বিষয়বস্তুতে চলুন

বনু আসাদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বনু আসাদ
بَنُو أَسَدْ
মুদারি আরব গোত্র
নৃগোষ্ঠীআরব
নিসবাআল-আসাদী
ٱلْأَسَدِيّ
অবস্থানআরবলেভান্ট
এর বংশআসাদ ইবন খুযাইমা[]
প্রধান উপজাতিখুযাইমা
ভাষাআরবি
ধর্মশিয়া ইসলাম

বনু আসাদ (আরবি: بَنُو أَسَدْ) একটি প্রাচীন আরব গোত্র, যারা আসাদ ইবন খুযাইমার বংশধর। এই গোত্রটি আদনানীয় আরবদের অন্তর্ভুক্ত এবং আরব বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ও সুপরিচিত গোত্র হিসেবে বিবেচিত। অনেক আরব গোত্রের কাছেই এরা সম্মানিত।

শিয়া মুসলিমদের কাছে বনু আসাদ অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র, কারণ এই গোত্রের লোকজন হুসাইন ইবন আলি ও তাঁর পরিবার (আহলুল বায়ত) এবং সঙ্গীদের দেহ আলি ইবন হুসাইন জয়নুল আবিদিন-এর সহায়তায় কারবালার যুদ্ধে শহীদ হওয়ার পর দাফন করেন। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শহীদও এই গোত্রের সদস্য ছিলেন।

বর্তমানে এই গোত্রের বহু সদস্য ইরাকের বিভিন্ন শহরে বসবাস করেন, যেমন: বাসরা, নাজাফ, কুফা, কারবালা, নাসিরিয়া, আমারা, কুত, হিল্লা, দিয়ালা এবং বাগদাদ। এছাড়া, এই গোত্রের একটি শাখা উত্তর সুদানে বাস করে, যাদের বলা হয় বনু কাহিল। এরা হিজাজ অঞ্চল থেকে সুদানে অভিবাসিত হয়।

আরও একটি শাখা ইরানের খুজেস্তান অঞ্চলের আহওয়াজ শহরে বাস করে। তারা সেখানে বনু তামিম, বানি মালিক, বনু কা'বসহ অন্যান্য উল্লেখযোগ্য আরব গোত্রের সঙ্গে অবস্থান করছে।

বংশপরম্পরা

[সম্পাদনা]

বনু আসাদ একটি পিতৃতান্ত্রিক গোত্র, যাদের বংশধারা শুরু হয়েছে আসাদ ইবন খুযাইমা ইবন মুদ্রিকা ইবন ইলিয়াস ইবন মুদার ইবন নিযার ইবন মা'আদ ইবন আদনান... ইবন কিদার ইবন ইসমাঈল (ইসমায়েল) ইবন ইব্রাহিম (ইব্রাহিম) পর্যন্ত বিস্তৃত।

বর্তমানে যে আসাদ গোত্র বিদ্যমান, তারা মুদার (মুদারীয়) বংশধারাভুক্ত, সুনির্দিষ্টভাবে খুযাইমার বংশধর। এই কারণে তারা ইসলামের নবী মুহাম্মদ-এর চাচাতো ভাই হিসেবে গণ্য হন, কারণ তাঁদের মধ্যে খুযাইমা ইবন মুদ্রিকা ইবন ইলিয়াস ইবন মুদার-এর মাধ্যমে এক অভিন্ন পূর্বপুরুষ রয়েছে।[]

ইতিহাস

[সম্পাদনা]

বনু আসাদের ঐতিহ্য

[সম্পাদনা]

৬ষ্ঠ শতকে বনু আসাদ গোত্র কিন্দা রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এই বিদ্রোহে কিন্দা গোত্রের রাজা হুজর নিহত হন, যিনি কিন্দার শেষ রাজা ইমরু' আল-কাইস-এর পিতা ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডের ফলে কিন্দা গোত্র বনু আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং তাগলিবসহ অধীনস্থ কিছু গোত্রের সহায়তায় দীর্ঘ যুদ্ধ শুরু হয়। হিমিয়ার রাজ্য এই যুদ্ধে ইমরু' আল-কাইসকে সহায়তা করে। যুদ্ধের ফলে কিন্দা রাজ্যের পতন ঘটে এবং ইমরু' আল-কাইস নজদ অঞ্চল থেকে পালিয়ে যান।

বিখ্যাত আরবি 'মু'আল্লাকাত' কবি 'আবিদ বিন আল-আবরাস বনু আসাদ গোত্রের সদস্য ছিলেন এবং তিনি হুজরের হত্যাকাণ্ড নিয়ে গর্ব অনুভব করতেন।

