বিষয়বস্তুতে চলুন

বর্বর রাজ্যসমূহ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
৪৭৬ সাধারণ অব্দে ইউরোপ মহাদেশ, উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র; যেখানে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অবশিষ্ট পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য এবং পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের প্রাক্তন অঞ্চলগুলোতে নতুন বারবারিয়ান রাজ্যগুলো দেখানো হয়েছে।

বারবারিয়ান রাজ্যসমূহ ছিল এমন কিছু রাষ্ট্র, যা পঞ্চম শতাব্দীতে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর পশ্চিম ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকায় বিভিন্ন অ-রোমান (মূলত জার্মানীয়) জাতিগোষ্ঠী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[] বারবারিয়ান রাজ্যগুলো ছিল প্রাক-মধ্যযুগে পশ্চিম ইউরোপের প্রধান শাসনব্যবস্থা। ৮০০ সালে সম্রাট হিসেবে শার্লেমেনের রাজ্যাভিষেকের মাধ্যমে বারবারিয়ান রাজ্যগুলোর যুগের অবসান ঘটেছে বলে মনে করা হয়, যদিও কিছু ক্ষুদ্র অ্যাংলো-স্যাক্সন রাজ্য ৮৮৬ সালে মহা আলফ্রেড কর্তৃক একীভূত হওয়ার আগে পর্যন্ত টিকে ছিল।[]

ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বারবারিয়ান রাজ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে হিস্পানিয়ার ভিসিগোথিক রাজ্য, গ্যালিয়ার ফ্রাঙ্কিশ রাজ্য, হেপ্টার্কি গঠনকারী ৭টি রাজ্য, ইতালির অস্ট্রোগথিক রাজ্যলম্বার্ড রাজ্য, গ্যালেসিয়ার সুয়েভিক রাজ্য, আফ্রিকার ভ্যান্ডাল রাজ্য এবং সাপাডিয়ার বার্গুন্ডিয়ান রাজ্য

বারবারিয়ান রাজ্যগুলোর গঠন ছিল একটি জটিল, ধীর এবং অনেকটা অনিচ্ছাকৃত প্রক্রিয়া।[][] এদের উৎস মূলত রোমান রাষ্ট্রের সীমানায় বারবারিয়ান অভিবাসীদের সামলাতে ব্যর্থ হওয়ার মধ্যে নিহিত ছিল, যার ফলে তৃতীয় শতাব্দী থেকে সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে আক্রমণ এবং আমন্ত্রণ উভয় প্রক্রিয়াই শুরু হয়।[] বারবারিয়ানদের ক্রমবর্ধমান অনুপ্রবেশ সত্ত্বেও রোমানরা তাদের সাম্রাজ্যিক কাঠামোতে সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়নি। বারবারিয়ান শাসকরা শুরুতে ছিলেন স্থানীয় যুদ্ধবাজ নেতা এবং অনুগত রাজা, যাদের কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক ছিল না। রোমান সম্রাট ও জবরদখলকারীরা যখন তাদের গৃহযুদ্ধে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন, তখন থেকেই মূলত তাদের প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। পশ্চিম রোমান কেন্দ্রীয় শাসনের কার্যকর পতনের পরেই কেবল বারবারিয়ান শাসিত অঞ্চলগুলো প্রকৃত আঞ্চলিক রাজ্যে রূপান্তরিত হয়।[]

বারবারিয়ান রাজারা রোমান সাম্রাজ্যের সাথে নিজেদের যুক্ত করার মাধ্যমে তাদের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।[] প্রায় সব বারবারিয়ান শাসকই ডমিনাস নস্টার ("আমাদের প্রভু") উপাধি গ্রহণ করেছিলেন, যা আগে রোমান সম্রাটরা ব্যবহার করতেন। এছাড়া অনেকেই প্রনাম হিসেবে ফ্ল্যাভিয়াস নামটি গ্রহণ করেন, যা প্রান্তীয় প্রাচীন যুগে প্রায় সব রোমান সম্রাট ব্যবহার করতেন। অধিকাংশ শাসক অবশিষ্ট পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের সাথে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে একপ্রকার আনুগত্যের সম্পর্ক বজায় রাখতেন। প্রান্তীয় রোমান প্রশাসনের অনেক দিকই বারবারিয়ান শাসনামলে টিকে ছিল, যদিও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পুরনো ব্যবস্থাটি ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।[]

ব্যুৎপত্তি

[সম্পাদনা]

"বারবারিয়ান রাজ্যসমূহ" হলো আধুনিক ঐতিহাসিকদের দ্বারা ব্যবহৃত একটি সম্মিলিত পরিভাষা, যা মূলত পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর পশ্চিম ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত রাজ্যগুলোকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।[] তবে "বর্বর" (barbarian) শব্দটি নেতিবাচক হওয়ায় কোনো কোনো পণ্ডিত এই পরিভাষাটির সমালোচনা করেছেন।[] কিছু ঐতিহাসিক "বারবারিয়ান রাজ্যসমূহ" নামটিকে অনুপযুক্ত বলে মনে করেন, কারণ এই রাজ্যগুলো মূলত প্রাক্তন রোমান অভিজাতদের দ্বারা সমর্থিত ও পরিচালিত হতো।[১০] বিকল্প হিসেবে কিছু ঐতিহাসিক "উত্তর-রোমান রাজ্য",[১১] "রোমান-বারবারিয়ান রাজ্য", "ল্যাটিন-জার্মানীয় রাজ্য", "ল্যাটিন-বারবারিয়ান রাজ্য", "পশ্চিমা রাজ্য" এবং "প্রাক-মধ্যযুগীয় রাজ্য" এর মতো শব্দগুলো ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছেন।[১২]

"বারবারিয়ান রাজ্য" শব্দটি সেই সময়ে প্রচলিত ছিল না এবং ওইসব রাজ্যের সাধারণ মানুষও নিজেদের রাষ্ট্রের জন্য এটি ব্যবহার করত না।[] প্রাক-মধ্যযুগের লেখকরা মাঝেমধ্যে অন্য রাজ্যের বাসিন্দাদের বোঝাতে "বারবারিয়ান" শব্দ ব্যবহার করলেও, নিজের রাজ্যের ক্ষেত্রে কখনো তা ব্যবহার করেননি।[]

প্রেক্ষাপট

[সম্পাদনা]

পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের শাসনাধীন অঞ্চলে বারবারিয়ান রাজ্যগুলোর উত্থান ছিল একটি ধীর, জটিল এবং বহুলাংশে অনিচ্ছাকৃত প্রক্রিয়া।[১৩] এদের উৎস মূলত রোমান সাম্রাজ্যের ভূখণ্ডে বিপুল সংখ্যক বারবারিয়ান (অর্থাৎ অ-রোমান) জাতিগোষ্ঠীর পরিযাণ বা স্থানান্তরের মধ্যে নিহিত। যদিও পরিযাণ কালকে (আনু. ৩০০–৬০০) প্রায়ই "বারবারিয়ান আক্রমণ" বলা হয়, তবে এই স্থানান্তর কেবল আক্রমণের কারণেই ঘটেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে আমন্ত্রণের মাধ্যমেও হয়েছে। সাম্রাজ্যের সীমানার বাইরে থেকে মানুষদের রোমান ভূখণ্ডে বসবাসের জন্য আমন্ত্রণ জানানো কোনো নতুন নীতি ছিল না। রোমান সম্রাটরা অতীতে বহুবার অর্থনৈতিক, কৃষি বা সামরিক প্রয়োজনে এমনটা করেছেন। রোমান সাম্রাজ্যের বিশাল আকার ও ক্ষমতার কারণে এর অভিবাসীদের গ্রহণ করার ক্ষমতা ছিল প্রায় অসীম।[১৩] তবে চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীর বেশ কিছু ঘটনা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।[১৩]

রোমান দৃষ্টিভঙ্গি

[সম্পাদনা]

