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও, সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের বিরুদ্ধে সমুদ্রপথের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্যও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেই সময় নতুন উদ্ভাবিত বাইজেন্টাইন নৌবাহিনীর সবচেয়ে পরিচিত এবং ভয়ঙ্কর গোপন অস্ত্র " গ্রীক আগুন " ব্যবহারের মাধ্যমে কনস্টান্টিনোপল বেশ কয়েকটি অবরোধ থেকে রক্ষা পায় এবং অসংখ্য নৌ যুদ্ধে বাইজেন্টাইন বিজয় লাভ করে। শুরুতে, বাইজেন্টাইন উপকূল এবং কনস্টান্টিনোপলের প্রবেশপথের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ছিল কারাবিসিয়ানয়দের বিশাল নৌবহরের ওপর। তবে ধীরে ধীরে তারা বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক নৌবহরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পাশাপাশি কনস্টান্টিনোপলের কেন্দ্রীয় রাজকীয় নৌবহরও রাখা হয়। এটি শহরটি পাহারা দিত এবং বিভিন্ন নৌ-অভিযানের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করত। ৮ম শতাব্দীর শেষের দিকে,বাইজেন্টাইন নৌবাহিনী একটি সুসংগঠিত ও সুপরিচালিত বাহিনী হিসেবে ভূমধ্যসাগরের প্রধান সামুদ্রিক শক্তিতে পরিণত হয়। মুসলিম বিশ্বের নৌবাহিনীর সাথে তাদের সংঘাত চলতেই থাকে। এ সকল সংঘাতে কখনও একপক্ষ তো কখনও অন্যপক্ষ জয়ী হচ্ছিল। তবে ১০ম শতাব্দীতে বাইজেন্টাইনরা পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নিজেদের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ১১শ শতাব্দীতে সাম্রাজ্যের অবনতির সাথে সাথে নৌবাহিনীরও পতন শুরু হয়। পশ্চিম থেকে আসা নতুন নৌচ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে বাইজেন্টাইনরা ক্রমবর্ধমানহারে ভেনিস এবং জেনোয়ার মতো ইতালীয় শহর ও রাষ্ট্রগুলোর নৌবাহিনীর ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়। এর ফলে সাম্রাজ্যের অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বের ওপর বিপর্যয়কর প্রভাব পড়ে। কোমনেনোস রাজবংশের অধীনে পুনরুদ্ধারের একটি সময়কাল অতিবাহিত হওয়ার পর আবারও অবনতি শুরু হয়। এ অবনতির চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১২০৪ সালে চতুর্থ ক্রুসেডের মাধ্যমে সাম্রাজ্যের বিপর্যয়কর বিলুপ্তি। ১২৬১ সালে সাম্রাজ্য পুনপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পালাইওলোগোস রাজবংশের বেশ কয়েকজন সম্রাট নৌবাহিনী পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের প্রচেষ্টা ছিল কেবলই সাময়িক, তারা তাদের চেষ্টাই সফল হননি। সম্রাট দ্বিতীয় অ্যান্ড্রোনিকোস পালাইওলোগোস নৌবাহিনী সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে দেন। এর ফলে ভেনিস দুটি যুদ্ধে বাইজেন্টাইনদের পরাজিত করতে সক্ষম হয়। প্রথম যুদ্ধের পর একটি অপমানজনক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে ভেনিসীয়রা যুদ্ধের সময় দখল করা বাইজেন্টাইন দ্বীপগুলো নিজেদের অধীনে রাখার অধিকার পায়। এছাড়াও, এ চুক্তির মাধ্যমে কনস্টান্টিনোপলের ভেনিসীয় কোয়ার্টার ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ দিতে বাইজেন্টাইনদের বাধ্য করা হয়।

১৪শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে একসময় শত শত যুদ্ধজাহাজ সমুদ্রে নামাতে সক্ষম হওয়া বাইজেন্টাইন নৌবহর কয়েক ডজন জাহাজে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এজিয়ান সাগরের নিয়ন্ত্রণ চূড়ান্তভাবে ইতালীয় নৌবাহিনীর হাতে চলে যায়। পরবর্তীতে,১৫শ শতাব্দীতে নবগঠিত অটোমান নৌবাহিনী এজিয়ান সাগরের দখল নিয়ন্ত্রণ করে। এই ক্ষয়িষ্ণু বাইজেন্টাইন নৌবাহিনী ১৪৫৩ সালে অটোমান সাম্রাজ্যের হাতে কনস্টান্টিনোপলের পতন পর্যন্ত কোনোমতে সক্রিয় ছিল।

পরিচালনার ইতিহাস

[সম্পাদনা]

প্রারম্ভিক কাল

[সম্পাদনা]

গৃহযুদ্ধ এবং বর্বর আক্রমণ: ৪র্থ ও ৫ম শতাব্দী

[সম্পাদনা]
৫ম শতাব্দীর শেষভাগে পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল বর্বর রাজ্যগুলোর দখলে চলে যায়। প্রথম জাস্টিনিয়ানের বিজয় অভিযানগুলো সমগ্র সমুদ্রের ওপর পুনরায় রোমান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এ নিয়ন্ত্রণ ৭ম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে মুসলিম বিজয় পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।

পূর্ব রোমান বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের মতোই বাইজেন্টাইন নৌবাহিনীও রোমান সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থাকেই ধারণ করে এগিয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৩১ অব্দে অ্যাক্টিয়ামের যুদ্ধের পর ভূমধ্যসাগরে কোনো বহিঃশত্রুর হুমকি না থাকায় রোমান নৌবাহিনী মূলত পুলিশি টহল এবং প্রহরা দেওয়ার কাজ করত। এর কয়েক শতাব্দী আগে খ্রিস্টপূর্ব ২৬৪ থেকে ১৪৬ অব্দে সংগঠিত পিউনিক যুদ্ধের মতো বিশাল কোনো নৌযুদ্ধ তখন আর ঘটত না। এসকলকারনে রোমান নৌবহরগুলো তুলনামূলকভাবে ছোট আকারের জাহাজ নিয়ে গঠিত ছিল। মূলত, তাদের টহলের মত কাজ করার কাজের জন্য এ ধরনের জাহাজ সবচেয়ে উপযোগী ছিল। চতুর্থ শতাব্দীর শুরুর দিকে স্থায়ী রোমান নৌবহর অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়ে।এমনকি, ৩২৪ খ্রিস্টাব্দে যখন প্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাট প্রথম কনস্টানটাইন এবং লাইসিনিয়াসের নৌবাহিনী যুদ্ধে লিপ্ত হয়[] তখন সেই বহরগুলোর বড় অংশই ছিল পূর্ব ভূমধ্যসাগরের বন্দর নগরীগুলো থেকে নতুন তৈরি করা বা রিকুইজিশন করা জাহাজ।[] তবে ৪র্থ এবং ৫ম শতাব্দীর শুরুর দিকে গৃহযুদ্ধগুলোর ফলে নৌ-তৎপরতার পুনর্জাগরণে করা হয়। এসময় জাহাজগুলো প্রধানত সেনাবাহিনী পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হতো।[] পঞ্চম শতাব্দীর প্রথম চতুর্থাংশ পর্যন্ত পশ্চিম ভূমধ্যসাগর বিশেষ করে উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা উল্লেখযোগ্য নৌবাহিনী সক্রিয় ছিল। কিন্তু, যখন ভ্যান্ডালগণ আফ্রিকা দখল করে নেয় তখন রোমের সেই একক আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।[১০] রাজা গেইসারিকের (শা. ৪২৮–৪৭৭) নেতৃত্বে কার্থেজের নতুন ভ্যান্ডাল রাজ্য তৎক্ষণাৎ ইতালি এবং গ্রিসের উপকূলে অভিযান শুরু করে। এমনকি ৪৫৫ খ্রিস্টাব্দে তারা রোমে লুণ্ঠন করা শুরু করে।[১১] তাদের দমনে রোমানদের বারবার চেষ্টা সত্ত্বেও পরবর্তী দুই দশক ধরে ভ্যান্ডালদের এই দৌরাত্ম্য অব্যাহত ছিল।[১১] পশ্চিম সাম্রাজ্য তখন ছিল একপ্রকার শক্তিহীন।তাদের নৌবাহিনী ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।[১২] তবে পূর্ব সাম্রাজ্যের সম্রাটরা তখনও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সম্পদ ও নৌ-কৌশল কাজে লাগাতে পারতেন। ৪৪৮ খ্রিস্টাব্দে পাঠানো প্রথম পূর্ব অভিযাত্রী দলটি সিসিলি পর্যন্তই যেতে পেরেছিল। এরপর ৪৬০ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের কার্টাজেনায় ভ্যান্ডালরা আক্রমণ করে পশ্চিম রোমানদের একটি আক্রমণকারী নৌবহর ধ্বংস করে দেয়।[১১] অবশেষে ৪৬৮ খ্রিস্টাব্দে ব্যাসিলিস্কাসের নেতৃত্বে ১,১১৩টি জাহাজ এবং ১,০০,০০০ সৈন্যের এক বিশাল পূর্ব অভিযাত্রী দল একত্রিত করা হয়। কিন্তু তারা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়। অগ্নিজাহাজের আক্রমণে প্রায় ৬০০টি জাহাজ হারিয়ে যায়। এই অভিযানের আর্থিক খরচ ছিল ১,৩০,০০০ পাউন্ড স্বর্ণ এবং ৭,০০,০০০ পাউন্ড রুপা। এ বিশাল খরচ রোমান সাম্রাজ্যকে প্রায় দেউলিয়া করে দিয়েছিল।[১৩] এই বিপর্যয়ের ফলে রোমানরা গেইসারিকের সাথে আপস এবং শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করতপ বাধ্য হয়। তবে, ৪৭৭ খ্রিস্টাব্দে গেইসারিকের মৃত্যুর পর ভ্যান্ডালদের ভীতি ধীরে ধীরে কমে আসে।[১৪]

৬ষ্ঠ শতাব্দী – জাস্টিনিয়ান কর্তৃক ভূমধ্যসাগরে রোমান নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার

[সম্পাদনা]

ষষ্ঠ শতাব্দী ছিল রোমান নৌ-শক্তির পুনর্জন্মের কাল। ৫০৮ খ্রিস্টাব্দে থিওডোরিকের অস্ট্রোগথিক রাজ্যের সাথে বিরোধ তুঙ্গে উঠলে সম্রাট প্রথম অ্যানাস্টাসিয়াস (শা. ৪৯১–৫১৮) ইতালির উপকূলে অভিযান চালানোর জন্য ১০০টি যুদ্ধজাহাজের একটি নৌবহর পাঠিয়েছিলেন বলে জানা যায়।[১৫] ৫১৩ খ্রিস্টাব্দে জেনারেল ভাইটালিয়ান অ্যানাস্টাসিয়াসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। বিদ্রোহীরা ২০০টি জাহাজের একটি বহর একত্রিত করলেও প্রাথমিক কিছু সাফল্যের পর অ্যাডমিরাল মারিনাস তাদের ধ্বংস করে দেন। মারিনাস বিদ্রোহীদের দমনে সালফারভিত্তিক একটি দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করেছিলেন।[১৬]

৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে সার্ডিনিয়ার বিদ্রোহ দমনে ভ্যান্ডাল নৌবহরের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ান (শা. ৫২৭–৫৬৫) রাজ্য পুনরুদ্ধারের প্রথম যুদ্ধ ভ্যান্ডাল যুদ্ধ শুরু করে। জেনারেল বেলিসারিয়াসের অধীনে ১৫,০০০ সৈন্যের একটি বাহিনীকে ৯২টি ড্রোমন এবং ৫০০টি পরিবহন জাহাজের এক বিশাল বহর আফ্রিকায় নিয়ে যায়।[১৭] এগুলো ছিল মূলত উভচর অভিযান যা ভূমধ্যসাগরের জলপথের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকার কারণেই সম্ভব হয়েছিল। দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে থাকা বাইজেন্টাইন অভিযাত্রী দল ও গ্যারিসনগুলোতে রসদ এবং সৈন্য সরবরাহে এই নৌবহর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।[১৬] বাইজেন্টাইনদের শত্রুরাও এই বিষয়টি বুঝতে পেরেছিল। ৫২০-এর দশকেই থিওডোরিক বাইজেন্টাইন এবং ভ্যান্ডালদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য একটি বিশাল নৌবহর তৈরির পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ৫২৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর কারণে সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।[১৮] ৫৩৫ খ্রিস্টাব্দে একটি দ্বিমুখী বাইজেন্টাইন আক্রমণের মাধ্যমে গথিক যুদ্ধ শুরু হয়। একটি নৌবহর বেলিসারিয়াসের বাহিনীকে সিসিলি এবং তারপর ইতালিতে নিয়ে যায়। অন্যদিকে আরেকটি বাহিনী ডালমেশিয়া আক্রমণ করে। সমুদ্রের ওপর বাইজেন্টাইনদের এই নিয়ন্ত্রণ ছিল কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সামুদ্রিক সুবিধাই ৫৪০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ক্ষুদ্র এক বাইজেন্টাইন বাহিনীকে পুরো উপদ্বীপটি সফলভাবে দখল করতে সাহায্য করে।[১৯]

তবে ৫৪১ খ্রিস্টাব্দে নতুন অস্ট্রোগথ রাজা টটিলা ৪০০টি যুদ্ধজাহাজের একটি বহর তৈরি করেন যাতে ভূমধ্যসাগরে সাম্রাজ্যের আধিপত্য খর্ব করা যায়। ৫৪২ খ্রিস্টাব্দে নেপলসের কাছে দুটি বাইজেন্টাইন নৌবহর ধ্বংস হয়।[২০] ৫৪৬ খ্রিস্টাব্দে বেলিসারিয়াস নিজেই ২০০টি জাহাজের নেতৃত্ব দিয়ে টাইবার নদীর মোহনায় গথিক নৌ-অবরোধ ভেঙে রোমকে সহায়তা করার চেষ্টা করেন।কিন্তু তিনি সফল হননি।[২১] ৫৫০ খ্রিস্টাব্দে টটিলা সিসিলি আক্রমণ করেন এবং পরবর্তী এক বছরে তাঁর ৩০০ জাহাজের বহর সার্ডিনিয়া ও কর্সিকা দখল করে নেয়। এমনকি তারা কর্ফু এবং এপিরাস উপকূলেও অভিযান চালায়।[২২] তবে সেনা গ্যালিকার যুদ্ধে পরাজয় গথদের পতনের সূচনা করে এবং সাম্রাজ্যের আধিপত্য পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।[১৬] জাস্টিনিয়ানের অধীনে ইতালি এবং দক্ষিণ স্পেন বিজয়ের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগর আবারও একটি "রোমান হ্রদে" পরিণত হয়।[১৬]

পরবর্তীতে লম্বার্ডদের কাছে ইতালির বড় একটি অংশ হারিয়ে ফেললেও বাইজেন্টাইনরা উপদ্বীপের চারপাশের সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। লম্বার্ডরা খুব কমই সমুদ্র অভিযানে যেত, ফলে বাইজেন্টাইনরা শতাব্দী ধরে ইতালীয় ভূখণ্ডের বেশ কিছু উপকূলীয় অঞ্চল নিজেদের দখলে রাখতে পেরেছিল।[২৩] পরবর্তী ৮০ বছরের মধ্যে একমাত্র বড় নৌ-যুদ্ধটি ঘটেছিল ৬২৬ খ্রিস্টাব্দে সাসানীয় পারস্য, আভার (কার্পেথিয়ান) এবং স্লাভদের দ্বারা কনস্টান্টিনোপল অবরোধের সময়। সেই অবরোধের সময় স্লাভদের ব্যবহৃত মনোক্সিল নৌবহরটি বাইজেন্টাইন নৌবাহিনীকে মাঝপথে আটকে দিয়ে ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে পারস্য সেনাবাহিনী বসফরাস পার হতে পারেনি এবং শেষ পর্যন্ত আভাররা পিছু হটতে বাধ্য হয়।[২৪]

আরবদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম

[সম্পাদনা]

আরব নৌ-শক্তির উত্থান ও হুমকি

[সম্পাদনা]
৭ম থেকে ১১শ শতাব্দী পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে প্রধান বাইজেন্টাইন-মুসলিম নৌ-অভিযান এবং যুদ্ধসমূহের মানচিত্র।

৬৪০ এর দশকে, মুসলিমদের সিরিয়া এবং মিশর বিজয় বাইজেন্টাইনদের জন্য এক নতুন হুমকির সৃষ্টি করে। আরবরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ জনবল ও রাজস্ব আদায়ের অঞ্চলগুলোই দখল করে। উপরন্তু, ৬৪৪ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইনরা যখন স্বল্প সময়ের জন্য আলেকজান্দ্রিয়া পুনরুদ্ধার করে শক্তিশালী নৌবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে দিয়েছিল, তখন আরবরাও নিজেদের একটি নৌবাহিনী তৈরির উদ্যোগ নেয়। এই প্রচেষ্টায় তারা আরব উপদ্বীপের স্থলভাগের অধিবাসী নতুন মুসলিম অভিজাত শ্রেণি এবং বিজিত লেভান্ট অঞ্চলের (বিশেষ করে মিশরের কপ্টদের) সম্পদ এবং জনশক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছিল। উল্লেখ্য যে, এর মাত্র কয়েক বছর আগেও এই অঞ্চলটি বাইজেন্টাইনদের জন্য জাহাজ এবং নাবিক সরবরাহ করত।[২৫][২৬][২৭] তবে এমন প্রমাণও পাওয়া যায় যে, ফিলিস্তিনের নতুন নৌ-ঘাঁটিগুলোতে পারস্য ও ইরাকের জাহাজ নির্মাতাদেরও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।[২৮] ১৪শ শতাব্দীর আগের কোনো চিত্রিত নিদর্শন না থাকায় প্রাথমিক মুসলিম যুদ্ধজাহাজগুলোর সুনির্দিষ্ট গঠন সম্পর্কে কিছু জানা যায় না। তবে সাধারণত ধরে নেওয়া হয় যে, তাদের নৌ-নির্মাণশৈলী ভূমধ্যসাগরীয় বিদ্যমান সামুদ্রিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল। নৌ-পরিভাষাগুলোর মধ্যে ব্যাপক মিল এবং দুই সংস্কৃতির মধ্যে শতাব্দী প্রাচীন মিথস্ক্রিয়া থাকায় ধারণা করা হয় যে বাইজেন্টাইন এবং আরব জাহাজগুলোর মধ্যে অনেক সাদৃশ্য বিদ্যমান ছিল।[২৯][৩০][৩১] এই সাদৃশ্য যুদ্ধকৌশল এবং সামগ্রিক নৌবহর পরিচালনার ক্ষেত্রেও বিস্তৃত ছিল। এমনকি বাইজেন্টাইন সামরিক নির্দেশিকাগুলোর অনুবাদও আরব অ্যাডমিরালদের কাছে সহজলভ্য ছিল।[২৯]

