বডি শেমিং

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বডি শেমিং

বডি শেমিং বা শরীর অমর্যদা বা শরীর উপহাস বা শরীর অসম্মান হচ্ছে কোনও ব্যক্তির শারীরিক অবস্থাকে উপহাস করা বা উপহাস করার মত কিছু কাজ করা।

শরীর অমর্যদা বা উপহাসের পদ্ধতি অনেক। চর্বি বা স্থুল হওয়ায়, পাতলা বা চিকন হওয়ায় , উচ্চতা বা লম্বা, লোমশতা বা লোম না থাকায়, চুলের রঙ, শরীরের আকৃতি, কারো পেশীবহুলতায় বা এর অভাব, চেহারার বা মুখের বৈশিষ্ট্যের জন্য এবং এর বিস্তৃত অর্থে ট্যাটু এবং ছিদ্র বা রোগে ও বিভিন্ন কারণে পড়া শারীরিক চিহ্ন বা দাগ এর জন্য লজ্জা দেয়া প্রভৃতি।[১][২]

শিশুদের মনস্তত্ত্ব প্রকাশ মূলক বিভিন্ন ছায়াছবিতে এর গুরুত্ব সম্পর্কে উপস্থাপিত যেখানে দেখানো হয়েছে শিশুদের জন্য বিভিন্ন মাধ্যমে সম্পর্কের এবং আন্তঃব্যক্তিক মিথস্ক্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে আকর্ষণীয়তার বিষয়টির প্রভাব বা ভূমিকা।[৩]

এগুলো নিয়ে গবেষণা করা হয় এবং গবেষণায় ব্যবহৃত সিনেমাগুলির মধ্যে দুটি ডিজনি মুভিতে ব্যক্তিগত সৌন্দর্য সম্পর্কে সর্বাধিক সংখ্যক বার্তা রয়েছে। এই সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে যে ৬৪% ছবিতে স্থূল চরিত্রগুলিকে অমনোযোগী, দুষ্ট, নিষ্ঠুর এবং বন্ধুত্বপূর্ণ বলে উপস্থাপন করেছে এবং অর্ধেকেরও বেশি চিত্রিত চিত্র বিবেচনা বা খাবারের সাথে জড়িত।[৪]

শরীর অমর্যদা -এর কিছু রূপ জনপ্রিয় কুসংস্কারের প্রাচীন উৎপত্তি, যেমন লাল চুলের প্রতি কুসংস্কার। বয়সের উপর নির্ভর করে বৈষম্যের রূপও উল্লেখযোগ্যভাবে আলাদা হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, সমবয়সীদের মধ্যে যারা লম্বা তাদের কখনও কখনও "লম্বু" এর মতো অবমাননাকর ছদ্মবেশী পদগুলির মুখোমুখি হতে হয়। তবে, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরে, এই ধরনের উদ্বিগ্ন মনোভাবগুলি সাধারণত একটি বিপর্যয় ঘটে কারণ তখন সমবয়সীদের মধ্যে লম্বা হওয়াটা গুরুত্ব সহকারে দেখা হয় সর্বত্র।[১] কখনো কখনো শরীর অমর্যদা এমন ধারণা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে যে যা একজন পুরুষত্ব বা নারীত্বকে পর্যাপ্তভাবে প্রদর্শন করে না। উদাহরণস্বরূপ,কখনও কখনও প্রশস্ত কোমর বা পুরুষের একটু সুডোল স্তন বা মুখে দাঁড়ির অভাব এ নারী বৈশিষ্ট্য উপস্থিত হওয়ার জন্য লজ্জা দেয়া।[৫] একইভাবে নারীদেহে পুরুষদের বৈশিষ্ট্য উপস্থিতির জন্য,[৬] যেমন: বিস্তৃত কাঁধ, পেশিবহুলতা, ছোটচুল অথবা টাক,দাড়ি বা লোমশতা প্রভৃতি থাকার কারণে বডি শেমিং করা।[৫]

শরীর অমর্যাদার বিস্তৃত স্তরের নেতিবাচক সংবেদনশীল প্রভাব থাকতে পারে, আত্ম-সম্মান হ্রাস (পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার) এবং অন্যান্য সমস্যা যেমন খাওয়ার ব্যাধি (ইটিং ডিজঅর্ডার), রাগ, উদ্বেগ,মানসিক চাপ, শরীরের ডিস্মারফিয়া এবং হতাশা[৭] এছাড়াও, শরীর অমর্যদা মারাত্মক বিষণ্নতার দিকে নিয়ে যেতে পারে, বিশেষ করে যখন মানুষ মনে করে যে তাদের শরীর সামাজিক মানদণ্ড পূরণ করতে পারে না।[৮]

যাঁরা বডি শেমিং করে, দেখা যায় তাঁরা নিজে হীনম্মন্যতায় ভোগে বা তাঁদের ব্যক্তিত্বের সমস্যা আছে। যিনি নিজে ব্যক্তিজীবনে বা পেশাগত ক্ষেত্রে কোথাও পরাজিত বা হতাশ, তাঁরাই বেশি বেশি শরীর অসম্মান করে থাকে। যাঁরা নিজেরা একসময় শরীর অসম্মান মুখোমুখি হয়েছিলো, পরবর্তী সময়ে তাঁদের মধ্যেও অপরকে শরীর অসম্মান করার প্রবণতা থাকতে পারে। যদি কারও মধ্যে ব্যক্তিত্বের বিকার থাকে, তবে কখনো তাঁরাও অপরকে শরীর অসম্মান করে থাকে।[৯]

বিভিন্ন দেশে বডি শেমিং ও আইন[সম্পাদনা]