রোমান লেখকরা দীর্ঘদিনের নৃতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের আলোকে এই গোষ্ঠীগুলোকে সংজ্ঞায়িত করতেন, যেখানে মূলত তাদের সাংস্কৃতিক ভিন্নতার ওপর জোর দেওয়া হতো। "বারবারিয়ানদের" বর্ণনা অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের চেয়ে প্রচলিত সাহিত্যিক রীতির ওপর বেশি নির্ভরশীল ছিল; তাদের অসভ্য, যুদ্ধবাজ এবং রোমান সমাজ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হিসেবে চিত্রায়িত করা হতো।[১৪] এই ধরনের বর্ণনাগুলো সাম্রাজ্যবাদী আদর্শের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করত, যা বিজয়কে বৈধতা দিত এবং রোমান অবক্ষয়কে নৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করত।[১৫] ঐতিহাসিক মাইকেল মাসের মতে, প্রান্তীয় প্রাচীন যুগের রোমান নৃতত্ত্ব বর্ণনার নির্ভুলতার চেয়ে এই গোষ্ঠীগুলোকে রোমের নিয়তি ও ভবিষ্যতের আখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে বেশি মনোযোগী ছিল।[]

নৃতাত্ত্বিক এই ধ্যানধারণাগুলো প্রবল থাকলেও রাজ্যগুলোর গঠন ছিল মূলত বাস্তবমুখী পরিস্থিতির প্রতিফলন: ফেডারেশনভুক্ত সেনাবাহিনীগুলো নিজেদের অঞ্চল দখল করে নিচ্ছিল, রাজনৈতিক সুবিধার জন্য কখনও কখনও সাম্রাজ্যিক স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছিল এবং খোদ রোমান অভিজাতরাই অনেক ক্ষেত্রে নতুন শাসকদের সাথে সহযোগিতা করছিলেন।[] উপজাতীয় গোষ্ঠী থেকে আঞ্চলিক রাজ্যে এই রূপান্তর রোমের পতন নাকি একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রূপান্তর তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।[১৬][১৭]

ভিসিগোথ (৩৭৬–৪১০)

[সম্পাদনা]
৩৯৫ সালে এথেন্স দখলের পর প্রথম অ্যালারিকের নগরে প্রবেশের ২০শ শতাব্দীর একটি চিত্র। তিনি ৩৯৫-৪১০ সাল পর্যন্ত ভিসিগোথদের নেতা ছিলেন।

৩৭৬ সালে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য সরকার ভিসিগোথদের দানিউব নদী পার হয়ে বলকান অঞ্চলে বসতি স্থাপনের অনুমতি দেয়।[১৮] প্রায় ৫০,০০০ মানুষের এই ভিসিগোথ দলটি (যাদের মধ্যে ১০,০০০ ছিলেন যোদ্ধা) ছিল মূলত উদ্বাস্তু, যারা অস্ট্রোগথদের হাত থেকে বাঁচতে পালিয়ে আসছিল; আর অস্ট্রোগথরা পালাচ্ছিল হুনদের ভয়ে।[১৯] পূর্ব রোমান সম্রাট ভ্যালেন্স (রাজত্বকাল ৩৬৪–৩৭৮) ভিসিগোথদের আগমনে খুশি হয়েছিলেন, কারণ এর মাধ্যমে তিনি কম খরচে যোদ্ধা সংগ্রহ করে তার সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করতে পারতেন। সাধারণত সাম্রাজ্যে বসতি স্থাপন করতে চাওয়া বারবারিয়ান উপজাতিদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু ভিসিগোথদের ঐক্যবদ্ধ থাকার অনুমতি দেওয়া হয় এবং তারা বসতি স্থাপনের জন্য থ্রেস অঞ্চলটিকে বেছে নেয়।[২০] যদিও রোমান রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভিসিগোথদের খাবার সরবরাহ করার কথা ছিল, কিন্তু রোমান লজিস্টিক ব্যবস্থা এত বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তুর চাপ সামলাতে পারেনি। তদুপরি, রোমান কর্মকর্তা লুপিসিনাসের অধীনে থাকা কর্মকর্তারা খাবার ভিসিগোথদের কাছে পৌঁছানোর আগেই তা বিক্রি করে দিয়ে সংকট আরও ঘনীভূত করেন। ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মুখে পড়ে কিছু ভিসিগোথ পরিবার খাবারের বিনিময়ে তাদের সন্তানদের রোমানদের কাছে দাস হিসেবে বিক্রি করতে বাধ্য হয়।[২১] লুপিসিনাস উচ্চপদস্থ একদল ভিসিগোথকে হত্যা করার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং একটি পূর্ণাঙ্গ বিদ্রোহ শুরু হয়, যা পরবর্তীকালে গোথিক যুদ্ধ নামে পরিচিতি পায়। ৩৭৮ সালে অ্যাড্রিয়ানোপলের যুদ্ধে ভিসিগোথরা পূর্ব রোমান ফিল্ড আর্মিকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে, যেখানে সম্রাট ভ্যালেন্স নিজেও নিহত হন।[১৮]

অ্যাড্রিয়ানোপলের এই পরাজয় রোমানদের জন্য ছিল এক চরম আঘাত এবং এটি তাদের ভিসিগোথদের সাথে সমঝোতা করতে ও সাম্রাজ্যের সীমানার ভেতর বসতি স্থাপনের অনুমতি দিতে বাধ্য করে।[১৮] গোথিক যুদ্ধের সমাপ্তিতে স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে ভিসিগোথরা তাদের নিজস্ব নেতাদের অধীনে আধা-স্বাধীন ফোডেরাটি হিসেবে স্বীকৃতি পায়, যাদের প্রয়োজনে রোমান সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা যেত। আগের বসতিগুলোর মতো এবার ভিসিগোথদের বিচ্ছিন্ন করা হয়নি, বরং তাদের সিথিয়া, মোয়েশিয়া এবং সম্ভবত মেসিডোনিয়া প্রদেশে সংহতিপূর্ণ জমি দেওয়া হয়।[২২] যদিও এই পরাজয় বিপর্যয়কর ছিল, তবুও অনেক আধুনিক ঐতিহাসিক মনে করেন এটি পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের সরাসরি কারণ ছিল না। ৩৮০-এর দশকের শুরুর দিকেই তাদের কার্যকরভাবে শান্ত ও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছিল।[২৩]

চতুর্থ শতাব্দীর শেষের দিকে রোমান গৃহযুদ্ধ এবং পূর্ব ও পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ ভিসিগোথ নেতা প্রথম অ্যালারিককে (রাজত্বকাল ৩৯৫-৪১০) সাম্রাজ্যের রাজনীতিতে একটি সক্রিয় শক্তিতে পরিণত হওয়ার সুযোগ করে দেয়।[১৩] রোমান এবং গোথ উভয় পক্ষই জানত যে, গোথদের এই স্বায়ত্তশাসন কেবল বিকল্পহীনতার কারণেই মেনে নেওয়া হয়েছে। রোমানদের হয়ে যুদ্ধে বারবার গোথদের প্রাণহানি সম্ভবত তাদের রোমান উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দিহান করে তুলেছিল।[২৪] এই প্রেক্ষাপটে, অ্যালারিকের অধীনে ভিসিগোথরা বেশ কয়েকবার বিদ্রোহ করে। অ্যালারিক রোমান জেনারেল হিসেবে একটি আনুষ্ঠানিক পদ এবং তার অনুসারীদের জন্য রোমান সৈনিক হিসেবে বেতন নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন।[২৫] অ্যালারিক বারবার পূর্ব ও পশ্চিম সাম্রাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং দরবারি ষড়যন্ত্রের জালে আটকা পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না পেয়ে ৪১০ সালে তার বাহিনী রোম লুণ্ঠন করে।[২৬]

গল ও ব্রিটানিয়ায় পতন (৩৮৮–৪১১)

[সম্পাদনা]
ম্যাগনাস ম্যাক্সিমাসের (শা. ৩৮৩–৩৮৮– ) মুদ্রা। তিনি ছিলেন ব্রিটানিয়া ও উত্তর গলে উল্লেখযোগ্যভাবে সক্রিয় থাকা শেষ রোমান সম্রাট।

