বাঙালি রন্ধনশৈলী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(বাংলার খাদ্য থেকে পুনর্নির্দেশিত)

বাঙালি রন্ধনশৈলী হচ্ছে বাঙালি জাতির ঐতিহ্যগতভাবে প্রাপ্ত এবং চর্চাকৃত রন্ধনপদ্ধতি । এ রান্না বাঙালি জাতির পছন্দ-অপছন্দ, জাতির ক্রমবর্ধমান ইতিহাস, অঞ্চলটির ভৌগলিক অবস্থান এবং আবহাওয়া দ্বারা প্রভাবিত । বঙ্গ অঞ্চলটি ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এবং বর্তমানে অঞ্চলটি পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ এ দুটি অঞ্চলে বিভক্ত ।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

প্রাচীন বাংলার রান্না[সম্পাদনা]

প্রাচীন বাংলার আহারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল ভাত, মাছ, মধু, দুধ এবং সবজি । বঙ্গ অঞ্চলটি প্রাচীন হিন্দুবৌদ্ধ রাজত্বের সময় দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক অঞ্চল ছিল; এবং পরবর্তীতে মুসলিম শাসন আমলেও । বাঙালি খাবারের বিভিন্নতা এবং বিচিত্র্তা ব্যাপক ও বিশাল । বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিবেশিত ও প্রস্তুতকৃত বিভিন্ন ধরনের খাবার ছাড়াও নিজের পরিবার অথবা আত্মীয়স্বজনদের জন্য বিভিন্ন ধরনের পানীয়, আচার, পিঠা ইত্যাদি তৈরি করা হয়ে থাকে ।

নবাবদের শাসন আমল[সম্পাদনা]

বিভিন্ন সময়ে বঙ্গদেশ মুসলিম নবাব ও সুলতানদের অধীনে শাসিত হয়েছে । ১৭১৭ সালে মোগল শাসন আমলে এ অঞ্চলের শাসনভার নবাব মুর্শিদ কুলী জাফর খান এর হাতে ন্যস্ত করা হয় । মোগলদের শাসন আমলে স্বাভাবিকভাবেই মোগল সংস্কৃতি এবং সাহিত্যের পাশাপাশি রন্ধণপ্রণালী এবং খাদ্যাভাসের প্রভাব এ অঞ্চলে বসবাসরত বাঙালিদের উপর পড়ে । বর্তমান সময়েও বিভিন্ন মোগলাই খাবার যেমন: বাকরখানি, মোগলাই পরোটা, কাবাব, হালুয়া, বিরিয়ানী ইত্যাদি বাংলাদেশপশ্চিমবঙ্গ উভয় স্থানেই ব্যাপক জনপ্রিয় ।

ক্রিশ্চিয়ান এবং অন্যান্য ইউরোপীয় সংস্কৃতির প্রভাব[সম্পাদনা]

চা এবং বিভিন্ন ফাস্টফুড জাতীয় খাবার, যা এখন এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বহুল প্রচলিত এবং জনপ্রিয় খাবার, সেগুলো মূলত ক্রিশ্চিয়ান এবং অন্যান্য ইউরোপীয় কালচার তথা খাদ্যাভাসের সুস্পষ্ট প্রভাব । কলকাতায় ইহুদীদের বৃহৎ বেকারী যদিও আগের মত চলে না,[১] তথাপি এর প্রভাব সারা বঙ্গদেশেই পরিলক্ষিত হয় ।

বিধবা মহিলা রীতির প্রভাব[সম্পাদনা]