"সেই সময় হেলিওপোলিসের (বালবেক) কারিগর কালিনিকোস রোমানদের কাছে পালিয়ে আসেন। তিনি এক প্রকার 'সামুদ্রিক আগুন' আবিষ্কার করেছিলেন যা আরবদের জাহাজগুলো জ্বালিয়ে দিত এবং আরোহীসহ পুড়িয়ে মারত। এভাবেই রোমানরা বিজয় নিয়ে ফিরে আসে এবং গ্রিক আগুনের সন্ধান পায়।"

থিওফানিস দ্য কনফেসার-এর ক্রনিকল, আনাস মুন্ডি ৬১৬৫।[৩২]

৬৪৯ খ্রিস্টাব্দে আরব নৌবাহিনী সাইপ্রাস দখল করে এবং রোডস, ক্রিট ও সিসিলিতে অভিযান চালায়। ৬৫৫ খ্রিস্টাব্দের মাস্তুলের যুদ্ধে নব্য আরব নৌবাহিনী সম্রাট দ্বিতীয় কনস্টানসের (৬৪১–৬৬৮) সরাসরি কমান্ডে থাকা বাইজেন্টাইন বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে।[৩৩] বাইজেন্টাইনদের এই শোচনীয় পরাজয় ভূমধ্যসাগরকে আরবদের সামনে উন্মুক্ত করে দেয়। আরবরা ভূমধ্যসাগরের জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কয়েক শতাব্দী ধরে চলা নৌ-সংঘাতের সূচনা করে।[৩৩][৩৪] প্রথম মুয়াবিয়ার (৬৬১–৬৮০) শাসনামল থেকে কনস্টান্টিনোপলের ওপর এক মহাবিক্রমে আক্রমণের প্রস্তুতি হিসেবে অভিযানগুলো আরও তীব্রতর হয়। কনস্টান্টিনোপলের প্রথম দীর্ঘ আরব অবরোধের সময় বাইজেন্টাইন নৌবাহিনী সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা নব-উদ্ভাবিত এক গোপন অস্ত্র আবিষ্কার করে যা "গ্রিক ফায়ার" নামে পরিচিত। এটি ব্যবহারের মাধ্যমে তারা আরব নৌবহরকে পরাজিত করা হয়। এর ফলে এশিয়া মাইনর এবং এজিয়ান সাগরে মুসলিমদের অগ্রযাত্রা থমকে যায়। শীঘ্রই বাইজেন্টাইন ও আরবদের মধ্যে একটি ৩০ বছর মেয়াদী যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।[৩৫]

৬৮০-এর দশকে, সম্রাট দ্বিতীয় জাস্টিনিয়ান (শা. ৬৮৫–৬৯৫, ৭০৫–৭১১) নৌবাহিনীর উন্নয়নে বিশেষ মনোযোগ দেন। তিনি সাম্রাজ্যের দক্ষিণ উপকূল বরাবর ১৮,৫০০-এরও বেশি মার্ডাইটসদের পুনর্বাসিত করার মাধ্যমে নৌবাহিনীকে শক্তিশালী করেন। মার্ডাইটসরা বাইজেন্টাইন নৌবাহিনীতে নৌসেনা ও দাঁড়টানকারী হিসেবে কাজ করত।[৩৬] এতদসত্ত্বেও, ৬৮০ ও ৬৯০-এর দশকে আরবরা যখন ধীরে ধীরে উত্তর আফ্রিকা দখল করে নেয়, তখন আরব নৌ-হুমকি আরও ঘনীভূত হয়।[৩৭] ৬৯৮ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইনদের শেষ ঘাঁটি কার্থেজের পতন ঘটে। তবে, একটি বাইজেন্টাইন নৌ-অভিযাত্রী দল অল্প সময়ের জন্য এটি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল।[৩৮] আরব গভর্নর মুসা বিন নুসাইর তিউনিসে একটি নতুন শহর ও নৌ-ঘাঁটি নির্মাণ করেন। তিনি একটি নতুন নৌবহর তৈরির জন্য ১,০০০ কপ্টিক জাহাজ নির্মাতাকে নিয়ে আসেন। এটি পশ্চিম ভূমধ্যসাগরে বাইজেন্টাইন নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।[৩৯] ফলস্বরূপ, ৮ম শতাব্দীর শুরু থেকে পশ্চিম ভূমধ্যসাগরে বাইজেন্টাইন অঞ্চলগুলো বিশেষ করে সিসিলিতে মুসলিম অভিযান অবিরামভাবে চলতে থাকে।[২৮][৪০] এই নতুন নৌবহর মুসলিমদের মাগরেব বিজয় সম্পন্ন করতে এবং ভিসিগথ নিয়ন্ত্রিত আইবেরিয়ান উপদ্বীপের বেশিরভাগ অংশ সফলভাবে আক্রমণ ও দখল করতে সক্ষম করে তোলে।[৪১]

বাইজেন্টাইনদের পাল্টা আক্রমণ

[সম্পাদনা]
সম্রাট তৃতীয় লিও এবং তাঁর পুত্র ও উত্তরসূরি পঞ্চম কনস্টানটাইন। তাঁরা একত্রে আরবদের বিরুদ্ধে বাইজেন্টাইনদের ভাগ্যোন্নয়নে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের প্রতিমা-বিরোধী নীতির কারণে অভ্যন্তরীণ বিবাদও তৈরি হয়েছিল।

৬৯৫ থেকে ৭১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দুই দশকব্যাপী চরম অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার কারণে বাইজেন্টাইনরা আফ্রিকায় মুসলিমদের অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি।[৪২] তবে তারা প্রাচ্যে পাল্টা আক্রমণ করেছিল। উল্লেখ্য, ৭০৯ খ্রিস্টাব্দে মিশরে অভিযানের মাধ্যমে তারা স্থানীয় আরব অ্যাডমিরালকে বন্দী করে।[৪০] একইসাথে তারা একটি আসন্ন বড় আক্রমণের ব্যাপারেও সচেতন ছিল। খলিফা প্রথম আল-ওয়ালিদ (শা. ৭০৫–৭১৫) যখন কনস্টান্টিনোপলে নতুন করে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন সম্রাট দ্বিতীয় অ্যানাস্টাসিওস (শা. ৭১৩–৭১৪) রাজধানী সুরক্ষিত করেন এবং মুসলিমদের নৌ-প্রস্তুতি নস্যাৎ করতে একটি আগাম আক্রমণ চালিয়েছিলেন। তবে সম্রাট দ্বিতীয় অ্যানাস্টাসিওস এতে ব্যার্থ হয়।[৪২] এর পরপরই অ্যানাস্টাসিওসকে ক্ষমতাচ্যুত করেন তৃতীয় থিওডোরোস। আবার ঠিক যখন মুসলিম সেনাবাহিনী আনাতোলিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে আসছিল, তখন থিওডোরোসের স্থলাভিষিক্ত হন তৃতীয় লিও (ইসৌরিয়ান)। সম্রাট লিও-র আমলেই কনস্টান্টিনোপল তার ইতিহাসে দ্বিতীয় এবং চূড়ান্ত আরব অবরোধের সম্মুখীন হয়। আরব নৌবহরকে তছনছ করে দেওয়া গ্রিক আগুনের ব্যবহার আবারও বাইজেন্টাইন বিজয়ে প্রধান ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি প্রচণ্ড শীত এবং বুলগারদের আক্রমণ অবরোধকারীদের শক্তি আরও কমিয়ে দেয়।[৪৩] অবরোধ শেষ হওয়ার পর পিছু হটে যাওয়া আরব নৌবহরের অবশিষ্টাংশ ঝড়ের কবলে পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর বাইজেন্টাইন বাহিনী পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। তাদের নৌবহর লাওডিশিয়া লুণ্ঠন করে এবং সেই বাইজেন্টাইন স্থলবাহিনী আরবদের এশিয়া মাইনর থেকে বিতাড়িত করে।[৪৪][৪৫] পরবর্তী তিন দশক ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে নিয়মিত নৌ-অভিযান চলতে থাকে। বাইজেন্টাইনরা সিরিয়া (লাওডিশিয়া) এবং মিশরের (ড্যামিয়েটাতিন্নিস) মুসলিম নৌ-ঘাঁটিগুলোতে বারবার আক্রমণ চালায়।[৪০] ৭২৭ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইন সম্রাটের প্রতিমা-বিরোধী নীতির বিরুদ্ধে বাইজেন্টাইন প্রাদেশিক জেলা থিমে নৌবহরগুলোর একটি বিদ্রোহ সংঠটিত হয়। রাজকীয় নৌবহর গ্রিক আগুন ব্যবহার করে বিদ্রোহীদের দমন করে।[৪৬] এই গৃহযুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও, ৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে ড্যামিয়েটা আক্রমণের জন্য ৩৯০টি যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হয়েছিল বলে জানা যায়। ৭৪৬ খ্রিস্টাব্দে সাইপ্রাসের কেরামায়ায় বাইজেন্টাইনরা আলেকজান্দ্রীয় নৌবহরকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে উমাইয়া খিলাফতের নৌ-শক্তি ভেঙে দেয়।[৪০]

বাইজেন্টাইনরা এরপর উত্তর আফ্রিকার ক্ষুদ্র নৌবহরগুলোকেও ধ্বংস করা শুরু করে। তারা সমুদ্রে সাফল্যের পাশাপাশি মুসলিম বণিকদের ওপর কঠোর বাণিজ্যিক সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। জলপথের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকায় এটি মুসলিম সামুদ্রিক বাণিজ্যকে পঙ্গু করে দেয়।[৪৭] এর কিছুকাল পরেই উমাইয়া শাসনের পতন এবং মুসলিম বিশ্বের ক্রমবর্ধমান বিভাজনের ফলে বাইজেন্টাইন নৌবাহিনী ভূমধ্যসাগরের একমাত্র সংগঠিত নৌ-শক্তিতে পরিণত হয়।[৪০] ফলে ৮ম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাইজেন্টাইনরা আবারও সমুদ্রে নিরঙ্কুশ আধিপত্য উপভোগ করে।[২৬] এটি মোটেও কাকতালীয় নয় যে, প্রথম এবং দ্বিতীয় হিজরি শতকে রচিত অনেক ইসলামি ভবিষ্যদ্বাণীমূলক গ্রন্থে কিয়ামত বা শেষ সময়ের আগে বাইজেন্টাইনদের সমুদ্রপথে আক্রমণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সময়ের অনেক বর্ণনা অনুযায়ী, সিরিয়ার উপকূলে পাহারার চৌকিতে অবস্থান করাকে জিহাদের সমতুল্য মনে করা হতো। এমনকি আবু হুরায়রা (রা.)-র মতো বর্ণনাকারীদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হতো যে, এক দিনের জিহাদ কাবা শরিফে এক রাত ইবাদতের চেয়েও বেশি পুণ্যের কাজ।[৪৮]

এই সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে সম্রাট পঞ্চম কনস্টানটাইন ৭৬০-এর দশকে বুলগারদের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় তাঁর নৌবহর ভূমধ্যসাগর থেকে কৃষ্ণ সাগরে সরিয়ে নিতে সক্ষম হন। ৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে ৮০০টি জাহাজের একটি বহর ৯,৬০০ অশ্বারোহী এবং কিছু পদাতিক সৈন্য নিয়ে অ্যানকিয়ালাস অভিমুখে যাত্রা করে এবং সেখানে একটি বড় বিজয় অর্জন করে। তবে ৭৬৬ খ্রিস্টাব্দে ২,৬০০টি জাহাজের আরেকটি বহর আবারও অ্যানকিয়ালাস যাওয়ার পথে ডুবে যায় বলে দাবি করা হয়।[৪৯] একই সময়ে, ইসৌরিয়ান সম্রাটরা বাইজেন্টাইন নৌ-শক্তিকে কিছুটা দুর্বলও করেছিলেন। যেহেতু আরবদের তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল না এবং নৌ-থিমগুলো ছিল মূলত প্রতিমা-ভক্ত ) ও সম্রাটের নীতির ঘোর বিরোধী, তাই সম্রাটরা নৌবাহিনীর আকার কমিয়ে আনেন এবং নৌ-থিমগুলোর গুরুত্ব হ্রাস করেন।[৫০]

প্রথম বাসিলের রাজত্বকাল

[সম্পাদনা]
সম্রাট প্রথম বাসিলের আমলের স্বর্ণমুদ্রা বা সলিডাস। নৌবাহিনীর প্রতি তাঁর বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা বেশ কিছু সাফল্য বয়ে এনেছিল যা নাবিকদের কাছে দীর্ঘকাল স্মরণীয় ছিল। এর ফলে মেসিডোনীয় রাজবংশের প্রতি তাদের এক গভীর আনুগত্য তৈরি হয়, যা তাঁর নাতি সপ্তম কনস্টানটাইনের শাসনকাল পর্যন্ত অনুভূত হয়েছিল।[৫১]

সম্রাট প্রথম বাসিলের (৮৬৭–৮৮৬ খ্রিস্টাব্দ) সিংহাসনে আরোহণ এই পুনর্জাগরণের বার্তা দেয়। কারণ তিনি এক আগ্রাসী বিদেশ নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পূর্বসূরি তৃতীয় মাইকেলের (৮৪২–৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দ) নীতি অনুসরণ করে তিনি নৌবাহিনীর প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন। এসকল কাজের ফলে একের পর এক বিজয় অর্জিত হয়।[৫২] ৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে ড্রুনগারীয়স টু প্লোইমু (droungarios tou ploïmou) নিকেতাস ওরুফাসের নেতৃত্বে একটি নৌবহর রাগুসাকে এক আরব অবরোধ থেকে রক্ষা করে এবং ওই অঞ্চলে বাইজেন্টাইন উপস্থিতি পুনর্প্রতিষ্ঠা করে।[৫৩] কয়েক বছর পর, তিনি ক্রিটীয় জলদস্যুদের কার্ডিয়া এবং করিন্থিয়ান উপসাগরে দুবার শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন।[৫৪][৫৫] এর ফলে সাময়িকভাবে এজিয়ান সাগর নিরাপদ হয়ে উঠে।[৫৬] সাইপ্রাসও সাময়িকভাবে পুনরুদ্ধার করা হয় এবং বারি দখল করা হয়।[৫৭] তবে একই সময়ে কিলিকিয়াতে মুসলিমদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয় এবং তারসোস বাইজেন্টাইন ভূখণ্ডে স্থল ও সমুদ্রপথে আক্রমণের প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হয়। বিশেষ করে খ্যাতনামা আমির ইয়াজমান আল-খাদিমের (৮৮২–৮৯১) অধীনে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদিও তাঁর একটি অভিযান ইউরিপোসের সামনে ভীষণভাবে পরাজিত হয়েছিল।[৫৮]

পশ্চিম রণাঙ্গনে মুসলিমরা তাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখে, কারণ স্থানীয় বাইজেন্টাইন বাহিনী তাদের ঠেকাতে ব্যার্থ হয়েছিল। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য তখন তাদের নামমাত্র ইতালীয় প্রজাদের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয় এবং কোনো অগ্রগতি অর্জনের জন্য পূর্বদিকের নৌবহরগুলোকে ইতালিতে স্থানান্তর করার পথ বেছে নেয়।[৫৯] ৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে এন্নার পতনের পর বাইজেন্টাইনরা সিসিলির পূর্ব উপকূলে কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে থাকে। ৮৬৮ খ্রিস্টাব্দের একটি উদ্ধারকারী অভিযান খুব সামান্যই সাফল্য পায়। ৮৬৯ সালে সিরাকিউজ আবারও আক্রান্ত হয় এবং ৮৭০ সালে মাল্টা আঘলাবিডদের দখলে চলে যায়।[৬০] উপরন্তু,মুসলিম জলদস্যুরা অ্যাড্রিয়াটিক সাগরে হানা দিতে থাকে। যদিও তাদের আপুলিয়া থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল, কিন্তু ৮৮০-এর দশকের শুরুতে তারা পশ্চিম ইতালীয় উপকূলে নিজেদের ঘাঁটি তৈরি করে। ৯১৫ সালের আগে তাদের সেখান থেকে পুরোপুরি উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি।[৬১] ৮৭৮ সালে সিসিলিতে বাইজেন্টাইনদের প্রধান ঘাঁটি সিরাকিউজ আবারও আক্রান্ত হয় এবং এর পতন ঘটে। এর প্রধান কারণ ছিল তৎকালীন রাজকীয় নৌবহর বাসিলের নতুন গির্জা 'নিয়া এক্লেসিয়া' নির্মাণের জন্য মার্বেল পাথর পরিবহনে ব্যস্ত ছিল।[৬২] ৮৮০ সালে ওরুফাসের উত্তরসূরি টেমপ্লেট:Translit নাসার, আয়োনিয়ান দ্বীপপুঞ্জে অভিযানরত আঘলাবিডদের বিরুদ্ধে এক নৈশ যুদ্ধে বিশাল জয় লাভ করেন। এরপর তিনি সিসিলিতে অভিযান চালিয়ে প্রচুর লুঠতরাজ করেন এবং পুন্টা স্টিলোর কাছে আরেকটি মুসলিম নৌবহরকে পরাজিত করেন। একই সময়ে আরেকটি বাইজেন্টাইন স্কোয়াড্রন নেপলসে গুরুত্বপূর্ণ বিজয় অর্জন করে।[৬৩][৬৪] এই সাফল্যগুলো ৮৭০ ও ৮৮০-এর দশকে প্রবীণ নিকেফোরোস ফোকাসের অধীনে পশ্চিমে এক স্বল্পস্থায়ী বাইজেন্টাইন পাল্টা আক্রমণের সুযোগ করে দেয়। এর মাধ্যমে আপুলিয়া এবং কালাব্রিয়াতে বাইজেন্টাইন দখলদারিত্ব বৃদ্ধি পায় এবং লঙ্গোবার্ডিয়া থিম গঠিত হয়। এ থিমই পরবর্তীতে ইতালির ক্যাটেপানেটে রূপান্তরিত হয়েছিল। তবে ৮৮৮ সালে মিলাজোর কাছে এক শোচনীয় পরাজয় পরবর্তী এক শতাব্দীর জন্য ইতালির চারপাশের সমুদ্রে প্রধান বাইজেন্টাইন নৌ-তৎপরতার কার্যত অবসান ঘটায়।[৫৬][৬৫]