চতুর্থ শতাব্দীর শেষের দিকে সংঘটিত রোমান গৃহযুদ্ধগুলো পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের প্রতিরক্ষার জন্য বিপর্যয়কর প্রমাণিত হয়েছিল। ৩৮৮ সালে পূর্বের সম্রাট প্রথম থিওডোসিয়াস (শা. ৩৭৯–৩৯৫– ) পশ্চিমের জবরদখলকারী সম্রাট ম্যাগনাস ম্যাক্সিমাসকে (শা. ৩৮৩–৩৮৮– ) পরাজিত করেন। ৩৯৪ সালে থিওডোসিয়াসের সৈন্যরা আবারো পশ্চিমের এক প্রতিদ্বন্দ্বী ইউজেনিয়াসকে (শা. ৩৯২–৩৯৪– ) পরাজিত করে। উভয় যুদ্ধের অর্থ ছিল পশ্চিম রোমান সৈন্যদলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি।[২৩] ম্যাগনাস ম্যাক্সিমাসের পর পশ্চিমের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সম্রাট কখনোই লিয়নের উত্তরে যাননি এবং ব্রিটানিয়া বা উত্তর গলে সাম্রাজ্যের প্রকৃত কর্মকাণ্ড খুব সামান্যই ছিল বলে মনে হয়।[২৩] অনেক দিক থেকেই রোমান সাম্রাজ্য এই অঞ্চলে তার প্রভাব হারিয়ে ফেলেছিল; স্থানীয় অফিসগুলো দক্ষিণ গলে সরিয়ে নেওয়া হয়, অভিজাতরা দক্ষিণে পালিয়ে যান এবং ৩৯৫ সালে স্থানীয় রাজধানী ট্রায়ার থেকে আরলেসে স্থানান্তরিত হয়।[২৩] ব্রিটানিয়া এবং উত্তর গলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো রোমান শিল্পকারখানা, ভিলা জীবন এবং সামগ্রিকভাবে রোমান সভ্যতার দ্রুত পতনের চিত্র তুলে ধরে।[২৭] সাম্রাজ্যের প্রকৃত সীমানা রাইন সীমান্ত থেকে লোয়ার নদীতে সরে আসে।[২৭]

৪০৫ থেকে ৪০৭ সালের মধ্যে বিপুল সংখ্যক বর্বর গোষ্ঠী গলে আক্রমণ করে, যা রাইন নদী পারাপার নামে পরিচিত। এদের মধ্যে অ্যালান, ভান্দাল এবং সুয়েবিরা অন্তর্ভুক্ত ছিল।[১৩] এই গোষ্ঠীগুলো রোমান গলের একদম পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলো থেকে আসেনি; বরং তারা সম্ভবত রোমান উপহারের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল ছিল। উপহার দেওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং পূর্বে হুনদের আগমনের ফলে তারা পশ্চিমে চলে আসতে প্ররোচিত হয়।[২৭] বর্বররা এই অঞ্চলে রোমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যা কিছু অবশিষ্ট ছিল তা দ্রুত ধূলিসাৎ করে দেয়[২৮] এবং ব্রিটেনে অবস্থানরত রোমান বাহিনীকে জবরদখলকারী সম্রাট তৃতীয় কনস্টানটাইনকে (শা. ৪০৭–৪১১– ) সমর্থন করতে বাধ্য করে।[২৯]

তৃতীয় কনস্টানটাইন রাইন নদীর পাড়ে বর্বরদের কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন। অভ্যন্তরীণ রোমান সংঘাতের ফলে তার শাসনের অবসানের পর[৩০] গলের সেনাবাহিনী বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে[৩১] এবং এর ফলে উপজাতিগুলো গল ও হিস্পানিয়ার গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়।[৩০] পর্যাপ্ত সামরিক শক্তি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায়, সাম্রাজ্য সরকার ৪১০ সালের দিকে ব্রিটানিয়া এবং উত্তর গল কার্যত ত্যাগ করে।[২৭][৩২] ব্রিটানিয়ায় এর ফলে অসংখ্য স্থানীয় ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভাজন ঘটে। উত্তর গলে ফ্রাঙ্ক এবং বার্গুন্ডিয়ানদের মতো গোষ্ঠীগুলো শাসন ক্ষমতা দখল করে, যারা আগে সাম্রাজ্যের সীমান্তের বাইরে বাস করত।[৩৩]

সাম্রাজ্যের স্বীকৃতি (৪১১–৪৭৬)

[সম্পাদনা]
৪৬০ সালে রোমান সাম্রাজ্য (লাল) এবং পশ্চিমে নতুন বর্বর রাজ্যগুলোর মানচিত্র

বর্বর রাজ্যগুলো গঠনের দ্বিতীয় ধাপ ছিল সাম্রাজ্য কর্তৃক বিদ্যমান পরিস্থিতির স্বীকৃতি। রোমান সরকার কোনো সময়েই আধা-স্বায়ত্তশাসিত বর্বর-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের অস্তিত্বকে কাম্য মনে করেনি, কিন্তু ৪২০ ও ৪৩০-এর দশকের দিকে তা সহ্য করতে শুরু করে।[১৩] রোমান বা বিভিন্ন বর্বর গোষ্ঠী, কেউই সাম্রাজ্য সরকারের পরিবর্তে নতুন ও স্থায়ী আঞ্চলিক রাজ্য স্থাপনের চেষ্টা করেনি। বর্বর রাজ্যগুলোর উত্থান তাদের রাজ্য তৈরির আগ্রহ থেকে নয়, বরং রোমান শাসনের ব্যর্থতা এবং বিদ্যমান রোমান ব্যবস্থার সাথে বর্বর শাসকদের একীভূত করতে না পারার কারণে হয়েছিল।[৩৪]

প্রথমদিকের বর্বর শাসকদের শুধুমাত্র রোমান সাম্রাজ্যের শর্তাধীনেই সহ্য করা হতো। ফলস্বরূপ হিস্পানিয়ার সুয়েবি ও ভান্দালদের মতো প্রাথমিক 'রাজ্য'গুলো কম গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশগুলোর প্রান্তে সীমাবদ্ধ ছিল।[৩৫] ৪১৮ সালে, সম্রাট অনারিয়াস (শা. ৩৯৩–৪২৩– ) আগে অ্যালারিকের অধীনে থাকা ভিসিগোথিক গোষ্ঠীগুলোকে দক্ষিণ গলের অ্যাকুইটানিয়ায় বসতি স্থাপনের অনুমতি দেন, যা ভিসিগোথিক রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে।[৩৬][৩০] রোমানরা এটিকে সাম্রাজ্য সরকারের অনুগত মক্কেলদের একটি সাময়িক বসতি হিসেবে কল্পনা করেছিল, যাদের সমর্থন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে পাওয়া যাবে। এই সমঝোতাকে সাম্রাজ্যের এলাকা ত্যাগ করা হিসেবে দেখা হয়নি, কারণ মনে করা হয়েছিল যে ওই ভূমিগুলোতে রোমান প্রশাসন অব্যাহত থাকবে, যদিও ভিসিগোথরা সামন্ত হিসেবে তা তদারকি করবে।[৩০] যদিও অনারিয়াসের সময়ের কিছু রোমান জেনারেল বর্বর শাসকদের প্রভাব ও ক্ষমতা সীমিত করার জন্য কাজ করেছিলেন, কিন্তু অনারিয়াসের মৃত্যুর পর গৃহযুদ্ধের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বর্বরদের বিষয়টি গৌণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্বর রাজাদের দমন করার পরিবর্তে পঞ্চম শতাব্দীর সম্রাট এবং জবরদখলকারীরা তাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারযোগ্য খেলোয়াড় হিসেবে দেখতে শুরু করেন।[৩৫]

