বাংলাদেশে জেন্ডারভিত্তিক অসমতা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

নারী হলো পৃথিবীর অর্ধেক জনসমষ্টি। সভ্যতা সৃষ্টির লগ্ন থেকেই পৃথিবীর কল্যাণে নারীর অবদান অনঃস্বীকার্য। একজন নারী শুধুমাত্র কারো মা, বোন বা স্ত্রীই নয় বরং ধৈর্য্য , সংগ্রাম, সাহস, দৃঢ়তা ইত্যাদি বিশেষনের অন্যরূপ। নারীর হাত ধরেই হাজার হাজার বছর ধরে এ সভ্যতা গড়ে উঠেছে। তাই নারীকে অবহেলা করে কখনো উন্নতির নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। আধুনিক সমাজে নারী পুরুষ সকলেরই মৌলিক অধিকার এক ও অভিন্ন – এ কথাটি বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু নারীরা এখনো অনেকাংশেই পুরুষদের তুলনায় পিছিয়ে। সৃষ্টিলগ্ন থেকেই এ সমাজে নারী-পুরুষের বৈষম্য বিরাজমান। এ বৈষম্য বিধাতা প্রদত্ত নয়। বরং তার সৃষ্টির দ্বারা সৃষ্ট এ বৈষম্য। জন্ম থেকেই একটি কন্যা শিশু বড় হওয়ার সাথে সাথে নানা ক্ষেত্রে তার বৈষম্যের ফর্দটাও বড় হতে থাকে। সভ্যতা বিকাশে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অবদান দৃশ্যমান কখনও বা মায়ের রূপে, কখনও বা বোনের রূপে, কখনও বা মেয়ের রূপে আর কখনও বা স্ত্রীর রূপে। শিশুকাল থেকেই নারীরা সকল ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়ে চলেছে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এখনো নারীদেরকে পুরুষের অধস্তন করে রাখে। সকলক্ষেত্রে পুরুষ নারীর উপর তার আধিপত্ত বিস্তার করে। ফলে দক্ষ ও মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও নারীরা বঞ্চিত হয়। অনেক চেষ্টার পর এ অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হলেও অধিকাংশ স্থানে নারী –পুরুষের বৈষম্য কমেনি। নারীর প্রতি এ বৈষম্য দূরীকরণে প্রয়োজন - নারী শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার নিরসন, কর্মক্ষেত্রে নারী পুরুষ উভয়ের অন্তর্ভূক্তি ইত্যাদি। তাহলে সমাজের প্রতিটি স্তরে এমন এক পরিস্থিতি বজায় থাকবে যেখানে নারী আপন মহিমায় স্বাধীনতা এবং মর্যাদার অধিকারী হয়ে উঠবে এবং নারী –পুরুষে থাকবে না কোনো ভেদাভেদ।

শিক্ষাক্ষেত্রে অসমতা[সম্পাদনা]

বর্তমানে সারা বিশ্বে  যে বিষয় গুলো আলোচনায় ঝড় তুলেছে নারী শিক্ষা তার মধ্যে অন্যতম। নারী শিক্ষার বিষয়টি আমাদের সামাজিক অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে অপরিহার্যভাবে জড়িত। “নেপোলিয়ন বোনাপার্ট” বলেছেন,

“আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি শিক্ষিত জাতি দিব”

এ উক্তি থেকে বোঝাই যাচ্ছে নারী শিক্ষার গুরুত্ব কতটুকু। একটি শিশু জন্মের পর থেকে বেশিরভাগ সময় তার মায়ের সংস্পর্শে থাকে। একজন মা যদি শিক্ষিত হন, তিনি তার সন্তানদেরকেও শিক্ষিত করে তুলতে পারেন। এজন্য আরবিতে একটি প্রবাদ আছে

“একজন পুরুষ মানুষকে শিক্ষা দেওয়া মানে একজন ব্যক্তিকে শিক্ষিত করে তোলা আর একজন নারীকে শিক্ষা দেওয়া মানে একটি গোটা পরিবারকে শিক্ষিত করে তোলা।”