ষষ্ঠ লিওর রাজত্বকালে আরব অভিযান

[সম্পাদনা]
৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ট্রিপোলির লিও-র নেতৃত্বে আরবদের দ্বারা থেসালোনিকা লুণ্ঠন, যা মাদ্রিদ স্কাইলিটজিস পাণ্ডুলিপিতে চিত্রিত হয়েছে। এটি ছিল ষষ্ঠ লিও-র শাসনামলে এজিয়ান সাগরে মুসলিম নৌবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত জলদস্যু অভিযানের নবতর তরঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ।
দাঁড়যুক্ত একটি বাইজেন্টাইন যুদ্ধজাহাজের (ড্রোমন) মডেল, যা এথেন্স ওয়ার মিউজিয়ামে সংরক্ষিত।

বাসিলের অধীনে সাফল্য সত্ত্বেও, তাঁর উত্তরসূরি ৮৮৬ থেকে ৯১২ পর্যন্ত রাজত্বকারী ষষ্ঠ লিওর শাসনামলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য আবারও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। উত্তরে বুলগেরীয় জার প্রথম সিমেওনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। ৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে বুলগেরিয়া আক্রমণ করার জন্য রাজকীয় নৌবহরের একটি অংশকে মাগইয়ার বাহিনীর দানিউব নদী পারপারে ব্যবহার করা হয়।[৬৬] বুলগেরীয় যুদ্ধে তাদের পরাজয় ঘটে। উপরন্তু, অনেক টাকাও খরচ হয়ে যায়। আর ঠিক সেই সময়েই আরব নৌ-হুমকি এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। একের পর এক অভিযানে বাইজেন্টাইন নৌ-শক্তির প্রাণকেন্দ্র এজিয়ান সাগরের উপকূলগুলো বিধ্বস্ত হতে থাকে। ৮৯১ বা ৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে আরব নৌবহর সামোস দ্বীপ লুণ্ঠন করে এবং সেখানকার সামরিক গভর্নর স্ট্রেটিগোসকে বন্দী করে। ৮৯৮ সালে অ্যাডমিরাল রাগিব ৩,০০০ কিবাইরিয়ট বাইজেন্টাইন নাবিককে বন্দী হিসেবে নিয়ে যান।[৬৭] এই ক্ষয়ক্ষতি বাইজেন্টাইন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দেয়। এছাড়াও,সিরীয় নৌবহরগুলোর জন্য এজিয়ান সাগর উন্মুক্ত হয়ে যায়।[৫৮] এরপর, প্রথম বড় আঘাতটি আসে ৯০১ সালে যখন ধর্মত্যাগী তারসোসের ড্যামিয়ান ডিমেট্রিয়াস লুণ্ঠন করেন। পরের বছর সিসিলিতে সাম্রাজ্যের শেষ ঘাঁটি তাওরমিলাও মুসলিমদের দখলে চলে যায়[৬৮][৬৭] তবে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটে ৯০৪ সালে, যখন আরেক ধর্মত্যাগী ট্রিপোলির লিও এজিয়ান সাগরে তান্ডব চালান। এমনকি,তাঁর নৌবহর দার্দানেলেস প্রণালী পর্যন্ত ঢুকে পড়ে এবং সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর থেসালোনিকা ধ্বংস করে। আরবদের সংখ্যাধিক্যের সামনে সাম্রাজ্যের নৌবহর তখন নিষ্ক্রিয় হয়ে ছিল।[৬৯] উপরন্তু, ক্রিটীয় জলদস্যুদের হানা এতটাই তীব্র আকার ধারণ করে যে লিওর শাসনামলের শেষ দিকে দক্ষিণ এজিয়ানের বেশিরভাগ দ্বীপ জনশূন্য হয়ে পড়ে অথবা জলদস্যুদের কর দিতে বাধ্য হয়।[৭০] স্বাভাবিকভাবেই লিওর সমসাময়িক (Naumachica) অর্থাৎ নৌ-যুদ্ধ বিষয়ক নির্দেশিকায় এক প্রকার রক্ষণাত্মক ও সতর্ক মানসিকতা পরিলক্ষিত হয়।[৫৬] সেই সময়ের সবচেয়ে বিশিষ্ট বাইজেন্টাইন অ্যাডমিরাল ছিলেন লোগোথেটেস টু ড্রোমু হাইমেরিওস। ৯০৪ সালে অ্যাডমিরাল হিসেবে নিযুক্ত হয়ে তিনি থেসালোনিকা লুণ্ঠন ঠেকাতে না পারলেও ৯০৫ বা ৯০৬ সালে প্রথম বিজয় ছিনিয়ে আনেন। এছাড়াও, তিনি ৯১০ সালে লাওডিশিয়া আক্রমণে নেতৃত্ব দেন।[৭১][৭২] এ আক্রমণে তিনি কোনো জাহাজ না হারিয়েই শহরটি লুণ্ঠন এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চল তছনছ করতে সক্ষম হন।[৭৩] তবে এক বছর পর হাইমেরিওসের নেতৃত্বে ১১২টি ড্রোমন, ৭৫টি প্যামফিলোই এবং ৪৩,০০০ সৈন্য নিয়ে ক্রিট আমিরাত পুনরুদ্ধারের এক বিশাল অভিযান চালানো হয়। এ অভিজান কেবল ব্যর্থই হয়নি[৭৪] বরং ৯১২ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে ফেরার পথে চিওস দ্বীপের কাছে ট্রিপোলির লিওর অতর্কিত হামলায় বাইজেন্টাইন বাহিনী পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে যায়।[৭৫][৭৬] ৯২০ খ্রিস্টাব্দের পর যুদ্ধের মোড় আবারও ঘুরতে শুরু করে। কাকতালীয়ভাবে সেই বছরেই ৯২০ থেকে ৯৪৪ পর্যন্ত দায়িত্ব থাকা একজন অ্যাডমিরাল প্রথম রোমানোস ল্যাকাপেনোস সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে বসেন। এটি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের ইতিহাসে দ্বিতীয় এবং শেষবারের মতো কোনো নৌ-প্রধানের সম্রাট হওয়ার ঘটনা। অবশেষে ৯২৩ সালে লেমনসের কাছে ট্রিপোলির লিওর চূড়ান্ত পরাজয় হয়। এর পরের বছর এক অবরোধের সময় ড্যামিয়ানের মৃত্যু বাইজেন্টাইন পুনরুত্থানের পথ প্রশস্ত করে।[৭৭]

ক্রিট এবং উত্তর লেভান্ট পুনরুদ্ধার

[সম্পাদনা]
ক্রিটের প্রধান মুসলিম ঘাঁটি চ্যান্ডাক্স অবরোধ 'মাদ্রিদ স্কাইলিটজিস' পাণ্ডুলিপিতে চিত্রিত। নিকেফোরোস ফোকাস এক বিশাল উভচর অভিযানের নেতৃত্ব দিয়ে সাম্রাজ্যের জন্য ক্রিট পুনরুদ্ধার করেন এবং এজিয়ান সাগরকে মুসলিম জলদস্যু মুক্ত করেন।

৯৪২ খ্রিস্টাব্দে সাম্রাজ্যের ক্রমবর্ধমান শক্তি প্রদর্শিত হয় যখন সম্রাট প্রথম রোমানোস টাইরেনিয়ান সাগর-এ একটি স্কোয়াড্রন পাঠান। গ্রিক আগুন ব্যবহার করে সেই স্কোয়াড্রনটি ফ্রাক্সিনেটাম থেকে আসা মুসলিম জলদস্যুদের একটি নৌবহর ধ্বংস করে দেয়।[৭৮] তবে ৯৪৯ সালে সপ্তম কনস্টানটাইন (৯৪৫–৯৫৯) কর্তৃক ক্রিট আমিরাতের বিরুদ্ধে প্রেরিত প্রায় ১০০টি জাহাজের আরেকটি অভিযান কমান্ডার কনস্টানটাইন গঞ্জিলেস-এর অযোগ্যতার কারণে ব্যর্থ হয়।[৭৯][৮০] ৯৫১-৯৫২ সালে ইতালিতে নতুন আক্রমণে ফাতেমীয়দের কাছে পরাজিত হলেও ৯৫৬ সালের একটি অভিযান এবং ৯৫৮ সালে এক ঝড়ে ইফ্রিকীয় নৌবহরের ধ্বংসের ফলে উপদ্বীপের পরিস্থিতি সাময়িকভাবে স্থিতিশীল হয়।[৭৮] ৯৬২ সালে ফাতেমীয়রা সিসিলিতে অবশিষ্ট বাইজেন্টাইন ঘাঁটিগুলোর ওপর হামলা চালায়। বড়দিনের দিনে তাওরমিলা পতনের পর রোমেটা অবরুদ্ধ হয়। জবাবে ৯৬৪ সালে বাইজেন্টাইনরা একটি বিশাল অভিযান চালায় যাতে শোচনীয়ভাবে বাইজেন্টাইনের পরাজয় ঘটে। ফাতেমীয়রা রোমেটার সামনে বাইজেন্টাইন স্থলবাহিনীকে পরাজিত করে এবং পরে প্রণালীর যুদ্ধে নৌবহরটিকে ধ্বংস করে দেয়। এ যুদ্ধে তারা বিশেষ ধরনের ডুবুরি ব্যবহার করে জাহাজে অগ্নিসংযোগ করেছিল। উভয় শক্তির মনোযোগ অন্যদিকে থাকায় ৯৬৭ সালে একটি যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হয়। এটি পশ্চিমে বাইজেন্টাইন নৌ-তৎপরতা কমিয়ে দেয়। ১০২৫ সাল পর্যন্ত ইতালির সমুদ্রসীমা মূলত স্থানীয় বাইজেন্টাইন বাহিনী এবং ইতালীয় রাষ্ট্রগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।[৮১][৮২] প্রাচ্যে ৯৫৬ সালে স্ট্রেটিগোস বাসিল হেক্সামিলাইটস তারসীয় নৌবহরকে চূর্ণ করে দিয়ে ক্রিট পুনরুদ্ধারের পথ প্রশস্ত করেন।[৭৮] এই অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল দ্বিতীয় নিকেফোরোস ফোকাসকে। ৯৬০ সালে তিনি ১০০টি ড্রোমন, ২০০টি চেলান্ডিয়া এবং ৩০৮টি পরিবহন জাহাজ নিয়ে ৭৭,০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে দ্বীপটি জয় করতে বের হন।[৮৩] যদিও যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে নৌবাহিনীর ভূমিকা ছিল সীমিত। তবে সমুদ্রপথ খোলা রাখা এবং রসদ সরবরাহের জন্য এটি ছিল অপরিহার্য।[৮৪] ক্রিট বিজয়ের ফলে এজিয়ান সাগরের ওপর সরাসরি হুমকি দূর হয়। এরপর ফোকাসের ধারাবাহিক অভিযানে বাইজেন্টাইনরা ৯৬৩ সালে কিলিকিয়া, ৯৬৮ সালে সাইপ্রাস,[৮৫] এবং ৯৬৯ সালে উত্তর সিরীয় উপকূল পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন।[৮৬] এই বিজয়ের ফলে একসময়ের শক্তিশালী মুসলিম সিরীয় নৌবহরের ভয় ঘুচে যায়। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে বাইজেন্টাইন আধিপত্য এতটাই সুসংহত হয় যে, নিকেফোরোস ফোকাস সদম্ভে লিউটপ্র্যান্ড অফ ক্রেমোনাকে বলেছিলেন যে,"আমি একাই সমুদ্রের অধিপতি"।[৫২][৮৭] ৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে ফাতেমীয়দের সাথে বিরোধের জেরে কিছু নৌ-সংঘর্ষ হলেও শীঘ্রই শান্তি ফিরে আসে এবং পরবর্তী কয়েক দশক পূর্ব ভূমধ্যসাগর শান্ত থাকে।[৮৮] একই সময়ে বাইজেন্টাইন নৌবহর কৃষ্ণ সাগরেও সক্রিয় ছিল। ৯৪১ সালে কনস্টান্টিনোপল অভিমুখে আসা একটি রুশ নৌবহর ১৫টি পুরনো জাহাজের গ্রিক আগুনের সাহায্যে ধ্বংস করা হয়। ৯৭০-৯৭১ সালের রুশ-বাইজেন্টাইন যুদ্ধেও নৌবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ যুদ্ধে সম্রাট প্রথম জন তজিমিসকেস ৩০০টি জাহাজ পাঠিয়ে দানিউব নদী দিয়ে কিভান রুশদের পালানোর পথ বন্ধ করে দিয়েছিলেন।[৮৯]

কোমনেনীয় যুগ

[সম্পাদনা]

১১শ শতাব্দীতে অবক্ষয়

"সর্বদা সচেষ্ট থাকো যেন নৌবহর সর্বোত্তম অবস্থায় থাকে এবং এর যেন কোনো কিছুর অভাব না হয়। কারণ নৌবহরই হলো রোমানিয়া অর্থাৎ বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের গৌরব। [...] নৌবহরের ড্রুনগারীয়স এবং প্রোটোনোটায়ারীয়সদের উচিত নৌবহরের সামান্যতম ত্রুটিও কঠোরভাবে তদন্ত করা। কারণ নৌবহর যখন অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে, তখন তুমিও ক্ষমতাচ্যুত হবে এবং তোমার পতন ঘটবে।"

সম্রাটের প্রতি উপদেশ, কেকাউমেনোস-এর স্ট্র্যাটেজিকন থেকে, অধ্যায় ৮৭।[৯০]

১১শ শতাব্দীর অধিকাংশ সময়ই বাইজেন্টাইন নৌবাহিনীকে খুব কম চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হয়েছিল। মুসলিম হুমকি তখন স্তিমিত হয়ে এসেছিল। তখন তাদের নৌ-শক্তি হ্রাস পায় এবং বিশেষ করে ফাতেমীয়দের সাথে সাম্রাজ্যের সম্পর্ক ছিল মূলত শান্তিপূর্ণ। বাইজেন্টাইন রাজকীয় ভূখণ্ডে শেষ আরব অভিযানের কথা নথিভুক্ত আছে ১০৩৫ সালে সাইক্ল্যাডিস দ্বীপপুঞ্জে। এর পরের বছরই অভিযান ব্যর্থ হয়।[৯১] ১০৪৩ সালে আরেকটি রুশ আক্রমণ অনায়াসেই প্রতিহত করা হয়। এছাড়া জর্জ ম্যানিয়াকিসের অধীনে সিসিলি পুনরুদ্ধারের একটি স্বল্পস্থায়ী প্রচেষ্টা ছাড়া বড় ধরনের কোনো নৌ-অভিযান চালানো হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই শান্তি ও সমৃদ্ধি অনিবার্যভাবেই সামরিক বাহিনীর প্রতি এক প্রকার আত্মতুষ্টি এবং অবহেলার জন্ম দেয়। এমনকি দ্বিতীয় বাসিলের ৯৭৬ থেকে ১০২৫ পর্যন্ত শাসনামলেই অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ভেনিসীয়দের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ১০৪২ থেকে ১০৫৫ পর্যন্ত নবম কনস্টানটাইনের শাসন আমলে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী উভয়ই সংকুচিত করা হয়। এসময় সামরিক পরিষেবার পরিবর্তে নগদ অর্থ প্রদানের প্রথা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে বিদেশি ভাড়াটে সৈন্যদের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যায়।[৯২][৯৩] বিশাল 'থিম' নৌবহরগুলোর অবক্ষয় ঘটে এবং সেগুলোর স্থলাভিষিক্ত হয় স্থানীয় সামরিক কমান্ডারের অধীনে থাকা ছোট ছোট স্কোয়াড্রন। তাদের মূল কাজ ছিল জলদস্যু দমন করা, কোনো বড় সামুদ্রিক শত্রুর মোকাবিলা করা নয়।[৯৪] ১১শ শতাব্দীর শেষ চতুর্থাংশ নাগাদ বাইজেন্টাইন নৌবাহিনী তার পূর্বের গৌরবের ছায়া মাত্র অবশিষ্ট ছিল। অবহেলা, কর্মকর্তাদের অযোগ্যতা এবং তহবিলের অভাবে এটি ধ্বংসের মুখে পড়ে।[৯৫] ১০৭৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে লিখতে গিয়ে কেকাউমেনোস আক্ষেপ করে বলেন যে, "যৌক্তিক টহলের অজুহাতে বাইজেন্টাইন জাহাজগুলো এজিয়ান দ্বীপপুঞ্জ ও উপকূল থেকে কেবল গম, বার্লি, ডাল, পনির, মদ, মাংস, অলিভ অয়েল, প্রচুর অর্থ এবং অন্যান্য জিনিসপত্র পরিবহন ছাড়া আর কিছুই করছে না।" তিনি আরও বলেন যে, জাহাজগুলো "শত্রুদের চোখের দেখা দেখার আগেই পালিয়ে যায় এবং এভাবে তারা রোমানদের জন্য একটি লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।"[৯০] কেকাউমেনোস যখন এই কথাগুলো লিখছিলেন, ততদিনে নতুন এবং শক্তিশালী প্রতিপক্ষের উত্থান ঘটেছে। পশ্চিমে দক্ষিণ ইতালি থেকে বাইজেন্টাইনদের বিতাড়ন কারী নর্মানদের সিসিলি রাজ্য ছিল।[৯৬] তারা এখন বাইজেন্টাইন অ্যাড্রিয়াটিক উপকূল এবং তার ওপারের দিকে নজর দিচ্ছিল। পূর্বে ১০৭১ সালের বিপর্যয়কর মানজিকার্টের যুদ্ধের ফলে সাম্রাজ্যের সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র এশিয়া মাইনর সেলজুক তুর্কিদের দখলে চলে যায়। ১০৮১ সালের মধ্যে তারা কনস্টান্টিনোপল থেকে মাত্র একশ মাইল দক্ষিণে নিসিয়াতে তাদের রাজধানী স্থাপন করে।[৯৭] এর পরপরই এজিয়ান সাগরে তুর্কি এবং খ্রিস্টান জলদস্যুদের আনাগোনা শুরু হয়। বাইজেন্টাইন থিম নৌবহরগুলো, যারা একসময় সমুদ্রে পাহারা দিত, অবহেলা এবং একের পর এক গৃহযুদ্ধের কারণে তখন এতটাই নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল যে তারা কার্যকর কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে অক্ষম ছিল।[৯৮]

প্রথম আলেকসিওস এবং দ্বিতীয় জনের অধীনে পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা

[সম্পাদনা]