বর্বর রাজ্য গঠনের তৃতীয় ধাপটি ছিল ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীল পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের সরকারের এই স্বীকৃতি যে, তারা আর কার্যকরভাবে নিজেদের অঞ্চল শাসন করতে সক্ষম নয়। এটি সাম্রাজ্যকে বর্বর শাসকদের কাছে আরও বেশি ভূমির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে বাধ্য করে এবং এই অঞ্চলগুলো এখন স্থায়ী রূপ লাভ করে।[১৩] এই আঞ্চলিক পরিবর্তনের অর্থ এই ছিল না যে সাবেক সাম্রাজ্য সীমানার ভেতরের ভূমিগুলো তাত্ত্বিকভাবে রোমান সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।[১৩] ৪৩৯ সালে ভিসিগোথদের সাথে এবং ৪৪২ সালে উত্তর আফ্রিকা জয় করা ভান্দালদের সাথে সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে কার্যত ওইসব জাতিগোষ্ঠীর শাসকদের সাম্রাজ্যের নির্দিষ্ট অঞ্চলের গভর্নর হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে সক্রিয় রোমান প্রশাসনের দাবি ত্যাগ করা হয়। এই চুক্তিগুলো অপরিবর্তনীয় হিসেবে দেখা না হলেও, এগুলোই প্রকৃত আঞ্চলিক রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।[৩৭]

বর্বর শাসকরা রোমান সাম্রাজ্য কাঠামোর মধ্যে নিজেদের বৈধ শাসক হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন,[৩৮] যারা নামমাত্র পশ্চিম রোমান সম্রাটের অধীনস্থ ছিলেন। ৪৭৬ সালে শেষ পশ্চিম রোমান সম্রাট রোমুলাস অগাস্টুলাসকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরেও এই প্রথা অব্যাহত ছিল। ৪৭৬-এর পরবর্তী বর্বর শাসকরা সাধারণত নিজেদের অবশিষ্ট পূর্ব রোমান সম্রাটের অধীনস্থ হিসেবে উপস্থাপন করতেন এবং বিনিময়ে মাঝেমধ্যে সাম্রাজ্য সরকার কর্তৃক বিভিন্ন সম্মানে ভূষিত হতেন।[৩৯]

আঞ্চলিক রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ (৪৭৬–৬০০)

[সম্পাদনা]
ভিসিগোথিক রাজ্যের রাজা লিউভিগিল্ডের মুদ্রা, যা ৫৮০–৫৮৩ সালে তৈরি। লিউভিগিল্ড ছিলেন প্রথম ভিসিগোথিক রাজা যিনি নিজের নামে মুদ্রা জারি করেছিলেন।

পশ্চিম ইউরোপের প্রায় কোথাও পঞ্চম শতাব্দীর শেষভাগ বা তার পরেও বর্বর শাসকরা দৃঢ়ভাবে আঞ্চলিক রাজ্যের সাথে যুক্ত ছিলেন না।[৪০] বর্বর রাজ্য গঠনের চূড়ান্ত পর্যায়টি তখন ঘটে যখন বর্বর শাসকরা পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য আবারো সঠিকভাবে কার্যকর হওয়ার অপেক্ষায় থাকার অভ্যাসটি ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেন। নিজেদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে বর্বর শাসকরা সম্রাটের আগে পালন করা ভূমিকাগুলো নিজেরা গ্রহণ করতে শুরু করেন এবং প্রকৃত আঞ্চলিক রাজায় পরিণত হন।[১৩] এই প্রক্রিয়াটি কেবল স্থানীয় রোমান অভিজাতদের দ্বারা বর্বর শাসকদের স্বীকৃতির মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছিল, যারা অনেক ক্ষেত্রেই পশ্চিম রোমান কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকে উত্তরোত্তর এক নিষ্ফল প্রত্যাশা হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলেন।[৪১] অনেক বর্বর শাসক রোমান অভিজাতদের কাছ থেকে যথেষ্ট সমর্থন পেতেন, যারা তাদের সমর্থনে বা বিপক্ষে নিজস্ব ভূমি থেকে সেনাবাহিনী গঠন করতেন।[৪২]

পশ্চিম ইউরোপের বর্বর-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের জনগণ ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত নিজেদের রোমান সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবেই মনে করত। ইতালির অস্ট্রোগোথিক রাজা থিওডোরিক দ্য গ্রেট (শা. ৪৯৩–৫২৬– ) যখন ৫১১ সালে হিস্পানিয়ার ভিসিগোথদেরও শাসক হন, তখন রাভেনায় এটিকে হিস্পানিয়ার মুক্তি এবং রোমান সাম্রাজ্যে ভিসিগোথিক অঞ্চলগুলোর পুনর্একত্রীকরণ হিসেবে উদ্‌যাপন করা হয়েছিল।[৪৩] যদিও ভিসিগোথরা এর আগেও সাম্রাজ্যের আইনত (de jure) অংশ ছিল।[৪৩]

বর্বর রাজারা ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় আগে রোমান সম্রাটদের জন্য নির্ধারিত কিছু কার্যাবলি ও বিশেষাধিকার গ্রহণ করেছিলেন তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। মনে করা হয় এটি ছিল একটি সুদীর্ঘ প্রক্রিয়া।[৪৪] ইতিহাস সাধারণত প্রথম অ্যালারিককে 'ভিসিগোথদের প্রথম রাজা' হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যদিও এই উপাধিটি তাকে কেবল ভূতাপেক্ষভাবে প্রদান করা হয়েছে। সমসাময়িক উৎসগুলো অ্যালারিককে কেবল ডুক্স বা কখনো কখনো হেগেমোন হিসেবে উল্লেখ করে এবং তিনি কোনো রাজ্য শাসন করেননি, বরং তার পুরো জীবন নিজেকে এবং তার জনগণকে রোমান সাম্রাজ্য ব্যবস্থার সাথে একীভূত করার ব্যর্থ চেষ্টায় ব্যয় করেছিলেন। প্রথম ভিসিগোথিক শাসক হিসেবে যিনি নিজেকে রাজা বলে ডাকতেন এবং সাম্রাজ্যের চ্যান্সারির মতো কোনো দপ্তর থেকে নথি জারি করতেন বলে জানা যায়, তিনি হলেন দ্বিতীয় অ্যালারিক (শা. ৪৮৪–৫০৭– ),[৪৫] যদিও সমসাময়িক লেখাগুলোতে ৪৫০-এর দশকের মধ্যেই গলে একটি ভিসিগোথিক রাজ্যের ব্যাপক স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।[৪৫] হিস্পানিয়ায় ধীরগতির এবং প্রায়শই নৃশংস বিজয়ের পর ৫৬০-এর দশকে লিউভিগিল্ডের অধীনে ভিসিগোথরা সচেতনভাবে একটি উত্তর-সাম্রাজ্যীয় রাজ্য হিসেবে একটি সুরক্ষিত ক্ষমতার ভিত্তি স্থাপন করতে পেরেছিল।[৪০]

সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ানের (শা. ৫২৭–৫৬৫– ) পুনর্দখলের যুদ্ধের ফলে বর্বর রাজ্যগুলোর পূর্ব রোমান সম্রাটের অধীনস্থ থাকার প্রথাটি শেষ হয়ে যায়। জাস্টিনিয়ান সাবেক পশ্চিম সাম্রাজ্যে সরাসরি রাজকীয় নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিলেন। যদিও তার পুনর্দখল অসম্পূর্ণ ছিল, তবে এটি এই ধারণার জন্ম দেয় যে পূর্ব সাম্রাজ্যের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরের কোনো ভূমি আর রোমান সাম্রাজ্যের অংশ নয়। এটি পশ্চিম ইউরোপে রোমান পরিচয়ের নাটকীয় অবনতিও ঘটায়।[৪৬] ভিসিগোথিক রাজ্যের মুদ্রায় ৫৮০-এর দশক পর্যন্ত পূর্ব রোমান সম্রাটদের প্রতিকৃতি প্রদর্শিত হতে থাকে, এরপর থেকে ভিসিগোথিক রাজারা নিজেদের নামে মুদ্রা তৈরি করতে শুরু করেন।[৪৭]

রোমান ঐতিহ্য এবং ধারাবাহিকতা

[সম্পাদনা]

প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা

[সম্পাদনা]