বঙ্গ অঞ্চলে বিধবা মহিলাদের উপর সবসময়ই কঠোর নীতি চালু ছিলো । যদিও ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা রোধ ও ১৮৫৬ সালে হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন এর মাধ্যমে এর অনেকটাই রোধ করা গেছে, তবুও কিছু কিছু সামাজিক আচার এখনও চালু রয়েছে [২]। বাল্য বিবাহ [৩] এবং কম গড় আয়ুর ফলসরূপ অনেক মহিলাই বিধবাতে পরিণত হয়- প্রায় ২৫ শতাংশ পরিবারে একজন বিধবা মহিলা রয়েছে, যারা বাড়ির ভিতরেই আবদ্ধ থাকে এবং রান্নাবান্নার কাজেই অধিক সময় ব্যয় করে থাকে ।[৪] যদিও অধিকাংশ বাঙালি সম্প্রদায়ই মাছ মাংস খেতে পারত, বিধবা মহিলাদের জন্য এটা ছিল নিষিদ্ধ ।[৬] এ কারনেই বিধবা মহিলাদের শুধুমাত্র নিরামিষ আহারের উপর নির্ভর করে নিরামিষ খাবার রান্নার এক বৃহৎ খাদ্য রেসিপি গড়ে উঠেছে । এ সম্পর্কে একজন বাঙালি লেখিকা চিত্রিতা ব্যানার্জী তার বইতে উল্লেখ করেন ।[৫]

রন্ধনপদ্ধতি এবং ব্যবহৃত দ্রব্যাদি[সম্পাদনা]

বাঙালি খাবার রান্নার ক্ষেত্রে প্রধানত সরিষার তেল এবং সয়াবিন তেল ব্যবহৃত হয়ে থাকে । রান্নার ক্ষেত্রে প্রচলিত দ্রব্যাদি ও মশলা হচ্ছে হলুদ, মরিচ, আদা, রসুন, পেয়াজ, জিরা, লবঙ্গ, এলাচ, দারুচিনি ইত্যাদি ।

আহারপদ্ধতি[সম্পাদনা]

দৈনন্দিন আহারের ক্ষেত্রে সাধারনত প্রতিবেলার খাবার পৃথকভাবে কিছু ভাত অথবা রুটিসহ প্রস্তুতকৃত তরকারির সাথে ভোজন করা হয়ে থাকে ।

খাবারের প্রধান প্রধান পদসমূহ[সম্পাদনা]

দৈনন্দিন আহারের ক্ষেত্রে ভাত, ডাল, ভর্তা, ভাজা, মাছ ভাজা, মাছের তরকারি, সবজি, মাংস, ভূনা খিচুরি, পোলাও, রুটি, পরোটা, সেমাই, পায়েস ইত্যাদি প্রধান পদ হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে । বাঙালির প্রধান খাদ্য হচ্ছে ভাত। অর্থাৎ চাল থেকে প্রস্তুতকৃত ভাত ও ভাতজাতীয় খাদ্য বাঙালির খাদ্যতালিকায় মৌলিক চাহিদার স্থান দখল করেছে বলা যায়। চালকে সিদ্ধ করে তৈরি করা ভাত বাঙালি দৈনিক দুই কি তিনবেলা খেয়ে থাকে।

সাধারণ খাদ্য[সম্পাদনা]

শুঁটকি[সম্পাদনা]

চ্যাপা[সম্পাদনা]

চ্যাপা হলো পুটিঁ মাছের শুটকি। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে যেসকল মাছের শুটকি করা হয় তার মধ্যে পুঁটি মাছ অন্যতম। পুঁটি মাছ ধরার পর ভুঁড়ি ফেলে দিয়ে মাছের তেল দিয়ে মাছ মেখে একটু রোদে শুকিয়ে মটকায় ভরে বায়ুরোধী করে মাটিতে পুঁতে রেখে ৪/৫ মাস পর মাটির নিচ থেকে উঠিয়ে ঢাকনা খুলে স্তরে স্তরে সাজানো পুটিমাছ বের করে বাজারে বিক্রি করা হয়। ঝাল কাঁচা মরিচ বেশি দিয়ে রসুন-পেঁয়াজসহ ভালোভাবে হাত দিয়ে মিহি করে সাবধানে মেখে গরম ও নরম আঠালো ভাত দিয়ে খাওয়া হয়। চ্যাপা শুটকির রান্না তীব্র গন্ধপ্রদ। এই শুঁটকি বিভিন্ন অঞ্চলে চাপা শুঁটকি নামেও পরিচিত।