নামারা শিলালিপিতে আল-হিরার নাসরিদ রাজা ইমরু আল-কাইস প্রথম ইবন আমর দাবি করেন যে তিনি বনু আসাদের দুই নেতাকে হত্যা করেছিলেন। এই ঘটনাটি ইবন ইসহাকের গ্রন্থে উল্লেখ আছে, যেখানে নিহতদের ভাতিজা তাঁদের সম্পর্কে কবিতা রচনা করেন: "দুপুরবেলায় এক সংবাদবাহক এসে জানাল আসাদের দুই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির মৃত্যু — 'আমর ইবন মাস্তিদ এবং নির্ভরযোগ্য নেতা (আল-সামাদ)'।"[][][]

ইসলামের পূর্বে বনু আসাদদের নিজস্ব তালবিয়া (হজযাত্রায় উচ্চারিত ধর্মীয় আহ্বান) ছিল।[]

ইরাকে অভিবাসন

[সম্পাদনা]

৭ম শতকে বনু আসাদ গোত্র ইরাকে অভিবাসন করে এবং কুফায় বসতি স্থাপন করে। তারা ফুরাত নদীর তীরবর্তী কুফা ও কারবালা এলাকায় বসতি গড়ে তোলে এবং পরবর্তীতে বাসরাআহওয়াজেও বসতি স্থাপন করে, যেখানে তারা বনু তামিম গোত্রের সঙ্গে জমি ভাগ করে নেয়।

উটের যুদ্ধে বনু আসাদ আলি-এর পক্ষ নেয়। ইসলামের অনেক সাহাবি ও আলির অনুসারী এই গোত্রের অন্তর্গত ছিলেন। ৬১ হিজরি (অক্টোবর ৯ বা ১০, ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ) মুহাররমের ১০ তারিখে কারবালার যুদ্ধে বনু আসাদ গোত্র হুসাইনের পক্ষে যুদ্ধ করে এবং তাদের বহু সদস্য এই যুদ্ধে শহীদ হন।[]

বনু মাজ্যাদ আমিরাত

[সম্পাদনা]

৯৯৮ সালে বনু আসাদ গোত্রের নেতা আলি ইবন মাজ্যাদ ইরাকের কুফা অঞ্চলে প্রায় স্বাধীন একটি মাজ্যাদ আমিরাত প্রতিষ্ঠা করেন। একটি শক্তিশালী উপজাতীয় বাহিনী নিয়ে, এই শাসকগোষ্ঠী দেড় শতকের বেশি সময় ধরে অঞ্চলটিতে প্রভাব বিস্তার করে। তারা বুয়িদদের কাছ থেকে সামরিক সহায়তার বিনিময়ে উপাধি ও ভাতা লাভ করে। তাদের দীর্ঘস্থায়ী কীর্তির মধ্যে অন্যতম হলো হিল্লা নগরীর প্রতিষ্ঠা, যা ১১০১ সালে তাদের রাজধানীতে পরিণত হয়।[]

মাজ্যাদ নামের সূচনা হয় একজন পণ্ডিত, হাদিস বর্ণনাকারী ও রসায়নবিদ মাজ্যাদ ইবন মিখলেদ আল সাদাকা থেকে। ইমাদ আদ-দীন আল-ইসফাহানি মাজ্যাদ শাসকদের সম্পর্কে বলেন:

তারা আরব, বনু আসাদ গোত্রের শক্তিশালী শাখা বনু মাজ্যাদের অন্তর্গত। তারা ফুরাত নদীর তীরে তাদের তরবারির শক্তিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে। তারা অভাবীদের আশ্রয়, প্রত্যাশীদের আশ্বাস, সাহায্যপ্রার্থীদের সহায় এবং দুর্বলের সহায়ক ছিল। অনেকেই তাদের উদারতায় আকৃষ্ট হতো এবং পণ্ডিতরা তাদের কাছে আর্থিক সহায়তা পেত। তারা যা কিছু ভালো কাজে ব্যয় করত, তা সুপরিচিত। তাদের দানশীলতা নিয়ে বহু কথা প্রচলিত। সাদাকা কবিতা শুনে গর্বিত হতেন এবং কবিদের জন্য বিশেষভাবে পুরস্কার রাখতেন। তিনি দরিদ্রদের মুক্তি দিতেন, তাদের কথায় কর্ণপাত করতেন এবং উদারভাবে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতেন।

[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

ইরাকের বাইরে বনু আসাদ গোত্র

[সম্পাদনা]

মানসুর মুসা আল-মাজ্যাদি কুয়েতের সংবিধান (প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি, ১৯৬৩) প্রণয়নে আল মাজলিস আল-তাসিসি (প্রতিষ্ঠাতা পরিষদ)-এর সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।[]