বর্বর রাজ্যগুলোর উত্থানের ফলে পশ্চিম ইউরোপের ক্ষমতা অতীতের রোম বা রাভেনার মতো কোনো একক রাজধানী থেকে সরে গিয়ে বেশ কিছু স্থানীয় রাজা এবং যুদ্ধবাজদের হাতে ছড়িয়ে পড়ে। তা সত্ত্বেও, প্রাক্তন সাম্রাজ্যিক সরকারের কাঠামোটি পশ্চিমে মৌলিকভাবে কার্যকর ছিল, কারণ বর্বর শাসকরা পরবর্তী সময়ের রোমান প্রশাসনের অনেক বৈশিষ্ট্য গ্রহণ করেছিলেন।[৪৮][১১] পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দী জুড়ে রোমান আইন প্রধান আইনি ব্যবস্থা হিসেবে টিকে ছিল। বেশ কিছু বর্বর রাজা আইনি বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন এবং রোমান আইনের ওপর ভিত্তি করে নিজস্ব আইনবিধি জারি করেছিলেন।[৪৯]

শহর ও নগরগুলো ছিল পুরনো সাম্রাজ্যের মূল ভিত্তি এবং প্রাথমিকভাবে বর্বর রাজ্যগুলোতেও সেগুলো অপরিবর্তিত ছিল। পুরনো রোমান সাম্রাজ্যিক কাঠামোর বিলুপ্তি ছিল একটি ধীর প্রক্রিয়া, যা কয়েক শতাব্দী ধরে চলেছিল এবং মাঝে মাঝে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তা ত্বরান্বিত হয়েছিল।[৫০] রোমান প্রদেশ, ডায়োসিস এবং প্রিটোরিয়ান প্রিফেকচারের পুরনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা কিছু স্থানে বর্বর শাসকদের অধীনে আংশিকভাবে কার্যকর ছিল। কিছু শাসক এমনকি প্রশাসনের কিছু অংশ পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপও নিয়েছিলেন। ৫১০ সালে ইতালির অস্ট্রোগোথিক রাজা মহামতি থিওডোরিক ভিসিগথদের কাছ থেকে জয় করা ভূখণ্ডে গলের প্রিটোরিয়ান প্রিফেকচার পুনরদ্ধার করেন এবং রোমান অভিজাত লিবেরিয়াসকে প্রিটোরিয়ান প্রিফেক্ট হিসেবে নিযুক্ত করেন।[৪৩]

পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর রোমান রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক অনেক পদ টিকে ছিল, যা বর্বর রাজাদের জারি করা বিভিন্ন আইনবিধি থেকে প্রমাণিত হয়। এমন অসংখ্য নথি রয়েছে যা দেখায় যে, রোমানরা সেইসব রাজ্যের দাপ্তরিক কাজে সক্রিয় ছিলেন।[৫১] ফলে বর্বর রাজ্যগুলোর প্রতিষ্ঠা রোমান সমাজের অবসান ঘটায়নি।[১০] আইরিশ ঐতিহাসিক পিটার ব্রাউনের মতে, তারা বরং "বিপরীতভাবে [এমন] অঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা কয়েক দশক ধরে কর্তৃত্বের শূন্যতায় ভুগছিল।"[১০]

রোমান সাম্রাজ্যিক প্রশাসন এবং নতুন রাজকীয় প্রশাসনের মধ্যে প্রধান পার্থক্য ছিল তাদের ব্যাপ্তি। কেন্দ্রীয় সাম্রাজ্যিক আদালত এবং বিভিন্ন প্রদেশের সরকারকে যুক্ত করার মতো কর্মকর্তাদের অভাব থাকায় রাজ্যগুলোর প্রশাসন অনেক বেশি সীমিত ও সরল হয়ে পড়ে।[৪৪] বর্বর রাজ্যগুলোর আকার ছোট হওয়ায় দাপ্তরিক ক্ষমতা সংকুচিত হয়েছিল এবং পুরনো সাম্রাজ্যের মতো ব্যক্তিগত উন্নতি ও কর্মজীবনের সুযোগগুলো আর অবশিষ্ট ছিল না।[৫১] রোমান শৃঙ্খলার এই অবনতির ফলে জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক জটিলতা ভেঙে পড়ে।[৫০] তবে এই উন্নয়ন সব জায়গায় একরকম ছিল না; যেমন গলে ষষ্ঠ শতাব্দীতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দেখা দিয়েছিল।[১০]

রোমান বৈধতা

[সম্পাদনা]
ইতালির রাজা ডেসিডেরিয়াসের (৭৫৬–৭৭৪) একটি মুদ্রা, যাতে ডিএন ডিজাইডার রেক্স (ডমিনাস নস্টার ডেসিডেরিয়াস রেক্স) খোদাই করা আছে

পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর, পশ্চিম ইউরোপের বর্বর শাসকরা প্রাক্তন সাম্রাজ্যের কিছু উপাদান গ্রহণের মাধ্যমে তাদের বৈধতা জোরদার করার চেষ্টা করেছিলেন। রাজাদের ব্যবহৃত সবচেয়ে জনপ্রিয় উপাধি ছিল রেক্স , যা তাদের ক্ষমতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করত। তারা এই উপাধি ব্যবহার করে অন্যান্য রাজ্য এবং কনস্টান্টিনোপলে টিকে থাকা সাম্রাজ্যিক আদালতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতেন।[৫২] যদিও প্রোকোপিয়াসের মতো কিছু পূর্ব রোমান লেখক 'রেক্স' শব্দটিকে "বর্বরদের পরিভাষা" হিসেবে অভিহিত করেছেন, তবে অতীতে এটি মাঝে মাঝে রোমান সম্রাটদের বর্ণনা করতেও ব্যবহৃত হত। এটি নির্দেশ করত যে বর্বর শাসকরা সার্বভৌম ছিলেন, তবে তাদের ক্ষমতা কনস্টান্টিনোপলের সম্রাটের চেয়ে বেশি ছিল না।[৩৮]

অনেক বর্বর রাজা (তবে সবাই নয়) তাদের উপাধিতে জাতিগত বিশেষণ ব্যবহার করতেন। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রাঙ্কিশ রাজারা তাদের উপাধি লিখতেন ("ফ্রাঙ্কদের রাজা") হিসেবে। ইতালির শাসকদের ক্ষেত্রে রোমান ধারাবাহিকতার দাবি বিশেষভাবে জোরালো ছিল, তাই তারা খুব কমই জাতিগত বিশেষণ ব্যবহার করতেন।[৫৩]

'রেক্স' ছাড়াও বর্বর শাসকরা বিভিন্ন রোমান সাম্রাজ্যিক উপাধি ও সম্মান গ্রহণ করেছিলেন। প্রায় সব বর্বর রাজাই ডমিনাস নস্টার ("আমাদের প্রভু") উপাধি ব্যবহার করতেন,[] যা আগে শুধুমাত্র রোমান সম্রাটরা ব্যবহার করতেন। এছাড়া প্রায় সব ভিসিগথ রাজা এবং ইতালির বর্বর রাজারা (লম্বার্ড রাজ্যের শেষ পর্যন্ত) প্রিনোমেন হিসেবে ফ্ল্যাভিয়াস নাম ব্যবহার করতেন, যা পরবর্তীকালের প্রায় সকল রোমান সম্রাটরা ব্যবহার করতেন।[৫৫] শুরুর দিকের বর্বর শাসকরা কনস্টান্টিনোপলের সম্রাটদের অনুগত থাকার বিষয়ে সতর্ক ছিলেন এবং সম্রাটরাও বিনিময়ে তাদের বিভিন্ন সম্মানে ভূষিত করতেন,[৫৬] যা তাদের এক ধরণের উচ্চ স্বায়ত্তশাসিত অনুগত রাজায় পরিণত করেছিল।[৩৯]

যদিও বর্বর রাজ্যগুলো অ-রোমানদের দ্বারা শাসিত ছিল, তবুও পরবর্তী প্রাচীন যুগে কেউ এই বিষয়ে সন্দেহ করত না যে তারা বৃহত্তর রোমান রাজনৈতিক ব্যবস্থারই অংশ ছিল।[৫৭] রাজ্যগুলো কিছু ক্ষেত্রে বর্বর ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠলেও সেগুলো রোমান সাম্রাজ্যিক উচ্চপদগুলোর সাথে যুক্ত ছিল এবং তাদের শাসকরা স্বীকৃত উপ-সাম্রাজ্যিক ক্ষমতা ভোগ করতেন।[৫৭]