খাদ্য অনুষঙ্গ[সম্পাদনা]

চটকদার খাদ্য[সম্পাদনা]

বাঙালি সমাজে এমন অনেক খাদ্য প্রচলিত আছে, যেগুলো পুষ্টিগুণ বিবেচনায় ঠিক গ্রহণযোগ্য মাত্রার নয়, কিন্তু তবুও খাদ্য হিসেবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশ আদৃত। এসকল খাদ্যকে একত্রে চটকদার খাদ্যের তালিকায় একত্রিত করা যায়:

চানাচুর[সম্পাদনা]

চানাচুর
মূল নিবন্ধ: চানাচুর

চানাচুর একপ্রকার ভাজা ঝাল খাবার। মুলত এটি ছোলার বা অড়হড় ডালের মিহি গুড়া থেকে তৈরি হয়। কখনও কখনও চানাচুর ঘি দিয়েও ভাজা হয়ে থাকে। এর সাথে যোগ করা হয় বিভিন্ন প্রকারের মশলা। দক্ষিণ এশীয়দের কাছে অসম্ভব জনপ্রিয় একটি নাস্তা। যেকোনো আড্ডা চানাচুর ছাড়া যেন চিন্তাও করা যায় না। চানাচুর বাঙালি সমাজে এতোটাই আদৃত যে, অধুনা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বাণিজ্যিকভাবে চানাচুর উৎপাদন ও বিক্রয় করে থাকে এমনকি বহির্বিশ্বের বাঙালি সমাজে চানাচুর রপ্তানিও করা হয়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

মুড়ির মোয়া[সম্পাদনা]

মুড়ি এবং গুড়কে একসাথে জ্বাল দিয়ে গোল পাকিয়ে মোয়া নামক এজাতীয় মিষ্টি তৈরি করা হয়। তবে কখনও কখনও খই বা মুড়কি দিয়েও মোয়া তৈরি হয়। ভারতের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের জয়নগরের মোয়া খুবই বিখ্যাত।

ঘুঘনী[সম্পাদনা]

ঘুঘনী একটি বিশেষ ধরনের ছোলা ভুনা। তবে এতে একটু বেশি গরম মশলা এবং সুগন্ধী চাল মেশানো হয়।

নাড়ু[সম্পাদনা]

নাড়ু সাধারণত নারকেল এবং গুড় একত্রে জ্বাল দিয়ে গোল পাকিয়ে তৈরি করা হয়। যেমন তিলের নাড়ু। চিনি সহযোগে গোল পাকিয়েও নাড়ু তৈরি করা হয়। তবে নারকেল ও চিনি জ্বাল দিয়ে তাকে ক্ষীর দিয়ে পাকিয়ে যে নাড়ু তৈরি করা হয় তাকে বাঙালিরা রসকরা বলে। এটি নারকেলের নাড়ুর থেকে তুলনামূলক ভাবে নরম হয়। প্রত্যেক বাঙালি বাড়িতেই নাড়ু তৈরি হয়। বিশেষত বিজয়া দশমীর পর বাড়িতে আগত আত্মীয়-পরিজনকে নাড়ু, মোয়া, মিষ্টান্ন পরিবেশন করে বাঙালিরা সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়।

মোরব্বা[সম্পাদনা]

মোরব্বা হলো খুব ঘন চিনির রসে ডোবানো একপ্রকার মিষ্টান্ন যা সাধারণত কোনো সবজিকে বিশেষভাবে জারিত করে প্রস্তুত হয়। যেমন: পেঁপের মোরব্বা, কুমড়োর মোরব্বা, পটলের মোরব্বা, শতমূলীর মোরব্বা ইত্যাদি।

আঞ্চলিক খাদ্য[সম্পাদনা]