  • মালয়েশিয়ায় সামাজিক মাধ্যমে কারো শরীর নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করলে সর্বোচ্চ সোয়া ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা সর্বোচ্চ এক বছরের জেল, কিংবা উভয় শাস্তি হতে পারে৷
  • ভারতে ২০২০ সালে এক নারী বডি শেমিং করায় তার স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ির বিরুদ্ধে মামলা করেন৷ অভিযোগে তিনি বলেন যে, ২০১৭ সালের বিয়ের পর থেকে তারা তার শরীরের অতিরিক্ত ওজন নিয়ে কথা বলতে থাকে৷
  • ইন্দোনেশিয়ায় বডি শেমিং করার অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাড়ে চার মাস জেল কিংবা সর্বোচ্চ সাড়ে চার হাজার ইন্দোনশিয়ান রূপি জরিমানা হতে পারে৷ সামাজিক মাধ্যমে বডি শেমিং করলে সর্বোচ্চ চার বছরের জেল কিংবা সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় শাস্তি হতে পারে৷
  • বাংলাদেশে ২০২২ সালের মার্চে প্রকাশিত এক জরীপ অনুযায়ী ৬৯.৯২ শতাংশ তরুণী শারীরিক অবয়ব নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্যের শিকার হয়েছেন৷ ৩৭.২৪ শতাংশ তরুণী আত্মীয় স্বজনদের কথায় ও ইঙ্গিতে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছেন৷ বন্ধুবান্ধবের কাছে বডি শেমিংয়ের শিকার হয়েছেন ২২ শতাংশ নারী৷ দেশে অন্যান্য যৌন হয়রানির ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ থাকলেও বডি শেমিংয়ের বিষয়ে আইন স্পষ্ট নয়৷ অন্য আইনগুলো দিয়ে মামলা করা বা থানায় অভিযোগ করা যায়৷
  • যুক্তরাষ্ট্রে মিশিগান রাজ্য ও সান ফ্রান্সিসকো, ম্যাডিসনের মতো কয়েকটি শহর ছাড়া বাকি সব জায়গায় চাকরিদাতারা মোটা হওয়ার কারণ দেখিয়ে কাউকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করতে পারে৷ এই বৈষম্য থেকে রক্ষা করার কোনো আইন নেই সেখানে৷ এক জরিপ অনুযায়ী প্রতি ২.৭২ কেজি ওজন বাড়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে একজন নারী কর্মীর বেতন ঘণ্টাপ্রতি দুই শতাংশ কমে গেছে৷
  • অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্যযুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত ওজনধারী প্রায় ১৪ হাজার মানুষের উপর পরিচালিত জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেকের বেশি তাদের ডাক্তার, পরিবার, বন্ধুবান্ধব, ক্লাসমেট ও সহকর্মীদের দ্বারা ফ্যাট-শেমিংয়ের শিকার হয়েছেন৷ সবচেয়ে বেশি (৭৬ থেকে ৮৮ শতাংশ) ফ্যাট-শেমিং করেছেন পরিবারের সদস্যরা৷[১০]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. চেন, হং এবং টড জ্যাকসন এর গবেষণা লেখা- "Are cognitive biases associated with body image concerns similar between cultures?." Body Image 2.2 (2005): 177-186.
  2. জীবনকর্ম সম্প্রদায়ের লেখা,https://www.lifeworkscommunity.com/blog/what-is-body-shaming-and-how-can-it-be-stopped
  3. সিলভিয়া হার্বোজো, স্ট্যাসি ট্যানলেটফ-ডান, জেসিকা গোকি-লারোস এবং জে। কেভিন থম্পসন এর গবেষণা লেখা।‌ প্রকাশ: টেন্ড অনলাইন, সময়: ১৭ আগস্ট ২০১০। https://www.tandfonline.com/doi/abs/10.1080/10640260490267742
  4. ব্রেডলি এস. গ্রিনবাগ, ম্যাথেউ এস্টেন এবং কেলি ডি. ব্রাউনেল এর গবেষণা, প্রকাশ: আমেরিকান জনস্বাস্থ্য পত্রিকা, https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC1447967/
  5. নামাস্তে, কি এর লেখা "Genderbashing: Sexuality, gender, and the regulation of public space." Environment and Planning D: Society and Space 14.2 (1996): 221-240.
  6. কবিতা মহারানা এর লেখা,২ আগস্ট ২০১৭, https://www.ibtimes.co.uk/that-your-d-bella-thorne-body-shamed-posing-see-through-bra-top-boxer-1633094
  7. ম্যাথেসন, মিকায়লা এর লেখা, "Women’s Body Image in the Media: An Analytical Study of Recent Body Image Movements across Media Platforms." (২০১৭).
  8. ব্রুইস, আলেকজান্দ্রা এ., ব্রুএনিং, মেগ এর গবেষণা লেখা, আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য পত্রিকা, প্রকাশ:২০১৮ , https://www.sciencedirect.com/science/article/abs/pii/S1740144519304929?via%3Dihub
  9. ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ এর লেখা, প্রকাশ: প্রথম আলো,১৪ জূলাই ২০২১। https://www.prothomalo.com/amp/story/feature/adhuna/%E0%A6%AC%E0%A6%A1%E0%A6%BF-%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%82-%E0%A6%95%E0%A6%96%E0%A6%A8%E0%A7%8B%E0%A6%87-%E0%A6%A8%E0%A7%9F
  10. বিশ্বজুড়ে বডি শেমিং ও আইনি সহায়তা, ডয়চে ভেলে বাংলা , ১ এপ্রিল ২০২২