সাম্রাজ্য পুনরদ্ধারের সম্ভাবনা

[সম্পাদনা]
৫২৩ সালে তাঁর রাজ্যের স্বর্ণযুগে, মহামতি থিওডোরিক ইতালির অস্ট্রোগোথদের শাসন করতেন, হিস্পানিয়ার ভিসিগথদের অভিভাবক ছিলেন এবং বারগুন্ডিয়ানভ্যান্ডালদের কর দিতে বাধ্য করেছিলেন।

ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরুতে পশ্চিম ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজা ছিলেন ইতালির মহামতি থিওডোরিক এবং ফ্রাঙ্কদের প্রথম ক্লোভিস। উভয় শাসকই কনস্টান্টিনোপলের সাম্রাজ্যিক আদালত থেকে সম্মান ও স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন, যা তাদের এক ধরণের বৈধতা প্রদান করেছিল এবং তারা এটি আঞ্চলিক সম্প্রসারণের ন্যায্যতা হিসেবে ব্যবহার করতেন।[৩৯] থিওডোরিককে সম্রাট প্রথম অ্যানাস্টাসিয়াস প্যাট্রিশিয়ান হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং ৪৭৬ সাল থেকে কনস্টান্টিনোপলে থাকা পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের রাজকীয় প্রতীকগুলো ইতালিতে ফিরিয়ে দেন।[৫৬] থিওডোরিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই প্রতীকগুলো পরতেন এবং তাঁর কিছু রোমান প্রজারা তাঁকে সম্রাট হিসেবে সম্বোধন করতেন।[] কিন্তু তিনি নিজে সম্রাটকে অসন্তুষ্ট না করার জন্য শুধু রেক্স উপাধিটিই ব্যবহার করতেন।[৫৮][৫৯] ফ্রাঙ্করা ৫০৭ সালে ভুইয়ের যুদ্ধে ভিসিগথদের পরাজিত করার পর, অ্যানাস্টাসিয়াস ক্লোভিসকে সম্মানসূচক কনসাল, প্যাট্রিশিয়ান এবং একজন অনুগত রাজা হিসেবে স্বীকৃতি দেন।[৩৯] থিওডোরিকের মতো ক্লোভিসের কিছু প্রজাও তাকে রাজার পরিবর্তে সম্রাট বলে ডাকতেন, যদিও তিনি নিজে কখনোই সেই উপাধি গ্রহণ করেননি।[৬০]

থিওডোরিক এবং ক্লোভিস বেশ কয়েকবার যুদ্ধের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন এবং ধারণা করা হয় যে এই ধরনের সংঘর্ষের বিজয়ী নিজের অধীনে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য পুনরদ্ধার করতে পারতেন।[৬০] যদিও কোনো যুদ্ধ হয়নি, তবে এ ধরণের ঘটনা পূর্ব রোমান সম্রাটদের চিন্তিত করে তুলেছিল। তারা আশঙ্কা করেছিলেন যে তাদের দেওয়া সম্মানগুলো হয়তো সাম্রাজ্যিক "অনুমোদন" হিসেবে দেখা হতে পারে, তাই পূর্বের আদালত পরবর্তীতে আর আগের মতো উদারভাবে সম্মান প্রদান করেনি।[৩৯] পরিবর্তে, পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য তার নিজস্ব রোমান বৈধতার ওপর জোর দিতে শুরু করে, যা তারা ইতিহাসের শেষ পর্যন্ত বজায় রেখেছিল।[৬০]

ষষ্ঠ শতাব্দীতে পূর্ব রোমান ঐতিহাসিকরা পশ্চিমের অঞ্চলগুলোকে বর্বর আক্রমণে "হারিয়ে গেছে" বলে বর্ণনা করতে শুরু করেন, অথচ বাস্তবতা ছিল যে অনেক বর্বর রাজাকে রোমানরাই সেখানে বসতি স্থাপন করতে দিয়েছিল। আধুনিক ঐতিহাসিকরা এই ঘটনাকে "জাস্টিনীয় মতাদর্শগত আক্রমণ" হিসেবে অভিহিত করেন।[৬০] যদিও পশ্চিম সাম্রাজ্যের স্থলে বর্বর রাজ্যগুলোর উত্থান পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ ছিল না, কিন্তু "বর্বর আক্রমণ" প্রাচীন বিশ্বের আকস্মিক ও সহিংস অবসান ঘটিয়েছিল, এমন ধারণা সঠিক নয়, যদিও একসময় আধুনিক ঐতিহাসিকদের মধ্যেও এটি প্রচলিত ছিল।[৬১] অসংখ্য বর্বর রাজ্যের মধ্যে আফ্রিকায় প্রতিষ্ঠিত ভ্যান্ডাল রাজ্যই ছিল একমাত্র রাজ্য যা কম-বেশি সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল।[২৭] পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনকে শুধুমাত্র "বর্বর আক্রমণ" হিসেবে দায়ী করা হলে নতুন রাজ্যগুলোর বৈচিত্র্যকে উপেক্ষা করা হয় এবং সাম্রাজ্য নিজেই যে তার পতনে জড়িত ছিল, সেই বিশ্লেষণটিও আড়ালে পড়ে যায়।[৬১]

সংস্কৃতি

[সম্পাদনা]

বেশ কিছু ছোট রাজ্যে বিভক্ত হওয়া সত্ত্বেও বর্বর রাজ্যগুলোর জনগণ একে অপরের সাথে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সম্পর্ক বজায় রেখেছিল এবং ল্যাটিন ভাষায় কথা বলা অব্যাহত রেখেছিল।[৪৮] একই সাথে তারা তাদের অ-রোমান পরিচয়ও ধরে রেখেছিল এবং নিজেদের আলাদা পরিচয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল।[১১]

পশ্চিম ইউরোপে রোমান পরিচয় ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এর কারণ ছিল পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের নিজস্ব অনন্য রোমান বৈধতার ওপর জোর দেওয়া এবং স্থানীয় বর্বর শাসক গোষ্ঠী ও রোমান জনগণের জাতিগতভাবে মিশে যাওয়া।[৪৬][৬২] রোমান সাম্রাজ্যের সাথে সংযোগ কমে যাওয়া এবং পশ্চিমের রাজনৈতিক বিভাজনের ফলে সংস্কৃতি ও ভাষা ধীরে ধীরে খণ্ডিত হতে থাকে, যা শেষ পর্যন্ত আধুনিক রোমান্স জাতি এবং রোমান্স ভাষাগুলোর জন্ম দেয়।[৬৩]

বর্বর রাজ্যগুলোর পরিচয় ও রাজনীতির মূলে ছিল ধর্ম। তাদের অনেক শাসক এবং অভিজাতরা প্রাথমিকভাবে আরিয়ানবাদ অনুসরণ করতেন, যা খ্রিস্টধর্মের এমন একটি রূপ ছিল যা ত্রিত্ববাদের নাইসিন সংজ্ঞাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। এই ধর্মবিশ্বাসটি, যা প্রায়শই সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে 'ফেডারেটি' হিসেবে কাজ করার সময় গৃহীত হয়েছিল, গোথিক এবং ভ্যান্ডাল শাসকদের তাদের অধিকাংশ নাইসিন রোমান প্রজাদের থেকে আলাদা করার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করত।[৬৪] অস্ট্রোগোথ, ভিসিগোথ এবং ভ্যান্ডালরা বিদ্যমান ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের পাশাপাশি আরিয়ান শ্রেণিবিন্যাস বজায় রাখত; কখনও কখনও তারা কনস্টান্টিনোপল থেকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা সুসংহত করতে এই ধর্মীয় পার্থক্যকে কাজে লাগাত।[]