এই সন্ধিক্ষণে, বাইজেন্টাইন নৌবহরের শোচনীয় অবস্থার চড়া মাশুল দিতে হয়েছিল। নর্মান আক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। তাদের সেনাবাহিনী করফু দখল করে এবং কোনো বাধা ছাড়াই এপিরাস উপকূলে অবতরণ করে ডাইরাকিয়াম অবরোধ করে।[৯৯] এর মাধ্যমে শুরু হয় এক দশকের যুদ্ধ যা বিপর্যস্ত সাম্রাজ্যের যৎসামান্য সম্পদকেও নিঃশেষ করে দেয়।[১০০] নতুন সম্রাট প্রথম আলেকসিওস কোমনেনোস ( শাসনকাল ১০৮১–১১১৮) ভেনিসীয়দের সহায়তা চাইতে বাধ্য হন। এই ভেনিসীয়রাই ১০৭০-এর দশকেই নর্মানদের বিরুদ্ধে অ্যাড্রিয়াটিক এবং ডালমেশিয়ার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল।[১০১] সহায়তার বিনিময়ে ১০৮২ সালে তিনি তাদের বড় ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা প্রদান করেন।[১০২] এই চুক্তি এবং পরবর্তীতে এসব সুবিধার ক্রমাগত বিস্তার বাইজেন্টাইনদের কার্যত ভেনিসীয়দের এবং পরবর্তীতে জেনোয়া ও পিসানদের কাছে জিম্মি করে ফেলে। ঐতিহাসিক জন বার্কেনমেয়ার উল্লেখ করেছেন: "বাইজেন্টাইনদের নিজস্ব নৌবাহিনীর অভাবের অর্থ ছিল এই যে—ভেনিস নিয়মিতভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করতে পারত। নর্মান বা ক্রুসেডারদের মতো আক্রমণকারীরা সাম্রাজ্যে প্রবেশ করবে কি না তা নির্ধারণ করতে পারত এবং ভেনিসীয় বাণিজ্যিক বা নৌ-তৎপরতা সীমিত করার যেকোনো বাইজেন্টাইন প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করে দিতে পারত।"[১০০] ১০৮০-এর দশকে নর্মানদের সাথে সংঘর্ষে একমাত্র কার্যকর বাইজেন্টাইন নৌ-শক্তি ছিল একটি স্কোয়াড্রন। এর নেতৃত্বে ছিলেন গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞ নৌ-কমান্ডার মাইকেল মউরেক্স। তিনি এটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও পালন করতেন। ভেনিসীয়দের সাথে মিলে তিনি শুরুতে নর্মান নৌবহরের ওপর জয়লাভ করলেও ১০৮৪ সালে করফুর কাছে নর্মানদের অতর্কিত আক্রমণে এই যৌথ বাহিনী পরাজিত হয়।[১০৩][১০৪] আলেকসিওস শেষ পর্যন্ত নিজস্ব নৌবহর থাকার গুরুত্ব অনুধাবন করেন এবং স্থল অভিযানে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও নৌ-শক্তি পুনর্প্রতিষ্ঠায় পদক্ষেপ নেন। তাঁর প্রচেষ্টা কিছুটা সফলও হয়েছিল, বিশেষ করে স্মার্নার তুর্কি আমির জাকাসের এজিয়ান সাগরে নৌবহর নামানোর প্রচেষ্টাকে রুখে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সফল হয়েছিলেন।[১০৫][১০৬] পরবর্তীতে জন ডুকাসের অধীনে থাকা নৌবহরটি ক্রিট ও সাইপ্রাসের বিদ্রোহ দমনে ব্যবহৃত হয়।[১০৭] ক্রুসেডারদের সহায়তায় আলেকসিওস পশ্চিম আনাতোলিয়ার উপকূলগুলো পুনরুদ্ধার করতে এবং পূর্বে তাঁর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন। ১১০৪ সালে ১০টি জাহাজের একটি বাইজেন্টাইন স্কোয়াড্রন লাওডিশিয়া এবং লেবাননের ত্রিপোলি পর্যন্ত অন্যান্য উপকূলীয় শহর দখল করে।[১০৮] ১১১৮ সাল নাগাদ আলেকসিওস তাঁর উত্তরসূরি দ্বিতীয় জন কোমনেনোসের (শাসনকাল ১১১৮–১১৪৩) জন্য একটি ছোট নৌবাহিনী রেখে যেতে সক্ষম হন।[১০৯] তাঁর পিতার মতো দ্বিতীয় জনও সেনাবাহিনী এবং নিয়মিত স্থল অভিযানের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তবে তিনি নৌবাহিনীর শক্তি এবং রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখার দিকে নজর দেন।[১০৬] তবে ১১২২ সালে জন ভেনিসীয়দের দেওয়া বাণিজ্যিক সুবিধাগুলো নবায়ন করতে অস্বীকার করেন। এর প্রতিশোধ হিসেবে ভেনিসীয়রা বেশ কিছু বাইজেন্টাইন দ্বীপ লুণ্ঠন করে এবং বাইজেন্টাইন নৌবহর তাদের মোকাবিলা করতে অক্ষম হওয়ায় ১১২৫ সালে জন পুনরায় চুক্তিটি নবায়ন করতে বাধ্য হন।[১০৯] স্পষ্টতই, সেই সময়ে বাইজেন্টাইন নৌবাহিনী ভেনিসকে সফলভাবে মোকাবিলা করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না। এর কারণ তখন সাম্রাজ্যের সম্পদের ওপর অন্যান্য জরুরি চাহিদা ছিল। এই ঘটনার কিছুকাল পরেই অর্থমন্ত্রী জন অফ পুতজার পরামর্শে দ্বিতীয় জন নৌবাহিনীর তহবিল বন্ধ করে তা সেনাবাহিনীতে স্থানান্তর করেন এবং কেবল বিশেষ প্রয়োজনে জাহাজ সজ্জিত করার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানা যায়।[১০৯][১১০]

প্রথম ম্যানুয়েলের নৌ-অভিযানসমূহ

[সম্পাদনা]

উচ্চাভিলাষী সম্রাট প্রথম ম্যানুয়েল কোমনেনোসের ১১৪৩ থেকে ১১৮০ সাল পর্যন্ত শাসনকালে বাইজেন্টাইন নৌবাহিনী এক বিশাল প্রত্যাবর্তনের স্বাদ পায়। তিনি পূর্ব ভূমধ্যসাগরের লাতিন ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নৌবাহিনীকে বৈদেশিক নীতির এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেন।[১১১] তাঁর রাজত্বের শুরুর বছরগুলোতে বাইজেন্টাইন নৌ-শক্তি তখনও দুর্বল ছিল। ১১৪৭ সালে অ্যান্টিওকের জর্জের নেতৃত্বে সিসিলির দ্বিতীয় রজারের নৌবহর প্রায় কোনো বাধা ছাড়াই করফু, আয়োনিয়ান দ্বীপপুঞ্জ এবং এজিয়ান সাগরে হানা দিতে সক্ষম হয়।[১১২] পরের বছর ভেনিসীয়দের সহায়তায় নর্মানদের কাছ থেকে করফু ও আয়োনিয়ান দ্বীপপুঞ্জ পুনরুদ্ধারের জন্য একটি বিশাল নৌবহরসহ একটি সেনাবাহিনী পাঠানো হয়। দাবি অনুযায়ী, এ বিশাল নৌবহরে ৫০০টি যুদ্ধজাহাজ ও ১,০০০টি পরিবহন জাহাজ ছিল। এর প্রতিশোধ হিসেবে ৪০টি জাহাজের একটি নর্মান নৌবহর খোদ কনস্টান্টিনোপলে পৌঁছে যায় এবং মহা প্রাসাদের সামনে বোসফরাস প্রণালীতে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে শহরতলিতে লুটতরাজ চালায়।[১১৩][১১৪] তবে ফেরার পথে একটি বাইজেন্টাইন বা ভেনিসীয় নৌবহর তাদের আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেয়।[১১৪] ১১৫৫ সালে নর্মান বিদ্রোহী লোরিটেলোর তৃতীয় রবার্টের সমর্থনে ১০টি জাহাজের একটি বাইজেন্টাইন স্কোয়াড্রন অ্যানকোনাতে পৌঁছায়। এটি ছিল দক্ষিণ ইতালি পুনরুদ্ধারে বাইজেন্টাইনদের শেষ প্রচেষ্টা। প্রাথমিক সাফল্য এবং মেগাস ডুক্স আলেকসিওস কোমনেনোস ব্রায়েনিয়াসের অধীনে অতিরিক্ত সৈন্য আসা সত্ত্বেও ১১৫৬ সালে এই অভিযানটি শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয় এবং ৪টি বাইজেন্টাইন জাহাজ শত্রুদের কবলে পড়ে।[১১৫] ১১৬৯ সালের দিকে ম্যানুয়েলের প্রচেষ্টাগুলো স্পষ্টতই ফলপ্রসূ হয়। তখন টেমপ্লেট:Translit আন্দোনিকোস কোন্টোস্টেফানোসের নেতৃত্বে প্রায় ১৫০টি গ্যালি, ১০-১২টি বড় পরিবহন জাহাজ এবং ৬০টি ঘোড়া পরিবহনকারী জাহাজ নিয়ে গঠিত একটি সম্পূর্ণ বাইজেন্টাইন নৌবহর মিশর আক্রমণের জন্য পাঠানো হয়। এই অভিযানে ক্রুসেডার জেরুজালেম রাজ্যের শাসকরাও তাদের সাথে যুক্ত ছিল।[১১৬][১১৭] তবে এই আক্রমণ ব্যর্থ হয় এবং ফেরার পথে ঝড়ে বাইজেন্টাইনরা তাদের অর্ধেক নৌবহর হারায়।[১১৮] ১১৭১ সালের মার্চ মাসে সাম্রাজ্য জুড়ে সমস্ত ভেনিসীয়দের আটক ও কারাবন্দী করার পর বাইজেন্টাইন নৌবাহিনী এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তারা ভেনিসীয়দের সরাসরি আক্রমণ থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়। ভেনিসীয়রা চিওস দ্বীপে গিয়ে আলোচনার পথ বেছে নেয়। ম্যানুয়েল তাদের মোকাবিলায় কোন্টোস্টেফানোসের অধীনে ১৫০টি জাহাজের একটি বহর পাঠান এবং কালক্ষেপণের কৌশল অবলম্বন করেন। শেষ পর্যন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়লে ভেনিসীয়রা পিছু হটতে শুরু করে এবং কোন্টোস্টেফানোসের নৌবহর তাদের তাড়া করে।[১১৯] ১১২৫ সালের অপমানের তুলনায় এটি ছিল ভাগ্যের এক অভাবনীয় পরিবর্তন। ১১৭৭ সালে মিশরের উদ্দেশ্যে কোন্টোস্টেফানোসের অধীনে ৭০টি গ্যালি এবং ৮০টি সহায়ক জাহাজের আরেকটি নৌবহর পাঠানো হয়। কিন্তু আক্রের উপকূলে পৌঁছানোর পর তারা ফিরে আসে। এর কারণ ফ্ল্যান্ডার্সের কাউন্ট প্রথম ফিলিপ এবং জেরুজালেম রাজ্যের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অভিজাত এই অভিযানে অংশ নিতে অস্বীকার করেন।[১১৮][১২০][১২১] তবে ম্যানুয়েলের রাজত্বের শেষ নাগাদ সব ফ্রন্টে ক্রমাগত যুদ্ধের ধকল এবং সম্রাটের বিভিন্ন ব্যয়বহুল প্রকল্পের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিক নিকেতাস চোানিয়াটিস ম্যানুয়েলের রাজত্বের শেষ বছরগুলোতে জলদস্যুতা বৃদ্ধির পেছনে নৌবাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণের তহবিল রাজকীয় কোষাগারের অন্যান্য প্রয়োজনে সরিয়ে নেওয়াকে দায়ী করেছেন।[১২২]

অবক্ষয়

[সম্পাদনা]

অ্যাঞ্জেলোস রাজবংশ এবং চতুর্থ ক্রুসেড

[সম্পাদনা]

১১৮০ সালে প্রথম ম্যানুয়েলের মৃত্যু এবং ১১৮৫ সালে কোমনেনীয় রাজবংশের পতনের পর বাইজেন্টাইন নৌবাহিনীর দ্রুত অবনতি ঘটে। গ্যালি জাহাজগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং দক্ষ নাবিকদের খরচ চালানো ছিল অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ। আর চরম অবহেলার কারণে নৌবহরের অবস্থায় দ্রুত ধস নামে। ১১৮২ সালের মধ্যেই বাইজেন্টাইনরা তাদের কিছু গ্যালি পরিচালনার জন্য ভেনিসীয় ভাড়াটে সৈন্যদের অর্থ প্রদান করতে বাধ্য হচ্ছিল।[১২৩] তবে ১১৮০-এর দশকেও কোমনেনীয় আমলের নৌ-কাঠামোর অবশিষ্টাংশ টিকে থাকায় সমসাময়িক সূত্রে ৭০ থেকে ১০০টি জাহাজের অভিযানের উল্লেখ পাওয়া যায়।[১২৪] উদাহরণস্বরূপ, ১১৮৫ সালে সম্রাট প্রথম অ্যান্ড্রোনিকোস কোমনেনোস (শাসনকাল ১১৮৩–১১৮৫) তখনও ১০০টি যুদ্ধজাহাজ একত্রিত করতে পেরেছিলেন। এটি মারমারা সাগরে একটি নর্মান নৌবহরকে প্রতিরোধ ও পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছিল।[১২৫] তবে পরবর্তী শান্তি চুক্তিতে এমন একটি শর্ত ছিল যে, নর্মানরা সাম্রাজ্যের জন্য একটি নৌবহর সরবরাহ করবে। এর পাশাপাশি পরের বছর দ্বিতীয় আইজ্যাক অ্যাঞ্জেলোস (১১৮৫–১১৯৫ এবং ১২০৩–১২০৪) ভেনিসের সাথে একটি অনুরুপ চুক্তি করেন। সেখানে ভেনিস ছয় মাসের নোটিশে ৪০ থেকে ১০০টি গ্যালি সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। বিনিময়ে তাদের অনুকূল বাণিজ্যিক সুবিধা দেওয়া হয়। এসব চুক্তি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, বাইজেন্টাইন সরকার তাদের নিজস্ব নৌ-ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততা সম্পর্কে সচেতন ছিল।[১২৩]

১২০৪ সালে চতুর্থ ক্রুসেডের হাতে কনস্টান্টিনোপলের পতন। এটি ছিল দুর্বল হয়ে পড়া বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের ওপর লাতিন পশ্চিম এবং বিশেষ করে ভেনিসীয় নৌ-শক্তির বিজয়ের প্রতীক।

এই সময়ে পূর্ব ভূমধ্যসাগর জুড়ে জলদস্যুতার উত্থান ঘটে। এজিয়ান সাগরে জলদস্যুতা চরমে পৌঁছায় এবং জলদস্যু ক্যাপ্টেনরা প্রায়ই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে নিজেদের বিলিয়ে দিত। এটি ঐসব শক্তিগুলোর জন্য স্থায়ী নৌবাহিনী ছাড়াই বিশেষ অভিযানের জন্য দ্রুত ও সস্তায় নৌবহর তৈরির একটি সুযোগ করে দিয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, আইজ্যাক অ্যাঞ্জেলোস কর্তৃক সাইপ্রাসের আইজ্যাক কোমনেনোসের কাছ থেকে সাইপ্রাস পুনরুদ্ধারের জন্য পাঠানো ৬৬টি জাহাজের একটি বাইজেন্টাইন নৌবহর জলদস্যু মার্গারিটাস অফ ব্রিন্ডিসি ধ্বংস করে দেয়। মার্গারিটাস অফ ব্রিন্ডিসি তখন সিসিলির নর্মানদের অধীনে কাজ করছিলেন।[১২৬] জলদস্যুদের অত্যাচারে বিশেষ করে জেনোয়া বংশোদ্ভূত ক্যাপ্টেন কাফুরেসের তাণ্ডবে অতিষ্ঠ হয়ে শেষ পর্যন্ত অ্যাঞ্জেলোস শাসকরা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হন। কাফুরেসের এই ধ্বংসযজ্ঞের বর্ণনা নিকেতাস চোানিয়াটিস এবং তাঁর ভাই এথেন্সের মেট্রোপলিটন মাইকেল চোানিয়াটিস দিয়েছেন। উপকূলীয় অঞ্চলগুলো থেকে আবারও নৌ-কর আদায় করা শুরু হয় এবং ৩০টি জাহাজের একটি নৌবাহিনী সাজানো হয়। এ নৌবাহিনীর দায়িত্ব দেওয়া হয় কালাব্রিয়ান জলদস্যু স্টেইরিওনেসকে। প্রাথমিক কিছু সাফল্য পেলেও, সেস্টোসের কাছে কাফুরেসের অতর্কিত হামলায় স্টেইরিওনেসের নৌবহর ধ্বংস হয়ে যায়। পরে পিসান জাহাজ যুক্ত করে গঠিত এবং স্টেইরিওনেসের কমান্ডে থাকা দ্বিতীয় একটি নৌবহর শেষ পর্যন্ত কাফুরেসেকে পরাজিত করতে এবং তার দস্যুতা থামাতে সক্ষম হয়।[১২৭] তবে একই সময়ে তৎকালীন মেগাস ডুক্স মাইকেল স্ট্রিফনোসের বিরুদ্ধে নিকেতাস চোানিয়াটিস অভিযোগ তোলেন। তিনি রাজকীয় নৌবহরের সরঞ্জাম বিক্রি করে নিজে ধনী হচ্ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়।[১২৩][১২৮] ১৩শ শতাব্দীর শুরুর দিকে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে, বিভিন্ন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রদেশগুলোতে ক্ষমতা দখল করতে শুরু করেন।[১২৯] সামগ্রিক পরিবেশটি ছিল আইনহীনতায় ভরা। এর সুযোগ নিয়ে দক্ষিণ গ্রিসের লিও সগোরোস বা সামোসের রাজকীয় গভর্নর পেগোনাইটসের মতো ব্যক্তিরাও নিজেদের জাহাজ ব্যবহার করে নিজস্ব স্বার্থে অভিযান শুরু করেন। এমনকি সম্রাট তৃতীয় আলেকসিওস অ্যাঞ্জেলোস (১১৯৫–১২০৩) সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি তাঁর এক কমান্ডার কনস্টানটাইন ফ্র্যাঙ্গোপুলোসকে কৃষ্ণ সাগরে বাণিজ্যের ওপর জলদস্যু হামলা চালানোর লাইসেন্স বা অনুমতি দিয়েছিলেন।[১৩০] এই জরাজীর্ণ অবস্থায় বাইজেন্টাইন রাষ্ট্র এবং তার নৌবহর ভেনিসের নৌ-শক্তির সামনে দাঁড়ানোর মতো অবস্থায় ছিল না। ভেনিসের নৌ-শক্তি তখনচতুর্থ ক্রুসেডকে সমর্থন দিচ্ছিল। নিকেতাস চোানিয়াটিসের মতে, যখন তৃতীয় আলেকসিওস এবং স্ট্রিফনোস জানতে পারেন যে ক্রুসেডাররা কনস্টান্টিনোপলের দিকে যাত্রা করেছে, তখন তল্লাশি চালিয়ে মাত্র ২০টি "জরাজীর্ণ ও পচা" জাহাজ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। ১২০৩ সালে ক্রুসেডারদের প্রথম অবরোধের সময় গোল্ডেন হর্নে ক্রুসেডার নৌবহরের প্রবেশ ঠেকানোর বাইজেন্টাইন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এমনকি বাইজেন্টাইনদের অগ্নিজাহাজ ব্যবহারের চেষ্টাও সফল হয়নি, কারণ ভেনিসীয়রা তাদের জাহাজ চালনায় অত্যন্ত দক্ষ ছিল।[১৩১]