অঞ্চলভেদে স্থানভিত্তিক কিছু কিছু খাদ্য বাঙালির কাছে পরিচিত এবং তা ঐ অঞ্চলের ঐতিহ্যেরও একটা অংশ। এরকম কিছু খাদ্যের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নিম্নে তুলে ধরা হলো:

সিদল ভর্তা[সম্পাদনা]

সিদল বা বাংগালি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের, বিশেষ করে গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাটরংপুর অঞ্চলে বিশেষ পছন্দনীয় খাবারবর্ষা মৌসুমে টাকিমাছকচু ঢেঁকি বা সামগাইন দ্বারা একত্রে মিশিয়ে মুঠা বা চাকার মতো করে তৈরি করা হয় বাংগালি, তারপর তা শুকিয়ে তাওয়ায় ভেজে তেল, মরিচ, আদা, রসুন, এবং পেঁয়াজ একত্রে পিষে খাওয়া হয়।

মিষ্টান্ন[সম্পাদনা]

বাঙালিদের তৈরিকৃত মিষ্টান্ন গর্ববোধ করার মত । ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন তৈরি এবং উদ্ভাবনে বাঙালিরাই অগ্রদূত ।[৬] রসগোল্লা, পানতোয়া,[৭] কালোজাম, সন্দেশ, নাড়ু, চমচম, গজা, ক্ষীর, পায়েস, সেমাই, দই ইত্যাদি বাঙালিদের দ্বারা প্রস্তুতকৃত এবং জনপ্রিয় মিষ্টান্ন ।

এছাড়াও বাঙালি খাবারের অন্তর্ভূক্ত রয়েছে বিভিন্ন ধরনের পানীয় যেমন সরবত, আখের রস, মালাই, লাচ্ছি, ফালুদা, বোরহানী, ঘোল, বেলের সরবত, চা, কফি ইত্যাদি ।

জনপ্রিয় মাধ্যমে উপস্থাপনা[সম্পাদনা]

বাঙালির খাদ্যপ্রীতির উপস্থিতি রয়েছে বাঙালির গণমাধ্যমগুলোতেও। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে বাংলার খাদ্য বিষয়ে আলাদা অনুষ্ঠান না হলেও রান্না বিষয়ক অনুষ্ঠানগুলোর প্রায় সিংহভাগ জুড়ে থাকে বাংলার বিভিন্ন খাদ্য। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে ভারতের স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল স্টার প্লাস-এ শুরু হওয়া মাস্টার শেফ ইন্ডিয়া অনুষ্ঠানেও বাংলার বিভিন্ন খাদ্য তৈরিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এছাড়াও ডিসকভারি নেটওয়ার্ক-এর স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল ট্র্যাভেল এ্যান্ড লিভিং-এর ভারতীয় চ্যানেলে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয় বাংলার বিভিন্ন খাদ্যকে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Among the last Jews of Kolkata"। khabar.com। সংগৃহীত ৫ অক্টোবর ২০১৬ 
  2. Mahapatra, Dhananjay (১ মে ২০১০)। "Status of widows worst in West Bengal: NCW"The Times of India। সংগৃহীত ৫ অক্টোবর ২০১৬ 
  3. "Every second girl is a child bride in West Bengal"The Hindu। ১০ সেপ্টেম্বর ২০১১। সংগৃহীত ৫ অক্টোবর ২০১৬ 
  4. Nair, Rukmini। "Are we what we eat?"। সংগৃহীত ৫ অক্টোবর ২০১৬ 
  5. Banerji, Chitrita (১৯৯৭)। Bengali Cooking: Seasons and Festivals। Serif। পৃ: ২০১। আইএসবিএন 978-1-897959-50-3। সংগৃহীত "৫ অক্টোবর ২০১৬" 
  6. "The Origin of Rossogolla"। Rossogolla। সংগৃহীত ৫ অক্টোবর ২০১৬ 
  7. "History Of Rasgulla"। সংগৃহীত ৫ অক্টোবর ২০১৬