বিভাজন তৈরির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, আরিয়ানবাদ সর্বদা কঠোর নিপীড়নের উৎস ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে শাসকরা ক্যাথলিক যাজকতন্ত্রের প্রতি সহনশীলতা দেখাতেন, কারণ তারা নাগরিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এর ভূমিকা স্বীকার করতেন। উদাহরণস্বরূপ, মহান থিওডোরিক ইতালিতে আরিয়ান এবং ক্যাথলিক উভয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নিজের কর্তৃত্ব বজায় রেখে ধর্মীয় সহাবস্থান নিশ্চিত করেছিলেন।[৬৫] তবে কিছু সংঘর্ষও দেখা দিয়েছিল: উদাহরণস্বরূপ, উত্তর আফ্রিকার ভ্যান্ডালরা নাইসিন বিশপদের নির্বাসন, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং মাঝে মাঝে সহিংসতার সম্মুখীন করেছিল, যা ধর্মীয় সীমানার রাজনৈতিকীকরণের প্রতিফলন ছিল।[৬৬]

সময়ের সাথে সাথে আরিয়ানবাদ নাইসিন খ্রিস্টধর্মের কাছে নতিস্বীকার করে। ৫৮৯ সালে, ভিসিগোথ রাজা প্রথম রেকারেড টলেডোর তৃতীয় কাউন্সিলে ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিত হন, যা গোথিক এবং হিস্পানো-রোমান পরিচয় একীভূত করার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক ছিল।[৬৭]

বর্বর রাজ্যগুলোর অবসান

[সম্পাদনা]
৮১৪ সালে ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র

বর্বর রাজ্যগুলো অত্যন্ত ভঙ্গুর রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল।[৬৮] তিনটি সবচেয়ে শক্তিশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজ্য, ভিসিগোথ, ফ্রাঙ্ক এবং লম্বার্ডদের মধ্যে, কেবল ফ্রাঙ্কীয় রাজ্য এবং দক্ষিণ ইতালির একটি লম্বার্ডীয় অবশিষ্টাংশ উচ্চ মধ্যযুগ পর্যন্ত টিকে ছিল।[৬৯]

সুয়েবি রাজ্য ৫৮৫ সালে ভিসিগোথদের দ্বারা বিজিত হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ৭২১ সালে উমাইয়া খিলাফত দ্বারা বিজিত হয়।[৬৮] গেপিডি রাজ্য ৫৬৭ সালে লম্বার্ডদের দ্বারা বিজিত হয়। তার পুনর্দখল যুদ্ধের মাধ্যমে পূর্ব রোমান সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ান আফ্রিকার ভ্যান্ডাল রাজ্য এবং ইতালির অস্ট্রোগোথিক রাজ্য উভয়ই ধ্বংস করেন।[৬৮] ৫৩২–৫৩৪ সালের মধ্যে ফ্রাঙ্করা থুরিংগি এবং বারগুন্ডিয়ান রাজ্য উভয়ই জয় করে। ৭৭৪ সালে তারা লম্বার্ড রাজ্য জয় করে, কেবল বেনেভেন্তো বাদে।

বর্বর রাজ্যগুলোর উত্থান ছিল মূলত একটি রোমান রাজনৈতিক ঘটনা, যা পরবর্তী রোমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঘটেছিল।[৭০] এই রাজ্যগুলোর স্থলে সপ্তম থেকে নবম শতাব্দীতে নতুন নতুন সাম্রাজ্য আবির্ভূত হয়েছিল যা একটি নতুন ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করত, যা পুরনো রোমান বিশ্বের সাথে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিল। উমাইয়া খিলাফত, যারা ভিসিগোথদের কাছ থেকে হিস্পানিয়া এবং পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের কাছ থেকে উত্তর আফ্রিকা জয় করেছিল, তারা রোমান ধারাবাহিকতা বজায় রাখার কোনো ভান করেনি। লম্বার্ড রাজ্য, যদিও প্রায়শই অন্যান্য বর্বর রাজ্যগুলোর মধ্যে গণনা করা হয়, তারা এমন একটি ইতালি শাসন করেছিল যা অস্ট্রোগোথ এবং পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যকার সংঘর্ষে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।[৬৮] ৭৭৪ সালে ফ্রাঙ্করা তাদের রাজ্য জয় করলে ইতালিতে তাদের শাসনের অবসান ঘটে।[৭১] হিস্পানিয়ায় ভিসিগোথদের ক্ষুদ্র উত্তরসূরি রাজ্যগুলো, যেমন লিওন, কাস্তিল এবং আরাগন মৌলিকভাবে ফ্রাঙ্ক-পরবর্তী সংস্কৃতির ছিল এবং প্রশাসনিকভাবে তারা পতনশীল ভিসিগোথিক রাজ্যের চেয়ে ফ্রাঙ্কীয় রাজ্যের অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ ছিল।[৬৮]

পুরনো রাজ্যগুলোর একমাত্র উত্তরসূরি হিসেবে ফ্রাঙ্কীয় রাজ্য প্রারম্ভিক মধ্যযুগীয় রাজত্বের যে মডেল প্রদান করেছিল, তা পরবর্তীতে মধ্যযুগের বাকি সময়ে পশ্চিম ইউরোপীয় সম্রাটদের অনুপ্রাণিত করেছিল।[৪০] যদিও ফ্রাঙ্কীয় শাসকরা রোমান আদর্শ মনে রেখেছিলেন এবং প্রায়শই সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের অস্পষ্ট আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন, তবুও তাদের শতাব্দীর পর শতাব্দী শাসনের ফলে তাদের রাজ্যের শাসনব্যবস্থা এমন কিছুতে রূপান্তরিত হয়েছিল যার সাথে রোমান সাম্রাজ্যের খুব সামান্যই মিল ছিল। শাসনের নতুন রূপটি ছিল ব্যক্তিগত, যা রোমানদের উচ্চ প্রশাসনিক, বিচার বিভাগীয় এবং আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তে ব্যক্তিদের ক্ষমতা এবং সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।[৬৮] ৮০০ সালে পোপ তৃতীয় লিও কর্তৃক ফ্রাঙ্কদের রাজা শার্লমাইনকে অবশিষ্ট পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের কর্তৃত্বের বিপরীতে রোমান সম্রাট হিসেবে অভিষেকের মাধ্যমে বর্বর রাজ্যগুলোর যুগের অবসান ঘটে।[৭২][৭৩] শার্লমাইনের ক্যারোলিঞ্জীয় সাম্রাজ্য, যা ফ্রান্স এবং জার্মানির পূর্বসূরি ছিল, বাস্তবে পুরনো পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের সাথে কোনো অর্থবহ সংযোগের চেয়ে কেবল শার্লমাইনের কর্তৃত্ব দ্বারা ঐক্যবদ্ধ রাজ্যগুলোর একটি সংগ্রহ ছিল।[৭৪]

ইতিহাসতত্ত্ব

[সম্পাদনা]

বর্বর রাজ্যগুলোর ব্যাখ্যা দীর্ঘকাল ধরে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন নিয়ে বৃহত্তর ইতিহাসতাত্ত্বিক বিতর্ক দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। রেনেসাঁ এবং আলোকায়নের পতনের ধারণা দ্বারা প্রভাবিত প্রারম্ভিক আধুনিক পাণ্ডিত্য এই রাজ্যগুলোকে রোমের পতন এবং একটি "বর্বরায়িত" ইউরোপের সূচনার প্রমাণ হিসেবে চিত্রিত করেছে।[] উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের ইতিহাসবিদরা প্রায়শই এই চিত্রটিকে আরও জোরালো করেছেন। তারা রোমান উৎস থেকে পাওয়া নৃগোষ্ঠীগত গতানুগতিক ধারণার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন, যেখানে গোথ, ভ্যান্ডাল এবং অন্যান্য গোষ্ঠীকে ধ্বংসাত্মক বহিরাগত হিসেবে দেখানো হয়েছে।[১৪]