আল-মাজ্যাদি পরিবার ইরাকে শিয়া, যার ফলে আরব অঞ্চলে শিয়া সংখ্যালঘুদের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। কুয়েতেও এই পরিবারে শিয়া ও সুন্নি দুই সম্প্রদায়ের সদস্য আছেন। সাম্প্রতিককালে জানা যায়, এই পরিবারের কিছু সদস্য শতাব্দী আগে ইয়েমেনের হাদরামাউত অঞ্চলে অভিবাসিত হন। তাদের গোত্রের নাম ছিল আল-মাজ্যাদ বা বনু আসাদ এবং তাদের উপাধি বা পারিবারিক নাম ছিল আসাদি, আল-আসাদি বা আল-মাজ্যাদি।

এই গোত্রের প্রায় এক হাজার সদস্য ওমানভারতের কার্নাটক রাজ্যের থোকুর গ্রামে বসবাস করেন। টিপু সুলতানের শাসনামলে এই সুন্নি মুসলিম 'আসাদি' নামধারীরা মাঙ্গালোর বন্দরে পৌঁছান। তারা ফারসিভাষী ছিলেন এবং বনু আসাদ বংশের দাবিদার ছিলেন। তারা থোকুর গ্রামে একটি কমিউনিটি সেন্টার “থোকুর জামিয়া মসজিদ” নির্মাণ করেন।

কারবালার যুদ্ধে বনু আসাদের শহীদগণ

[সম্পাদনা]

নিম্নলিখিত বনু আসাদ সদস্যরা কারবালার যুদ্ধে শহীদ হন:

মাসহারের তিন দিন পর, অর্থাৎ ১৩ মুহাররম তারিখে, কারবালার বনু আসাদ গোত্র হুসাইন, তাঁর পরিবার ও সঙ্গীদের মরদেহ দাফন করার সম্মান লাভ করে। শিয়া আরব গোত্রগুলোর মধ্যে বনু আসাদ অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়। আলি ইবন হুসাইন জয়নুল আবিদিন, বারো শিয়ার চতুর্থ ইমাম, বনু আসাদ গোত্রকে শহীদদের মরদেহ সনাক্ত ও দাফনে সহায়তা করেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. "Genealogy File: Tamim Ibn Murr"Royalblood.co.uk। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
  2. Ibn Ishaq, Guillaume (১৯৫৫)। The Life of Muhammad: A Translation of Ibn Isḥāq's sīrat। London। পৃ. ৩। আইএসবিএন ০১৯৫৭৭৮২৮৬The Lineage of Muhammad, Asad and Muhammad have same grandfather Khuzaimah {{বই উদ্ধৃতি}}: আইএসবিএন / তারিখের অসামঞ্জস্যতা (সাহায্য)উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: অবস্থানে প্রকাশক অনুপস্থিত (লিঙ্ক)
  3. Ibn Ishaq, Guillaume (১৯৫৫)। The Life of Muhammad: A Translation of Ibn Isḥāq's sīrat। London। পৃ. ৭৩৬, ১২০, ৫৬৮, ৭২০, ৩০৫, ৫৫৭, ৭৫৬। আইএসবিএন ০১৯৫৭৭৮২৮৬ {{বই উদ্ধৃতি}}: আইএসবিএন / তারিখের অসামঞ্জস্যতা (সাহায্য)উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: অবস্থানে প্রকাশক অনুপস্থিত (লিঙ্ক)
  4. Watt, Montgomery (১৯৫৬)। Muhammad at Medina। পৃ. ৩০, ৩৬, ৭৯, ৮৮। আইএসবিএন ৯৭৮০১৯৯০৬৪৭৩১Qatan battle page 30, Mecca battle 36,79, Tulayha 88 {{বই উদ্ধৃতি}}: আইএসবিএন / তারিখের অসামঞ্জস্যতা (সাহায্য) Alt URL
  5. Shahid (১৯৮৯)। Byzantium and the Arabs in the 5th century। Washington D.C.: Dumbarton Oaks। আইএসবিএন ০৮৮৪০২১৫২১
  6. Angelika Neuwirth; Nicolai Sinai; Michael Marx, সম্পাদকগণ (২০১০)। The Qur'an in context historical and literary investigations into the Qur'anic milieu। Leiden: Brill। পৃ. ৩০২। আইএসবিএন ৯৭৮৯০৪৭৪৩০৩২২ Alt URL ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০১৫-১০-০২ তারিখে
  7. Karbala: Chain of events Section – The Battle
  8. George Makdisi, Notes on Ḥilla and the Mazyadids in Medieval Islam, Journal of the American Oriental Society, Vol. 74, No. 4 (Oct. - Dec., 1954), pp. 249–262
  9. Amiri Diwan, The Efforts of the Constituent Assembly, State of Kuwait 2006