নিসিয়া এবং পালাইওলোগোস যুগ

[সম্পাদনা]
সম্রাট অষ্টম মাইকেল পালাইওলোগোস। তিনি কনস্টান্টিনোপল পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য পুনপ্রতিষ্ঠা করেন এবং একটি প্রধান নৌ-শক্তি হিসেবে বাইজেন্টাইনদের শেষ উৎকর্ষের জন্য অবদান রেখেছিলেন।

১২০৪ সালে চতুর্থ ক্রুসেডের হাতে কনস্টান্টিনোপল পতনের পর, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ক্রুসেডারদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। অন্যদিকে তিনটি গ্রিক উত্তরাধিকারী রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। এর হলো এপিরাস ডেসপোটেট, ট্রেবিজোন্ড সাম্রাজ্য এবং নিসিয়া সাম্রাজ্য। তাদের প্রত্যেকেই বাইজেন্টাইন রাজকীয় খেতাব দাবি করে। প্রথম রাষ্ট্রটির কোনো নৌবহর ছিল না। ট্রেবিজোন্ডের নৌবাহিনী ছিল অতি ক্ষুদ্র। তারা মূলত টহল ও সৈন্য পরিবহনে ব্যবহৃত হতো। অন্যদিকে, নিসিয়ানরা শুরুতে সংহতি নীতি অনুসরণ করে এবং তাদের নৌবহর উপকূলীয় প্রতিরক্ষায় ব্যবহার করে।[১৩২][১৩৩] সম্রাট তৃতীয় জন ভাতাতজেসের ১২২২ থেকে ১২৫৪ পর্যন্ত শাসনকালে এক উদ্যমী পররাষ্ট্র নীতি গ্রহণ করা হয়। এরপর, ১২২৫ সালে নিসিয়ান নৌবহর লেসবস, চিওস, সামোস এবং ইকারিয়া দ্বীপপুঞ্জ দখল করতে সক্ষম হয়।[১৩৪] তবে ভেনিসীয়দের সামনে তারা তখনও নগণ্য ছিল। ১২৩৫ সালে কনস্টান্টিনোপল অবরোধের চেষ্টাকালে নিসিয়ান নৌবাহিনী অনেক ছোট একটি ভেনিসীয় বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়। ১২৪১ সালের অনুরূপ আরেকটি প্রচেষ্টায় নিসিয়ানরা আবারও বিধ্বস্ত হয়।[১৩৪] ১২৩০-এর দশকে ক্রিট দ্বীপে ভেনিসের বিরুদ্ধে স্থানীয় বিদ্রোহে সহায়তা করার নিসিয়ান প্রচেষ্টাও কেবল আংশিক সফল হয়। সবশেষে,১২৩৬ সালে তাদের শেষ সৈন্যদল দ্বীপটি ছাড়তে বাধ্য হয়।[১৩৫][১৩৬] নিজের নৌবাহিনীর দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে, ১২৬১ সালের মার্চ মাসে সম্রাট অষ্টম মাইকেল পালাইওলোগোস (শাসনকাল ১২৫৯–১২৮২) জেনোয়া প্রজাতন্ত্রের সাথে নিমফিয়াম চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে বাণিজ্যিক সুবিধার বিনিময়ে সমুদ্রে ভেনিসের বিরুদ্ধে জেনোয়ার সহায়তা নিশ্চিত করা হয়।[১৩৭][১৩৮] কয়েক মাস পরেই কনস্টান্টিনোপল পুনরুদ্ধারের পর অষ্টম মাইকেল নিজের নৌবহর গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দেন। ১২৬০-এর দশকের শুরুতে বাইজেন্টাইন নৌবাহিনী তখনও দুর্বল ছিল এবং জেনোয়ার সহায়তার ওপর অনেকটা নির্ভরশীল ছিল। তা সত্ত্বেও, মিত্রশক্তিরা সরাসরি সংঘাতে ভেনিসের সামনে দাঁড়াতে পারেনি। যার প্রমাণ মেলে ১২৬৩ সালে সেত্তেপোজ্জির যুদ্ধে। এ যুদ্ধে ৪৮টি জাহাজের একটি যৌথ বাইজেন্টাইন-জেনোয়িজ নৌবহর অনেক ছোট একটি ভেনিসীয় বহরের কাছে পরাজিত হয়।[১৩৯] তবে, ইতালীয়রা যখন নিজেদের মধ্যে ভেনিসীয়-জেনোয়িজ যুদ্ধে ব্যস্ত ছিল, সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ১২৭০ সাল নাগাদ মাইকেলের প্রচেষ্টায় ৮০টি জাহাজের একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে ওঠে। একই বছর ২৪টি গ্যালির একটি বহর নেগ্রোপোন্টের ইউবোয়া ওরিওস শহর অবরোধ করে এবং ২০টি গ্যালির একটি লাতিন নৌবহরকে পরাজিত করে।[১৪০] এটি ছিল বাইজেন্টাইনদের প্রথম সফল স্বাধীন নৌ-অভিযান এবং এজিয়ান সাগরে এক সংগঠিত নৌ-তৎপরতার সূচনা। এ তৎপরতা ১২৭০-এর দশক জুড়ে অব্যাহত ছিল। এর ফলে লাতিনদের কাছ থেকে অনেক দ্বীপ সাময়িকভাবে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়।[১৪১] তবে,এই পুনর্জাগরণ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১২৮৫ সালে চার্লস অফ আনজুর মৃত্যু এবং ইতালি থেকে আক্রমণের হুমকি কেটে যাওয়ার পর, মাইকেলের উত্তরসূরি দ্বিতীয় অ্যান্ড্রোনিকোস পালাইওলোগোস (শাসনকাল১২৮২–১৩২৮) মনে করেন যে, জেনোয়িজ মিত্রদের নৌ-শক্তির ওপর নির্ভর করলেই চলবে। তিনি ভাবলেন নৌবহর রক্ষণাবেক্ষণের বিশাল খরচ রাজকোষের পক্ষে বহন করা আর সম্ভব ছিল না। তাই এটি বন্ধ করা উচিত। একই সাথে অ্যান্ড্রোনিকোস পশ্চিমের তুলনায় এশিয়া মাইনরের তুর্কি অগ্রযাত্রা ঠেকানোর দিকে বেশি মনোযোগী ছিলেন যেখানে নৌবাহিনীর কোনো ভূমিকা ছিল না। তবে তাও শেষ পর্যন্ত বৃথা যায়। ফলস্বরূপ, পুরো নৌবহরটি ভেঙে দেওয়া হয়, নাবিকদের ছাঁটাই করা হয় এবং জাহাজগুলো হয় টুকরো করে ফেলা হয় অথবা পচনের জন্য ফেলে রাখা হয়।[১৪২][১৪৩] এর ফলাফল খুব দ্রুতই ফলেছিল। অ্যান্ড্রোনিকোসের দীর্ঘ শাসনামলে তুর্কিরা ধীরে ধীরে আনাতোলিয়ার এজিয়ান উপকূলগুলোর স্থায়ী দখল নিয়ে নেয় এবং সাম্রাজ্য তা পুনরুদ্ধারে ব্যর্থ হয়।[১৪৪][১৪৫] অন্যদিকে, ১২৯৬ থেকে ১৩০২ সালের বাইজেন্টাইন-ভেনিসীয় যুদ্ধের সময় ভেনিসীয় নৌবহর ইচ্ছামতো কনস্টান্টিনোপলে আক্রমণ করে এর শহরতলিতে লুটতরাজ চালাতে সক্ষম হয়।[১৪৬][১৪৭] অ্যান্ড্রোনিকোসের এই সিদ্ধান্ত শুরু থেকেই সমসাময়িক পণ্ডিত ও কর্মকর্তাদের তীব্র সমালোচনা ও বিরোধিতার মুখে পড়ে। প্যাকিমেরেস এবং নিকেফোরোস গ্রেগোরাসের মতো ঐতিহাসিকরা এই অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয়কর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। তাদের মতে,জলদস্যুতা বৃদ্ধি পায় কারন প্রায়ই ছাঁটাইকৃত বাইজেন্টাইন নাবিকরা তুর্কি বা লাতিন প্রভুদের অধীনে কাজ শুরু করত, কনস্টান্টিনোপল ইতালীয় নৌ-শক্তিগুলোর সামনে অরক্ষিত হয়ে পড়ে এবং একের পর এক এজিয়ান দ্বীপপুঞ্জ বিদেশি শাসনে চলে যায়। গ্রেগোরাস মন্তব্য করেছিলেন, "যদি বাইজেন্টাইনরা আগের মতো সমুদ্রের অধিপতি থাকত, তবে লাতিনরা এতটা অহংকারী হতো না। তুর্কিরা কখনও এজিয়ান সাগরের বালু দেখতে পেত না। আর আমাদেরও প্রতি বছর সবাইকে কর দিতে হতো না।"[১৪৮][১৪৯][১৫০] ১৩০৫ সালের পর জনরোষ এবং 'ক্যাটালান কোম্পানিকে' ঠেকানোর প্রয়োজনে সম্রাট দেরিতে হলেও ২০টি জাহাজের একটি নৌবহর গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাও কয়েক বছর পরেই আবারও ভেঙে দেওয়া হয়।[১৫১][১৫২] ১৪শ শতাব্দীতে বারবার গৃহযুদ্ধ, বলকানে বুলগেরিয়া ও সার্বিয়ার আক্রমণ এবং ক্রমবর্ধমান তুর্কি অভিযানের ফলে বাইজেন্টাইন রাষ্ট্রের পতন ত্বরান্বিত হয়। যা ১৪৫৩ সালে অটোমান তুর্কিদের হাতে সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।[১৫৩] দ্বিতীয় অ্যান্ড্রোনিকোসের পর বেশ কয়েকজন সম্রাট আবারও নৌবহর গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। বিশেষ করে কনস্টান্টিনোপলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ইতালীয় নৌ-শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ থেকে স্বাধীনতা বজায় রাখতে তারা চেষ্টা করেছিলেন।কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা কেবল স্বল্পমেয়াদী ফল দিয়েছিল।[১৫৪] অ্যান্ড্রোনিকোসের উত্তরসূরি তৃতীয় অ্যান্ড্রোনিকোস পালাইওলোগোস (শাসনকাল ১৩২৮–১৩৪১) সিংহাসনে আরোহণের পরপরই বিভিন্ন ধনীদের সহায়তায় ১০৫টি জাহাজের এক বিশাল নৌবহর একত্রিত করেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে এজিয়ান সাগরে বাইজেন্টাইন নৌবাহিনীর শেষ বড় অভিযানের নেতৃত্ব দেন। জেনোয়াদের কাছ থেকে চিওস ও ফোকাওয়া পুনরুদ্ধার করেন এবং ছোট ছোট লাতিন ও তুর্কি রাজত্বগুলোকে সন্ধি করতে বাধ্য করেন।[১৫৫][১৫৬] তবে বিথিনিয়ায় অটোমানদের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযানগুলো ব্যর্থ হয় এবং শীঘ্রই অটোমানরা মারমারা সাগরের ট্রিগ্লিয়াতে তাদের প্রথম নৌ-ঘাঁটি স্থাপন করে। সেখান থেকে তারা থ্রেস উপকূলে হানা দিতে শুরু করে।[১৫৭] এই নতুন হুমকি মোকাবিলায় ১৩৪০-এর দশকের শুরুতে কনস্টান্টিনোপলে ৭০টি জাহাজের একটি নৌবহর তৈরি করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মেগাস ডুক্স আলেক্সিওস আপোকাউকস[১৫৮] ১৩৪১ থেকে ১৩৪৭ সালের বাইজেন্টাইন গৃহযুদ্ধের সময় এই নৌবহরটি অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। গৃহযুদ্ধের পর সম্রাট ষষ্ঠ জন কান্তাকুজেনোস (শাসনকাল ১৩৪৭–১৩৫৪) নৌ ও বাণিজ্য বহর পুনর্জীবিত করার চেষ্টা করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল গালাটার জেনোয়িজ কলোনির ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা কমানো এবং তুর্কিদের পারাপার রোধে দার্দানেলেস প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।[১৫৯][১৬০] এই লক্ষ্যে তিনি ভেনিসীয়দের সহায়তা চান। কিন্তু,১৩৪৮ থেকে ১৩৪৯ সালে বাইজেন্টাইন-জেনোয়িজ যুদ্ধ ১৩৪৯ সালের মার্চ মাসে তাঁর নতুন তৈরি ৯টি যুদ্ধজাহাজ ও প্রায় ১০০টি ছোট জাহাজের বহরটি কনস্টান্টিনোপলের দক্ষিণ উপকূলে ঝড়ের কবলে পড়ে। অনভিজ্ঞ নাবিকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়লে জেনোয়িজরা জাহাজগুলো হয় ডুবিয়ে দেয় নয়তো দখল করে নেয়[১৫৯][১৬১] দমে না গিয়ে কান্তাকুজেনোস আবারও নৌবহর গড়ার চেষ্টা করেন। যা তাঁকে থেসালোনিকা এবং কিছু উপকূলীয় শহর ও দ্বীপের ওপর কর্তৃত্ব পুনপ্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে। এই নৌবহরের একটি অংশ কনস্টান্টিনোপলে রাখা হয়েছিল। যদিও বাইজেন্টাইন জাহাজগুলো এজিয়ানে সক্রিয় ছিল এবং তুর্কি জলদস্যুদের বিরুদ্ধে কিছু সাফল্য পেয়েছিল। কিন্তু তারা কখনও তাদের তৎপরতা পুরোপুরি থামাতে পারেনি, ইতালীয় নৌবাহিনীগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানানো তো দূরের কথা।[১৬২] তহবিলের অভাবে শেষ পর্যন্ত এই নৌবহরটি কনস্টান্টিনোপলে মোতায়েন করা মাত্র গুটিকয়েক জাহাজে এসে ঠেকে। ১৪১৮ সালে স্কলার গেমিস্টোস প্লেথন ডেসপোট দ্বিতীয় থিওডোর পালাইওলোগোসকে দেওয়া এক পরামর্শে নৌবাহিনী বজায় না রাখার পরামর্শ দেন। কারণ নৌবাহিনী এবং একটি কার্যকর সেনাবাহিনী উভয়কেই একসাথে চালানোর মতো যথেষ্ট সম্পদ তখন সাম্রাজ্যের ছিল না।[১৬৩] এরপর থেকে, নিঃস্ব বাইজেন্টাইন রাষ্ট্রটি সমসাময়িক বড় শক্তিগুলোর হাতের পুতুলে পরিণত হয় এবং তাদের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কাজে লাগিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করতে থাকে।[১৬৪] এর ধারাবাহিকতায় ১৩৫১ সালে কান্তাকুজেনোস জেনোয়ার সাথে প্রণালীর যুদ্ধে ভেনিসের পক্ষ নিতে প্ররোচিত হন। কিন্তু পরবর্তী বোসফরাস যুদ্ধে একটি রক্তক্ষয়ী ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয় এবং ভেনিসীয় অ্যাডমিরালরা দ্বিতীয় কোনো যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে অস্বীকার করেন। মিত্রদের দ্বারা পরিত্যক্ত হয়ে কান্তাকুজেনোস একটি প্রতিকূল শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন।[১৬৫] ১৩৯০ সালে সপ্তম জন পালাইওলোগোসের সংক্ষিপ্ত ক্ষমতা দখলের সময়, দ্বিতীয় ম্যানুয়েল পালাইওলোগোস (শাসনকাল ১৩৯১–১৪২৫) তাঁর পিতা পঞ্চম জন পালাইওলোগোসকে উদ্ধার এবং কনস্টান্টিনোপল পুনরুদ্ধারের জন্য মাত্র পাঁচটি গ্যালি এবং চারটি ছোট জাহাজ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর মধ্যে কিছু ছিল রোডসের হসপিটালারদের [১৬৬] ছয় বছর পর, ম্যানুয়েল নিকোপোলিস ক্রুসেডে সহায়তার জন্য দশটি জাহাজ সজ্জিত করার প্রতিশ্রুতি দেন।[১৬৭] এর ২০ বছর পর, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ৪টি গ্যালি এবং অন্য ২টি জাহাজে কিছু পদাতিক ও অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে অভিযানে নেতৃত্ব দেন এবং থাসোস দ্বীপকে আক্রমণ থেকে রক্ষা করেন।[১৬৮] অটোমান ইন্টাররেগনাম বা অটোমান রাজবংশের অভ্যন্তরীণ বিবাদের সময় বাইজেন্টাইন জাহাজগুলো অত্যন্ত সক্রিয় ছিল, কারণ তখন বাইজেন্টাইনরা একের পর এক প্রতিদ্বন্দ্বী অটোমান রাজপুত্রদের পক্ষ নিচ্ছিল। ম্যানুয়েল তাঁর জাহাজগুলো ব্যবহার করে প্রতিদ্বন্দ্বী দাবিদার এবং তাদের বাহিনীকে প্রণালী পার করে দিতেন।[১৬৯] জেনোয়ার সহায়তায় ম্যানুয়েলের নৌবহর ৮টি গ্যালির একটি বহর গড়ে তুলতে এবং ১৪১০ সালের মে মাসে গ্যালিপোলি দখল করতে সক্ষম হয়। যদিও তা ছিল স্বল্প সময়ের জন্য।[১৭০] ১৪১১ সালের আগস্ট মাসে অটোমান রাজপুত্র মুসা চেলেবি কর্তৃক কনস্টান্টিনোপল অবরোধ ব্যর্থ করতে বাইজেন্টাইন নৌবহর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন তারা মুসার নৌ-অবরোধের প্রচেষ্টাকে পরাজিত করে।[১৭১] একইভাবে, ১৪২১ সালে ১০টি বাইজেন্টাইন যুদ্ধজাহাজ সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের বিরুদ্ধে অটোমান সিংহাসনের দাবিদার মুস্তাফার সমর্থনে নিয়োজিত ছিল।[১৬৭] বাইজেন্টাইনদের শেষ নৌ-বিজয়ের রেকর্ডটি পাওয়া যায় ১৪২৭ সালের এচিনাদেসের যুদ্ধে। সেই যুদ্ধে সম্রাট অষ্টম জন পালাইওলোগোস (শাসনকাল ১৪২৫–১৪৪৮) কেফালোনিয়ার কাউন্ট এবং এপিরাসের ডেসপট প্রথম কার্লো টোকোর শক্তিশালী নৌবহরকে পরাজিত করেন। তাঁকে মোরিয়া অঞ্চলে তাঁর সমস্ত অধিকার বাইজেন্টাইনদের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য করেন।[১৭২] বাইজেন্টাইন নৌবাহিনীর সর্বশেষ উপস্থিতি দেখা যায় ১৪৫৩ সালের চূড়ান্ত অটোমান অবরোধের সময়, যখন বাইজেন্টাইন, জেনোয়িজ এবং ভেনিসীয় জাহাজের একটি মিশ্র নৌবহর অটোমান নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে কনস্টান্টিনোপল রক্ষা করছিল। উৎসের ওপর ভিত্তি করে জাহাজের সংখ্যা ১০ থেকে ৩৯টি পর্যন্ত বলা হয়।[১৭৩][১৭৪] অবরোধ চলাকালীন, ১৪৫৩ সালের ২০ এপ্রিল বাইজেন্টাইন ইতিহাসের সর্বশেষ নৌ-সংঘাতটি ঘটে। যখন তিনটি জেনোয়িজ গ্যালি একটি বাইজেন্টাইন মালবাহী জাহাজকে পাহারা দিয়ে অটোমানদের বিশাল নৌ-অবরোধ ভেঙে গোল্ডেন হর্নে প্রবেশ করে।[১৭৫] এর মাধ্যমেই বাইজেন্টাইন নৌবাহিনীর হাজার বছরের ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটে।