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ইতিহাসবিদরা আকস্মিক পতনের পরিবর্তে ধারাবাহিকতা এবং রূপান্তরের ওপর ক্রমবর্ধমান গুরুত্বারোপ করেছেন। পিটার ব্রাউনের "পরবর্তী প্রাচীন যুগ" মডেল এবং পরবর্তীতে ইয়ান উড ও অন্যদের কাজ এই রাজ্যগুলোর মধ্যে রোমান প্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকা এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন পুনর্গঠনে তাদের ভূমিকার কথা তুলে ধরেছে।[১৬][৭৫] একই সাথে, গবেষকরা সেইসব শ্রেণিবিন্যাস বা মানদণ্ডকে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন যার মাধ্যমে "বর্বর" পরিচয় তৈরি করা হয়েছিল। নৃতত্ত্বের ওপর তার কাজে গ্রেগ উলফ দেখিয়েছেন যে রোমান নৃগোষ্ঠীগত ঐতিহ্যগুলো এই জাতিগুলোকে এমনভাবে চিত্রিত করেছিল যা সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলনের পরিবর্তে সাম্রাজ্যের মতাদর্শকে সমর্থন করত।[১৫] ইতিহাসবিদ মাইকেল মাস একইভাবে যুক্তি দেন যে পরবর্তী রোমান নৃতত্ত্ব বর্বরদের রোমের ভাগ্য এবং পতনের আখ্যানের সাথে একীভূত করেছিল, যা নির্ভুলতার চেয়ে অর্থের প্রতি বেশি মনোযোগী ছিল।[৭৬] এই দৃষ্টিভঙ্গি রোমান সাহিত্যিক চিত্রায়নকে রাজ্যগুলোর বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে এক করে দেখার ক্ষেত্রে অধিকতর সতর্কতা অবলম্বনের দিকে ধাবিত করেছে। আধুনিক ইতিহাসতত্ত্ব এইভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী দৃষ্টিভঙ্গিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে: পতনের পুরনো মডেল, ধারাবাহিকতার ওপর জোর দেওয়া রূপান্তর তত্ত্ব এবং এমন পদ্ধতি যা পরীক্ষা করে দেখে যে কীভাবে রোমান ধারণাগুলো বর্বর রাজ্য সম্পর্কে প্রাচীন ও আধুনিক উভয় বোঝাপড়াকে গঠন করেছিল।[৭৭][]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]
  1. ডমিনাস নস্টার উপাধিটি পশ্চিম ইউরোপে কয়েক শতাব্দী ধরে প্রচলিত ছিল। ইতালির শাসকদের ক্ষেত্রে এই উপাধিটি ইতালির শেষ লম্বার্ড রাজা ডেসিডেরিয়াসের (শা. ৭৫৬–৭৭৪) সময় পর্যন্ত ব্যবহারের নথিপত্র পাওয়া যায়, যার মুদ্রায় তাকে dominus noster Desiderius rex হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।[৫৪]
  2. উদাহরণস্বরূপ, ক্যাসিনা মাভোর্টিয়াস বাসিলিয়াস ডেসিয়াস (৪৮৬ সালে পশ্চিমের কনসাল, ৪৮৬–৪৯৩ সাল পর্যন্ত ইতালির প্রিটোরিয়ান প্রিফেক্ট) একটি শিলালিপিতে থিওডোরিককে dominus noster gloriosissimus adque inclytus rex Theodericus victor ac triumfator semper Augustus ("আমাদের প্রভু, পরম গৌরবময় ও প্রখ্যাত রাজা থিওডোরিক, বিজয়ী এবং সর্বদাই অগাস্টাস") হিসেবে উল্লেখ করেছেন।[৫৮]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Croke 2003, পৃ. 349, Kulikowski 2012, পৃ. 31, Delogu 2002, পৃ. 84
  2. Tombs 2015, পৃ. 30–33।
  3. Grygiel 2018, পৃ. 134।
  4. Wood 2025, পৃ. 229–231।
  5. 1 2 3 Maas 2018, পৃ. 100–103।
  6. 1 2 3 Wood 2025, পৃ. 229–233।
  7. 1 2 Wood 2025, পৃ. 146–149।
  8. Wood 2025, পৃ. 233–236।
  9. 1 2 3 4 Beckwith 2009, পৃ. 356।
  10. 1 2 3 4 Brown 2015, Chapter 4।
  11. 1 2 3 Ghosh 2009, পৃ. 1।
  12. Kulikowski 2012, পৃ. 31।
  13. 1 2 3 4 5 6 7 8 9 Kulikowski 2012, পৃ. 41।
  14. 1 2 Woolf 2011, পৃ. 32–35।
  15. 1 2 Woolf 2011, পৃ. 59–61।
  16. 1 2 Wood 2025, পৃ. 229–230।
  17. Maas 2018, পৃ. 101–103।
  18. 1 2 3 Katz 1955, পৃ. 88–89।
  19. Katz 1955, পৃ. 145, 507।
  20. Heather 2005, পৃ. 158–162।
  21. Kulikowski 2006, পৃ. 131।
  22. Heather 2005, পৃ. 185–186।
  23. 1 2 3 4 Halsall 2005, পৃ. 48।
  24. Heather 1999, পৃ. 50।
  25. Heather 1999, পৃ. 49।
  26. James 2014, পৃ. 57।
  27. 1 2 3 4 5 Halsall 2005, পৃ. 49।
  28. Heather 2005, পৃ. 221।
  29. Kulikowski 2000, পৃ. 328, 332–334।
  30. 1 2 3 4 Kulikowski 2012, পৃ. 42।
  31. Heather 2008, পৃ. 247, 513।
  32. Heather 2005, পৃ. 195।
  33. Halsall 2005, পৃ. 50।
  34. Kulikowski 2012, পৃ. 33।
  35. 1 2 Kulikowski 2012, পৃ. 43।
  36. Kulikowski 2006, পৃ. 158।
  37. Kulikowski 2012, পৃ. 45।
  38. 1 2 Gillett 2002, পৃ. 118–119।
  39. 1 2 3 4 5 Mathisen 2012, পৃ. 105–107।
  40. 1 2 3 Kulikowski 2012, পৃ. 40।
  41. Kulikowski 2012, পৃ. 47।
  42. Halsall 2005, পৃ. 52।
  43. 1 2 3 Wolfram 2005, পৃ. 263।
  44. 1 2 Kulikowski 2012, পৃ. 48।
  45. 1 2 Kulikowski 2012, পৃ. 36।
  46. 1 2 Halsall 2018, পৃ. 53।
  47. Grierson ও Blackburn 1986, পৃ. 49–52।
  48. 1 2 Croke 2003, পৃ. 349।
  49. Kulikowski 2012, পৃ. 49।
  50. 1 2 Kulikowski 2012, পৃ. 32।
  51. 1 2 Dodd 2016, পৃ. 170।
  52. Halsall 2018, পৃ. 51।
  53. Gillett 2002, পৃ. 113–114।
  54. Gillett 2002, পৃ. 91–105।
  55. Gillett 2002, পৃ. 116।
  56. 1 2 Bury 2005, পৃ. 422–424।
  57. 1 2 Wolfram 1996, পৃ. 255।
  58. 1 2 Jones 1962, পৃ. 128।
  59. Hen 2018, পৃ. 66।
  60. 1 2 3 4 Halsall 2018, পৃ. 52।
  61. 1 2 Kulikowski 2012, পৃ. 31–32।
  62. Parker 2018, পৃ. 7, 10।
  63. Pohl 2018, পৃ. 4, 15–18, 38–39।
  64. Maas 2018, পৃ. 254–256।
  65. Wood 2025, পৃ. 146–148।
  66. Wood 2025, পৃ. 231–233।
  67. Maas 2018, পৃ. 255–256।
  68. 1 2 3 4 5 6 Kulikowski 2012, পৃ. 50।
  69. Kulikowski 2012, পৃ. 32, 34।
  70. Esders ও Hen 2019, Conclusion।
  71. Muldoon 1999, পৃ. 47।
  72. Bickmore 1857, Table III।
  73. Nelsen ও Guth 2003, পৃ. 5।
  74. Delogu 2002
  75. Wood 2018, পৃ. 21–23, 30–33।
  76. Maas 2018, পৃ. 101–104।
  77. Wood 2018, পৃ. 33–36।

গ্রন্থপঞ্জি

[সম্পাদনা]