নারী শিক্ষার গুরুত্ব বর্ণনাতীত। কিন্তু নারী শিক্ষার এতো প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা সত্ত্বেও প্রশ্ন থেকেই যায়, নারী শিক্ষা কী সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়েছে?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বলা যেতে পারে যে, এ দেশের অনেক নারীরা এখনো শিক্ষার আলো পায়নি। হয়তো তাদের সে সুযোগই হয়ে ওঠেনি। কেবলমাত্র শিক্ষার মাধ্যমেই নারীরা এগিয়ে যেতে পারবে। এটি নারী উন্নয়নের প্রাথমিক উপাদান। একজন শিক্ষিত নারী তার নিজের অধিকার, স্বাস্থ্য, পরিবার সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু নারী শিক্ষার প্রসারে প্রধান অন্তরায় হলো সচেতনতার অভাব। সাধারণ মানুষ ছেলেদের তুলনায় মেয়েদেরকে শিক্ষাদানে ইচ্ছুক নয়। তাদের মতে মেয়েদেরকে শুধু রান্নাঘর রক্ষণাবেক্ষণ এবং ঘরের কাজ শেখাতে হবে। কিন্তু তারা অবগত নন যে শিক্ষা জীবনের সকল স্তরেই প্রয়োজন। শিক্ষা শুধুমাত্র চাকরি পাওয়ার জন্যই নয়, উন্নত মানুষ হবার জন্য প্রয়োজন। এজন্য নারী শিক্ষার প্রসারে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। এছাড়া একশ্রেনির মানুষ ধর্মীয় অজুহাত দেখিয়ে নারীদেরকে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত  করেছে।  কিন্তু কোনো ধর্মেই নারীদেরকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখার কথা বলা হয়নি। তাই ভ্রান্ত ধারণা ভুলে নারীদেরকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করতে হবে। প্রত্যন্ত এবং মফস্বল অঞ্চলে নারীশিক্ষা সম্বন্ধে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। শিক্ষার মান বাড়াতে হবে এবং নারীর প্রতি জনসাধারনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। আর এ জন্য নারীকেও এগিয়ে আসতে হবে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের সহায়তায় আমরা লাভ করব একটি শিক্ষিত নারী জাতি। অবশ্য আজকাল এদেশের শিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে নারীরা। প্রতিবছর পাসের হার ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের বেশি থাকছে। মেয়েদের ঝরে পড়ার হার কমে যাচ্ছে । এভাবে চলতে  থাকলে সেই সময় বেশি দুরে নয় যখন বাংলাদেশ হবে শতভাগ শিক্ষিত নারীর দেশ।

কর্মক্ষেত্রে অসমতা[সম্পাদনা]

একজন নারীর জীবনের প্রতিটি স্তরে রয়েছে প্রতিবন্ধকতার ইতিহাস। শতবাঁধা পেরিয়ে যখন কোনো নারী স্বাবলম্বী হয়ে কোনো কর্মক্ষেত্রে ভালো ফলাফল করে, সেখানেও সে শিকার হয় বৈষম্যের, অধিকাংশ কোম্পানিতেই নারীদের তুলনায় পুরুষদের বেতন বেশি। ফলে হাঁড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করা সত্ত্বেও শুধুমাত্র নারী হওয়ার জন্য তারা কম পারিশ্রমিক পান। নারীদেরকে মাসসিকভাবেও ছেলেদের চেয়ে দূর্বল ভাবা হয়। ফলে মেধাবী হওয়ার পরও তারা তার যথাযথ মূল্যায়ন পায় না।

এছাড়া যেকোনো কর্মকান্ডেই নারীর আগে একজন পুরুষকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। একজন নারীকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য স্বাবলম্বী হতে হবে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায়  নারীরা অর্থনৈতিকভাবে পুরুষের ওপর নির্ভরশীল। এজন্য নারীর কর্মসংস্থান অতীব জরুরী। একটি ভাল কর্মসংস্থান একজন নারীকে আর্থিক নিরাপত্তা দেয়। বর্তমানে সরকার নারীদের জন্য চাকুরী প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোটা সংরক্ষনের ব্যবস্থা করেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে 60% নারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। যা নারীর কর্মসংস্থানের এক বিরাট সুযোগ করে দিয়েছে। এছাড়া এমন কিছু কিছু পদই আছে যা শুধুমাত্র নারীদের জন্য সংরক্ষিত। কিন্তু এতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্রে নারীর যোগদান বাড়ছে না। এর কারণ দেশে শিক্ষিত নারীর সংখ্যা মাত্র 26 শতাংশ। সামাজিক প্রতিবন্ধকতা নারী-পুরুষ বৈষম্য, আর্থিক সমস্যা ইত্যাদি পেরিয়ে খুব কম সংখ্যক নারীই নিজের পায়ে দাড়াতে পারছে। এছাড়া অধিকাংশ মেয়েদেরই অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। ফলে তারা সংসার চালানোর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে যোগদান করতে পারছে না। তবুও জীবিকার টানে বা অদম্য মানসিকতার পরিচয় অনেক নারী কর্মক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে।

পারিবারিক অসমতা[সম্পাদনা]

একটি শিশুর বেড়ে ওঠার সর্ব প্রথম স্থান তার পরিবার। কিন্তু পরিবার থেকেই ছেলে মেয়ের বৈষম্য শুরু হয়। কিছু কিছু পরিবারে তো মেয়েদেরকে ঘরের বাইরেই যেতে দেওয়া হয় না। তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। আবার ছেলেদেরকে বেশি স্বাধীনতাও দেওয়া হয়। ছেলেদের সুবিধার দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়। এভাবে পরিবার থেকেই নারীরা – নারী বৈষম্যের শিকার হতে থাকে। ফলে সর্বোচ্চ আশ্রয়টিই হয়ে ওঠে তার বৈষম্যের আঁতুড়ঘর।

সামাজিক অসমতা[সম্পাদনা]