জাহাজ পরিচিতি

[সম্পাদনা]

ড্রোমন এবং এর বিবর্তিত রূপসমূহ

[সম্পাদনা]

১২শ শতাব্দী পর্যন্ত বাইজেন্টাইন নৌবাহিনীর প্রধান যুদ্ধজাহাজ ছিল ড্রোমন এবং এই জাতীয় অন্যান্য জাহাজ। দৃশ্যত এটি ছিল রোমান রাজকীয় নৌবহরের হালকা লিবুরনিয়ান গ্যালির একটি বিবর্তিত রূপ। 'ড্রোমন' শব্দটি প্রথম ৫ম শতাব্দীর শেষভাগে দেখা যায় এবং ৬ষ্ঠ শতাব্দী নাগাদ এটি একটি নির্দিষ্ট ধরনের যুদ্ধ-গ্যালির জন্য সাধারণ নাম হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।[১৭৬] ড্রোমন (δρόμων) শব্দটি এসেছে গ্রিক মূল শব্দ δρομ-(άω) থেকে, যার অর্থ 'দৌড়ানো'; অর্থাৎ ড্রোমন মানে হলো 'ধাবমান' বা 'রানার'। ৬ষ্ঠ শতাব্দীর লেখক প্রোকোপিয়াস তাঁর লেখায় এই জাহাজগুলোর গতির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।[১৭৭] পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে আরবদের সাথে নৌ-সংগ্রাম তীব্রতর হওয়ার সাথে সাথে দুই বা সম্ভবত তিন স্তরের দাঁড়যুক্ত আরও ভারী সংস্করণ বিবর্তিত হয়।[১৭৮] শেষ পর্যন্ত শব্দটি সাধারণভাবে 'যুদ্ধজাহাজ' অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এটি বড় যুদ্ধজাহাজের জন্য ব্যবহৃত অন্য একটি বাইজেন্টাইন শব্দ চেলান্ডিয়ন (χελάνδιον যা গ্রিক শব্দ কেলেস বা 'দ্রুতগামী ঘোড়া' থেকে এসেছে)-এর সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। চেলান্ডিয়ন শব্দটি প্রথম ৮ম শতাব্দীতে আবির্ভূত হয়।[১৭৯] বাইজেন্টাইনদের এই 'ড্রোমন' জাহাজগুলো কিন্তু তাদের গ্রিক ফায়ার নিক্ষেপ করার ক্ষমতার জন্য বিখ্যাত ছিল।

বিবর্তন ও বৈশিষ্ট্য

[সম্পাদনা]

মধ্যযুগীয় যুদ্ধজাহাজের আবির্ভাব এবং বিবর্তন নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে অনেক বিতর্ক ও অনুমান রয়েছে। ১৯ শতক পর্যন্ত প্রাচীন বা প্রাথমিক মধ্যযুগীয় কোনো দাঁড়যুক্ত যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি। তাই সাহিত্যিক প্রমাণ, সাধারণ শৈল্পিক চিত্রকর্ম এবং কিছু পণ্যবাহী জাহাজের ধ্বংসাবশেষ বিশ্লেষণ করেই তথ্য সংগ্রহ করতে হতো। তবে ২০০৫-২০০৬ সালে থিওডোসিয়াস বন্দর অর্থাৎ আধুনিক ইয়েনিকাপি স্থানে মারমারে প্রকল্পের প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শতাব্দীর ৩৬টিরও বেশি বাইজেন্টাইন জাহাজের ধ্বংসাবশেষ উন্মোচিত হয়। এদের মধ্যে গ্যালিয়া টাইপের চারটি হালকা গ্যালিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।[১৮০]

সংগৃহীত মতানুসারে, প্রধান কিছু বৈশিষ্ট্য দেখে প্রাথমিক ড্রোমনগুলোকে লিবুরনিয়ান জাহাজ থেকে আলাদা করা যেত। সকল বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্যতম কিছু বৈশিষ্ট্য হলো: পূর্ণাঙ্গ ডেক, 'র‍্যামের' বদলে 'স্পার' ব্যবহার এবং ধীরে ধীরে ল্যাটিন পালের প্রবর্তন।[১৮১] র‍্যাম (লাতিন: rostrum ἔμβολος ) বর্জন করার সঠিক কারণ এখনও অস্পষ্ট। ৪র্থ শতাব্দীর পাণ্ডুলিপিতে ঊর্ধ্বমুখী চঞ্চুর মতো অংশের চিত্র থেকে বোঝা যায় যে, প্রাচীন আমলের শেষভাগেই গ্যালিগুলোতে র‍্যামের বদলে স্পারের ব্যবহার চলে এসেছিল।[১৮২] প্রাচীন জাহাজের কাঠামো নির্মাণের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসার ফলে র‍্যামের কার্যকারিতা কমে গিয়েছিল।এর র‍্যামের ব্যবহার কমে এসেছিল বলে ধারণা করা হয়। আগের পদ্ধতিতে র‍্যাম দিয়ে জাহাজের তলা ফুটো করা সহজ হলেও পরবর্তী নতুন পদ্ধতিতে নির্মিত কাঠামো ছিল অনেক বেশি শক্তিশালী ও নমনীয়।[১৮৩] সেভিলের ইসিডোরের মন্তব্য থেকে বোঝা যায় যে,৭ম শতাব্দীর শুরুর দিকে র‍্যামের আদি কাজ যে মানুষ ভুলে গিয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন যে, এগুলো পানির নিচে থাকা পাথরের সাথে সংঘর্ষ থেকে জাহাজকে রক্ষা করতে ব্যবহৃত হতো।[১৮৪] ল্যাটিন পালের ক্ষেত্রে আগে মনে করা হতো আরবরা এটি ভারত থেকে ভূমধ্যসাগরে এনেছিল। তবে সাম্প্রতিক দশকগুলোর গবেষণায় দেখা গেছে যে, এটি হেলেনিস্টিক বা প্রাথমিক রোমান যুগেই লেভান্ট অঞ্চলে প্রচলিত ছিল।[১৮৫][১৮৬][১৮৭][১৮৮] ৫৩৩ সালে বেলিসারিয়াসের আক্রমণকারী নৌবহরেও অল্প কিছু ল্যাটিন পালের ব্যবহার ছিল। যা নির্দেশ করে যে মধ্যযুগে এটিই ড্রোমনের আদর্শ পালে পরিণত হয়েছিল।[১৮৯][১৯০]

প্রোকোপিয়াস যে ড্রোমনগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন সেগুলো ছিল এক সারি দাঁড়যুক্ত। ধারনা করা হয় যে প্রতি পাশে ২৫টি করে দুইপাশে ৫০টি দাঁড় ছিল।[১৯১] হেলেনিস্টিক জাহাজের বিপরীতে এগুলোর দাঁড় সরাসরি জাহাজের মূল কাঠামো থেকে বের হতো।[১৯২] ৯ম ও ১০ম শতাব্দীর পরবর্তী সময়ের দুই সারি দাঁড়যুক্ত ড্রোমনগুলোতে দুটি ডেক দিয়ে আলাদা করা জায়গা থাকত। এক সারি ডেকের নিচে এবং অন্য সারি ডেকের ওপরে। এই দাঁড়টানুনীরা প্রয়োজনে নৌ-সেনাদের সাথেও সরাসরি যুদ্ধেও অংশ নিতেন।[১৯৩] ১২০ জন দাঁড়টানুনী বিশিষ্ট একটি ড্রোমনের প্রতি পাশে ডেকের নিচে ২৫ জন এবং ওপরে ৩৫ জন থাকতেন বলে ধারণা করা হয়।[১৯৪] এই জাহাজগুলোর দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩২ মিটার।[১৯৫] অধিকাংশ জাহাজে একটি মাস্তুল থাকলেও, বড় ড্রোমনগুলোকে কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য অন্তত দুটি মাস্তুলের প্রয়োজন হতো।[১৯৬] জাহাজের পেছনের অংশে দুটি রাডার দিয়ে এটি চালানো হতো। যেখানে ক্যাপ্টেনের বিশ্রামের জন্য একটি তাঁবুও থাকত।[১৯৭] জাহাজের সামনের অংশে একটি উঁচু মঞ্চ থাকত, যার নিচ থেকে গ্রিক ফায়ার নিক্ষেপ করার সাইফন বা নলটি বের হয়ে থাকত।[১৯৮] এছাড়া জাহাজের দুই পাশে সুরক্ষার জন্য কাস্তেল্লোমা অর্থাৎ পলিবেষ্টনী বা শিল্ড টাঙানোর ব্যবস্থা ছিল। বড় জাহাজগুলোতে মাস্তুলের মাঝে কাঠের তৈরি ছোট দুর্গ থাকত।[১৯৯] সামনের স্পারটি শত্রুর জাহাজের ওপর দিয়ে চালিয়ে তাদের দাঁড়গুলো ভেঙে ফেলার জন্য নকশা করা হয়েছিল।[২০০]

ইয়েনিকাপি খননে ১০ম-১১শ শতাব্দীর যে চারটি জাহাজ পাওয়া গেছে, সেগুলোর নির্মাণশৈলী একই। এটি নির্দেশ করে যে এগুলো কোনো কেন্দ্রীয় কারখানায় তৈরি করা হয়েছিল। এগুলো লম্বায় প্রায় ৩০ মিটার এবং ইউরোপীয় কৃষ্ণ পাইন ও ওরিয়েন্টাল প্লেন কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল।[২০১]

বাইজেন্টাইনদের এই শক্তিশালী জাহাজের সবচেয়ে ভয়ানক দিক ছিল গ্রিক ফায়ার।

জাহাজের ধরণ

[সম্পাদনা]
১১শ শতাব্দীর ওপিয়ানের 'সিনেজেটিকা' এর একটি অনুলিপি অবলম্বনে একটি সামুদ্রিক যুদ্ধের চিত্র।

১০ম শতাব্দী নাগাদ সাধারণ ড্রোমন জাতীয় জাহাজের মধ্যে প্রধানত তিন শ্রেণির 'বাইরেম' (দুই সারি দাঁড়যুক্ত) যুদ্ধজাহাজ ছিল। যার বিস্তারিত বিবরণ ৯১১ এবং ৯৪৯ সালের ক্রিট অভিযানের তালিকায় পাওয়া যায়:

(ওউসিয়াকন চেলান্ডিয়ন বা ousiakon chelandion): এর নামকরণ করা হয়েছিল কারণ এটি একটি ওউসিয়া অর্থাৎ ১০৮ জন ক্রু দ্বারা পরিচালিত হতো।

(পেমফাইলোন চেলান্ডিওন বা pamphylon chelandion): এতে ১২০ থেকে ১৬০ জন ক্রু থাকত। এর নামের অর্থ নিয়ে বিতর্ক আছে। এ নামটি প্যামফিলিয়া অঞ্চলে পণ্যবাহী জাহাজ হিসেবে উদ্ভাবিত হয়েছিল অথবা এতে "বাছাইকৃত ক্রু" থাকত।

('ডি সেরিমোনিস' বা De Ceremoniis): ভারী ড্রোমনগুলোতে ২৩০ জন দাঁড়টানুনী এবং ৭০ জন নৌ-সেনার এক বিশাল বাহিনীর কথা। নৌ-ইতিহাসবিদ জন এইচ. প্রায়র মনে করেন, এরা ছিল জাহাজে বহন করা অতিরিক্ত সৈন্য। অন্যদিকে গ্রিক পণ্ডিত ক্রিস্টোস মাক্রিপুলিয়াস মনে করেন, উপরের সারির প্রতিটি দাঁড়ে দুজন করে দাঁড়টানুনী থাকার কারণে এই অতিরিক্ত সংখ্যা দেখা যায়।[২০২][২০৩] এছাড়া স্কাউটিং বা মূল যুদ্ধরীতির দুই পাশে পাহারার জন্য এক সারি দাঁড়যুক্ত ছোট জাহাজ ব্যবহৃত হতো, যাকে (moneres) বা (galea) বলা হতো (যা থেকে আধুনিক 'গ্যালি' শব্দটি এসেছে)। এতে প্রায় ৬০ জন ক্রু থাকত।[২০৪] বিশেষ করে 'গ্যালিয়া' জাহাজগুলো মারডাইটদের (Mardaites) সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিল বলে ধারণা করা হয়।[২০৫]

তিন সারি দাঁড়যুক্ত ('ট্রাইরেম') ড্রোমনের বর্ণনা ৯ম শতাব্দীর একটি গ্রন্থে পাওয়া যায়, তবে এটি ধ্রুপদী ট্রাইরেমের অনুকরণে লেখা হওয়ায় মধ্য-বাইজেন্টাইন যুগের ক্ষেত্রে এটি কতটা সঠিক তা নিয়ে সংশয় আছে।[২০৬] তবে ১১শ ও ১২শ শতাব্দীতে ফাতেমীয় নৌবাহিনীতে ট্রাইরেম জাহাজের অস্তিত্ব প্রমাণিত।[২০৭] পণ্য পরিবহনের জন্য বাইজেন্টাইনরা সাধারণত সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে (পণ্যবাহী) বা (রসদবাহী) হিসেবে ব্যবহার করত। এগুলো দাঁড়ের বদলে পালের সাহায্যে চলত।[২০৮] এছাড়া তারা ঘোড়া পরিবহনের জন্য বিশেষ জাহাজ (hippagoga) ব্যবহার করত। যেহেতু 'চেলান্ডিয়ন' মূলত ঘোড়া পরিবহনের জন্য তৈরি দাঁড়যুক্ত জাহাজ ছিল, তাই সাধারণ ড্রোমনের সাথে এর গঠনগত পার্থক্য ছিল। চেলান্ডিয়নের মাঝখানে ঘোড়া রাখার জন্য বিশেষ জায়গা থাকায় এর খোল (hold) বেশি গভীর এবং প্রশস্ত হতো।[২০৯] এছাড়া বাইজেন্টাইন সূত্রে (sandalos) নামক নৌকার উল্লেখ পাওয়া যায়, যা বড় জাহাজের সাথে রাখা হতো। সাম্রাজ্যের শুরুর দিকে জাহাজ তৈরিতে মূলত সরলবর্গীয় (conifer) কাঠ ব্যবহৃত হলেও পরবর্তী সময়ে তুরস্কের বনাঞ্চল থেকে আসা চওড়া পাতাযুক্ত গাছের কাঠ ব্যবহার করা হতো।[২১০]


শেষ শতাব্দীগুলোতে পশ্চিমা নকশা

[সম্পাদনা]
১৪শ শতাব্দীর একটি হালকা গ্যালি-র চিত্র; এটি বর্তমানে এথেন্সের 'বাইজেন্টাইন অ্যান্ড খ্রিস্টান মিউজিয়াম'-এ সংরক্ষিত একটি আইকন থেকে নেওয়া।

ঠিক কোন সময়ে 'ড্রোমন' জাহাজগুলো ইতালীয় বংশোদ্ভূত টেমপ্লেট:Translit-জাতীয় জাহাজ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। ১২শ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত টেমপ্লেট:Translit শব্দটি ব্যবহৃত হতো, যদিও বাইজেন্টাইন লেখকরা এর ব্যবহারে খুব একটা বাছবিচার করতেন না।[২১১] সেই সময়ের পশ্চিমা লেখকরা শব্দটি ব্যবহার করতেন বড় জাহাজ, বিশেষ করে পণ্যবাহী জাহাজ বোঝাতে। তথ্যপ্রমাণ বলছে যে, এই ব্যবহারটি বাইজেন্টাইনদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল।[২১২] ১১৬৯ সালে উইলিয়াম অফ টায়ার বাইজেন্টাইন নৌবহরের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে তিনি "ড্রোমন" গুলোকে খুব বড় পণ্যবাহী জাহাজ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করেছেন এবং দুই সারি দাঁড়যুক্ত যুদ্ধজাহাজগুলোকে সেগুলো থেকে আলাদা দেখিয়েছেন। এটি সম্ভবত বাইজেন্টাইনদের দ্বারা নতুন ধরনের 'বাইরেম' গ্যালি গ্রহণেরই ইঙ্গিত দেয়।[২১৩] ১৩শ শতাব্দী থেকে টেমপ্লেট:Translit শব্দটির ব্যবহার ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় এবং এর স্থলাভিষিক্ত হয় টেমপ্লেট:Translit (κάτεργον, যার অর্থ 'সেবা বা সামরিক কাজে নিয়োজিত')। ১১শ শতাব্দীর শেষভাগের এই শব্দটি মূলত সেই সব ক্রুদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল যারা বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা দিতে আসা জনসংখ্যা থেকে সংগৃহীত হতো।[২১৪] বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের শেষ দিকে তাদের জাহাজগুলো পশ্চিমা মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হতো। এই সময়ে টেমপ্লেট:Translit শব্দটি বাইজেন্টাইন এবং লাতিন—উভয় ধরনের জাহাজের ক্ষেত্রেই নির্বিচারে ব্যবহৃত হতো। এছাড়া ঘোড়া বহনকারী বাইজেন্টাইন টেমপ্লেট:Translit-এর জায়গা দখল করে নেয় পশ্চিমা টেমপ্লেট:Translit (taride) (এটি মূলত আরবি শব্দ টেমপ্লেট:Translit থেকে এসেছে এবং গ্রিক ভাষায় টেমপ্লেট:Translit বা ταρέτα হিসেবে গৃহীত হয়েছিল)।[২১৫] সিসিলির অ্যাঞ্জভিন (Angevin) রাজবংশের ঐতিহাসিক উৎসগুলোতেও একই প্রক্রিয়া দেখা যায়। সেখানে দুটি শব্দের মধ্যেই কোনো নির্মাণগত পার্থক্যের উল্লেখ নেই; উভয়ই ২০ থেকে ৪০টি ঘোড়া বহন করতে সক্ষম জাহাজ (usserii) বোঝাতে ব্যবহৃত হতো।[২১৬] ইতালীয় ধাঁচের 'বাইরেম' গ্যালিগুলো ১৩শ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরীয় নৌবহরগুলোর মূল ভিত্তি ছিল। তবে এগুলোর নির্মাণশৈলী সম্পর্কে সমসাময়িক বর্ণনায় খুব কম তথ্যই পাওয়া যায়।[২১৭] সেই সময় থেকে গ্যালিগুলো সর্বজনীনভাবে 'ট্রাইরেম' বা তিন সারি দাঁড়যুক্ত জাহাজে পরিণত হয়; অর্থাৎ ডেকের ওপরের এক সারি অবস্থানে তিনজন মানুষ থাকত, যারা প্রত্যেকে আলাদা দাঁড় টানত। এই পদ্ধতিটিকে বলা হতো আল্লা সেনসিলে (alla sensile)।[২১৮][২১৯] ভেনিসীয়রা "মহা গ্যালি" (galea grossa) নামক আরও বড় আকারের গ্যালি উদ্ভাবন করেছিল, যা বাণিজ্যের জন্য অনেক বেশি পণ্য বহন করতে পারত।[২২০] এই সময়ে নির্দিষ্ট কোনো বাইজেন্টাইন জাহাজ সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। ১৪৩৭ সালে ফ্লোরেন্স কাউন্সিলে বাইজেন্টাইন প্রতিনিধি দলের সমুদ্রযাত্রার বিবরণ পাওয়া যায় বাইজেন্টাইন ধর্মযাজক সিলভেস্টার সিরোপুলোস এবং গ্রিক-ভেনিসীয় ক্যাপ্টেন মাইকেল অফ রোডস-এর লেখায়। সেখানে উল্লেখ আছে যে, অধিকাংশ জাহাজই ছিল ভেনিসীয় বা পোপের পাঠানো। তবে সম্রাট অষ্টম জন একটি "রাজকীয় জাহাজে" ভ্রমণ করেছিলেন বলেও উল্লেখ আছে। সেই জাহাজটি বাইজেন্টাইনদের নিজস্ব ছিল নাকি ভাড়া করা ছিল, তা স্পষ্ট নয় এবং এর ধরনও উল্লেখ করা হয়নি। তবে নথিতে বলা হয়েছে যে, জাহাজটি সাথে থাকা ভেনিসীয় বড় পণ্যবাহী গ্যালিগুলোর চেয়ে অনেক বেশি দ্রুতগামী ছিল। এটি সম্ভবত ইঙ্গিত দেয় যে সেটি ছিল একটি হালকা যুদ্ধ গ্যালি।[২২১] মাইকেল অফ রোডস জাহাজ নির্মাণ নিয়ে একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধও লিখেছিলেন, যেখানে ১৫শ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভেনিস এবং অন্যান্য সামুদ্রিক রাষ্ট্রগুলোর ব্যবহৃত প্রধান গ্যালি এবং পালতোলা জাহাজগুলোর নির্মাণ কৌশল ও চিত্র দেওয়া হয়েছিল।

বাইজেন্টাইন ইতিহাসে নৌবাহিনীর ভূমিকা

[সম্পাদনা]

ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রভাব

[সম্পাদনা]

বাইজেন্টাইন ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে তাদের নৌবাহিনীর গুরুত্ব মূল্যায়ন করা সহজ নয়। একদিক থেকে দেখলে, সাম্রাজ্যকে তার অস্তিত্বের পুরোটা সময় জুড়ে এক বিশাল উপকূলরেখা রক্ষা করতে হয়েছে। এর বিপরীতে অনেক সময়ই পর্যাপ্ত স্থলভূমি ছিল না। এছাড়া সবসময়ই নৌপথ ছিল দ্রুততম ও সস্তা পরিবহন মাধ্যম। সাম্রাজ্যের প্রধান নগরী, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং উর্বর অঞ্চলগুলোর অধিকাংশ ছিল সমুদ্রের কাছাকাছি।[২২২] এছাড়াও,৭ম থেকে ১০ম শতাব্দীতে আরবদের হুমকির বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় একটি শক্তিশালী নৌবহর রক্ষণাবেক্ষণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। আরবদের দুটি বিশাল অবরোধ থেকে কনস্টান্টিনোপলকে সফলভাবে রক্ষা করার ক্ষেত্রে নৌবাহিনীই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এ নৌবাহিনীই শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়। ১০ম শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত আরবদের সাথে যে নিরন্তর আক্রমণ ও পাল্টা-আক্রমণের খেলা চলেছিল তাতে নৌ-অভিযান ছিল বাইজেন্টাইন সামরিক প্রচেষ্টার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।[২২৩]

অন্যদিকে, সেই সময়ের সামুদ্রিক প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে বাইজেন্টাইন বা তাদের প্রতিপক্ষ—কেউই প্রকৃত থ্যালাসোক্রেসি অর্থাৎ নিরঙ্কুশ সমুদ্র-আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।[২২৪] গ্যালি নৌবহরগুলো মূলত উপকূলীয় অভিযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো স্বাধীন ভূমিকা পালন করতে পারত না। আরবদের বিরুদ্ধে বাইজেন্টাইনদের জয়-পরাজয়ের পর্যায়ক্রমিক ইতিহাস এটিই প্রমাণ করে যে, কোনো পক্ষই দীর্ঘস্থায়ী শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে পারেনি। যদিও বাইজেন্টাইনরা কিছু দর্শনীয় সাফল্য পেয়েছিল। এর মধ্যে ৮৮০ সালে নাসারের অসাধারণ রাত্রিকালীন বিজয় অন্যতম। কিন্তু, এই জয়গুলো আবার অনেক সময় বিপর্যয়কর পরাজয় দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে যায়।[২২৫] এছাড়া বাইজেন্টাইন নৌবহরে দাঁড়টানুনীদের বিদ্রোহের খবর থেকে বোঝা যায় যে, যুদ্ধের পরিস্থিতিতে নৌবাহিনী সামরিক নির্দেশিকার মতো আদর্শ অবস্থার মতো ছিল না।[২২৬] এর সাথে যুক্ত হয়েছিল আনাতোলিয়ার বিশাল ভূস্বামী ও উচ্চবিত্ত অভিজাতদের সেনাবাহিনী ও সিভিল প্রশাসনে চিরাচরিত প্রাধান্য। ফলে রোমান সাম্রাজ্যের মতোই বাইজেন্টাইন নৌবাহিনীকে তার স্বর্ণযুগেও মূলত স্থলবাহিনীর একটি 'সহায়ক অংশ' হিসেবে গণ্য করা হতো। রাজকীয় পদমর্যাদার ক্রমতালিকায় নৌ-অ্যাডমিরালদের তুলনামূলক নিম্ন অবস্থান থেকেই এই সত্যটি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।[২২৭][২২৮]

তা সত্ত্বেও এটি পরিষ্কার যে, ১০ম ও ১১শ শতাব্দীতে বাইজেন্টাইনদের নিজস্ব নৌ-শক্তির ক্রমাবনতি সাম্রাজ্যের ভাগ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলেছিল। এই সময়ে ইতালীয় শহর-রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে ভেনিস এবং পরে জেনোয়া, বাইজেন্টাইনদের ছাড়িয়ে যায়। চতুর্থ ক্রুসেডের সময় কনস্টান্টিনোপল লুণ্ঠন এবং বাইজেন্টাইন রাষ্ট্রের ভিত্তি চূর্ণ হওয়ার অন্যতম বড় কারণ ছিল সমুদ্রে সাম্রাজ্যের চরম নিরাপত্তাহীনতা।[২২৯] ৯ম শতাব্দীতে বাইজেন্টাইনরা পশ্চিমে নিজেদের নৌ-দুর্বলতা ঢাকতে ক্রমবর্ধমান হারে ইতালীয়দের নিয়োগ করা শুরু করে। এর মাধ্যমে খোদ বাইজেন্টাইনরাই সমুদ্রে সাম্রাজ্যের চরম নিরাপত্তাহীনতা প্রক্রিয়ার সূচনা করেছিল। ইতালীয় প্রজাতন্ত্রগুলো সাম্রাজ্য ও পশ্চিম ইউরোপের বাণিজ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের শক্তিশালী করে এবং বাইজেন্টাইন বণিকদের কোণঠাসা করে ফেলে, যা পরোক্ষভাবে বাইজেন্টাইন নৌ-শক্তির জনবল ও সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।[২৩০] সময়ের সাথে সাথে ইতালীয় প্রজাতন্ত্রগুলো বাইজেন্টাইন কক্ষপথ থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিজস্ব স্বার্থে চলতে শুরু করে। ১১শ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে তারা সাম্রাজ্যের রক্ষকের বদলে শোষক এবং কখনও কখনও সরাসরি লুটেরাতে পরিণত হয়। এর মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত বাইজেন্টাইনদের তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দাসে পরিণত করার পথ প্রশস্ত করে।[২৩১] কেকাউমেনোসের মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, একটি শক্তিশালী নৌবাহিনীর অভাব সেই সময়ে বাইজেন্টাইনরা কতটা তীব্রভাবে অনুভব করেছিল। ম্যানুয়েল কোমনেনোস বা অষ্টম মাইকেল পালাইওলোগোসের মতো শক্তিশালী সম্রাটরা নৌ-শক্তি পুনর্জীবিত করতে পারলেও, তারা কেবল এক ইতালীয় শক্তির (ভেনিস) বদলে অন্য শক্তির (জেনোয়া বা পিসান) ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ফলে বাণিজ্য সবসময়ই লাতিনদের হাতে থেকে যায়, লভ্যাংশ সাম্রাজ্যের বাইরে চলে যেতে থাকে এবং এই সম্রাটদের মৃত্যুর পর তাদের অর্জনগুলোও দ্রুত মিলিয়ে যায়।[২৩২] ১২০৪ সালের পর (অষ্টম মাইকেলের শাসনামলের সংক্ষিপ্ত ব্যতিক্রম ছাড়া), ছোট হয়ে আসা বাইজেন্টাইন নৌবাহিনীর ভাগ্য মূলত ইতালীয় সামুদ্রিক প্রজাতন্ত্রগুলোর সাথে পরিবর্তনশীল জোটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।[২৩৩]

বাইজেন্টাইন ইতিহাসের পুরো গতিপথ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, নৌবাহিনীর উত্থান-পতন সাম্রাজ্যের ভাগ্যের উত্থান-পতনেরই এক প্রতিচ্ছবি। এই পারস্পরিক সম্পর্কের দিকে লক্ষ্য রেখেই ফরাসি বাইজেন্টাইন বিশারদ লুই ব্রেইয়ার মন্তব্য করেছিলেন:

"বাইজেন্টাইন আধিপত্যের সেই যুগগুলোই ছিল স্বর্ণযুগ যখন সমুদ্র তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আর যখনই তারা সমুদ্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে, তখনই তাদের বিপর্যয় শুরু হয়েছে।"

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Verpeaux 1966, পৃ. 167।
  2. "Other Byzantine flags shown in the "Book of All Kingdoms" (14th century)"। Flags of the World। সংগ্রহের তারিখ ৭ আগস্ট ২০১০
  3. Treadgold 1998, পৃ. 67।
  4. Treadgold 1998, পৃ. 85।
  5. Lewis ও Runyan 1985, পৃ. 20।
  6. Scafuri 2002, পৃ. 1।
  7. Norwich 1990, পৃ. 48–49।
  8. Casson 1991, পৃ. 213।
  9. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 7।
  10. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 8।
  11. 1 2 3 Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 9।
  12. MacGeorge 2002, পৃ. 306–307।
  13. Norwich 1990, পৃ. 166।
  14. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 10।
  15. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 13।
  16. 1 2 3 4 Hocker 1995, পৃ. 90।
  17. Norwich 1990, পৃ. 207।
  18. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 14।
  19. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 14–15।
  20. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 15।
  21. Norwich 1990, পৃ. 77।
  22. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 17–18।
  23. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 19, 24।
  24. Norwich 1990, পৃ. 259–297।
  25. Campbell 1995, পৃ. 9–10।
  26. 1 2 Hocker 1995, পৃ. 91।
  27. Casson 1995, পৃ. 154।
  28. 1 2 Nicolle 1996, পৃ. 47।
  29. 1 2 Hocker 1995, পৃ. 98।
  30. Pryor 1988, পৃ. 62।
  31. Nicolle 1996, পৃ. 87।
  32. Turtledove 1982, পৃ. 53।
  33. 1 2 Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 25।
  34. Lewis ও Runyan 1985, পৃ. 24।
  35. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 26–27।
  36. Treadgold 1998, পৃ. 72।
  37. Lewis ও Runyan 1985, পৃ. 27।
  38. Norwich 1990, পৃ. 334।
  39. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 28।
  40. 1 2 3 4 5 Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 33।
  41. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 29–30।
  42. 1 2 Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 31।
  43. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 31–32।
  44. Norwich 1990, পৃ. 352–353।
  45. Treadgold 1997, পৃ. 349।
  46. Treadgold 1997, পৃ. 352।
  47. Lewis ও Runyan 1985, পৃ. 29।
  48. Bashear 1991
  49. Mango 2002, পৃ. 141।
  50. Runciman 1975, পৃ. 150।
  51. Jenkins 1987, পৃ. 192।
  52. 1 2 Runciman 1975, পৃ. 151।
  53. MacCormick 2002, পৃ. 413।
  54. Treadgold 1997, পৃ. 457।
  55. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 61।
  56. 1 2 3 Hocker 1995, পৃ. 92।
  57. Treadgold 1997, পৃ. 458।
  58. 1 2 Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 62।
  59. Scafuri 2002, পৃ. 49–50।
  60. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 64–65।
  61. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 65, 68।
  62. Treadgold 1998, পৃ. 33।
  63. MacCormick 2002, পৃ. 955।
  64. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 65–66।
  65. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 66।
  66. Treadgold 1997, পৃ. 463–464।
  67. 1 2 Tougher 1997, পৃ. 185–186।
  68. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 65।
  69. Tougher 1997, পৃ. 186–188।
  70. Christides 1981, পৃ. 82, 86–87।
  71. Tougher 1997, পৃ. 191।
  72. Christides 1981, পৃ. 93–94।
  73. Norwich 1999, পৃ. 120।
  74. Treadgold 1997, পৃ. 469–470।
  75. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 63।
  76. Christides 1981, পৃ. 94।
  77. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 64।
  78. 1 2 3 Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 72।
  79. MacCormick 2002, পৃ. 414।
  80. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 71।
  81. Halm 1996, পৃ. 404–405।
  82. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 74–75।
  83. Treadgold 1997, পৃ. 495।
  84. McMahon 2021, পৃ. 63-79।
  85. Norwich 1999, পৃ. 195।
  86. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 73।
  87. Hocker 1995, পৃ. 93।
  88. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 75–76।
  89. Treadgold 1997, পৃ. 509।
  90. 1 2 Kekaumenos ও Tsoungarakis 1996, Strategikon, Ch. 87।
  91. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 87–88।
  92. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 76–77, 89।
  93. Haldon 1999, পৃ. 90–91।
  94. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 88।
  95. Haldon 1999, পৃ. 91।
  96. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 91–93।
  97. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 94।
  98. Bréhier 2000, পৃ. 335।
  99. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 99।
  100. 1 2 Birkenmeier 2002, পৃ. 39।
  101. Nicol 1988, পৃ. 55–58।
  102. Nicol 1988, পৃ. 59–61।
  103. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 100।
  104. Nicol 1988, পৃ. 58।
  105. Pryor 1988, পৃ. 113।
  106. 1 2 Haldon 1999, পৃ. 96।
  107. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 109।
  108. Nicolle 2005, পৃ. 69।
  109. 1 2 3 Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 111।
  110. Treadgold 1997, পৃ. 631।
  111. Treadgold 1997, পৃ. 641।
  112. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 106–107, 111–112।
  113. Norwich 1996, পৃ. 98, 103।
  114. 1 2 Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 113।
  115. Treadgold 1997, পৃ. 643।
  116. Phillips 2004, পৃ. 158।
  117. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 112, 115।
  118. 1 2 Harris 2006, পৃ. 109।
  119. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 116।
  120. Magdalino 2002, পৃ. 97।
  121. Lilie 1994, পৃ. 215।
  122. Birkenmeier 2002, পৃ. 22।
  123. 1 2 3 Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 121।
  124. Harris 2006, পৃ. 128–130।
  125. Norwich 1996, পৃ. 151।
  126. Ahrweiler 1966, পৃ. 288–289।
  127. Ahrweiler 1966, পৃ. 289–290।
  128. Ahrweiler 1966, পৃ. 290–291।
  129. Ahrweiler 1966, পৃ. 293–294।
  130. Ahrweiler 1966, পৃ. 291–292।
  131. Ahrweiler 1966, পৃ. 294–296।
  132. Macrides 2007, পৃ. 168–169।
  133. Bryer 1966, পৃ. 4–5।
  134. 1 2 Nicol 1988, পৃ. 166, 171।
  135. Bartusis 1997, পৃ. 24।
  136. Nicol 1988, পৃ. 171–172।
  137. Bartusis 1997, পৃ. 39।
  138. Lane 1973, পৃ. 76।
  139. Geanakoplos 1959, পৃ. 127, 153–154।
  140. Bartusis 1997, পৃ. 59।
  141. Nicol 1993, পৃ. 59–60।
  142. Ahrweiler 1966, পৃ. 374–376।
  143. Laiou 1972, পৃ. 74–76, 114।
  144. Nicol 1988, পৃ. 246।
  145. Nicol 1993, পৃ. 158।
  146. Laiou 1972, পৃ. 75।
  147. Loenertz 1959, পৃ. 158–167।
  148. Ahrweiler 1966, পৃ. 375–378।
  149. Angelov 2007, পৃ. 175–176, 317।
  150. Laiou 1972, পৃ. 115।
  151. Ahrweiler 1966, পৃ. 380–381।
  152. Laiou 1972, পৃ. 164–166।
  153. Ahrweiler 1966, পৃ. 381–382।
  154. Ahrweiler 1966, পৃ. 382।
  155. Ahrweiler 1966, পৃ. 383।
  156. Nicol 1993, পৃ. 171।
  157. Ahrweiler 1966, পৃ. 383–384।
  158. Ahrweiler 1966, পৃ. 384।
  159. 1 2 Ahrweiler 1966, পৃ. 385।
  160. Nicol 1993, পৃ. 220–221।
  161. Bartusis 1997, পৃ. 98–99।
  162. Ahrweiler 1966, পৃ. 386–387।
  163. Bartusis 1997, পৃ. 219।
  164. Ahrweiler 1966, পৃ. 382, 387।
  165. Nicol 1993, পৃ. 236।
  166. Bartusis 1997, পৃ. 110।
  167. 1 2 Heath 1984, পৃ. 23।
  168. Norwich 1996, পৃ. 376–377।
  169. Kastritsis 2007, পৃ. 138, 146–147, 188।
  170. Kastritsis 2007, পৃ. 146–147।
  171. Kastritsis 2007, পৃ. 169।
  172. Setton 1978, পৃ. 18–19।
  173. Nicolle 2005, পৃ. 45।
  174. Bartusis 1997, পৃ. 132।
  175. Nicolle 2005, পৃ. 53–56।
  176. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 123–125।
  177. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 125–126।
  178. Pryor 1995a, পৃ. 102।
  179. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 166–169।
  180. Delgado 2011, পৃ. 188–191।
  181. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 127।
  182. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 138–140।
  183. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 145–147, 152।
  184. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 134–135।
  185. Casson 1995, পৃ. 243–245, Fig. 180–182।
  186. Basch 2001, পৃ. 57–64।
  187. Campbell 1995, পৃ. 8–11।
  188. Pomey 2006, পৃ. 326–329।
  189. Basch 2001, পৃ. 64।
  190. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 153–159।
  191. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 130–135।
  192. Pryor 1995a, পৃ. 103–104।
  193. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 232, 255, 276।
  194. Makrypoulias 1995, পৃ. 164–165।
  195. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 205, 291।
  196. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 238।
  197. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 215।
  198. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 203।
  199. Pryor 1995a, পৃ. 104।
  200. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 143–144।
  201. Delgado 2011, পৃ. 190–191।
  202. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 261–262।
  203. Makrypoulias 1995, পৃ. 165।
  204. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 190।
  205. Makrypoulias 1995, পৃ. 159–161।
  206. Pryor 2003, পৃ. 84।
  207. Pryor 1995a, পৃ. 108।
  208. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 305।
  209. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 166–169, 322–325, 449।
  210. Akkemik ও Kocabas 2014
  211. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 407–411।
  212. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 413–415।
  213. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 415–416।
  214. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 418–419।
  215. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 420।
  216. Pryor 1995a, পৃ. 115।
  217. Pryor 1995a, পৃ. 110–111।
  218. Pryor 1995a, পৃ. 116।
  219. Casson 1995, পৃ. 123।
  220. Casson 1995, পৃ. 123–124।
  221. Andriopoulou ও Kondyli 2008
  222. Mango 2002, পৃ. 197।
  223. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 386।
  224. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 388–390।
  225. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 385।
  226. Pryor ও Jeffreys 2006, পৃ. 385–386।
  227. Pryor 2003, পৃ. 103–104।
  228. Runciman 1975, পৃ. 149।
  229. Lewis ও Runyan 1985, পৃ. 38–39।
  230. Scafuri 2002, পৃ. 58–59, 61–63।
  231. Lane 1973, পৃ. 34।
  232. Lewis ও Runyan 1985, পৃ. 37।
  233. Bartusis 1997, পৃ. 10।