সমাজে তথাকথিত রক্ষনশীল মনোভাবাপন্ন কিছু লোক নারীকে সর্বক্ষেত্রে অবদমিত করে রাখতে চায়। ধর্মের অজুহাত দেখিয়ে তারা নারীকে এগিয়ে যেতে বাধা দেয়। কুসংষ্কারাচ্ছন্ন নিয়মের জালে আবদ্ধ হয় নারী। ফলে তাকে কাটাতে হয় অন্ধকার জগতের এক বন্দী জীবন। বর্তমানে শহরে এ অবস্থার অনেকটা পরিবর্তন হলেও গ্রামে ও মফস্বল অঞ্চলে এ ধারণা এখনো বিরাজমান। অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সমাজে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। নারীরা শিকার হচ্ছে যৌতুক, এসিড নিক্ষেপ, ধর্ষন, অপহরণ ইত্যাদি ঘৃণ্য অপরাধের। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিচার হলেও বেশিরভাগ অপরাধীই আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যায়। সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে মুসলিম নারী পুরুষের অর্ধেক পায়, আর হিন্দু নারীরা তো কিছুই পায় না। তাই ধর্মের দোহাই দিয়ে তথাকথিত রক্ষণশীলদের যে ফতোয়াবাজি তা বন্ধ করতে হবে। এঙ্গোলস তার “অরিজিন অব দ্যা ফ্যামিলি গ্রন্থে বলেছেন,

“নারী মুক্তি তখনিই সম্ভব যখন নারীরা সমাজের প্রতিটি কর্মকান্ডে সমগুরুত্বে নিয়ে অংশগ্রহন করবে।”

তাই সমাজে একজন নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে হবে। নারী-পুরুষ উভয়ের সমান অন্তর্ভূক্তিতেই উন্নয়নের দেখা পাওয়া যাবে।

সাফল্য[সম্পাদনা]

এতো কিছুর পরও নারীরা এগিয়ে যাছ্ছে। কিছু কিছু নারীর সাফল্য দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষদের চেয়েও এগিয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের মেয়েরা ক্রীড়াঙ্গনে অনেক সাফল্য বয়ে এনেছে। বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল এশিয়া কাপ জিতেছে  যেখানে ছেলেদের দল এখনো এশিয়া কাপ বা কোনো বড় আসরে জয়ী হতে পারেনি। এছাড়া নারী ফুটবলাররাও পুরুষদের তুলনায় অধিক এগিয়ে।  নারী ভারোত্তোরকেরাও পুরুষদের তুলনায় বেশি পদকধারী। এছাড়া এদেশে প্রধানমন্ত্রী একজন নারী। বহুদিন ধরে বিরোধদেলীয় নেত্রীও ছিলেন একজন নারী। প্রধান স্পিকার  একজন নারী। যে দেশের নারীরা রাজনৈতিকভাবে এতো সক্রিয় সেই দেশকে তো এগিয়ে যেতেই হবে। এদেশের নারীরা এভারেস্ট পর্যন্ত জয় করে ফেলেছে। কিছু কিছু নারী বিদেশে উন্নতি করছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ঝন্ডা বয়ে বেড়াচ্ছে একজন নারী। এভাবে নারীরা এগিয়ে চলেছে দূর্বার গতিতে। যেন কোনো অপশক্তিই এই গতিকে রুখতে না পারে।

নারী- পুরুষের বৈষম্যের বীজ মানুষের মস্তিষ্কে আদিকাল থেকেই বপন করা হয়েছে। সে বীজ উপড়ে ফেলতে আরো অনেকদিন লাগবে। সময় এসেছে নারীদের আরও এগিয়ে যাওয়ার। নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে হবে। নারীকে অবহেলিত রেখে সমাজ কখনো এগিয়ে যেতে পারে না। পুরুষদের সাফল্যের পেছনেও রয়েছে নারীর অবদান। এজন্য নারীর চিন্তাশক্তি, দূরদৃষ্টি ও মেধা ব্যবহার করে এগিয়ে যেতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও নারীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে গিয়েছে। যুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু অধিকাংশ নারীরা তাদের নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের দেশ গঠন করছে এবং বলিষ্ঠ ও শিক্ষিত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলছে। নারীরা দেশকে ভালোবাসেন, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে জানেন, উন্নয়ন প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে পারেন, তারাই আমাদেরকে সহায়তা করতে পারেন একটি শিক্ষিত প্রজন্ম গঠনে। নারীরা হচ্ছে দেশের আত্মা ও শক্তি। নারীর স্নেহ মমতা ছাড়া কোনো পুরুষও বেঁচে থাকতে পারে না। পৃথিবীর পুরুষেরা আসেন অপূর্ণ হয়ে। মা বা স্ত্রীর  ভালোবাসা তাকে পূর্ণতা দান করে। নারীরা বাংলাদেশের মূল সংস্কৃতিকে ধারণ করে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিল্পখাত পোশাকশিল্পে নারীর অবদান অভাবনীয়। পোশাকশিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মূলত নারীরা। এত পরিশ্রমের পরও নারীদের চাওয়া- পাওয়া অতি সামান্য। তারা শুধূ চান আরেকটু ভালোভাবে বেঁচে থাকতে। একটুখানি সম্মান পেতে। এভাবেই নারীরা এগিয়ে যাবে। তাদের ভবিষ্যৎ হয়ে উঠুক কন্টকহীন।