গ্রন্থপঞ্জি

[সম্পাদনা]
  • Ahrweiler, Hélène (1966), Byzance et la mer. La marine de guerre, la politique et les institutions maritimes de Byzance aux VIIe–XVe siècles (in French), Paris: Presses Universitaires de France
  • Akkemik, Ünal; Kocabas, Ufuk (January 2014). "Woods of byzantine trade ships of Yenikapi (Istanbul) and changes in wood use from 6th to 11th century". Mediterranean Archaeology and Archaeometry. 14 (2): 301–311 via ResearchGate.
  • Andriopoulou, Vera; Kondyli, Fotini (19 June 2008). "Ships on the Voyage from Constantinople to Venice" ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে. The Syropoulos Project. The Institute of Archaeology and Antiquity of the University of Birmingham. Retrieved 2009-03-09.
  • Angelov, Dimiter (2007), IImperial Ideology and Political Thought in Byzantium, 1204–1330, Cambridge University Press, ISBN <bdi>978-0-521-85703-1</bdi>
  • Bartusis, Mark C. (1997), The Late Byzantine Army: Arms and Society 1204–1453, University of Pennsylvania Press, ISBN <bdi>0-8122-1620-2</bdi>
  • Basch, Lucien (2001), "La voile latine, son origine, son évolution et ses parentés arabes", in Tzalas, H. (ed.), Tropis VI, 6th International Symposium on Ship Construction in Antiquity, Lamia 1996 proceedings (in French), Athens: Hellenic Institute for the Preservation of Nautical Tradition, pp. 55–85
  • Bashear, Suliman (1991), "Apocalyptic and Other Materials on Early Muslim-Byzantine Wars: A Review of Arabic Sources", Journal of the Royal Asiatic Society, 1 (2), Cambridge University Press: 173–207, doi:10.1017/S1356186300000572, JSTOR 25182323, S2CID 161589616
  • Birkenmeier, John W. (2002), The Development of the Komnenian Army: 1081–1180, Brill, ISBN <bdi>90-04-11710-5</bdi>
  • Bréhier, Louis (2000), Les institutions de l'empire byzantin (in French), Paris: Albin Michel, ISBN <bdi>978-2-226-04722-9</bdi>
  • Bryer, Anthony Applemore Mornington (1966), "Shipping in the empire of Trebizond", The Mariner's Mirror, 52: 3–12, doi:10.1080/00253359.1966.10659307
  • Bury, J. B. (1911). The Imperial Administrative System of the Ninth Century – With a Revised Text of the Kletorologion of Philotheos. London: Oxford University Press. OCLC 1046639111.
  • Campbell, I.C. (1995), "The Lateen Sail in World History" (PDF), Journal of World History, 6 (1): 1–23, archived from the original (PDF) on 2016-08-04, retrieved 2016-08-04
  • Casson, Lionel (1991), The Ancient Mariners: Seafarers and Sea Fighters of the Mediterranean in Ancient Times, Princeton University Press, ISBN <bdi>978-0-691-01477-7</bdi>
  • Casson, Lionel (1995), Ships and Seamanship in the Ancient World, Johns Hopkins University Press, ISBN <bdi>0-8018-5130-0</bdi>
  • Christides, Vassilios (1981), "The Raids of the Moslems of Crete in the Aegean Sea: Piracy and Conquest", Byzantion, 51: 76–111
  • Christides, Vassilios (1984), The Conquest of Crete by the Arabs (ca. 824): A Turning Point in the Struggle between Byzantium and Islam, Academy of Athens, OCLC 14344967
  • Cosentino, Salvatore (2008), "Constans II and the Byzantine navy", Byzantinische Zeitschrift, 100 (2): 577–603, doi:10.1515/BYZS.2008.577, ISSN 0007-7704, S2CID 192015598
  • Dawes, Elizabeth A., ed. (1928), The Alexiad, London: Routledge & Kegan Paul
  • Delgado, James P (2011), "Ships on Land", in Catsambis, Alexis; Ford, Ben; Hamilton, Donny L. (eds.), The Oxford Handbook of Maritime Archaeology, Oxford University Press, pp. 182–191, ISBN <bdi>978-0-19-537517-6</bdi>
  • Dolley, R. H. (1948), "The Warships of the Later Roman Empire", The Journal of Roman Studies, 38 (1–2), Society for the Promotion of Roman Studies: 47–53, doi:10.2307/298170, JSTOR 298170, S2CID 162710370
  • Dotson, John E. (1995). "Economics and Logistics of Galley Warfare". In Morrison, John S.; Gardiner, Robert (eds.). The Age of the Galley: Mediterranean Oared Vessels Since Pre-Classical Times. London: Conway Maritime Press. pp. 218–223. ISBN <bdi>0-85177-554-3</bdi>.
  • Dotson, John (2003), "Venice, Genoa and Control of the Seas in the Thirteenth and Fourteenth Centuries", in Hattendorf, John B.; Unger, Richard W. (eds.), War at Sea in the Middle Ages and the Renaissance, Boydell Press, pp. 109–136, ISBN <bdi>0-85115-903-6</bdi>
  • Failler, Albert (2003), "L'inscription de l'amiral dans la liste des dignités palatines", Revue des études byzantines (in French), 61: 229–239, doi:10.3406/rebyz.2003.2279, retrieved 29 May 2011
  • Geanakoplos, Deno John (1959). Emperor Michael Palaeologus and the West, 1258–1282: A Study in Byzantine-Latin Relations. Cambridge, Massachusetts: Harvard University Press. OCLC 1011763434.
  • Guilland, Rodolphe (1967). "Le Drongaire de la flotte, le Grand drongaire de la flotte, le Duc de la flotte, le Mégaduc". Recherches sur les institutions byzantines [Studies on the Byzantine Institutions]. Berliner byzantinische Arbeiten 35 (in French). Vol. I. Berlin and Amsterdam: Akademie-Verlag & Adolf M. Hakkert. pp. 535–562. OCLC 878894516.
  • Haldon, John (1999). Warfare, State and Society in the Byzantine World, 565–1204. London: UCL Press. ISBN <bdi>1-85728-495-X</bdi>.
  • Halm, Heinz (1996). The Empire of the Mahdi: The Rise of the Fatimids. Handbook of Oriental Studies. Vol. 26. Translated by Michael Bonner. Leiden: Brill. ISBN 9004100563.
  • Harris, Jonathan (2006), Byzantium and The Crusades, Hambledon & London, ISBN <bdi>978-1-85285-501-7</bdi>
  • Heath, Ian (1984), Armies of the Middle Ages, Volume 2: The Ottoman Empire, Eastern Europe and the Near East, 1300–1500, Wargames Research Group
  • Heath, Ian; McBride, Angus (1995), Byzantine Armies: AD 1118–1461, Osprey Publishing, ISBN <bdi>978-1-85532-347-6</bdi>
  • Ibn Khaldūn; Rosenthal, Franz (Ed. & Transl.) (1969), The Muqaddimah: An Introduction to History, Princeton University Press, ISBN <bdi>978-0-691-01754-9</bdi>
  • Jenkins, Romilly (1987), Byzantium: The Imperial Centuries, AD 610–1071, University of Toronto Press, ISBN <bdi>0-8020-6667-4</bdi>
  • Kastritsis, Dimitris (2007), The Sons of Bayezid: Empire Building and Representation in the Ottoman Civil War of 1402-13, Leiden and Boston: Brill, ISBN <bdi>978-90-04-15836-8</bdi>
  • Kazhdan, Alexander, ed. (1991). The Oxford Dictionary of Byzantium. Oxford and New York: Oxford University Press. ISBN <bdi>0-19-504652-8</bdi>.
  • Kekaumenos; Tsoungarakis, Dimitris (Ed. & Transl.) (1996), Στρατηγικὸν, Athens: Kanakis Editions, pp. 268–273, ISBN <bdi>960-7420-25-X</bdi>
  • Laiou, Angeliki E. (1972), Constantinople and the Latins: The Foreign Policy of Andronicus II, 1282–1328, Harvard University Press, ISBN <bdi>0-674-16535-7</bdi>
  • Lane, Frederic Chapin (1973), Venice, a Maritime Republic, Jons Hopkins University Press, ISBN <bdi>978-0-8018-1460-0</bdi>
  • Lewis, Archibald Ross; Runyan, Timothy J. (1985), European Naval and Maritime History, 300–1500, Indiana University Press, ISBN <bdi>0-253-20573-5</bdi>
  • Loenertz, Raymond-Joseph (1959), "Notes d'histoire et de chronologie byzantines", Revue des études byzantines (in French), 17: 158–167, doi:10.3406/rebyz.1959.1204
  • MacCormick, Michael (2002), Origins of the European Economy: Communications and Commerce, A.D. 300–900, Cambridge University Press, ISBN <bdi>978-0-521-66102-7</bdi>
  • MacGeorge, Penny (2002), "Appendix: Naval Power in the Fifth Century", Late Roman Warlords, Oxford University Press, ISBN <bdi>978-0-19-925244-2</bdi>
  • Macrides, Ruth (2007), George Akropolites: The History – Introduction, Translation and Commentary, Oxford University Press, ISBN <bdi>978-0-19-921067-1</bdi>
  • Magdalino, Paul (2002) [1993]. The Empire of Manuel I Komnenos, 1143–1180. Cambridge: Cambridge University Press. ISBN <bdi>0-521-52653-1</bdi>.
  • Makrypoulias, Christos G. (1995), "The Navy in the Works of Constantine Porphyrogenitus", Graeco-Arabica (6), Athens: 152–171
  • McMahon, Lucas (2021). "Logistical modelling of a sea-borne expedition in the Mediterranean: the case of the Byzantine invasion of Crete in AD 960". Mediterranean Historical Review. 36 (1): 63–94. doi:10.1080/09518967.2021.1900171. S2CID 235676141.
  • Mango, Cyril (2002), The Oxford History of Byzantium, Oxford University Press, ISBN <bdi>0-19-814098-3</bdi>
  • Nicol, Donald M. (1988). Byzantium and Venice: A Study in Diplomatic and Cultural Relations. Cambridge: Cambridge University Press. ISBN <bdi>0-521-34157-4</bdi>.
  • Nicol, Donald M. (1993). The Last Centuries of Byzantium, 1261–1453 (Second ed.). Cambridge: Cambridge University Press. ISBN <bdi>978-0-521-43991-6</bdi>.
  • Nicolle, David (1996), Medieval Warfare Source Book: Christian Europe and its Neighbours, Brockhampton Press, ISBN <bdi>1-86019-861-9</bdi>
  • Nicolle, David (2005), Constantinople 1453: The End of Byzantium, Praeger Publishers, ISBN <bdi>978-0-275-98856-2</bdi>
  • Norwich, John Julius (1990), Byzantium: The Early Centuries, Penguin Books, ISBN <bdi>978-0-14-011447-8</bdi>
  • Norwich, John Julius (1996), Byzantium: The Decline and Fall, Penguin Books, ISBN <bdi>978-0-14-011449-2</bdi>
  • Norwich, John Julius (1999), Byzantium: The Apogee, Penguin Books, ISBN <bdi>978-0-14-011448-5</bdi>
  • Pomey, Patrice (2006), "The Kelenderis Ship: A Lateen Sail", The International Journal of Nautical Archaeology, 35 (2): 326–329, Bibcode:2006IJNAr..35..326P, doi:10.1111/j.1095-9270.2006.00111.x, S2CID 162300888
  • Phillips, Jonathan (2004), The Fourth Crusade and the sack of Constantinople, Viking, ISBN <bdi>978-0-14-303590-9</bdi>
  • Pryor, John H. (1988), Geography, Technology, and War: Studies in the Maritime History of the Mediterranean, 649–1571, Cambridge University Press, ISBN <bdi>0-521-42892-0</bdi>
  • Pryor, John H. (1995). "From Dromōn to Galea: Mediterranean Bireme Galleys AD 500–1300". In Morrison, John S.; Gardiner, Robert (eds.). The Age of the Galley: Mediterranean Oared Vessels Since Pre-Classical Times. London: Conway Maritime Press. pp. 101–116. ISBN <bdi>0-85177-554-3</bdi>.
  • Pryor, John H. (1995). "The Geographical Conditions of Galley Navigation in the Mediterranean". In Morrison, John S.; Gardiner, Robert (eds.). The Age of the Galley: Mediterranean Oared Vessels Since Pre-Classical Times. London: Conway Maritime Press. pp. 206–217. ISBN <bdi>0-85177-554-3</bdi>.
  • Pryor, John H. (2003), "Byzantium and the Sea: Byzantine Fleets and the History of the Empire in the Age of the Macedonian Emperors, c. 900–1025 CE", in Hattendorf, John B.; Unger, Richard W. (eds.), War at Sea in the Middle Ages and the Renaissance, Boydell Press, pp. 83–104, ISBN <bdi>0-85115-903-6</bdi>
  • Pryor, John H.; Jeffreys, Elizabeth M. (2006), The Age of the ΔΡΟΜΩΝ: The Byzantine Navy ca. 500–1204, Brill Academic Publishers, ISBN <bdi>978-90-04-15197-0</bdi>
  • Pryor, John H. (2008). Kedar, Benjamin Z.; Riley-Smith, Jonathan S.C.; Phillips, Jonathan (eds.). "A View from the Masthead: The First Crusade from the Sea". Crusades. 7. Ashgate Publishing: 87–152. doi:10.1080/28327861.2008.12220214. ISSN 1476-5276.
  • Rankov, Boris (1995). "Fleets of the Early Roman Empire, 31 BC–AD 324". In Morrison, John S.; Gardiner, Robert (eds.). The Age of the Galley: Mediterranean Oared Vessels Since Pre-Classical Times. London: Conway Maritime Press. pp. 78–85. ISBN <bdi>0-85177-554-3</bdi>.
  • Runciman, Steven (1975), "Byzantine Civilisation", Nature, 134 (3395), Taylor & Francis: 795, Bibcode:1934Natur.134S.795., doi:10.1038/134795c0, ISBN <bdi>978-0-416-70380-1</bdi>, S2CID 4118229{{citation}}: CS1 maint: work parameter with ISBN (link)
  • Scafuri, Michael P. (2002), Byzantine Naval Power and Trade: The Collapse of the Western Frontier ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৩ মার্চ ২০১৬ তারিখে (PDF), Texas A & M University
  • Setton, Kenneth M. (1978). The Papacy and the Levant (1204–1571), Volume II: The Fifteenth Century. Philadelphia: The American Philosophical Society. ISBN <bdi>0-87169-127-2</bdi>.
  • Tougher, Shaun (1997), The Reign of Leo VI (886–912): Politics and People, Brill, ISBN <bdi>90-04-09777-5</bdi>
  • Treadgold, Warren (1997). A History of the Byzantine State and Society. Stanford, California: Stanford University Press. ISBN <bdi>0-8047-2630-2</bdi>.
  • Treadgold, Warren T. (1998), Byzantium and Its Army, 284–1081, Stanford University Press, ISBN <bdi>0-8047-3163-2</bdi>
  • Turtledove, Harry, ed. (1982), The chronicle of Theophanes: an English translation of anni mundi 6095–6305 (A.D. 602–813), University of Pennsylvania Press, ISBN <bdi>978-0-8122-1128-3</bdi>
  • Lilie, Ralph-Johannes (1994), Byzantium and the Crusader States: 1096–1204, Oxford University Press, ISBN <bdi>0-19-820407-8</bdi>
  • Verpeaux, Jean, ed. (1966). Pseudo-Kodinos, Traité des Offices (in French). Paris: Centre National de la Recherche Scientifique.
  • Ward-Perkins, Bryan (2005), The fall of Rome and the end of civilization, Oxford University Press, ISBN <bdi>978-0-19-280728-1</bdi>

আরও পড়ুন

[সম্পাদনা]